তাঁবেদারি নয় নেতৃত্বের ধর্ম ইসলাম -রিদওয়ান বিন ওয়ালী উল্লাহ

নাবিকবিহীন নৌকা নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি। এ কথা সচেতন ব্যক্তি মাত্রই অনুধাবন করতে পারে। যাত্রীবাহী চলমান বাস হঠাৎ ড্রাইভারের ব্যালান্স হারিয়ে ফেলা- কী দশা হবে? পরিচালকবিহীন প্রতিষ্ঠান ক’দিন চলবে? একটু ভেবে দেখুন তো! সুতরাং এ কথা চিরন্তন সত্য যে, নেতৃত্ব ছাড়া কখনো কোনো কাজ সফল হতে পারে না। ইসলাম শাশ্বত জীবনবিধান। তাই এই সত্যটি ইসলামেই প্রথম পরিলক্ষিত হওয়া স্বাভাবিক। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, যখন কোনো তিনজন  ব্যক্তিও সফরে যাক, তখন যেন একজনকে আমির বানিয়ে নেয়। (আবু দাউদ) আবু হুরায়রা (রা) রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না সেদিন আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে আরশের নিচে ছায়া দেবেন। প্রথম, ন্যায়পরায়ণ শাসক বা নেতা।  (মুত্তাফাকুন আলাইহি) নবী-রাসূলগণ একেকজন ত্রাণকর্তা ও নেতা হিসেবে আগমন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা প্রথম যে মানব সৃষ্টি করেছেন তাকেই প্রেরণ করেছেন নবী হিসেবে। আদম (আ) পৃথিবীর প্রথম নেতা।
যুগে যুগে যেসব নবী-রাসূল এসেছেন তারা সকলেই ছিলেন নেতৃত্বের আসনে সমাসীন। পথভ্রষ্টরা নবী-রাসূলদের সাথে বিরোধ করেছে নেতৃত্ব নিয়েই। যখনই কোনো সমাজ পাপীদের নোংরা ছোবলে পড়ে রসাতলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে তখনই নবী-রাসূলগণ রক্ষাকবচ নেতৃত্ব নিয়ে আগমন করেছেন পৃথিবীতে। তখনই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কুফরি ও মানবতাবিরোধী শক্তি। ইসলামের আগমনই হয়েছে দিশেহারা মানবতাকে আলোর পথ দেখানোর ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব নিয়ে। আর ষড়যন্ত্রকারীরা ইসলামের সাথে নেতৃত্ব নিয়েই বিরোধে লিপ্ত হয়েছে। তাই মিথ্যার তাঁবেদারি করতে ইসলাম আসেনি। এসেছে মুক্তিদাতা নেতৃত্ব নিয়ে।
হযরত মূসা (আ)-এর সাথে ফেরাউন, কারূন আর হামানের দ্বন্দ্ব একমাত্র নেতৃত্বের। আল্লাহ তায়ালা বলেন,  ‘আর কারূন, ফেরাউন ও হামানকে (আমি ধ্বংস করেছি) এবং অবশ্যই তাদের কাছে মূসা গিয়েছিল প্রমাণাদিসহ। অতঃপর তারা জমিনে অহঙ্কার করেছিল; এতদ্সত্ত্বেও তারা (আমার আজাব) এড়াতে পারেনি। (সূরা আল আনকাবুত : ৩৯) শুধু নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতেই নমরূদ ইবরাহিম (আ)কে নিঃশেষ করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের ফাঁদ এঁটেছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ধিক তোমাদেরকে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর তাদেরকে! তবুও কি তোমরা বুঝবে না? তারা বলল, তাকে আগুনে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের দেবদেবীদের সাহায্য কর, যদি তোমরা  কিছু করতে চাও। আমি বললাম, হে আগুন, তুমি শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও ইবরাহিমের জন্য। আর তারা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু আমি তাদেরকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম। (সূরা আল আম্বিয়া : ৬৭-৭০)
অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার আর জোর-জবরদস্তিতে যখন জনগণ হাঁফিয়ে গেছে তখন মোহাম্মদ (সা) আবির্ভূত হয়েছেন আমানতদারিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে। আমানত রক্ষায় তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মানুষ উপাধি দিয়েছে আল আমিন। দীর্ঘ চার মাস ধরে চলমান হারবুল ফিজার শেষ হলে নেতা হিসেবে তিনিও হিলফুল ফুজুল নামক জনকল্যাণমূলক সংগঠনের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত  ছিলেন।
কোরাইশদের ঐতিহ্যের স্মারক কাবা। এই কাবার পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হলো। হাজরে আসওয়াদের স্থান পর্যন্ত দেয়াল নির্মাণ সম্পন্ন হলে তা যথাস্থানে  কে স্থাপন করবে তা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ শুরু হলো। যথাস্থানে তা স্থাপন করার সম্মান লাভের আশায় গোত্রগুলো সংঘাতে জড়িয়ে গেল, এমনকি যুদ্ধের মুখোমুখি হলো। এই আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষাকল্পে মোহাম্মদ (সা) ৩৫ বছর বয়সে আবির্ভূত হলেন শান্তির বার্তাবাহক হয়ে। নেতৃত্বের উত্তম আদর্শ হয়ে। সর্বপ্রবীণ আবু উমাইয়া ইবনুল মুগিরের পরামর্শক্রমে পরদিন মোহাম্মদ (সা)কে সবার আগে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে সবাই তাকেই মীমাংসাকারীরূপে মেনে নিলো। শাশ্বত নেতৃত্বের আরেকটি নজির তিনি স্থাপন করলেন। তিনি বললেন, আমাকে একখানা কাপড় দাও। তা তিনি বিছিয়ে হাজরে আসওয়াদ উক্ত কাপড়ের মধ্যস্থলে স্থাপন করে প্রত্যেক গোত্রকে এই কাপড়ের চারপাশ ধরতে বললেন। সবাই উঁচু করে যথাস্থানে নিলে তিনি নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে রাখলেন।
অবশেষে ৪০ বছর বয়সে নেতৃত্বের ঐশী দায়িত্ব নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন মোহাম্মদ (সা)। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৩৩, সূরা আল ফাতহ্র ২৮ ও সূরা আস্ সাফের ৯ নং আয়াতে একই ঘোষণা দিয়েছেন তিনবার। এরশাদ হচ্ছে, তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন। অর্থাৎ ইসলামকে নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করাই তাঁর দায়িত্ব। এতদিন মোহাম্মদ ছিল সবার প্রিয়। আমানতের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু যখনই তিনি কোরাইশদের প্রচলিত নেতৃত্বের বিপরীতে ইসলামের শাশ্বত নেতৃত্বের ঘোষণা দেয়ার জন্য সাফা পর্বতে কোরাইশদেরকে ডাকলেন তখনই শুরু হলো বিরোধ। এরশাদ হলো- সুতরাং তোমাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে তা ব্যাপকভাবে প্রচার কর এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। নিশ্চয়ই আমি তোমার জন্য উপহাসকারীদের বিপক্ষে যথেষ্ট। (সূরা আল হাজর: ৯৪-৯৫)
খোদাদ্রোহী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যখন তিনি মূর্তিপূজা ও দেবদেবীর অসারতা তুলে ধরলেন তখন বেড়ে গেল বিরোধিতা। কিন্তু অনেক দলবল না থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁবেদারি করলেন না। বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে দিলেন, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় এবং তার বিনিময়ে আমাকে এই কাজ ত্যাগ করতে বলে, তবুও আমি এটা ত্যাগ করবো না। আমি ততদিন পর্যন্ত এ কাজ করতে থাকবো, যতদিন না আল্লাহ তার দীনকে বিজয়ী করেন কিংবা এই কাজ করতে করতে আমি ধ্বংস হয়ে যাই। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ৬২ পৃ:)
নবী মোহাম্মদ (সা)-এর নেতৃত্বে ইসলাম যখন দিন দিন প্রভাবশালী হতে লাগলো তখন কাফেররা দিশেহারা হয়ে বিভিন্ন ফাঁদ আঁটতে শুরু করল। উতবা ইবনে রাবিআকে দিয়ে বিপুল সম্পদশালী, মক্কার মহান নেতা বানানো ও রাজত্বের প্রস্তাব দেয়া হয় হযরত মোহাম্মদ (সা)কে। তখন তিনি তা তুচ্ছভাবে প্রত্যাখ্যান করে উতবাকে সূরা হামিম আস সিজদা তেলাওয়াত করে শুনাতে লাগলেন। এতে তার মন নরম হয়ে গেলো।
মোহাম্মদ (সা)-এর নেতৃত্বের কাছে কোরাইশদের প্রভাব খাটো হয়ে আসছিল, তখন তারা পাগল প্রায় হয়ে ওঠে। তারা সিদ্ধান্ত নিলো তাঁকে শেষ করে দিতে। আবু জাহেল পাথর মেরে নামাজরত অবস্থায় মোহাম্মদ (সা)-এর মাথা গুঁড়িয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র আঁটে। কিন্তু যখনই সে বিশালাকার পাথর নিয়ে কাছে গেল, ঐশী মদদে আবু জাহেলের সামনে ভেসে উঠলো একটি প্রকাণ্ড ও ভয়ঙ্কর উট। এমন ভয়ঙ্কর ঠুঁট, ঘাড় ও দাঁতওয়ালা উট সে কখনো দেখেনি বলে বর্ণনা দেয়। যা তাকে খেয়ে ফেলতে উদ্যত হয়। ফলে সে পরাজিত, ভীতবিহবল ও বিবর্ণ চেহারা নিয়ে ফিরে এলো। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ৭৪ পৃ:)
৬১৯ সাল। আম আল-হুজন। যে বছর খাদিজা (রা) ও সদা আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব ইনতেকাল করলেন। উতবা, শাইবা ইবনে রাবিয়া, আবু জাহল, উমাইয়া ইবনে খালফ, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব প্রমুখ বড় বড় কোরাইশ নেতা আবু তালিবের মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে তার মাধ্যমে মোহাম্মদকে আহবান জানাল তাদের নেতৃত্বকে মেনে নিতে। কিন্তু না। এমন অন্তিম সময়েও তিনি একচুল নড়লেন না। আগত নেতাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, কসম উপদেশপূর্ণ কুরআনের। বস্তুত কাফিররা আত্মম্ভরিতা ও বিরোধিতায় রয়েছে। তাদের পূর্বে আমি কত প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি; তখন তারা আর্তচিৎকার করেছিল, কিন্তু তখন পলায়নের কোন সময় ছিল না। আর তারা বিস্মিত হলো যে, তাদের কাছে তাদের মধ্য থেকেই একজন সতর্ককারী এসেছে এবং কাফিররা বলে, এ তো জাদুকর, মিথ্যাবাদী। সে, কি সকল উপাস্যকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? নিশ্চয় এ তো এক আশ্চর্য বিষয়। আর তাদের প্রধানরা চলে গেল এ কথা বলে যে, যাও এবং তোমাদের উপাস্যগুলোর ওপর অবিচল থাক। নিশ্চয় এ বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা তো সর্বশেষ ধর্মে এমন কথা শুনিনি। এটা তো বানোয়াট কথা ছাড়া আর কিছু নয়। (সূরা সোয়াদ : ১-৭)
রাসূল (সা)-এর নির্দেশে মুসলমানরা মদিনায় হিজরত করতে শুরু করলে কোরাইশরা ভীত হয়ে গেল। ভাবলো বুঝি কোনো আক্রমণের শিকার হবে তারা। তাই তারা কুসাই ইবনে কিলাবের বাড়িতে ‘দারুন্ নাদওয়ায়’ গণসমাবেশে সমবেত হলো। একেকজন একেক পরামর্শ দিল। অবশেষে আবু জাহেল পরামর্শ দিল, প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন শক্তিশালী সম্ভ্রান্ত যুবক বাছাই করে প্রত্যেকে একটা ধারালো তরবারি নিয়ে মোহাম্মদের ওপর হামলা করে তাকে হত্যা করবে। ছদ্মবেশে বৈঠকে উপস্থিত থাকা মোড়ল ইবলিশ শয়তান এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালো। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু হলো। এদিকে মহান নেতা নিজের গায়ের হাদরা মাউতি সবুজ চাদর  হযরত আলী (রা) কে দিয়ে বললেন, আমার বিছানায়  এই  চাদর  আবৃত  হয়ে  শুয়ে থাকো। এবং  আমানতগুলো প্রাপকের  হাতে বুঝিয়ে দিও। অতঃপর  তিনি একমুষ্টি ধূলি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। এবং  তা  কাফিরদের দিকে  নিক্ষেপ  করলেন। এসময়  আল্লাহ তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিলেন। তারপর  তিনি হযরত  আবু বকর (রা)কে সাথে নিয়ে মদিনার পথে রওয়ানা হলেন। এদিকে কোরাইশরা রাসূলকে ধরতে ১০০ উট পুরস্কার ঘোষণা করলো। রাসূল (সা) আবু বকরসহ সাওর পর্বতের গুহায় ৩ দিন অবস্থান শেষে মদিনার পথে রওয়ানা হলেন।
মদিনায় একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তিনি সফল নেতৃত্বের এক অতুলনীয় নজির সৃষ্টি করলেন। জনগণ তাকেই বেছে নিলো রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। ‘মদিনা সনদ’ নামে রাষ্ট্র পরিচালনার এক বিরল সংবিধান প্রণয়ন করে পৃথিবীর ইতিহাসে একক সফলতার মুকুট দখল করে নিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দলিল বা মানবাধিকার সনদ প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনায় মদিনা সনদই সর্বপ্রাচীন ও প্রথম স্থান অধিকারী।
৬২২ খ্রি:- মদিনা সনদ- ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান
১২২৫ খ্রি:- ম্যাগনা কার্টা
১৬২৮ খ্রি:- পিটিশন অব রাইটস
১৬৪৮ খ্রি:- ট্রিটিজ অব ওয়েস্টফেলিয়া
১৬৭৯ খ্রি:- হেবিয়াস কর্পাস অ্যাক্ট
১৬৮৯ খ্রি:- বিল অব রাইটস
১৮৩২ খ্রি:- দি ফার্স্ট রিফর্ম অ্যাক্ট
১৮৭৬ খ্রি:- দি সেকেন্ড রিফর্ম অ্যাক্ট
১৮৮৪ খ্রি:- দি থার্ড রিফর্ম অ্যাক্ট
১৯৪৮ খ্রি:- দি ইউনিভার্সাল ডিক্লেরেশন অব হিউম্যান রাইটস
গভীর নিরীক্ষণে দেখা যায়, উক্ত সনদগুলোর মধ্যে কেবল মদিনা সনদই পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সংবিধান, সবচেয়ে প্রাচীন, প্রথম স্থান অধিকারী ও সবচেয়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নকৃত। (মদিনা সনদ : একটি গভীর পুনঃনিরীক্ষণ : ৩৮-৩৯) এই আইন কাঠামো ও সাংবিধানিক ভিত্তি দিয়ে ব্রিটেনের লিংকনস-ইন-এর স্মৃতিফলকে মুহাম্মদ (সা)-এর নাম দুনিয়ার সবধরনের সর্বশ্রেষ্ঠ আইনদাতা হিসেবে শীর্ষে স্থান পেয়েছে। (মদিনা সনদ : একটি গভীর পুনঃনিরীক্ষণ: ৬৯)
অমুসলিমদের সাথে সামরিক অভিযানে তিনি এমনই সফল নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন যে, ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে ৮০০ বর্গকিলোমিটার হারে বিস্তৃত হয়েছে। এবং তাঁর জীবদ্দশায় এর আওতায় এসেছে ২৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড। অথচ এ বিশাল সফলতার পেছনে শত্রু পক্ষের মাত্র ১৫০ জন নিহত হয়েছে এবং মুসলিমদের মাত্র ১২০ জন শাহাদাত বরণ করেছেন। ৮ম হিজরিতে রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সফল নেতৃত্বের সংজ্ঞা। ইসলামী নেতৃত্বের পরিমণ্ডল বিশ্বব্যাপী। সকল মতাদর্শের ঊর্ধ্বে ইসলামের স্থান।
সর্বশেষ নবী মোহাম্মদ (সা) আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সফল নেতৃত্বের তালিকায় সবার শীর্ষে অবস্থান করছেন। যার কোনো তুলনা নেই। সে সময় পৃথিবীর প্রধান শক্তিগুলো ইউরোপের রোম সাম্রাজ্য, এশিয়ার পারস্য সাম্রাজ্য, আফ্রিকার হাবশা সাম্রাজ্য। এ ছাড়াও মিসরের আজিজ মুকাউকিস, ইয়েমেনের সর্দার এবং সিরিয়ার গাসসানি শাসনকর্তাও বেশ প্রতাপশালী ছিল। তৎকালীন এসব নেতৃবৃন্দের সাথে পত্র প্রেরণের মাধ্যমে নিজেকে একজন বিশ্ব নেতার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটালেন। রাসূলের (সা) ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদিনের শ্রেষ্ঠ ২৮ বছরের শাসনামল গোলামি আর তাঁবেদারি জীবনব্যবস্থার অসারতা, অপ্রয়োজনীয়তা, স্বার্থান্বেষিতা প্রমাণ করতে যথেষ্ট। জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইসলামের নেতৃত্বের কথা ইতিহাস স্বীকৃত, যা লেখার পরিসর বেড়ে যাবে বলে আলোচনায় আনা যায়নি।
এরপরও যারা মুসলিম দাবিদার হয়ে অন্য কোনো মানবরচিত মতাদর্শের তাঁবেদারি করে বাস্তব জীবনে তা লালন করে থাকে তবে তাকে কেবল মাকড়সার ঘরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা আল্লাহ ছাড়া বহু অভিভাবক গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার ন্যায়, যে ঘর বানায় এবং নিশ্চয় সবচাইতে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর, যদি তারা জানত। (সূরা আল  আনকাবুত : ৪১) হ
লেখক: এমফিল গবেষক, ইবি, প্রভাষক, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, নোয়াখালী