অবিরাম প্রশ্নপত্র ফাঁস মানুষরূপী দানব তৈরির সুদূরপ্রসারী মেগা প্রজেক্ট! -মো: কামরুজ্জামান বাবলু

বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে একটি অতি পরিচিত দৃশ্য হলো পরীক্ষা শুরুর আগের রাতে ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরের দিন পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে মিলিয়ে দেখা গেল মূল প্রশ্নের সাথে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের প্রায় শতভাগ মিল। যারা আরেকটু স্মার্ট তারা ফেসবুকের পাশাপাশি হোয়াটস অ্যাপ (WhatsApp) ও ভাইবারসহ (Viber) আরো নানা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়ে থাকেন। আর শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের গতানুগতিক প্রতিক্রিয়া হলো- দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না, এরপর আর প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝে মধ্যে দু’চারজন চুনোপুঁটিকে আটক করে বাগাড়ম্বর সংবাদ সম্মেলন করার দৃশ্যও হরহামেশা চোখে পড়ে। কিন্তু পরিস্থিতি একই রয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
এবার একটা সহজ সমীকরণ মেলাতে চাই। প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে বর্তমান সরকার ও তার শিক্ষামন্ত্রী যে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন তাতে ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামী মূল্যবোধের কোনো স্থান দেয়া হয়নি। কিন্তু পাঁঠাবলি থেকে শুরু করে হিন্দুত্ববাদের অসংখ্য উপাদান পরতে পরতে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। এর মানে হলো একটি কোমলমতি শিশু তার শিক্ষাজীবন শুরু করে পর্যায়ক্রমে যখন মাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে উচ্চ-মাধ্যমিকে পা রাখবে তখন সে আপাদমস্তক একজন নাস্তিক কিংবা কিছুটা হিন্দু ধর্মের ব্যাপারে আস্তিক হিসেবে গড়ে উঠবে। অবশ্য ধর্মীয় মূল্যবোধকে সুদীর্ঘকাল ধরে লালন করে তিল তিল গড়ে ওঠা এদেশের পরিবার ও সমাজব্যবস্থা এক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করবে। তবে, এই পরিবার ও সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে স্টার জলসা ও স্টার প্লাসের মতো ভারতীয় চ্যানেল এবং হাজারো নাইট শো সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
অপরদিকে, একটি শিশু ও তরুণ যখন সততা, দেশপ্রেম ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার কথা ঠিক তখনই সেই শিশু-কিশোরটি ফেসবুক খুলে বসে থাকে পরের দিনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাবার আশায়। পেয়েও যাচ্ছে অনায়াসে। আর এজন্য বাবা-মাকে দেদার পয়সাও খরচ করতে দেখছে সেই শিশু-কিশোরটি। আর যেই তরুণ-তরুণীটি এভাবে প্রশ্নপত্র জোগাড় করতে পারেনি, সে যখন দেখছে যে পরীক্ষার আগের রাতে যারা প্রশ্নপত্র পেয়েছে, তাদের পরীক্ষা তার চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে, তখন ওই কোমলমতি শিক্ষার্থীর মনটা যে কতটা বিষিয়ে যায় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাস্তবতা তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? একদিকে শিশুকাল থেকে শিখছে নাস্তিক্যবাদ যাতে পরকাল ও মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই এবং যেখানে শেখানো হচ্ছে যে এই দুনিয়াই সব। সফলতা কিংবা ব্যর্থতা যা কিছু তা সব এই দুনিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অপরদিকে, পর্যায়ক্রমে শিশুটি যতই বড় হচ্ছে ততই দেখতে পাচ্ছে যে কঠোর পরিশ্রম বা নিয়মিত অধ্যয়নের কোনো মূল্য নেই; এবং আগের রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করার মধ্যেই বেশি লাভ। এভাবে, গত প্রায় এক দশক ধরে যে কয়েকটি প্রজন্ম ক্রমেই বেড়ে উঠছে তারা কতটা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে? এরা বড় হয়ে যদি এক একজন সুবিধাভোগী, ঘুষখোর ও ধর্মহীন দানবে পরিণত হয় সেটা কি অবাক হবার মতো ঘটনা হবে? এ অবস্থা আরো কিছুকাল চললে খুব শিগগিরই দেশ ভরে যাবে মেধাশূন্য মানব দানবে যাদের কাছ থেকে দেশ, জাতি ও ধর্ম বলে কিছু থাকবে না। এরা শুধু নিজের ভোগবিলাস ও স্বার্থ সিদ্ধি করতে গিয়ে দেশটাকে রীতিমতো নরকে পরিণত করবে বলে অনেকেরই আশঙ্কা।
এদিকে, পরিস্থিতি এখন এতটাই নাজুক যে শুধুমাত্র প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিকই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তী স্বপ্নের বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হচ্ছে অহরহ। অর্থের লোভে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র, শিক্ষক ও কোচিং সেন্টার এই অপতৎপরতার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং শিগগিরই তাদের দমন করা হবে- এ ধরনের সস্তা বুলি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ হয়তোবা আওড়াতে পারেন। এ ছাড়া আর কিইবা বলবেন তিনি? কিন্তু আমি অন্তত এমন সরল সমীকরণে বিশ্বাস করি না এবং দেশের সচেতন জনগণও বিশ্বাস করে না বললেই আমার ধারণা। আমি মনে করি, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত রয়েছে।
পৃথিবীজুড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের একটি অতিপ্রিয় পলিসি বা নীতিমালা হলো- যদি কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চাও তাহলে সবার আগে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দাও। এবার একটু হিসাব মেলাই- নব্বইভাগ মুসলিম অধ্যুষিত এই ভূখণ্ডটি তার নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক তা একেবারেই কাম্য নয় এমন কেউ কি আছে? আমার মনে হয় বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। একটি উদার, মুসলিম ও সহনশীল জাতি হিসেবে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক তা কখনোই যেই প্রতিবেশী মেনে নিতে পারেনি তা সবাই খুব ভালো করে জানেন। তাই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে এদেশের নাস্তিক্যবাদী শক্তির প্রতি সব ধরনের মদদ ওই প্রতিবেশীর কাছ থেকে আসছে বলেই এদেশের বেশির ভাগ মানুষের বিশ্বাস।
তবে, নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো এক ধরনের কাপুরুষতা বৈ আর কিছু নয়। তাই প্রতিবেশী দেশ কিংবা বহির্শক্তিকে দোষ দিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর মতো হীনমন্যতায় ভুগতে চাই না। শুধুমাত্র ঘটনার গভীরে যাবার স্বার্থে আসল কারণগুলো খতিয়ে দেখতে গিয়েই আমাকে এই কথাগুলো বলতে হলো। কারণ এটাই হলো আজকের বাস্তবতা, আজকের বাংলাদেশ। ক্ষমতার মসনদে বসে আজকে যাদের শক্তিধর প্রতিবেশীর সামনে হাত কচলাতে কচলাতে হাতের রেখা মুছে ফেলার উপক্রম হয়েছে তাদের কাছে আমি সবিনয়ে জানতে চাই- আপনারা কি জানেন যাদেরকে আপনারা অকৃত্রিম বন্ধু বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলছেন তাদের অলঙ্ঘনীয় বিদেশনীতি (Foreign Policy) হলো- সব প্রতিবেশীই আমার শত্রু, কেউ আমার বন্ধু নয়।
এবার কয়েকটি অসঙ্গতির প্রতি একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। শিক্ষামন্ত্রী যা বলছেন আর বাস্তবে যা হচ্ছে তার কিছু খতিয়ান দেখতে চাই। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ইংরেজি দৈনিক ‘দি ডেইলি স্টার’ এর শিরোনাম ছিল ‘Allegation of SSC question paper leak, again অর্থাৎ ‘মাধ্যমিকে আবারো প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ’। প্রতিবেদনের খানিকটা তুলে ধরছি:
ÔAllegations of question paper leakage in the ongoing SSC examinations surfaced again despite education minister’s insistence that there was no possibility of question leakage this time. Students and guardians said sample questions, similar to those of the Bangla second paper under the Dhaka Board held on Sunday, were also found before the English first paper examination yesterday. Some guardians in Dhaka alleged they found sample questions on different Facebook pages the night before the exams, which were circulated through different online voice and messaging services like WhatsApp and Viber.’
অর্থাৎ ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আবারো কালিমালিপ্ত হলো চলমান মাধ্যমিক পরীক্ষা যদিও শিক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছিলেন যে এবারের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সম্ভাবনা নেই। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, গত রোববার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ঢাকা বোর্ডের অধীনে যে বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তার প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। গতকাল (৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ইংরেজি প্রথমপত্র পরীক্ষার আগে এটা নজরে আসে। ঢাকার কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, পরীক্ষাগুলোর আগের রাতে কয়েকটি ফেসবুক পেজে তারা প্রশ্নপত্র (sample questions) পান। হোয়াটস অ্যাপ ও ভাইবারসহ বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ব্যাপারে আগেই প্রচারণা চালানো হয়েছিল।’
সরকার এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ কেন নিচ্ছে না সে ব্যাপারে অভিভাবকদের ক্ষোভের বিষয়টিও উঠে আসে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে। শিক্ষার্থীদের বরাত দিয়ে ডেইলি স্টার আরো জানায়, বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সাথে আগের রাতে পাওয়া প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখা যায় অনেক কিছু মিলে যাচ্ছে। রচনা ও প্যাসেজসহ কী কী হুবহু মিলেছে তারও বিস্তারিত তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
কিন্তু মজার বিষয় হলো গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো প্রমাণ তারা পাননি। এমনকি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আরো একধাপ এগিয়ে বলেন, সোমবার মধ্যরাতে (৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা মূল প্রশ্নপত্রের সাথে ফেসবুকের প্রশ্ন মিলিয়ে দেখেছেন। কোন প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি জাল প্রশ্নপত্রের পেছনে না ঘোরার জন্য অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আহবানও জানান।
শিক্ষামন্ত্রীর এমন বাগাড়ম্বরের পর এক সপ্তাহ পেরুতে পারেনি এরই মধ্যে চলমান মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত ৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা সবাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ ঘটনায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতোই ফাঁস হয়ে যায় শিক্ষামন্ত্রীর মিথ্যাচার। ডেইলি স্টারের ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭-এর সংবাদ শিরোনাম ছিল ‘6 held over SSC question paper leakঅর্থাৎ ‘মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে ৬ জন আটক’। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) পুলিশের সংবাদ সম্মেলনের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ৬ জনকে নানা উপকরণসহ আটক করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘The arrestees were admins of various Facebook groups such as All Board Examinee, SSC Question 2017 Dhaka Board and SSC Question 2017 Barisal Board, the police official said. They distributed fake question papers via messenger group on Facebook using fake IDs and on messaging site Whatsapp. Each question paper was sold between Tk. 500 to Tk. 25,000 .

অর্থাৎ ‘পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, আটককৃতরা বিভিন্ন ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন বা নিয়ন্ত্রক। All Board Examinee (সব বোর্ডের শিক্ষার্থী), SSC Question 2017 Dhaka Board  (এসএসসি প্রশ্ন ২০১৭ ঢাকা বোর্ড) এবং SSC Question 2017 Barisal Board  (এসএসসি প্রশ্ন ২০১৭ বরিশাল বোর্ড), ইত্যাদি নামের ফেসবুকের অ্যাডমিন তারা। ভুয়া ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে তারা এই পেজগুলো চালাতো এবং হোয়াটস অ্যাপে ছড়িয়ে দিত। প্রতিটি প্রশ্নপত্র তারা ৫ শ’ টাকা থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতো।’
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ ধরনের কেলেঙ্কারির পর কোনো সভ্য দেশের শিক্ষামন্ত্রী স্বপদে বহাল থাকতেন কিনা সন্দেহ। নিশ্চয়ই তিনি ব্যর্থতার দায়ভার স্বীকার করে পদত্যাগ করতেন। কিন্তু সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীর জন্য এটা কোনো বিষয়ই নয়। তিনি বহাল তবিয়তে তার পদে অধিষ্ঠিত আছেন এবং একই বাগাড়ম্বর আওড়াতে থাকেন গণমাধ্যমের সামনে। অপরদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসও চলতে থাকে অব্যাহত গতিতে। গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। সুদূরপ্রসারী এই চক্রের কাছে যেন অসহায় হয়ে পড়েন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
চলতি বছরের ৯ মার্চ ‘প্রশ্নফাঁস উদ্বেগজনক, নিরসন হওয়া দরকার’- এই শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অব্যাহত প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিব্যক্তিত্ব ও নাগরিক। আজ বৃহস্পতিবার ‘শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন’ নামে এক সংগঠন গণমাধ্যমে এ বিবৃতি পাঠিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হচ্ছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও প্রচারমাধ্যম থেকে তাঁরা জানতে পারছেন। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষাতেও বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রশ্নফাঁস হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় এসেছে। এগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো, তা জানা যায়নি।
তাঁরা সরকারের শিক্ষা-কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেন, এগুলোর সঠিকভাবে তদন্ত করা হোক। প্রশ্নফাঁস প্রমাণিত হলে পরীক্ষাগুলো পুনরায় গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁসের মতো অসৎ প্রক্রিয়ার সঙ্গে উচ্চ থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত, যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। তা না হলে এটা শিক্ষাঙ্গনে ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনবে। জাতির এই ক্ষতি কখনো কাটিয়ে ওঠা যাবে না।’
কিন্তু শত বিবৃতি ও উদ্বেগে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলে প্রশ্নপত্র ফাঁস। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না এই দুষ্ট ক্ষত থেকে। উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি উল্লেখ করতে চাই। ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্নফাঁস : এফ ইউনিটের ভর্তি বাতিল, আবার পরীক্ষা’Ñএই শিরোনামে গত ৬ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হলো: ‘কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার এফ ইউনিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের সত্যতা পাওয়ায় ওই ইউনিটের ভর্তি বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে ওই ইউনিটের পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে সাময়িক বহিষ্কার, দু’জন শিক্ষককে পরীক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও স্নাতকোত্তর বিভাগের এক শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব এবং স্নাতক শ্রেণীর সনদ বাতিল করা হয়েছে।’
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষাক্ষেত্রে কখনোই যা ঘটেনি তাও ঘটেছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষে সব শিক্ষার্থীর স্বপ্নের বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পর্যন্ত ফাঁস হয়েছে। এমনকি ৩৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছিল। ‘৩৩তম লিখিত পরীক্ষা হঠাৎ স্থগিত : বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস?’- এই শিরোনামে ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হলো: ‘আকস্মিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে ৩৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে কয়েক দিন ধরে আলোচনা চলছিল। তবে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) থেকে বলা হয়েছিল, ‘গুজবে কান দেবেন না’। কিন্তু গতকাল শনিবার শেষ পর্যন্ত পিএসসি গুজবে কান দিয়েছে। আজ রোববার থেকে এই লিখিত পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল।’
পরবর্তীতে এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত অনেককে আটকও করা হয়। যাই হোক, লেখা আর দীর্ঘায়িত করতে চাই না। ‘আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন’ শিক্ষামন্ত্রীর সবশেষ অনুভূতির কথা একটু তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি পরিবেশের মধ্যে আছি যা আমরা সব খুলে বলতেও পারি না, সহ্যও করতে পারি না। কিন্তু আমরা আর সহ্য করব না। সত্যিকার অর্থে আমাদের মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক বেশি দরকার।’ ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৭ শিক্ষকসহ ১৯ জনের নাম এসেছে’- এই শিরোনামে গত ১১ মার্চ ২০১৭ তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
সত্যি কথা বলতে কখনো শিক্ষকের দোষ, কখনো অভিভাবকের দোষ, আবার কখনোবা শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে কিংবা লোক দেখানো আক্ষেপের মধ্যেই যে শিক্ষামন্ত্রীর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ তা সবার কাছেই পরিষ্কার। কারণ আসল ক্ষত যে অন্যখানে। সেখানে মলম না লাগালে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কিন্তু একতরফা নির্বাচন ও ভারতের একচেটিয়া সমর্থন নিয়ে স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতায় টিকে থাকা এই সরকারের পক্ষে সেই আসল ক্ষত সারিয়ে তোলা কখনোই সম্ভব হবে না।
একটু ভেবে দেখুন, আমরা যে বয়সে ‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’, ‘একতাই বল’, ‘কে ওই শোনালো মোরে আজানের ধ্বনি’, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’- এমন শত শত নীতিবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের কথা শুনে মুগ্ধ হতাম, শিক্ষকের মর্যাদার ওপর চমৎকার কবিতা ও গল্প শুনতাম, সেই বয়সের এখনকার সন্তানেরা সারাদিন ফেসবুক নিয়ে বসে থাকে ফেসবুক বিশেষজ্ঞ হওয়ার আসায় যাতে পরীক্ষার আগের রাতে কোনমতেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয়। আর টিভির পর্দায় আমরা যখন টিপু সুলতান ও সিন্দাবাদের মতো কাহিনী দেখতাম, এখন সেখানে পরকীয়া ও  পারিবারিক কলহনির্ভর ধারাবাহিক নাটকে পূর্ণ স্টার জলসা দেখছি। সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, পিস টিভি, ইসলামিক টিভি ও দিগন্তের মতো দর্শকনন্দিত টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর। এখন যা করণীয় বলে আমার বিশ্বাস তা হলো- প্রত্যেক পরিবারকে এক একটি সুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে হবে, গড়ে তুলতে হবে পারিবারিক পাঠাগার ও গবেষণাগার, পাড়া ও মহল্লায় মহল্লায় গড়ে তুলতে হবে গণ পাঠাগার যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের জ্ঞানসমৃদ্ধ বই থাকতে হবে। শাহজালাল, শাহমাগদুম ও শাহপরাণের এই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিতে হবে, আসল শত্রু-মিত্র চিনতে ভুল করা যাবে না।
লেখক : সাংবাদিক