বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

[ পূর্ব প্রকাশের পর ]

জেহাদকার্য পরিচালনার জন্য পাটনাকে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ১৮২২ সালে সাইয়েদ আহমদ যখন পাটনা গমন করেন, তখন বেলায়েত আলী ও মুহাম্মদ হোসেন তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। পাটনাকে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রস্থল স্থাপন করত সাইয়েদ সাহেব চারজন প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। তাঁরা হলেন, মওলানা বেলায়েত আলী, মুহাম্মদ হোসেন, এনায়েত আলী এবং ফরহাদ হোসেন।
ভারতের সর্বত্র জেহাদের প্রচারণা ও প্রস্তুতি শেষ করে সাইয়েদ আহমদ ১৮২৬ সালে তাঁর জন্মভূমি রায়বেরেলি ত্যাগ করেন। তারপর আর সেখানে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ হয়নি। জীবনের বাকি সময় তিনি ক্রমাগত আল্লাহর পথে জেহাদে অতিবাহিত করে শাহাদতের অমৃত পানে জীবনকে ধন্য করেন।
যাহোক, যাত্রার পূর্বে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ, যুদ্ধের হাতিয়ার, সরঞ্জাম, ঘোড়া, রসদ প্রভৃতি আনা শুরু হলো। আল্লাহর পথে জান কোরবান করার জন্য হাজার হাজার মুজাহিদ তার ঝান্ডার নিচে জমায়েত হতে লাগলো। এভাবে যাত্রাকালে তাঁর মুজাহিদ বাহিনীতে সদস্যসংখ্যা দাঁড়ালো বারো হাজার। সাইয়েদ সাহেবের ভক্ত-অনুরক্ত টংকের নবাব মুজাহিদ বাহিনীকে আমন্ত্রণ জানান এবং জেহাদের যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম নিজ তত্ত্বাবধানে সরবরাহ করে দিয়ে বিদায় করেন।
আফগানিস্তান পৌঁছে সাইয়েদ আহমদ আফগান আমিরের সাহায্য প্রার্থনা করেন। আমির তাঁকে কোনোরূপ সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। যাহোক তথা হতে মুজাহিদ বাহিনী সীমান্তের নওশেয়ার উপনীত হয়। এ সুদীর্ঘ পথে মুজাহিদ বাহিনীকে চরম অসুবিধা ও দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়। তবে তাদের যাত্রাপথে চারদিক থেকে সরদারগণ, শাসকগণ স্থানীয় কর্মচারীগণ ও জনসাধারণ সাইয়েদ সাহেবকে আনুগত্য জানিয়েছিল। কেউ বা বিবিধ উপঢৌকনাদি দিয়ে, কেউ তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করে এবং কেউ বা তাঁর বাহিনীতে যোগদান করে। তাঁর বাহিনীতে যোগদান করেছিল ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোকÑএমনকি সুদূর বাংলাদেশের বহু সংখ্যক মুজাহিদ।
সাইয়েদ সাহেব রায়বেরেলি থেকে দিল্লি গমন করে যখন শাহ আবদুল আজিজের নিকটে শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করছিলেন তখনই তিনি জানতে পারেন পাঞ্জাবে শিখ রাজ্যের অধীনে মুসলমানদের চরম নির্যাতনের কথা। মজলুম মুসলমানদের সহানুভূতিতে তাঁর প্রাণ কেঁদে ওঠে এবং তখনই তিনি সংকল্প গ্রহণ করেন তার প্রতিকারের। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিম অধ্যুষিত সীমান্তে  একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করবেন এবং সেখান থেকে অভিযান চালাবেন অন্যত্র মুসলিম দুশমন শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে। এ কারণেই তিনি সীমান্তকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর সংগ্রামের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, সীমান্তের যেসব মুসলমানের সাহায্য সহযোগিতার আশা হৃদয়ে পোষণ করে সাইয়েদ সাহেব তাঁর জেহাদের রূপরেখা রচনা করেছিলেন, তাদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা তাঁর সংগ্রামকে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। নওশেরায় পৌঁছার পর থেকে বালাকোটের যুদ্ধ পর্যন্ত ছোটো বড়ো এগারোটি বা ততোধিক যুদ্ধে মুজাহিদ বাহিনী শত্রুর মুকাবিলা করে।
নওশেরায় পৌঁছার পর সাইয়েদ সাহেব ইসলামের রীতিপদ্ধতি অনুযায়ী শিখদেরকে প্রকাশ্যে আহ্বান জানান ইসলাম গ্রহণ করতে, অথবা বশ্যতা স্বীকার করতে অথবা অস্ত্রের মুকাবিলা করতে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধই হলো এবং এক নৈশযুদ্ধে মাত্র নয়শত মুজাহিদ বৃহৎ শিখবাহিনীকে পরাজিত করে। তাদের বিজয় লাভে সীমান্তবাসী তাঁদের প্রশংসায় মুখর হয়ে দলে দলে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করলো। বহু স্থানীয় সরদার বিশেষ করে ইউসুফ জায়ীরা সাইয়েদ সাহেবের দলে যোগ দিলো।
কিছুকাল পর মনপুরী ও পঞ্জতরেও শিখরা পরাজয় বরণ করলো। মুজাহিদদের এ সাফল্যের ফলে গরহি ইমাজির দশ হাজার যোদ্ধা সাইয়েদ সাহেবকে ইমাম হিসেবে স্বীকার করে নিলো। পেশাওরবাসীগণ নওশেরায় ঘাঁটি করে শিখদের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে অভিযান শুরু করার জন্যে সাইয়েদ সাহেবকে অনুরোধ জানায়। এ সময় প্রায় লক্ষাধিক লোক মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করে।
কিন্তু সীমান্তের সরদারগণ ছিল অত্যন্ত স্বার্থপর। শিখ সেনাপতি বুধ সিংহ অর্থের প্রলোভনে পেশাওরের সরদারকে হাত করে ফেলে। তারা এতটা নীচতায় নেমে যায় যে অর্থের জন্য তারা সাইয়েদ সাহেবকে গোপনে বিষ প্রয়োগ করে। কিন্তু আল্লাহর অসীম কুদরতে তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এ সময়ে শিখদের সাথে যে যুদ্ধ হয়, তাতে সরদারগণ শিখদের পক্ষাবলন্বন করে এবং মুজাহিদ বাহিনী পরাজিত হয়।
সীমান্তের পাঠান সরদারদের ডিগ্বাজি ও বিশ্বাসঘাতকতার দরুন মুজাহিদ বাহিনীকে বিশেষ বেগ পেতে হয়। টংকের নবাবের নিকটে সাইয়েদ সাহেবের লিখিত এক পত্রে জানা যায় যে, প্রায় তিন লক্ষ লোক বায়াত গ্রহণ করে তার দলে যোগদান করে। কিন্তু এর প্রায় সকলেই ছিল স্থানীয় লোক। সম্ভবত যুদ্ধের মালে গনিমত লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যেই তারা সাইয়েদ আহমদের দলে যোগদান করে। তাদের ইসলামী চরিত্র বলে কিছু ছিল না। সাইয়েদ আহমদ তাঁর অতি সরলতার জন্য তাদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র নির্ভরযোগ্য সহকর্মী ছিলেন তাঁরাই যাঁরা বাইরে থেকে গিয়েছিলেন। তাঁরা বিপদে-আপদে সাইয়েদ আহমদের সঙ্গে ছায়ার মতো থাকতেন এবং প্রয়োজনে অকাতরে জান দিয়েছেন। এঁদের সংখ্যা ছিল হাজার খানেকের মতো। তাঁদের মধ্যে যারা যুদ্ধে শাহাদত বরণ করতেন তাদের স্থান অধিকার করতেন নবাগতের দল। দূর-দূরাঞ্চল হতে কাফেলা আসতো জেহাদে যোগদানেচ্ছু মানুষ নিয়ে, টাকাকড়ি, রসদ ও চিঠিপত্র নিয়ে। তাঁদেরকে রসদ জোগান হতো। সারা ভারতব্যাপী “তারগিবে মুহাম্মদিয়া” প্রতিষ্ঠানের গোপন কর্মকুশলতায়। ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের চোখে ধুলো দিয়ে টাকাকড়ি আসতো বিহার ও বাংলা থেকে। তার সঙ্গে আসতো খোদার পথে উৎসর্গীকৃত মুজাহিদের দল।
অদৃষ্টের পরিহাস এই যে, আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত এসব আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের মুকাবিলা করতে হতো ত্রিপক্ষের। শিখ, বিশ্বাসঘাতক পাঠান সরদার এবং হুন্দের দুর্ঘমালিক খাদে খাঁÑএ ত্রিশক্তি ছিল মুজাহিদ বাহিনীর দুশমন। এক সাথে এই তিন শক্তির মুকাবিলা তাঁদেরকে করতে হয়েছিল।
শিখদের সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ প্রায় লেগেই থাকতো। বাংলা, বিহার ও মধ্য প্রদেশের মুজাহিদগণ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতেন। শিখ ও বিশ্বাসঘাতক পাঠানরা তাঁদের হাতে মার খেতো। পেশাওরের দুররানি সরদারগণও প্রকাশ্যে শিখদের সাথে যোগদান করলো এবং খাদে খাঁ স্থানীয় পাঠনদেরকে মুজাহিদগণের বিরুদ্ধে সব সময়ে ক্ষিপ্ত করে তুলতো।
এবার সাইয়েদ আহমদ খাদে খাঁকে শায়েস্তা করার জন্যে শাহ ইসমাইলকে মাত্র দেড়শত মুজাহিদসহ হুন্দ দুর্গ অধিকারের জন্য পাঠান। রাত্রির অন্ধকারে হঠাৎ তাঁরা হুন্দ আক্রমণ করে তা দখল করেন এবং খাদে খাঁ নিহত হয়। খাদে খাঁর ভাই ইয়ার মুহাম্মদের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিরাট বাহিনীসহ হুন্দ দুর্গ পুনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হয়। ফলে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয় এবং ইয়ার মুহাম্মদ নিহত হয়। শত্রুপক্ষের বহু কামান হস্তগত করা হয় এবং প্রচুর যুদ্ধসরঞ্জাম ও মালামাল মুজাহিদ বাহিনীর হস্তগত হয়। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাগণ তার অধিকাংশই লুণ্ঠন করে নিয়ে যায়। মুজাহিদ বাহিনীর প্রধান বিশ্বাসঘাতক দুশমন খাদে খাঁ, ইয়ার মুহাম্মদ খাঁ ও আমীর খানের মৃত্যুর পর এখন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী রইলো শিখ ও পেশাওরের সুলতান মুহাম্মদ খান। হুন্দের যুদ্ধের পর সাইয়েদ সাহেব পেশাওরে ঘাঁটি স্থাপন করার মনস্থ করলে আম্বের পায়েন্দা খান বাধা দেয়। এখানেও শিখ ও পাঠানদের মিলিত শক্তির মুকাবিলা মুজাহিদ বাহিনীকে করতে হয়। এখানেও তারা পরাজিত হয় এবং আম্ব থেকে মর্দান পর্যন্ত মুজাহিদ বাহিনীর অধিকার স্বীকৃত হয়। এখন পেশাওর পর্যন্ত অগ্রসর হতে তাঁদের আর কোনো প্রতিবন্ধকতা রইলো না।
সুচতুর সুলতান মুহাম্মদ অবস্থা বেগতিক দেখে সাইয়েদ আহমদের হাতে বায়াত গ্রহণ করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করার অঙ্গীকার করলে সাইয়েদ সাহেব তাকে ক্ষমা করেন এবং শাসন পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপরই অর্পিত হয়।
সাইয়েদ আহমদ এবং তাঁর হাতে গড়া মুজাহিদগণের পদমর্যাদা লাভের কোনো বাসনা ছিল না। আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা এবং সমাজজীবনে খোদার আইন জারি করাই তাঁদের জীবনের লক্ষ্য ছিল। সুলতান মুহাম্মদের উপরে দায়িত্ব অর্পণ করার পেছনে সাইয়েদ সাহেবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল যার জন্য বহিরাগত মুজাহিদগণের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি স্থানীয় লোকের ওপরই দায়িত্ব অর্পণ করেন। কারণ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শরিয়তের বিধান জারি করা, স্বয়ং ক্ষমতা উপভোগ করা নয়।
যাহোক, আপাততদৃষ্টিতে এক বিরাট অঞ্চলের ওপর ইসলামী হুকমুত কায়েম হলো। সাইয়েদ সাহেব ইসলামী সমাজ ও ইসলামী আইন কানুন প্রবর্তনে বিশেষ প্রচেষ্টা চালাতে লাগলেন। পেশাওর তথা সমগ্র সীমান্ত এলাকাজুড়ে প্রচারকদল নিয়োজিত হলো। তাঁরা গ্রামে গ্রামে ইসলামী জীবনবিধান ও শরিয়তের আইন কানুনের প্রচারে লিপ্ত হলেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয় স্থানীয় অধিবাসীগণ ছিল দরিদ্র অজ্ঞ, অর্থলোভী ও বহুদিনের জাহেলি কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ। প্রচারকগণ যখন তাদের এসব কুসংস্কার পরিহার করে ইসলামী জীবন যাপনের আহবান জানাতে লাগলেন, তখন তাদের পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক গোত্রীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থে চরম আঘাত লাগে। ফলে তারা শুরু করলো অসহযোগ। অজ্ঞতা ও কুসংস্কার সঞ্জাত ক্ষমতা ও অর্থলোভী মোল্লার দলও করলো তীব্র বিরোধিতা। তার ফলে স্থানীয় অধিবাসীগণ সাইয়েদ সাহেবের বিরুদ্ধে একটা অন্ধ আক্রোশে ফেটে পড়লো। বিশ্বাসঘাতক সুলতান মুহাম্মদও তাই চাইছিল এবং সে এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করলো। অতি গোপনে সমগ্র অঞ্চলে এক গভীর ষড়যন্ত্রজাল ছড়ানো হলো এবং একই দিনে একই সময়ে ফজরের নামাজের সময় নামাজরত মুজাহিদ প্রচারকদলকে নির্মমভাবে নির্মূল করা হলো। একজন অলৌকিকভাবে আত্মরক্ষা করেন এবং পলায়নকরত সাইয়েদ সাহেবের নিকটে ঘটনা বিবৃত করেন।
সাইয়েদ সাহেব অত্যন্ত মর্মাহত হন। একই আঘাতে তাঁর কয়েকশত আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত কর্মী জীবন হারালেন। একটা আদর্শ ইসলামী সমাজগঠনের আশাও তাঁর বিলীন হয়ে গেল। তিনি বিশ্বাসঘাতক ও নিমকহারামদের দেশ পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার মনস্থ করলেন।
অতঃপর সাইয়েদ সাহেব তাঁর অবশিষ্ট মুজাহিদগণসহ বালাকোটের দিকে যাত্রা করেন। এ সময়ে শের সিংহের সৈন্য বাহিনী মুজাহিদগণের মুখোমুখি ছিল। সাইয়েদ সাহেব বালাকোট থেকে নওয়াব উযীরউদ্দৌলাকে যে পত্র লিখেন তার মর্ম নি¤œরূপÑ
“পেশাওরের লোকেরা এমনই হতভাগ্য যে, তারা জেহাদে আমাদের মুজাহিদ বাহিনীর সংগে যোগ দিল না। উপরন্তু তারা প্রলোভনে পড়ে গেল এবং সারা দেশময় নানা কাজে আমাদের যেসব মহৎ লোক ব্যস্ত ছিলেন, তাঁদের অনেককেই হত্যা করে ফেললো। সেখানে আমাদের অবস্থানের আসল উদ্দেশ্য ছিল যে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদে বহু সংখ্যক স্থানীয় মুসলিমের সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়া যাবে। বর্তমানে যখন আর কোনও আশা নাই, তখন আমরা স্থির করলাম যে, সেখান থেকে পাখলীর পাহাড়ি অঞ্চলেই স্থান বদল করব।
এখন আমাদের ঘাঁটি এমন নিরাপদ স্থানে অবস্থিত যে, আল্লাহর মর্জি দুশমনরা আমাদের সন্ধানও পাবে না। ইসলামের তরক্কির জন্য ও মুজাহিদ বাহিনীর সাফল্যের জন্য আল্লাহর দরবারে দিনরাত মুনাজাত করতে থাকুন।”
সাইয়েদ সাহেব তাঁর মুজাহিদ বাহিনীসহ বলাকোটের সৌন্দর্যমন্ডিত উপত্যকা বিশ্রামের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। পূর্ব দিক দিয়ে কুনহার বা কাগান পাহাড়ি নদী অবিরাম কুলকুল তানে বয়ে চলেছে। উত্তর পশ্চিম দিক থেকে সংকীর্ণ পাহাড়ি ঝর্ণা বার্না বড়ো বড়ো উপল খন্ডের ভেতর লুকোচুরি খেলতে খেলতে উদ্দাম উচ্ছল গতিতে বালাকোটে কুনহার নদীগর্ভে প্রবেশ করেছে। বার্ণা ঝর্ণার উত্তর দিকে প্রশান্ত নূরী ময়দান। প্রকৃতির এ লীলা ক্ষেত্রে প্রবেশ করলে মনে হয় কে যেন জীবন নদীর পরপার থেকে হাতছানি দিচ্ছে। রণক্লান্ত মুজাহিদগণ বিশ্রামের জন্য এখানে ছাউনি পাতলেও পরপারের হাতছানি হয়তো তাঁদের দৃষ্টির অগোচর হয়নি। তাই বিশ্রাম তাঁদের ভাগ্যে ঘটেনি।
ওদিকে শিখরা মুজাহিদ বাহিনীর সন্ধানে ছিল। তারা মনে করেছিল সাইয়েদ আহমদের লক্ষাধিক মুজাহিদের কয়েক শ’ মাত্র এদিকে রয়েছে এবং তারা হয়ে পড়েছে হতোদ্যম। এ সুযোগেই তাদের আঘাত হানতে হবে।
সে সময়ে কালাকোটে যাওয়ার দুটি মাত্র পথ ছিল। একটি ছিল এমন পাহাড়ি বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ যে স্থানীয় লোক ব্যতীত সে পথে চলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অপর পথটি ছিল একটি সংকীর্ণ গিরিসঙ্কটের মধ্য দিয়ে ও একটি সেতুর ওপর দিয়ে। এ দুইটি পথে অবশ্যই পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক মোটা অর্থের লোভে অরণ্যসঙ্কুল পথটিই শিখদের দেখিয়ে দেয়। ফলে তারা অতর্কিতভাবে মুজাহিদ বাহিনীকে ঘিরে ফেলে। মুজাহিদ বাহিনী সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত থাকলেও বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন। সাইয়েদ আহমদ, শাহ ইসমাইল ও সাইয়েদ আহমদের অন্যান্য প্রধান সহকর্মীগণ জেহাদ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন।
১৮৩১ সালের ৬ই মে রোজ শুক্রবার প্রায় দুপুরের দিকে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম মুজাহিদ সাইয়েদ আহমদ বেরেলভী (রহ) শাহাদৎ বরণ করেন।
সাইয়্যেদ আহমদ বেরেলভীর নেতৃত্বে শাহ্ মোহাম্মদ ইসমাইল, মওলানা আব্দুল হাই প্রমুখ মনীষীগণ ভারতে ইসলামী আজাদির তথা ইসলামী হুকুমত বা শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেন। এ আন্দোলনকে ইতিহাসে ওহাবি আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী ও আজাদি আন্দোলন। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল আসমুদ্র হিমাচলে এক অখন্ড স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে তোলা। সাইয়েদ স্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলেন এ দেশের বিষয়টি। কিন্তু কতিপয় লোকের চরম বিশ্বাসঘাতকতার দরুন অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। ১৮৩১ সালের ৬ মে শুক্রবার দুপুরের দিকে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম মুজাহিদ সাইয়্যেদ আহমদ বেরেলভী শাহাদত বরণ করেন।
বালাকোটের প্রান্তরে মুজাহিদগণ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেও এবং মুজাহিদ বাহিনীর পরিচালক সাইয়্যেদ আহমদ বেরেলভী ও শাহ ইসমাইল অন্যান্যের সাথে শাহাদাত বরণ করলেও যারা গাজী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন তাদের কর্মতৎপরতা মোটেও হ্রাস পায়নি। এদের অনেকেই মুসলমানদের মধ্যে জেহাদি আন্দোলন জাগ্রত রাখেন। যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব তথা সারা ভারতব্যাপী আজাদি আন্দোলনে। এ আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যায়নি ১৮৫৭ সালে, বরঞ্চ ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারকে বিব্রত ও বিপন্ন করে রেখেছিল।

আজাদি সংগ্রাম
১৮৫৭ সালে আজাদি আন্দোলন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সমগ্র ভারতব্যাপী যে বিপ্লবী আন্দোলন চলছিল তার প্রেরণা সঞ্চার করেছিল মৌলভী আহমদউল্লাহর জেহাদী আন্দোলন। ইংরেজরা ভারতব্যাপী ব্রিটিশবিরোধী এ আন্দোলনের নাম দিয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহ। সিপাহি, জনতা, মুজাহিদিন মিলে যে সংগ্রাম শুরু করেছিল তাতে এদেশে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূল আলোড়িত হয়েছিল। শাসকদের দৃষ্টিতে এটি ‘বিদ্রোহ’ হলেও প্রকৃতপক্ষে এ ছিল বৈদেশিক শাসন, শোষণের বিরুদ্ধে সত্যিকার আজাদির সংগ্রাম।
১৮৫৭ সালে সারা ভারত ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রুদ্ররোষে ফেটে পড়ার কারণ ছিল বহু ও নানাবিধ। শতাব্দীর পুঞ্জীভূত আক্রোশ আগ্নেয়গিরির ন্যায় বিস্ফোরিত হয়েছিল সাতান্ন সনে। শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ, শাহ্ আব্দুল আজিজ, সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, শাহ্ ইসমাইল শহীদ প্রমুখ বীর মুজাহিদগণ যে  জেহাদী প্রেরণার সঞ্চার করে রেখেছিলেন তা যেন বারুদের স্তূপে দিয়াশলাইয়ের কাজ করলো। চারদিকে দাউ দাউ করে বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠলো। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে যে যেখানে পেরেছে সংগ্রামে যোগদান করেছে। সিপাহিদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সাধারণ মানুষ-কৃষক-মজুর-সরকারি-বেসরকারি বহু কর্মচারী। সাতান্ন সালে ভারতের সংগ্রাম স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে এসে যে ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয় তার একটি কারণ হলো কতিপয় স্বার্থান্বেষীর চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ইংরেজরা নানান কৌশলের মাধ্যমে এ আন্দোলন ব্যর্থ করার প্রস্তুতি নেয়। একদিকে চীন, সিংহল ও অন্যান্য স্থান থেকে ইউরোপীয়দেরকে এবং পার্বত্য প্রদেশ থেকে গুর্খাদের আনা হয়। মুসলমান আমির, উমরাহ্দেরকে নানা প্রলোভন দিয়ে তাদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। এ ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতক রজব আলী ইংরেজদের সহায়ক হয়। সে আঁতাতের মাধ্যমে আন্দোলন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা চালায়। ফলে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সংগ্রাম ষড়যন্ত্র ও আঁতাতের ফলে ব্যর্থ হয়ে যায়। কায়েমি স্বার্থের দল এ আজাদি আন্দোলনের নাম দিলো বিদ্রোহ। ভারতে কয়েক শতাব্দী যাবৎ মুসলিম শাসনের শেষ চিহ্নটুকু চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়। এ আজাদি আন্দোলন সাময়িকভাবে ব্যর্থ হলেও এর পরিণাম ফল হয়েছে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। কিন্তু ইংরেজরা যে পৈশাচিকতার সাথে প্রতিশোধ নিয়েছে তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিরাট কলঙ্কের অধ্যায় সংযোজিত করেছে। মুসলিম মুজাহিদিন তার পরও এক দশক কাল ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন।
মুসলমানদের এ প্রতিরোধ সংগ্রাম চলে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত। ইংরেজবিরোধী এ বিদ্রোহাত্মক তৎপরতার কারণে মুসলমানদের বিরাট মূল্য দিতে হয়। অনেকে ফাঁসিতে জীবন দেয়, আন্দামানের নির্বাসনে গিয়ে হারিয়ে যায় শত শত মানুষ, ইংরেজদের জেলে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করে হাজার হাজার মুক্তিসংগ্রামী। আর ইংরেজদের অত্যাচার নিপীড়নে ধ্বংস হয় অসহায় লাখো মুসলিম পরিবার। ইংরেজদের বিদ্বেষ ও বৈষম্যনীতির শিকার হয়ে গোটা মুসলিম জাতি সবদিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
মুসলমানদের করুণ অবস্থার প্রেক্ষাপটে হিন্দু জনগণ ইংরেজ শাসকদের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে জাতীয় সমৃদ্ধি ও জাতি গঠনের দিকে প্রচন্ডভাবে এগিয়ে যায়। মুসলমানদের ব্রিটিশবিরোধী কোন সংগ্রামকেই তারা সুনজরে দেখেনি। মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা বিদ্রƒপ করে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা স্বাধীনতা সংগ্রামকে বাংলার হিন্দুরা নানাভাবে উপহাস করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যর্থ হবার পর যে প্রচন্ড হত্যালীলা শুরু হয় তার প্রাথমিক শিকার হন ওহাবি আন্দোলনের চিহ্নিত আলেমসমাজ। বিপ্লব-পরবর্তীকালে শহীদ হন শত শত আলেম। সাত’শ আলেম ফাঁসিতেই জীবন দেন।

মুসলমানদের রাজনৈতিক শক্তির পুনর্গঠন
সিপাহি বিদ্রোহের মাত্র ছয় বছর পর ১৮৬৩ সালের ২রা এপ্রিল নওয়াব আব্দুল লতিফ কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি।’
১৮৬৩ সালে মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি যখন গঠিত হচ্ছিল, তখন সারা দেশজুড়ে ‘ওহাবিদের ধরপাকড় চলছিল- ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহ ও সীমান্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণের অপরাধে। ব্রিটিশদের সকল ক্রোধ, আক্রোশ ছিল মুসলমানদের ওপর।
এ অবস্থায় মুসলমানদের বাঁচানো এবং বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নওয়াব আব্দুল লতিফ মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির মাধ্যমে কাজ করেন। তিনি সোসাইটির মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের আনুগত্য সৃষ্টি, মুসলমানদের প্রতি শাসকদের অবিশ্বাস দূর, মুসলিম সমাজে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো, সমকালীন চিন্তাধারার পক্ষে মুসলিম জনমত গড়ে তোলা, ইত্যাদি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেন। সংগ্রাম ও অসহযোগের পথ পরিহার করে আপস ও সুবিধাবাদের পথ অনুসরণ করা হয়।
এই বিচ্যুতি সত্ত্বেও মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি এক দুঃসময়ে মুসলিম জাতি স্বার্থকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। মোহামেডান সোসাইটি মুসলিম স্বার্থরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মুহসীন ফান্ডের টাকা মুসলমানদের জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হুগলী কলেজ সরকারীকরণ হয় এবং মুহসীন ফান্ডের টাকা মুসলমানদের শিক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়। এ টাকায় হুগলী ও কলকাতা মাদরাসার উন্নতি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মাদরাসা স্থাপন এবং মুসলিম ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। ব্রিটিশদের সাথে নওয়াব আব্দুল লতিফের সুসম্পর্কের ফলেই মুসলমানরা কিছুটা সুবিধা পায়। ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম ব্যর্থ হয়ে যাবার পর মুসলমানদের কঠিন দুর্দিনে এ অর্জন খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
মুসলমানদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব যখন হুমকির সম্মুখীন তখন নওয়াব আব্দুল লতিফের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুসলমানদের স্বতন্ত্র সত্তা কোনভাবে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ১৮৭৮ সালে সৈয়দ আমীর আলী প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক সংগঠন ‘ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশেন’। অ্যাসোসিয়েশন মুসলমানদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব প্রদান করেন। ১৮৮৪ সালে সৈয়দ আমীর আলী ভাইস রয়ের সেক্রেটারির নিকট লিখিত পত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চাকরির অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত রাখার অনুরোধ করেন। এ দাবির স্বপক্ষে তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। অ্যাসোসিয়েশনকে সর্বভারতীয় রূপ দেবার জন্য তিনি এর নাম রাখের ‘সেন্ট্রাল মোহামেডান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশেন।’ ১৮৮৮ সালের দিকে বাংলা, বিহার, যুক্তপ্রদেশ, পাঞ্জাব, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ে অ্যাসোসিয়েশনের ৫৩টি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৮৮৫ সালে কংগ্রেস গঠনের পর আবহাওয়া পাল্টাতে থাকে। ১৮৮৯ সালে স্যার সৈয়দ ‘মুসলিম প্রতিরক্ষা সমিতি’ গঠন করেন। ১৮৯২ সালে ‘ইন্ডিয়া কাউন্সিল অ্যাক্ট’ পাস হয়। ১৮৯৩ সালে মারা যান নওয়াব আব্দুল লতিফ এবং ১৮৯৮ সালে মারা যান স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। ১৯০৪ সালে সৈয়দ আমীর আলী বিলেতে বসতি স্থাপন করেন।
মুসলমানদের উত্থান বাধাগ্রস্ত হয়। সবদিক থেকে ঘোর অন্ধকারে ডুবে যায় মুসলমানরা। এই দুঃসহ অমনিশার মধ্যে ১০টি বছর কাটিয়ে মুসলমানরা উপনীত হলো বিশ শতকের তৃতীয় বর্ষে।
১৯০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গবিভাগ পরিকল্পনা ঘোষিত হয়। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য লর্ড কার্জন তৎকালীন বিশাল বাংলা প্রদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করেন। ১৯০৪ সালের ৬ ডিসেম্বর বঙ্গ বিভাগের নতুন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। ১৯০৫ সালের ৯ জুন বাংলা বিভাগকে অনুমোদন দেয়া হয়। অনুমোদিত এ পরিকল্পনা অনুসারে বাংলার রাজশাহী বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকা বিভাগ, পার্বত্য ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মালদহকে চিফ কমিশনার শাসিত আসামের সাথে যুক্ত করে নতুন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হয়। আর বাংলার অবশিষ্ট এলাকার সাথে সম্বলপুর ও উড়িষ্যার ৫টি এলাকা যুক্ত করে গঠিত হয় বাংলা প্রদেশ। হিন্দি ভাষাভাষী ৫টি এলাকা বাংলা প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুক্ত হয় মধ্য প্রদেশের সাথে। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে নতুন প্রদেশ বিভাগকে কার্যকর করা হয়।
প্রদেশ পুনঃগঠনের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হলো ঢাকা। এই নতুন প্রদেশের লোকসংখ্যা দাঁড়ালো ৩ কোটি ১০ লাখ। এর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়ালো ১ কোটি ৮০ লাখ, হিন্দুর সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। অন্যদিকে বাংলা প্রদেশের লোকসংখ্যা দাঁড়ালো ৫ কোটি ৪০ লাখ। এর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ৯০ লাখ আর হিন্দুর সংখ্যা ৪ কোটি ২০ লাখ। কলকাতা হলো বাংলা প্রদেশের রাজধানী। এ প্রদেশ বিভাগের ফলে জাতি হিসেবে মুসলমানরা লাভবান হয়। একদিকে ঢাকাকে তারা রাজধানী হিসেবে পেল অন্যদিকে ১৮৬৫৪০ বর্গমাইল বিশিষ্ট বিশাল প্রদেশে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মুর্শিদকুলি খান ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নেবার পর পূর্ব বাংলার প্রতি যে অবহেলা শুরু হয়েছিল এবং ব্রিটিশ আমলে কলকাতাকেন্দ্রিক শাসনে পূর্ব বাংলার উপর যে দুর্দিন চেপে বসেছিল, তার প্রতিকারের একটা পথ হলো নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে। সচেতন সবার কাছেই পরিষ্কার ছিল, রাজধানী থেকে বহু দূরের ‘পূর্ব বাংলার প্রশাসনব্যবস্থা ছিল দুর্বল অদক্ষ এবং স্বাভাবিকভাবেই কার্যকর ও সক্রিয় ছিল না। জনকল্যাণ ও অগ্রগতির জন্য যে অর্থ এ এলাকায় ব্যয় করা হতো তা ছিল বাস্তব প্রয়োজন অপেক্ষা নিতান্তই অপ্রতুল। এমনকি এ অঞ্চলের প্রধান প্রধান সমস্যাকেও উপেক্ষা করা হতো। শিক্ষা ছিল অবহেলিত, যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। কৃষকরা সাধারণত কলকাতায় বসবাসকারী জমিদারদের এজেন্ট ও কর্মচারীদের হাতে অত্যাচারিত হতো। ব্যবসায় বাণিজ্যের দিক থেকেও এ অঞ্চল দারুণভাবে পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের কোন উন্নতি না হওয়ার ফলে পূর্ব বাংলার বড় বড় নদী অঞ্চলকে ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসারের জন্য যথাযথ ব্যবহার করা হয়নি।’
বঙ্গ বিভাগের মূলে পূর্ব বাংলার এ দুর্দশা দূরীকরণ চিন্তা যতটাই থাক, মূলত প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল।
লর্ড কার্জন এক চিঠিতে বলেছিলেন, “যে কোন ব্যক্তির (প্রশাসকের) পক্ষে বাংলার প্রশাসন পরিচালনা এক অসম্ভব ব্যাপার। (এ অবস্থায়) প্রশাসন যে অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার তা অনুধাবনের জন্য শুধু তাকে জেলায় যেতে হবে।” সন্দেহ নেই, প্রশাসনিক সুবিধার দিকটা সামনে রেখেই সব বিরুদ্ধতাকে তিনি উপেক্ষা করেছিলেন। বিভিন্ন স্তরে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যখন চরম পর্যায়ে ওঠে, তখনও উপদেষ্টারা লর্ড কার্জনকে পরামর্শ দেন যে, ‘বিভিন্ন সংস্থা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিগত স্বার্থ অপেক্ষা প্রশাসনিক স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ ইবেৎসন কার্জনকে বলেন, “বাংলার (প্রশাসনিক) স্বার্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর আসামের জন্য তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, প্রশাসনিক প্রয়োজন (সকল স্তরের) বিরোধিতা সত্ত্বেও এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়া উচিত।”
বঙ্গভঙ্গ বা বঙ্গ বিভাগ ছিল এখানকার ব্রিটিশ শাসকদের দীর্ঘ দিনের প্রশাসনিক চিন্তা-ভাবনার ফল। যা কার্যত শুরু হয় ১৮৫৪ সালে। এ বছর বাংলার গভর্নরের লেফটেন্যান্ট গভর্নর) পদ সৃষ্টি করার সময় এ আশা পোষণ করা হয় যে, এর ফলে বাংলার প্রশাসন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। ১৮৬৭ সালে উড়িষ্যা-দুর্ভিক্ষের পর প্রণীত তদন্ত রিপোর্টে বাংলার আয়তন-জনিত প্রশাসনিক দুর্বলতাকে দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়াম গ্রে লরেন্সের নিকট লিখিত এক পত্রে বললেন, “বর্তমান বাংলা সরকারের মত এমন অস্বাভাবিক ব্যবস্থা ভারতে আর আছে বলে আমি জানি না। ভারতে আয়তনের দিক থেকে বৃহত্তম প্রশাসনিক ব্যবস্থা আর গুরুত্বের দিক থেকে সর্বপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও বাংলা সরকারের কর্মক্ষমতা বোম্বাই ও মাদ্রাজ সরকার অপেক্ষা অনেক কম ও শ্লথ।” এই ভাবেই বঙ্গ বিভাগের সুস্পষ্ট চিন্তা দানা বেঁধে উঠতে থাকে। উল্লেখ্য, এ সময় হিন্দুদের জাতীয়তাবাদী উত্থানের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়নি। লেফটেন্যান্ট গভর্নর গ্রে যখন এ চিঠি লেখেন, তারও নয় বছর পর ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, প্রমুখ হিন্দু নেতারা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, প্রতিষ্ঠা করেন এবং এরও নয় বছর পর ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দুদের জাতীয় কংগ্রেস। সুতরাং হিন্দুদের উত্থান প্রতিরোধ করার জন্য বঙ্গবিভাগ চিন্তার উদ্ভব হয়নি। এ ছাড়া লর্ড কার্জন গভর্নর জেনারেল হয়ে আসার ২ বছর আগে ১৮৯৬ সালে বঙ্গ বিভাগের সুস্পষ্ট প্রস্তাব প্রণীত হয়। চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ওল্ডহ্যাম ১৮৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুপারিশ করলেন যে, আসামসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের অংশবিশেষ নিয়ে পূর্ব বাংলা নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হওয়া দরকার। চট্টগ্রাম অথবা ঢাকাকে তিনি এ নতুন নামে নতুন প্রদেশের রাজধানী করার কথা বললেন। এ বছরই নভেম্বর মাসে আসামের চিফ কমিশনার স্যার উইলিয়াম ওয়ার্ড আসামের সাথে চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলার সংযুক্তি করণের প্রস্তাব দিলেন। উল্লেখ্য, এর আগে ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে লুসাই অধিবেশনের সুপারিশক্রমে চট্টগ্রাম জেলাসহ লুসাই অঞ্চলকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা অবশ্য তখন কার্যকর হয়নি। সুতরাং ইতিহাসের সাক্ষ্য হলো, গভর্নর জেনারেল হিসেবে লর্ড কার্জন আসার আগেই বঙ্গ বিভাগ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। লর্ড কার্জন এই চিন্তা, প্রস্তাবকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন মাত্র।
(চলবে)