নেপালের সংখ্যালঘু মুসলমান ইতিহাস ও ঐহিত্য -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

ভারত ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে হিমালয়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত সার্কভুক্ত দেশ নেপাল। নেপাল নামটি এসেছে নেপাল উপত্যকা বা কাঠমান্ডু উপত্যকা থেকে। এটি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর পূর্ব-পশ্চিমে ৮৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং উত্তর-দক্ষিণে ১৯৩ কিলোমিটার প্রস্থ। নেপালের সর্বমোট আয়তন ৫৫,৪৬৩ বর্গমাইল বা ১,৪৭,১৮৮ বর্গ কিলোমিটার। দেশটির শতকরা ৮০ ভাগ ভূমিই পাহাড়-পর্বতময়। বাকি অংশ সমতল, জলাভূমি এবং নদ-নদী বেষ্টিত। বর্তমান নেপালের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলমানরা দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। যদিও ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে নেপালের লোকসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৮.৪৬ মিলিয়ন। এর মধ্যে মুসলমান ৫,৯১,৩৪০ জন দেখানো হয়েছে। সেই অনুযায়ী শতকরা ৮৬ ভাগ হিন্দু, ৭.৮ ভাগ বৌদ্ধ এবং ৩.৩ ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠী উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০১ সালের রিপোর্ট অনুসারে এখানে ৮০.৬২% হিন্দু, ১০.৭৪% বৌদ্ধ, ৪.২০% মুসলমান ও অন্যান্য ৩.৬৪%। কিন্তু মুসলমান গবেষকগণ তাদের সংখ্যাকে গোপন করার অভিযোগ করে বলেন, তাদের প্রকৃত সংখ্যা হবে ১.৮ মিলিয়ন যা সর্বমোট জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় ১০ ভাগ। সেইসাথে জন্মগতভাবেই মুসলমানদের সংখ্যা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। কেননা যেখানে জাতীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাত প্রায় ১.১৬%, সেখানে মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় হার প্রায় ২.২৭%। এ ছাড়া সাম্প্রতিককালে নেপালে বাংলাদেশী ও আরাকানি শরণার্থী মুসলমানদের সংখ্যাও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়।India Today-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে: The official figures show that the strength of the Muslim community in Nepal has grown from 2% of the population in 1981 to 3.5% in 1999. Data compiled by the Nepalese Election commission in connection with the recent general elections indicates that this figure could now have crossed 5% and more even be close to 10%. Steady migration of Bangladesh Muslims to the Terai considerably contributed to this increase.” মূলত ধর্মপ্রচার ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নেপালে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণে অধিক মুসলমানদের বাস।

নেপালে ইসলামের প্রচার ও প্রসার
নেপালে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে বেশ কয়েকটি পর্যায় পরিলক্ষিত হয়। নানা রকমের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক নৈসর্গের এ বিচিত্রময় আকর্ষণীয় ভূমিতে ইসলামের সুমহান আদর্শ এক অভূতপূর্ব সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। মুসলিম সংস্কৃতির ছোঁয়ায় নেপালি সভ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই আলোকিত হয়েছে।
প্রথমত, বাংলা ও ভারতের মতো নেপালেও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে ইসলামের ইতিহাসে প্রাথমিক পর্বেই। তবে তা ছিল একেবারে ধর্মপ্রচারক, মুসলিম বণিক ও মুসলমানদের স্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে। সপ্তম ও অষ্টম শতকে নেপালের চেবিজরাজা ভারতের মুসলিম সেনাদেরকে নেপালি সেনাদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই নেপালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
দ্বিতীয়ত, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, ১৩ শ’ শতকে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির তিব্বত অভিযান যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তখন তাঁর কিছু সৈন্য দলছুট হয়ে নেপালে গমন করে।
তৃতীয়ত, মূলত রাজনৈতিকভাবে ইসলামের সম্প্রসারণ ঘটে চতুর্দশ শতাব্দীতে হাজী ইলিয়াস শাহের মাধ্যমে। ঐতিহাসিক M. Ali Kettani–এর মতে, The First Muslim presence in Nepal occured at the end of the fourteenth century when Sultan Shamsuddin of Bengal launched an attack on the Kathmandu Valley” আবদুল করিম তার বাংলার ইতিহাস (সুলতানি আমল) গ্রন্থে আক্রমণের সময়কাল ১৩৫০ বলে উল্লেখ করেছেন। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহ নেপাল আক্রমণ করেন এবং সেখানে বিস্তর ধন সম্পদ হস্তগত করেন। নেপাল বংশাবলিতে লিখিত আছে যে, ৪৬৯ নেওয়ারি সম্বৎ বা ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে নেপালের রাজা জয়রাজ মল্ল পশুপতিনাথের কোষ হতে অর্থ গ্রহণ করেন এবং তারপর পূর্বদেশের সুলতান শামসা দীনা (সুলতান শামস উদ্দীন) নেপাল আক্রমণ করেন এবং পশুপতিনাথকে তিন খণ্ড করেন। কাঠমান্ডুর নিকটস্থ স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরের এক শিলালিপিতে ইলিয়াস শাহের নেপাল আক্রমণের তারিখ ৪৭ নেওয়ারি সম্বৎ বা ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। ইলিয়াস শাহের নেপাল আক্রমণ ও নেপাল যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া না গেলেও পরিষ্কার বোঝা যায় যে, নেপাল আক্রমণের ফলে তাঁর রাজ্যসীমা বৃদ্ধি পায়নি। তিনি নেপাল থেকে ধন-সম্পদ হস্তগত করে ফিরে আসেন। তাঁর এই অভিযান পরবর্তীতে এ অঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের পথ প্রশস্ত করে।
চতুর্থত, পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে এবং ষোড়শ শতকের শুরুতে রাজা রতœমালা এর শাসনামলে কাঠমান্ডু উপত্যকায় প্রথম উল্লেখযোগ্য ধরনের মুসলমানের আগমন ঘটে। প্রথমদিকের এ সকল মুসলমান ছিল মূলত কাশ্মিরি বণিক এবং তিব্বত হয়ে কার্পেট ও উলের বস্ত্র বিক্রির উদ্দেশ্যে এরা নেপালে আগমন করে।
পঞ্চমত, ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য আউলিয়া কিরামের আগমনের কথাও জানা যায়। তবে Shamima Siddika-এর মতে, The first batch of Muslim came with a Kashmiri Saint who built the first mosque, Kashmiri Taqui, in 1524.” এর কিছুদিন পরেই আসে কয়েকজন মুসলিম চুড়ি ব্যবসায়ী যারা স্থানীয়ভাবে চুড়াটে নামে পরিচিত ছিল। এ সময় নেপালের শাসকেরা বিশেষ করে চৌবিসা এর রাজা পার্শ্ববর্তী ভারতবর্ষ থেকে কয়েকজন মুসলমান সেনাপতিকে আমন্ত্রণ করে নেপালে নিয়ে আসেন, যারা নেপালি সৈন্যদেরকে আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। ষষ্ঠত, মোগল শাসক জালালউদ্দীন মোহাম্মদ আকবরের শাসনামলে নেপালে মুসলমানদের প্রভাব আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে অনেকটা গুর্খাদের ভয়েই মোগল শাসকেরা নেপালকে মুসলিম সা¤্রাজ্যভুক্ত করা থেকে বিরত থাকে।
সপ্তমত, ১৮৫৭ সালে ভারত সিপাহি বিদ্রোহের পর নেপালের তেরাই অঞ্চলের নতুন করে উল্লেখযোগ্য বড় ধরনের মুসলমানদের আগমনের ঘটনা ঘটে। নেপালের প্রথম রানা প্রধানমন্ত্রী জং বাহাদুরের সাথে ব্রিটিশদের সখ্য সর্বজনবিদিত ছিল। কিন্তু ১৮৫৭-এর বিদ্রোহের সময় জংবাহাদুর অয্যোধার বিদ্রোহী বেগমকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এটি ছিল ব্রিটিশদের কূটচালের একটি অংশ মাত্র। জংবাহাদুর ব্রিটিশদের ইচ্ছাতেই বেগমকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা চেয়েছিল মুসলিম প্রভাবশালী মহলকে ভারতবর্ষের ভূসীমা থেকে দূরে রাখতে, যেন তারা নতুন করে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে না পারে। বেগমের আশ্রয় গ্রহণের কথা জানার পর ভারতবর্ষের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে মুসলমানরা তেরাই অঞ্চলে এসে জড়ো হতে শুরু করে। এ সকল মুসলমানদের বেশির ভাগই ছিল নি¤œশ্রেণীর তথা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং কৃষিজীবী, যাদের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। অন্যদিকে নেপালে হিন্দু জমিদারদের কৃষিকাজ করার জন্য মজুরের অভাব ছিল। ফলে তাঁদের কাছে অভিবাসী এ সকল মুসলমানদের কদর বেড়ে যায়। পাশাপাশি শাসক শ্রেণীও অধিকতর রাজস্বের লোভে মুসলমানদের এই অভিবাসনকে মেনে নেয়। কারণ মুসলমানদের কৃষি কাজে নিয়োগ করা গেলে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের কাছ থেকে অধিক রাজস্ব অর্জন করা সম্ভবপর হবে।
অষ্টমত, ১৯৫০ সালে চীন তিব্বত দখল করে নেয়। এ সময় মুসলমানরা ভীষণভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বিশেষকরে নিজেদের ভূখন্ডের স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে তাদের প্রচেষ্টা চীনের কাছে সুদৃষ্টিতে ছিল না। এ সময় তিব্বত থেকে একদল মুসলিম নেপালে আগমন করে এবং স্থায়ীভাবে নেপালে বসবাস করতে শুরু করে।

উল্লেখ্য, যদিও মুসলমানদের উত্তর ভারত বিজয় পার্শ্ববর্তী হিন্দু অধ্যুষিত নেপালে প্রভাব ফেলেছিল তথাপি দেশটি তার হিন্দু চরিত্র রক্ষা করতে পুরোপুরি সমর্থ হয়। নেপালিরাই ভারতবর্ষের একমাত্র বাসিন্দা যারা কখনো কোনো মুসলমান বংশের শাসন মেনে নেয়নি। রাজা পৃথীনারায়ণ শাহ’র রাজত্বকালে (১৭৪৩-১৭৭৫) নেপালের বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্যসমূহকে একীভূত করেছিলেন। তাঁকে আধুনিক নেপালের জনকও বলা হয়ে থাকে। তিনি তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে ১৭৭৫ সালে দিব্যসন্দেশ নামে এক রাজকীয় ফরমান জারি করেন এবং সবাইকে এই ফরমান অবশ্য পালনীয় হিসেবে ঘোষণা করেন। John Helpton  এর মতে, “In his divine message he had envisaged his kingdom as a land of Hindus, contrasting with ‘Moghlan’ (India), the land polluted by the rule of the Mughals and their successors.” পৃথ্বিনারায়ণের এই ফরমান থেকে প্রমাণিত হয়, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলিম শাসন তাঁর জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। নেপালি ভাষায় তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষ মোঘলান (Moghlan) নামে পরিচিত ছিল। জনশ্রুতি আছে যে, নেপালের অধিবাসীরা সহজে জাতীয় পশু গরুকে দক্ষিণে চরাত না, কারণ এতে সীমান্ত পার হয়ে এদের ভারতবর্ষে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল যেখানে গো-মাংসভক্ষণের ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা ছিল না। জংবাহাদুর পরবর্তীকালে দিব্য সন্দেশের মাধ্যমে জারিকৃত ফরমানকে আরো বর্ধিত করেন এবং ১৮৫৩ সালে ‘মুলুকি আইন’ নামে আরেকটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করেন। এই মুলুকি আইন (Mulki Ain-Law of the Land) ছিল হিন্দুদের সামাজিক প্রথাকে ভিত্তি করে রচিত কঠোর আইন। এই আইনে হিন্দুদের বর্ণপ্রথাকে গভীর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছিল। এই আইনে মুসলমানদেরকে অস্পৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে Marc Gaborieauবলেন, “In fact the people of Nepal tolerated the Muslims known as ‘Mlechehhas’ (barbarians) with restrictions to the extent that only ‘raw and dry eatables’ were acceptable from their hands.”এই আইনে মুসলমানদেরকে নি¤œশ্রেণীর নাগরিকের মর্যাদা প্রদান করা হয়। এমনকি যদি কোনো উচ্চবর্ণের হিন্দু কোনো কারণে বর্ণ হারাত, তবে তাকে মুসলমান হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
১৮৫৩ সালে নেপাল কোড চালু হবার পর মুসলমানরা তাদের নি¤œ সামাজিক মর্যাদা মেনে নেয় এবং হিন্দুসমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ জনগণ হিসেবে বসবাস করতে শুরু করে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, নেপালে এই দীর্ঘ রাজতন্ত্রের শাসন আমলে উল্লেখযোগ্য কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা পাওয়া যায় না। অনেকদিন হিন্দু অধ্যুষিত সমাজব্যবস্থায় থাকতে থাকতে মুসলমানরা এটাকেই সামাজিক রীতি হেসেবে মেনে নিয়েছে।

নেপালি মুসলমানদের নৃ-তাত্ত্বিক শ্রেণীবিন্যাস
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে নেপালে মুসলমানদের আগমন ঘটে। এ কারণে সামাজিকভাবে তাদের ভিন্ন ভিন্ন গোত্র পরিচয়ে বসবাস শুরু করতে হয়। মূলত স্থানীয় হিন্দুদের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখার নিমিত্তেই তারা নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ধারণ করে থাকে। নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নেপালে বসবাসরত মুসলমানদের ৪টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এরা হচ্ছে- ভারতীয়, তিব্বতি, কাশ্মিরি এবং নেপালি। নেপালি মুসলমানদের আবার ২ ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- তেরাই মুসলিম এবং পাহাড়ি মুসলিম।

কাশ্মিরি মুসলমান
কাশ্মিরি মুসলমানরা নেপালে বসবাসরত সবচেয়ে প্রাচীন মুসলমান বলে দাবি করে থাকে। এদের পূর্বপুরুষেরা মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে হাজার বছর আগে নেপালে আগমন করেছিল। এ ধরনের মুসলমানদের অধিকাংশই শিক্ষিত এবং ব্যবসায়ী। এদের অনেকেই সরকারি চাকরি এবং রাজনীতির সাথে জড়িত। এ মুসলমানরা নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে শ্রেয়তর বলে গণ্য করে।

ভারতীয় মুসলমান
এই মুসলমানদের পূর্ব-পুরুষেরা বিভিন্ন সময়ে ইসলাম প্রচারক, বণিক, রাষ্ট্রীয় অমাত্য বা সভাসদ, ব্যবসায়ী কিংবা কৃষিজীবী হিসেবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল হতে নেপালে আগমন করে। যদিও এই দলের মুসলমানরা নেপালের অন্যান্য মুসলমান থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়, তথাপি তারা নিজেদের স্বতন্ত্র শ্রেণীভুক্ত হিসেবে গণ্য করে।

তিব্বতীয় মুসলমান
প্রায় কয়েকশত বছর পূর্বে ব্যবসায়ী হিসেবেই তিব্বতীয় মুসলমানদের নেপালে আগমন ঘটে। D.B. Bista–এর মতে, An envoy of Nepalese king Ratna Malla in Lhasa invited some Tibetan Muslims”. সম্প্রতি আরো কিছু মুসলমান ১৯৬০-এর দিকে তিব্বতে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে সাথে নেপালে আগমন করে। তিব্বতি মুসলমানরা তিব্বতি সংস্কৃতির ধারা নেপালে নিয়ে আসে। তবে ধীরে ধীরে কাশ্মিরি এবং ভারতীয় মুসলমানদের সাথে তাদের এই সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সেতুবন্ধ ঘটতে থাকে। তিব্বতীয় মুসলমানরা মূলত ধনী। তাদের প্রায় সবারই নিজস্ব দোকান এবং ছোটখাটো বাণিজ্যিক স্থাপনা রয়েছে। এরা মূলত চীন এবং তিব্বতের সাথে বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিব্বতি মুসলমানগণ অত্যন্ত সাধারণ প্রকৃতির এবং বিশ্বাসগতভাবে অত্যন্ত মজবুত ঈমানের অধিকারী। জুমার নামাজে কাঠমান্ডু মসজিদে ব্যাপকভাবে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ধর্মীয় অনুশাসন পালনে এরা খুবই তৎপর এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল। এদের অনেকেই অদ্যাবধি তাদের তিব্বতি পূর্ব-পুরুষদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। এদের অধিকাংশই তিব্বতি ভাষায় কথা বলে এবং মহিলারা তিব্বতি পোশাক পরিধান করে। এরা নেপালের অন্যান্য মুসলমানদের সাথে খুব হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। কাশ্মিরি মুসলমানসহ সকল মুসলমানদের সাথে এরা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি লেনদেন করে থাকে।

তেরাই মুসলমান
১৮৫৭ সালের সর্বভারতীয় প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পর নেপালগঞ্জ অঞ্চলটি নেপালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। সাথে সাথে অঞ্চলটির মুসলমান অধিবাসীরাও নেপালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা নেপালকে, বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে সাহায্যের স্বীকৃতিস্বরূপ অযোধ্যার নবাব থেকে ৪টি জেলা দান করে। মূলত মুসলিম অধ্যুষিত এই চারটি জেলা হলো কাঞ্চনপুর, কাইলালি, বারদিয়া এবং বাঙ্কে। এ সমগ্র অঞ্চলটি এখনও নেপালে ‘নয়া মূলক’ নামে পরিচিত। এসব অঞ্চলের মুসলমানরা নেপালে অভিবাসী হিসেবে আগমন করেনি। বরং তারাই এসব অঞ্চলের মুসলিম প্রভাবিত প্রশাসন পরিচালনা করেছেন। এ অঞ্চলের মুসলমানগণ এখনো এ অঞ্চলকে ‘নয়া মূলক’ নামে আখ্যায়িত করে থাকে। এই অঞ্চলে নেপালি সরকারের অধিকার প্রতিষ্ঠারও বহু পূর্ব থেকেই মুসলমানরা বসবাস করে আসছে।
ঊনিশ শতকের শুরুতে, নেপাল সরকার তেরাই অঞ্চলের জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষি এবং বাসযোগ্য জমি গড়ে তুলতে নানাভাবে ভারতীয়দের আকৃষ্ট করতে শুরু করে। মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঠেকাতেই এ ধরনের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে বলে কোন কোন গবেষক মনে করেন। ফলে দক্ষিণ নেপালে ভারত থেকে আগত হিন্দু এবং মুসলমানদের বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। সময়ের সাথে অঞ্চলটিতে ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রসার লাভ করে। বর্তমানে নেপালগঞ্জ, ধানগড়, বুটয়াল, বীরগঞ্জ, জানাকপুর, বীরাটনগর, রাজবিরাজ প্রভৃতি তেরাই অঞ্চলের বিখ্যাত শিল্প শহর; যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫-৩০% মুসলমান। আরেকটি সূত্র অনুযায়ী, এই অঞ্চলের ২০টি জেলায় (নেপাল মোট ৭৫টি জেলা রয়েছে) প্রায় ১.২ মিলিয়ন মুসলমান বাস করে। সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলো হচ্ছে, রাওতাহাট, মোরাং, সাপতারি, কপিলাবাস্তু, পারসা এবং বারা, সানসারি, রূপানদেহি, ধানুসা, সিরহা, মাহোত্তারি এবং সারলেহি। প্রায় পঁচাত্তর হাজার থেকে এ লক্ষ মুসলমানের এই জেলাগুলোর প্রত্যেকটিতেই বাস। অনুরূপ আরও একটি সূত্র থেকে জানা যায়, চল্লিশ হাজার থেকে পঁচাত্তর হাজার মুসলমান ড্যাঙ এবং বারদিয়া অঞ্চলে বসবাস করে। সম্প্রতি তেরাই অঞ্চল থেকে কিছু মুসলমান শিক্ষা, বাণিজ্য অথবা রাজনৈতিক কারণে কাঠমান্ডু উপত্যকায় বসতি স্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বর্তমানে রাজনীতিবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এ সকল মুসলমানদের অধিকাংশই পেশাজীবী এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণীভুক্ত আবার অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথেও সম্পৃক্ত।

পাহাড়ি মুসলমান
কাঠমান্ডুর পশ্চিমাঞ্চলীয় পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ মুসলমান বাস করে। ২২টি পশ্চিমা জেলার মধ্যে গোর্খা, তানাহু, কাস্কি, পাল্পা, আরখা কাঞ্চি এবং ডাইলেখ, জেলার প্রায় প্রত্যেকটিতে দশ হাজার থেকে পঁচিশ হাজার মুসলমান বাস করে। এদেরকে স্বতন্ত্র শ্রেণীভুক্ত করা যেতে পারে। এগুলোর অনেকটিতেই মসজিদ এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। উল্লেখিত জেলাগুলোর মধ্যে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত গোর্খা জেলাটি গোর্খালি শাসকদের অধীনে ছিল। এ সময়ে গোর্খা শাসকেরা ভারত থেকে অস্ত্র, কৃষিযন্ত্র এবং চুড়ি তৈরি করার জন্য মুসলমানদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসে। এভাবে নেয়াকোট এবং ত্রিশুলি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে গোর্খা জেলায় ১টি মসজিদ, ১টি মাদ্রাসা এবং ১টি কবরস্থান রয়েছে। অন্যদিকে ১৮৫৭ এর বিদ্রোহের পর ব্রিটিশদের হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে অনেক ভারতীয় মুসলমান নেপালের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। এভাবে পাল্পা জেলার মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে।
[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]
লেখক : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক