ক্যারিয়ার গড়ুন মানবাধিকারে -শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় হচ্ছে মানবাধিকার। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এবং সামাজিক জীব হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মানবাধিকার অপরিহার্য। মূলত মানবাধিকার হলো ক্ষুধা ও ভয় থেকে মুক্তি এবং স্বাধীনতা। এটি একটি সহজাত বিষয় যা মানুষ জন্ম নেয়ার পর থেকেই তার প্রাপ্য। মানবাধিকার ব্যক্তিকে স্বাধীনতা, সমতা এবং মর্যাদা দিয়ে থাকে। প্রায় সব দেশে মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠন রয়েছে। যেগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। মূলত আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মানবাধিকার সুরক্ষা, চর্চা এবং বিকাশ সাধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সচেতন মানুষ মাত্রই মানবাধিকার নিয়ে সতর্ক অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। একজন মানবাধিকারকর্মী প্রতিটি সমাজ রাষ্ট্রের সবচেয়ে সচেতন সুতীক্ষè ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে মানবাধিকারের কাজের ক্ষেত্র প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সাধারণ জনগণ এমনকি শিক্ষিত সমাজে ক্যারিয়ারের ব্যাপারে এক ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। সমাজের অধিকাংশ মানুষ ভালো ক্যারিয়ার বলতে শুধুমাত্র ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার, সরকারি চাকরি, প্রতিরক্ষা ইত্যাদিকে বুঝে থাকেন। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও রয়েছে সম্মানজনক বেতন ও অন্যান্য সকল সুযোগ সুবিধাসহ এনজিও ও মানবাধিকারে স্বাধীনভাবে কাজ করার অনন্য সুযোগ। অধিকার, আইন ও সালিশকেন্দ্র, ব্লাস্ট এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির মতো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত মানবাধিকার সংগঠনসহ প্রায় ৪০০ মানবাধিকার সংগঠনে আকর্ষণীয় বেতন এবং অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়ে কর্মরত আছেন কয়েক হাজার মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠক। চাইলে আপনিও হতে পারেন একজন দক্ষ মানবাধিকারকর্মী। কিন্তু তার জন্য দরকার যথাযথ নির্দেশনা ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ।

মানবাধিকার কী?
মানবাধিকারের আক্ষরিক অর্থ হলো মানুষের অধিকার। সাধারণত মানবাধিকার বলতে মানুষের সে সকল অধিকার বোঝায় যা নিয়ে সে জন্মগ্রহণ করে, যা তাকে বিশিষ্টতা দান করে এবং যা হরণ করলে সে আর মানুষ থাকে না। অর্থাৎ মানুষকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য যে সকল অধিকার দরকার তাই মানবাধিকার। মানবাধিকার সে সকল অধিকারকে নির্দেশ করে যা স্বাভাবিক ও সহজাত। জীবনধারণ ও বেঁচে থাকার অধিকার এবং মতপ্রকাশের অধিকার, অন্ন বস্ত্র ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের অধিকার প্রভৃতি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে মানবাধিকার বলতে পারি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রত্যেক ব্যক্তির মানুষ হিসেবে মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ অধিকার পাওয়া একান্ত প্রয়োজন।
কোন ব্যক্তিবিশেষের সকল দাবিই মানবাধিকার বলে গণ্য হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন ব্যক্তি যদি যেভাবে খুশি জীবিকা নির্বাহ করতে চায় বা যা খুশি তা করতে চায় তাহলে তার এ দাবিকে মানবাধিকারের পর্যায়ভুক্ত বলে অভিহিত করা যায় না। কারণ যথেচ্ছাচার কোনো সভ্য সমাজে অধিকার বলে গণ্য হতে পারে না।

মানবাধিকার সংগঠন কিভাবে
কাজ করে?
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দেশে দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষার জন্য কাজ করে আসছে। মানবাধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নীতিমালা ও আইন প্রণয়নে সরকারকে উদ্বুদ্ধকরণ ও সহযোগিতা প্রদান, গবেষণা, আইনি সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানের মাধ্যমে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ করে থাকে। মানবাধিকারের লঙ্ঘন প্রতিরোধ, ঘটনার তদন্ত, রিপোর্ট প্রকাশ, পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারকে চাপ প্রয়োগ ইত্যাদি মানবাধিকার সংগঠনের অন্যতম প্রধান কাজ। এ ছাড়া মানবাধিকার বিষয়ে পরামর্শ প্রদান, শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা, মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পলিসি বিশ্লেষণ, অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন মনিটরিংসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে মানবাধিকার সংগঠনসমূহ।

মানবাধিকারে ক্যারিয়ার গড়ার
গুরুত্ব কী?
সমাজের বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য : ইসলাম এসেছে মানবতার মুক্তির জন্য। এটি হচ্ছে মানবতার ধর্ম। পবিত্র কুরআনে সূরা নিসার ৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে তোমরা কেন আল্লাহর রাস্তায় লড়াই সংগ্রাম করছো না? অথচ নির্যাতিত মানবতা আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছে, হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে এই নির্যাতিত জনপদ থেকে বের করে নিয়ে যাও অথবা আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী পাঠাও।’ কিন্তু আজকের সমাজে যখন কোন একজন নারী নির্যাতিত হয়, কোন একজন শ্রমিক তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, যখন ক্ষমতাসীন বা স্বার্থান্বেষী কোন মহল দ্বারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রান্ত হয় তখন সেখানে ছুটে যায় বাম ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা। আর ঢালাওভাবে দোষারূপ করে ইসলামপন্থিদেরকে। ফলে বিভ্রান্ত হয় ঐ নির্যাতিত সম্প্রদায়, দেশের জনগণ ও বিশ্বসম্প্রদায়। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই উপায় আর তা হলো এই নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা।

দেশ, জাতি ও বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য : আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪ শত বছর পূর্বে রাসূল (সা) বলে গেছেন সেবার বিনিময়ে আসে নেতৃত্ব। বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটেও আমরা দেখি যে সকল ব্যক্তি বা সংগঠন মানুষের বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ায়, কোন সংকট সমাধানে যে সকল দেশ এগিয়ে আসে তারাই নেতৃত্ব দেয়। অথচ আজকে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বিশেষ করে সিরিয়া, মিয়ানমার, ফিলিস্তিন ও কাশ্মিরসহ সারা পৃথিবীর নির্যাতিত মানবতার আর্তনাদে আকাশ বাতাস যখন প্রকম্পিত তখনও আমরা মুসলমানরা অর্থবহ সহযোগিতা তো নয়ই; এমনকি চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রটুকুও পৃথিবীবাসীর সামনে তুলে ধরতে পারছি না। যতটুকু সহযোগিতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র বিশ্ববাসীর নিকট ফুটে উঠছে তার বেশির ভাগ হচ্ছে অমুসলিমদের মাধ্যমে। এই অবস্থা চলতে থাকলে বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়াতো দূরের কথা মুসলিম উম্মাহ তথা নিজেদের নেতৃত্বই নিজেরা দিতে পারবো না।

জীবিকা উপার্জনের জন্য : মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে শুধু জনগণের সেবা নয় বরং সম্মানজনক জীবিকা উপার্জনেরও একটা ভালো উপায় হতে পারে এই মানবাধিকার। মানবাধিকারের মতো একটি চ্যালেঞ্জিং ও উপভোগ্য সেক্টরে সাজাতে পারেন আপনার ক্যারিয়ার। এই সেক্টরে রয়েছে খ্যাতি, সুনাম, সুপরিচিতির পাশাপাশি উজ্জ্বল জীবনের হাতছানি। বিশ্বব্যাপী তো বটেই, বাংলাদেশেও রয়েছে এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার বিশাল সুযোগ। যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজের ক্যারিয়ারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান মানবাধিকার বিষয়টি তার জন্য সোপান হতে পারে।

মানবাধিকার নিয়ে ক্যারিয়ার
গড়বেন কোথায়?
জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অবস্থিত জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন অফিস এবং ১৩টি অঞ্চল ও ১৩টি দেশে অবস্থিত মানবাধিকার হাইকমিশন অফিসে কর্মরত রয়েছেন ১০৮৫ জন ব্যক্তি (৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত)। এ ছাড়া জাতিসংঘ শান্তিমিশন ও রাজনৈতিক অফিসে ৬৮৯ জন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক স্কেলে বেতন কাঠামোর কারণে এই অঙ্গনে ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী স্বপ্নচারী ছাত্রছাত্রীদের জন্য চাকরি পাওয়া সোনার হরিণ পাওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার সংগঠন : মানবাধিকার হাইকমিশনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক মানবাধিকার সংগঠনসমূহে রয়েছে ক্যারিয়ার গড়ার অনন্য সম্ভাবনা। নিউ ইয়র্কভিত্তিক হিউম্যানরাইটস ওয়াচ, লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, জার্মানভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ, আর্টিকেল-১৯, এফআইডিএইচ (FIDH) প্রভৃতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন; ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন হিউম্যান রাইটস কমিশন, এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, আফ্রিকান হিউমেন রাইটস কমিশন প্রভৃতি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার সংগঠনে ক্যারিয়ার গঠন করে আপনিও হতে পারেন সমাজের অন্যান্য মানুষের প্রেরণার উৎস।
জাতীয় ও স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন : আমাদের দেশে মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যা ২০০৮ সালের ১লা ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। এই প্রতিষ্ঠানটি ১ জন চেয়ারম্যান ও ৬ জন সদস্য নিয়ে গঠিত। এ ছাড়াও এখানে কর্মরত রয়েছেন আরও অনেক কর্মকর্তা। অন্যদিকে ১৫০টিরও অধিক নিবন্ধিতসহ প্রায় চার শতাধিক বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক), অধিকার, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি, BLAST, মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস কমিশন ইত্যাদি। যেখানে প্রায় ১০ হাজারের অধিক ব্যক্তি কর্মরত রয়েছেন। মানবাধিকারের গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবাধিকার বিষয়টিকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উচ্চতর ডিগ্রি ও কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ।

মানবাধিকার সংগঠন প্রতিষ্ঠা
মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগী সংগঠন তৈরির মাধ্যমে উদ্যোক্তা হওয়ারও ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। যেসব বিষয় বা ইস্যুতে সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও কাজ করার অনন্য সুযোগ রয়েছে সেগুলো হলো- Women Rights, Child Rights, Labor Rights, Indigenous/ Tribal Rights, Minority Rights, Third Gender Rights, Health Service, Legal Aid, Alternative Dispute Resolution, Rights of Information, Refugee, Education, Awareness Building, Poverty Alleviation etc.

কী হিসেবে গড়বেন মানবাধিকার ক্যারিয়ার?
মানবাধিকারকে আপনি সহজেই নিতে পারেন আপনার ক্যারিয়ার হিসেবে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে আপনিও হতে পারেন একজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী। মানবাধিকারে ক্যারিয়ার গড়ার রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ। তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে
#    মানবাধিকার কর্মকর্তা
#    ফ্রিল্যান্স মানবাধিকার কর্মী
#    মানবাধিকার সংগঠক
#    মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত
#    মানবাধিকার আইনজীবী
#    মানবাধিকার গবেষক
#    মানবাধিকার সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবাধিকার কর্মকর্তা : বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আকর্ষণীয় বেতন ও সুনাম-সুখ্যাতিসহ মানবাধিকার কর্মকর্তা হিসেবে চাকরির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনের সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, লিগ্যাল কাউন্সিলর, পাবলিকেশন কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক, ডকুমেন্টেশন কর্মকর্তা, নেটওয়ার্কিং কর্মকর্তা, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, তদন্ত কর্মকর্তা ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনার ক্যারিয়ার শুরু করতে পারেন। পরবর্তীতে হতে পারেন পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক ইত্যাদি।

ফ্রিল্যান্স মানবাধিকারকর্মী : সিটিজেন জার্নালিজমের মতো মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার এখন একটি প্রচলিত টার্ম। কোন মানবাধিকার সংগঠনের সাথে সরাসরি জড়িত না হয়েও আপনি হতে পারেন মানবাধিকার কর্মী। ভূমিকা রাখতে পারেন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়। চারপাশে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনার ডকুমেন্ট, ছবি, ভিডিও সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনে পাঠানো এবং এসকল ঘটনার উপর রিপোর্ট, ডকুমেন্টারি, ভিডিও ক্লিপ তৈরি করে অনলাইন বা অফলাইন পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করার মধ্য দিয়ে যে কোন ব্যক্তিই মানবাধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। হতে পারেন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী।

মানবাধিকার সংগঠক : প্রতিষ্ঠিত কোনো মানবাধিকার সংগঠনে কিছু দিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলে আপনি নিজেই আপনার কিছু বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে সহজেই প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নতুন মানবাধিকার সংগঠন। এভাবে হতে পারেন মানবাধিকার সংগঠক। তবে এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের অবশ্যই মানবাধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনের বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন পর্যায়ে ভালো যোগাযোগ থাকা দরকার। তার চেয়ে বেশি থাকা দরকার মানুষ ও মানবতার প্রতি কমিটমেন্ট।

মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত : জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের অধীনে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশেষ মানবাধিকার দূত নিয়োগ করা হয়। এটা কোন ব্যক্তি অথবা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা গ্রুপও হতে পারে। এই বিশেষ দূত দুই ধরনের হতে পারে। ইস্যুভিত্তিক (Thematic) এবং দেশভিত্তিক (country based). বর্তমানে ৪৩টি ইস্যুভিত্তিক এবং ১৩টি দেশভিত্তিক দূত রয়েছে (৩০ সেপ্টেম্বও ২০১৬ পর্যন্ত)।

মানবাধিকার আইনজীবী : মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে আপনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। আপনাকে প্রথমে আইনের উপর ডিগ্রি নিতে হবে। আপনার যদি মনে হয় যুক্তি-তর্কে কাউকে পরাজিত করে সহজেই জিতে যান তাহলে ‘মানবাধিকার আইনজীবী’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা উচিত। দেশে দেশে কোন না কোন মাধ্যমে প্রচুর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকে। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে ঘোরতর অপরাধ বন্ধে আপনি রাখতে পারেন অসামান্য ভূমিকা। বিভিন্ন মানবাধিকার ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে হাইকোর্টে রিট করে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভকারী মনজুর মোর্শেদ গংয়ের মতো আপনিও হতে পারেন একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী।

মানবাধিকার গবেষক : মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পৃথিবীতে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। আপনিও চাইলে হতে পারেন একজন মানবাধিকার গবেষক। লুফে নিতে পারেন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশি বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষণা সংস্থায় উচ্চ বেতন ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধাসহ গবেষক হওয়ার অনন্য সুযোগ। প্রকাশ করতে পারেন মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন বই ও গবেষণাপত্র।

মানবাধিকার সাংবাদিক ও কলামিস্ট : মানবাধিকার সাংবাদিকতা তাদের জন্য যারা তদন্ত করতে ভালোবাসে, যারা মানবাধিকার পরিস্থিতি সঠিক জায়গা থেকে তুলে আনতে পছন্দ করে। এজন্য দরকার সুনিপুণ লেখার হাত এবং শক্ত ফটোগ্রাফি দক্ষতা। মানবাধিকার সাংবাদিকতা তাদের জন্য যারা ঝুঁকি নিতে ভালোবাসে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মানবাধিকার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। স্বনামধন্য দেশি বিদেশি পত্রিকায় কলামিস্ট হিসেবে বিভিন্ন মানবাধিকার ইস্যুতে কলাম লিখতে পারেন।

মানবাধিকারে ক্যারিয়ার গড়ার
যোগ্যতা কী?
মানবাধিকারে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে কিছু দক্ষতা অবশ্যই থাকা দরকার। মানবাধিকারে তারাই ভালো করতে পারে যাদের বিশ্লেষণী শক্তি, লেখার দক্ষতা, গবেষণা দক্ষতা ইত্যাদি বিষয়ে ভালো দখল রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনে ক্যারিয়ার প্রত্যাশীদের ওরাল এবং রিটেন কমিউনিকেশন স্কিল চমৎকার হতে হয়। জনসম্পৃক্ততা, বিদেশী ভাষা দক্ষতা, স্বতঃস্ফূর্ততা, নমনীয়তা ইত্যাদি যোগ্যতা একজন প্রার্থীকে এগিয়ে রাখে।
মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন ধরনের সনদ, দলিল ও ঘোষণাপত্র যেমন- United Nations Universal Declaration of Human Rights (UDHR), International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR), International Covenant on Economic, Social and Cultural Rights (ICESCR), Convention on the Elimination of Discrimination Against Women (CEDAW), International Convention on the Elimination of All Forms of Racial Discrimination (ICER) ইত্যাদি ও দেশের সংবিধান সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হয় একজন মানবাধিকার ক্যারিয়ারপ্রত্যাশীকে।

কোথায় নেবেন প্রশিক্ষণ?
মানবাধিকার একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। এখানে অনেক কিছু শেখার আছে। অনেক কিছু জানার আছে। অনেকে আছেন যারা মানবাধিকারে আসতে চান কিন্তু সঠিক প্ল্যাটফর্ম জানা না থাকায় আসতে পারছেন না এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণও নিতে পারছেন না। বুঝতে পারেন না কী করবেন, কোথায় যাবেন। তবে মানবাধিকারে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে ক্যারিয়ার গঠনে আগ্রহীদের আর কোনো চিন্তা নেই।
বাংলাদেশের শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠনগুলোতে রয়েছে ইন্টার্ন করার সুবিধা। তাছাড়া সম্প্রতি আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, এনজিও ও উন্নয়নকর্মীদের জন্য একটি কোর্স চালু করেছে যার নাম হচ্ছে ‘‘Human Rights and Gender Relations Analysis’. অধিকার ও সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস স্টাডিজ মানবাধিকার বিষয়ে স্বল্প খরচে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বছরের বিভিন্ন সময়ে ওয়ার্কশপ, সেমিনার ও কনফারেন্সের আয়োজন করে থাকে।Coursera.org ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবাধিকার বিষয়ে কোর্স করতে পারবেন অনায়াসে।
পৃথিবীতে যে কয়টি চ্যালেঞ্জিং পেশা রয়েছে তার মধ্যে মানবাধিকার অন্যতম। এ পেশায় যেমন রয়েছে ঝুঁকি তেমনি রয়েছে সম্মান, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ। আকর্ষণীয় বেতন, সম্মান ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি সব মিলিয়ে মানবাধিকার নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতেই পারেন। ভূমিকা রাখতে পারেন নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে। অবদান রাখতে পারেন মানুষের মধ্যে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, সুরক্ষা প্রদান, প্রতিকার বিধান ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে। সেই সাথে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করতে পারেন।
লেখক : মানবাধিকার সংগঠক ও
সমাজ উন্নয়ন কর্মী