প্রসঙ্গ : ধর্ম যার যার উৎসব সবার -ড. মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” শ্লোগানটি বেশ আগে থেকে আমাদের দেশে শোনা গেলেও গত ২০১৬ সালের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কেন যেন বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ঢালাওভাবে প্রচার করা হয়েছিল বেশি। তাছাড়াও এবারের হিন্দুদের হোলি নিয়েও যুবক-যুবতীদের অতি মাতামাতিও সবার নজর কেড়েছে। সামাজিক মিডিয়াগুলোতেও তার প্রভাব লক্ষণীয়। অনেক যুবকই খুব উৎসাহের সাথে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে যায়, হোলিতে অংশগ্রহণ করে এবং তার কিছু ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছে। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন জনের দেয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো বিজ্ঞজনদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। কলেজপড়–য়া মেয়ের বাসায় ফেরত পথে তাকে হোলির নামে হেনস্তা করাটা বেশ গুরুত্বের সাথে বিভিন্ন টিভি মিডিয়াতে প্রচার হয়েছে। তাছাড়া কিছুদিন আগে আমাদের পাশের দেশ ভারতে কুমারী পূজাতে একজন মুসলিম মেয়ের অংশগ্রহণও গুরুত্বের সাথে বিভিন্ন মিডিয়াতে স্থান পেয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো একজন মুসলিমের পক্ষে কি এ ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া কিংবা অংশগ্রহণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ? এসব পূজাতে যে ‘প্রসাদ’ বিতরণ করা হয় তা কি খাওয়া বৈধ?

উপরের এ দু’টি প্রশ্নের উত্তরই হলো ‘না’। এগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ (হালাল) নয় বরং নিষিদ্ধ (হারাম)। প্রথম বিষয়টি হারাম হওয়ার কারণ হলো, পূজাতে কিংবা হোলি নামের অনুষ্ঠানে যেসব দেব- দেবীর উপাসনা করা হয় কিংবা যে স্মৃতির স্মরণ করা হয় সেগুলোর কোনো স্থান ইসলাম ধর্মে যেমন নেই, তেমনি এসবের মধ্য দিয়ে দ্বিধাহীনভাবে আল্লাহর সাথে শরিক করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য মনে করা হয়। ইসলামী আকিদায় এটা একেবারেই হারাম কারণ তা তাওহিদের (আল্লাহর একত্ববাদের) পরিপন্থী। ইসলামে ‘শিরক’ (আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে সমকক্ষ মনে করা) একটি বড় গুনাহ (কবিরাহ গুনাহ)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “ নিশ্চয় শিরক এক মহা অন্যায়।” (সূরা লুকমান : ১৩) এ ধরনের গুনাহের কারণে জাহান্নাম অনিবার্য। এ রকম একটি ‘কবিরাহ’ গুনাহে লিপ্ত কোনো অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে, তাতে অংশগ্রহণ করে আনন্দ-উপভোগ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। এটাকে ‘শিরকে আকবার’ বা ‘বড় শিরক’ বলা হয়। এমন কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে অবশ্যই ‘তওবাহ’ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হলে জাহান্নামের কঠিন আজাব তাদের জন্য চিরস্থায়ীভাবে অপেক্ষা করছে। আল্লাহতা’আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে কউকে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ ক্ষমা করেন। কিন্তু যে আল্লাহর শরিক করে, সে এক মহা পাপ করে।” (সূরা নিসা : ৪৮)

উপরন্তু, এসব পূজা-পার্বণে তাদের দেব-দেবীদের নামে উৎসর্গকৃত বিভিন্ন মিষ্টি-খাদ্য পূজায় কিংবা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুণ্য হাসিলের জন্য বিতরণ করা হয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো খাদ্যই আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হলে তা খাওয়া হারাম বা নিষিদ্ধ। সুতরাং একজন মু’মিনের ও মুসলিমের পক্ষে এহেন গর্হিত কাজ কিভাবে করা সম্ভব? কখনোই সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেন, “বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমি এ ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছি যে, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমি এও ঘোষণা দিচ্ছি যে, আমি আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে প্রথম।” (সূরা আল-আন’আম : ১৬২-১৬৩)

এখানে আরো একটি বিষয় হলো, ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এদেশে ‘শিরক’ সংবলিত এসকল শ্লোগান কিভাবে ঢালাওভাবে প্রচার করা হচ্ছে? কে বা কারাই এসব শ্লোগানের ইন্ধন জোগাচ্ছে? একজন মুসলিম হিসেবে এ বিষয়গুলো নিয়ে সর্বদা সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, যারা ইসলাম ধর্মের মূল স্পিরিট (রুহানিয়্যাত) নষ্ট করতে চায়, যারা মু’মিনের আকিদাহ নষ্ট করতে চায় কিংবা যারা মুসলিমের আমলগুলোকে শিরকের সাথে মিশ্রণ ঘটিয়ে কলুষিত করতে চায় তারাই এ ধরনের শ্লোগানের ইন্ধন জোগাচ্ছে।

ধর্মীয় শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে কুরআনের মূলনীতি হলো: “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আর আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য।” (সূরা আল-কাফিরুন : ৬) এখানে ধর্ম আলাদা হয়ে উৎসব এক হওয়ার কিংবা তাতে অংশগ্রহণ করে, প্রসাদ খেয়ে আত্মতৃপ্তিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ হওয়ার কোনো সুযোগ ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এক্ষেত্রে অন্যান্য ধর্মের লোকদেরকে ‘তাওহিদের’ (আল্লাহর একত্ববাদের) দিকে আহবান করতে বলা হয়েছে। (সূরা আলে ইমরান: ৬৪)

প্রত্যেক ধর্মই নির্ভর করে কিছু মৌলিক বিশ্বাসের ওপর। এ বিশ্বাসগুলোই ব্যক্তিকে ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালনে উদ্বুদ্ধ করে। আর প্রত্যেক ধর্মেরই নিজস্ব স্বকীয়তার মাধ্যমে বিশ্বাস ও কাজের মাঝে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করে। এসবের মধ্য দিয়েই সেই ধর্ম যেমন পরিপূর্ণতা লাভ করে, তেমনি অনুসারীরা খুঁজে পায় প্রকৃত শান্তি। এসবে অন্য ধর্মের কেউ অংশগ্রহণ করলেও কোনো পুণ্য নেই, না করলেও কোনো ক্ষতি নেই। আর ইসলাম এমন একটি ধর্ম যার মধ্য দিয়ে সকল আসমানি ধর্মের পূর্ণতা লাভ করেছে। এ ধর্মের মূল আচার, নীতি, কার্যাবলি সব ‘তাওহিদ’ (আল্লাহর একত্ববাদ) নির্ভর। সুতরাং কোনো বিশ্বাস ও কাজের মাধ্যমে যদি ‘তাওহিদ’ তথা আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাসে ঘুণ ধরায় তাহলে তার সকল আমলই নষ্ট হয়ে যাবে। যে কারণে একজন মু’মিন-মুসলিমের প্রাথমিক কাজ হলো ঈমানের এ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে যথাযথভাবে রক্ষা এবং সেভাবে নিজেকে পরিচালনা করা।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক