বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

[ পূর্ব প্রকাশের পর ]

মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ১৯১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলা বিভক্ত ছিল। বঙ্গ বিভাগকে হিন্দুরা মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গ বিভাগের দিবসকে তারা ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসাবে পালন করত। বাংলা বিভাগের প্রতি কংগ্রেসের হুমকি মোকাবেলার জন্য ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় এক সম্মেলন আহ্বান করেন। নবাব সলিমুল্লাহর শাহবাগস্থ সুরম্য উদ্যানে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯০৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকায় এ সম্মেলনে ভারতের সকল প্রদেশ ছাড়াও দেশের বাইরে থেকে প্রতিনিধি এ সম্মেলনে আসেন। প্রায় ১ হাজার প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ২৭ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নবাব সলিমুল্লার প্রস্তাবক্রমে সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিখারুল মুলক। সলিমুল্লাহর ‘সর্ব ভারতীয় মুসলিম সংঘ’ পরিকল্পনাকে ভিত্তি করেই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতেই সম্মেলনের সভাপতি তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, “মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে”। “আমরা এখানে যে উদ্দেশ্যে মিলিত হয়েছি সেটা কিন্তু নূতন কোন বিষয় নয়। যেদিন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় সেদিন থেকেই এর শুরু আর সেটার গুরুত্ব এত বেশি যে, স্যার সৈয়দ আহমদের বিজ্ঞতাপ্রসূত ও দূরদর্শিতামূলক নীতির কাছে আমরা সর্বসময় ঋণী থাকব। তিনিও কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে এত বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি মুসলমানদের একথা বুঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন যে, কংগ্রেসে অংশগ্রহণ থেকে দূরে থাকার মাঝেই তাদের উন্নতি ও নিরাপত্তা নিহিত। তার উপদেশ এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও মুসলমানরা তাকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। যতই সময় যাচ্ছে ততই আমরা বুঝতে পারছি, মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য তাদেরই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
বঙ্গভঙ্গের পর কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শক্তি বৃদ্ধি পাওয়াটা উপলব্ধি করে এবং আইন পরিষদগুলো সম্প্রসারণে সরকারের একটা ইচ্ছার কথা লক্ষ্য করে মুসলমানরা প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে ভাইসরয়ের নিকট তাদের দাবি-দাওয়া ও তাদের প্রতি যে অন্যায় অবিচার করা হচ্ছে, সেসব বিষয় তুলে ধরেছে। সেই প্রতিনিধিদের বক্তব্য ও ভাইসরয়ের জবাব সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিনিধিদলে যেসব মুসলমান নেতা ছিলেন এবং যারা সিমলায় মিলিত হয়েছিলেন, তারা মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকারগুলো স্থায়ীভাবে রক্ষাকল্পে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করেছেন সেগুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রতিনিধিদল ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ঢাকায় মিলিত হওয়া উচিত এবং এ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
মুসলমানরা ভারতে অন্যান্য সকল সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। সুতরাং এ কথা খুবই স্পষ্ট যে, যদি কোন সময় ব্রিটিশ সরকার এ দেশত্যাগ করে তাহলে যে জাতির সংখ্যা চারগুণ বেশি তারাই এ দেশ শাসন করবে। ভদ্র মহোদয়গণ, প্রত্যেকে ভেবে দেখুন ঐ সময় আমাদের অবস্থা কিরূপ হবে। এ রকম অবস্থায় আমাদের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান, ধর্ম সবকিছুই বিপন্ন হবে। আজ যেখানে ব্রিটিশ সরকার তার অধীন এদেশবাসীকে রক্ষা করছে সেখানেও আমরা দেখছি বিভিন্ন প্রদেশে আমাদের প্রতিবেশীদের হাতে আমরা অনেক ধরনের সমস্যা ও কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছি। যেসব জাতি শত শত বছর পর আমাদের ওপর আওরঙ্গজেবের প্রতিশোধ নিতে চায় তাদের প্রজা হয়ে থাকা কত কষ্টেরই না হবে। আমাদের কর্তব্য হলো, যতদূর আমরা প্রভাব খাটাতে পারি, আমাদের বন্ধুদেরকে ভুল পথে যাওয়া থেকে নিরত করা, আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে তাদের সাথে ভালো আচরণ করা, সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের প্রতি সহানুভূতি জানানো এবং তাদের প্রতি কোনো বৈরী মনোভাব প্রদর্শন থেকে নিবৃত্ত হওয়া। একই সাথে আমাদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করে চলা। কংগ্রেসের সাথে আমাদের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য আছে অথবা ভবিষ্যতে হতে পারে সেটা তিনটি বিষয়কে নিয়ে আবর্তিত- প্রথমত, কংগ্রেসের সেই দাবিগুলো ভারতে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান বিপন্ন করতে পারে; দ্বিতীয়ত, সেইসব বিষয় যেগুলো আমাদের বৈধ অধিকারের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। তৃতীয়ত, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাদের উগ্র কণ্ঠ, যেটা মুসলমানরা প্রশংসা করে না।” (পাকিস্তান আন্দোলন : ঐতিহাসিক দলিলপত্র-জি অ্যালানা)
উদ্বোধনী বক্তব্য শেষে নবাব ভিখারুল মুলক স্যার সলিমুল্লাহকে তার পরিকল্পনা পেশ করতে বলেন। নবাব সলিমুল্লাহ তার পরিকল্পনা পেশ করতে উঠে দেশের পরিস্থিতি, মুসলমানদের জাগরণ এবং বর্তমান প্রয়োজন বিষয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব রাখেন। এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়:
ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি রাজভক্তি উদ্রেক করা এবং সরকারের কোন ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি হলে তা দূর করা।
মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, স্বার্থ রক্ষা ও উন্নতির ব্যবস্থা করা।
সংস্থার উপরোক্ত উদ্দেশ্যাবলি অব্যাহত রাখা এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি মুসলমানদের মধ্যে যাতে বিদ্বেষ সঞ্চার না হয় তার ব্যবস্থা করা।
(‘উপমহাদেশের রাজনীতি ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব’ ইয়াসমিন আহম্মদ)
ঢাকার এ ঐতিহাসিক সম্মেলনে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করে এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের নিন্দা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। নবাব ভিখারুল মুলক ও নবাব মুহসিনুল মুলক অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের যুগ্ম-কর্মসচিব নির্বাচিত হন। গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য গঠিত হয় ৬০ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রভিশনাল কমিটি। মুসলিম লীগ গঠন হিন্দুদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল। কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ শুরু করল তারা। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী সম্পাদিত ‘দি বেঙ্গলি’ মুসলিম লীগকে ‘সলিমুল্লাহ লীগ এবং ‘সরকারের ভাতাভোগী ও তাঁবেদারদের সমিতি’ বলে কটাক্ষ করল।
বলাবাহুল্য মুসলমানদের স্বতন্ত্র উত্থানের প্রত্যেকটি পদক্ষেপই এদের দ্বারা নানা রকম কটাক্ষ ও প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছিল। ১৮৬৩ সালের ‘মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ গঠনকে তারা সাংঘাতিক বক্র দৃষ্টিতে দেখেছে। ১৮৮২-এর ইন্ডিয়া কাউন্সিল অ্যাক্ট-এ মুসলমানরা মিউনিসিপ্যালিটিতে স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্বের যে অধিকার লাভ করল তা তাদের মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়েছিল এবং তারা কংগ্রেসের মাধ্যমে আন্দোলন করে ১৮৯২ সালে তা বাতিল করিয়ে ছেড়েছিল। মুসলিম লীগ গঠনের তিন মাস আগে ১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর আগাখানের নেতৃত্বে নওয়াব মুহসিনুল মূলক, বিলগ্রামী, নওয়াব আলী চৌধুরী, এ, কে, ফজলুল হকসহ ভারতের ৩৫ জন মুসলিম নেতা সিমলায় ভাইসরয় মিন্টোর সাথে দেখা করে মুসলমানদের পক্ষ থেকে কতকগুলো সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছিলেন। এ দাবিগুলোর মধ্যে ছিল “(ক) সামরিক, বেসামরিক এবং হাইকোর্টে মুসলমানদের যথেষ্ট সংখ্যায় নিয়োগ, উচ্চ পদগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যতীতই নিয়োগের ব্যবস্থা, (খ) মিউনিসিপ্যালিটি, জেলা বোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশ্চয়তা প্রদান, (গ) জনসংখ্যার অনুপাতে নয়, তাদের রাজনৈতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাদেশিক কাউন্সিলে মুসলমানদের নির্বাচন, (ঘ) মুসলমানরা যাতে অগুরুত্বপূর্ণ সংখ্যালঘুতে পরিণত না হয়, তার জন্য পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে যথেষ্ট সংখ্যক মুসলমানের ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে নির্বাচন করা এবং (ঙ) একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সাহায্য করা, যা হবে মুসলিম ধর্মীয় এবং বুদ্ধিগত জীবনের কেন্দ্রস্বরূপ।” মুসলমানদের এই দাবি-দাওয়া পেশকে সাংঘাতিক বিদ্বেষ দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। একে ‘সাম্প্রদায়িক শো’ নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে এর সংগঠক নাকি ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার। এমন কি কংগ্রেস কর্মী শিবলী নোমানী পর্যন্ত বলেছিলেন, “আমরা সিমলা ডেপুটেশনের কোন অর্থ বুঝি না। সাম্প্রদায়িক মঞ্চে ছিল এটা সর্ববৃহৎ শো।” অথচ সিমলা ডেপুটেশন ইতিবাচক ফল ডেকে এনেছিল মুসলমানদের জন্য। সিমলা ডেপুটেশনের কাছে লর্ড মিন্টো মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বের দাবি মেনে নেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। এই আশ্বাস কার্যকরী হয়েছিল ১৯০৯ সালে মর্লি-মিন্টো সংস্কারের মাধ্যমে। এই সংস্কারে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বের অধিকার দেয়া হয়। মুসলমানদের এই সুবিধা লাভও হিন্দুদের প্রবল বৈরিতার সম্মুখীন হয়। ১৯০৯ সালেই কংগ্রেস তার এক প্রস্তাবে ‘মহামান্য ব্রিটিশ স¤্রাটের ভারতীয় প্রজাদের মুসলিম ও অমুসলিম সংজ্ঞায় বিভক্ত করাকে অন্যায়, বিদ্বেষপ্রসূত ও অপমানকর বলে অভিহিত করে।’ অর্থাৎ কংগ্রেস মুসলমানদের স্বতন্ত্র উত্থান তো দূরে থাক, জাতি হিসেবে মুসলমানদের নাম পর্যন্ত বরদাশত করতে রাজি ছিল না। কারণ এই যে, জাতি হিসেবে মুসলমানদের নাম উচ্চারিত হলে, তাদের অধিকারের প্রতি স্বীকৃতি দিতে হয়। কংগ্রেস তা দিতে রাজি ছিল না। সে চাইছিল, মুসলমানরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় অর্থাৎ বৃহত্তর হিন্দু জাতি দেহে লীন হয়ে যাক। বিস্ময়ের ব্যাপার, এসময় কংগ্রেসী মুসলমানরাও হিন্দুদের এ চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিল। তারা হিন্দুদের মতই বিরোধিতা করছিল মুসলমানদের স্বতন্ত্র উত্থান প্রচেষ্টার। কংগ্রেস নেতা হিসেবে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নার মতো লোকও মর্লি-মিন্টো সংস্কারের বিরোধিতা করেছিলেন। শুধু বিরোধিতা নয়, ১৯১০ সালে কংগ্রেসের এলাহাবাদ অধিবেশনে মর্লি-মিন্টো সংস্কারের উল্লেখিত পৃথক নির্বাচন ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার বিরোধিতা করে যে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তার উত্থাপক ছিলেন কায়েদে আযম এবং জোরালো বক্তৃতার মাধ্যমে যিনি এ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন তিনি একজন মুসলিম, বিহারের জননেতা মৌলভী মজহারুল হক। অবশ্য কংগ্রেসের স্বরূপ ধরতে এবং নিজেদের ভুল বুঝতে এই সব মুসলমানের খুব বেশি দেরি হয়নি। যে জিন্নাহ মুসলমানদের স্বতন্ত্র অধিকার অর্জনের নিন্দা করে কংগ্রেস সম্মেলনে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, সেই জিন্নাহই মাত্র কয়েক বছর পর কংগ্রেস নেতাদের মুখের উপর ‘আপনারা কি চান না যে, মুসলিম ভারত আপনাদের সাথে এগিয়ে যাক, সংখ্যালঘুদের কি সংখ্যাগুরুদের দেবার মত কিছুই নেই?’ বলে অশ্রুসজল চোখে কংগ্রেস নেতাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
মুসলমানদের স্বতন্ত্র উত্থানের যাত্রা ছিল সেদিন সত্যই অত্যন্ত কঠিন। একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের প্রচন্ড বিরোধিতা, অন্য দিকে কংগ্রেসী কিছু মুসলমানের বাধা। এই দুয়ের মোকাবিলা করে সামনে এগুতে হয়েছিল উত্থানবাদী মুসলমানদের। মুসলিম লীগ গঠিত না হলে মুসলমানদের পক্ষে এই এগুনো সম্ভব হতো না। মুসলিম লীগ যে সময় যুদ্ধক্ষেত্রের পতাকার মত মুসলমানদের অস্তিত্ব, উপস্থিতি ও উত্থানের কথা ঘোষণা করছিল। নির্যাতিত মুসলমানরা জেগে উঠেছিল। সমবেত হয়েছিল একে কেন্দ্র করেই। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অশ্রুসজল চোখে কংগ্রেস থেকে বিদায় নিয়ে এসে শক্তিশালী করেছিলেন মুসলিম লীগকেই। সবচেয়ে বড় কথা, মুসলিম লীগ গঠনের মাধ্যমে মুসলমানরা একথা সোচ্চার কণ্ঠে বলে দিয়েছিল, ভারতে মুসলমান নামে একটা জাতি আছে যাদের অস্তিত্ব ও দাবি অস্বীকার করা যাবে না।
১৯০৭ সালের ২৮ ডিসেম্বরে করাচিতে সর্ব-ভারতীয় মুসলিম লীগের প্রথম বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা হয়। গঠনতন্ত্রে নিন্মক্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সংবলিত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। …..
১৯০৭ সালে নবাব মুহসিনুল মুলক মৃত্যুবরণ করেন এবং নবাব ভিখারুল মুলক আলীগড় কলেজের কর্মসচিব নিযুুক্ত হওয়ায় মুসলিম লীগের কর্মসচিবের দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন। ১৯০৮ সালের ১৮ মার্চ আলীগড়ে মুসলিম লীগের একটি বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে আগা খান মুসলিম লীগের স্থায়ী সভাপতি এবং মেজর সৈয়দ হোসেন বিলগ্রামী মুসলিম লীগের কর্মসচিব নির্বাচিত হন। আলীগড়ের হাজী মোহাম্মদ মুসা খান জয়েন্ট সেক্রেটারি হন। সৈয়দ আমীর আলী ১৯০৮ সালের ৬ মে লন্ডনে মুসলিম লীগের শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর মুসলিম লীগের দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশন অমৃতসরে অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আলী ইমাম। এ সম্মেলনে লর্ড মর্লির প্রস্তাবিত সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয় এবং প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় যে, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্ব ও সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের নিয়োগের বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে।
মুসলিম লীগের তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় দিল্লিতে ১৯১০ সালের ২৯ জানুয়ারি। সভাপতিত্ব করেন আর্কটের যুবরাজ স্যার গোলাম মাহমুদ আলী খান। সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিলগ্রামী ভারত সচিবের পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হওয়ায় এ সম্মেলন লীগের মহাসচিব নির্বাচিত করে মৌলবী মোহাম্মদ আজিজ মির্যাকে। লীগের সদর দপ্তর আলীগড় থেকে লাক্ষেèৗতে স্থানান্তরিত হয়।
মুসলিম লীগ চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলন সৈয়দ নাজিবুল্লার সভাপতিত্বে ১৯১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর নাগপুরে অনুষ্ঠিত হয়। লীগের পঞ্চম বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯১২ সালে ৩ মার্চ কলকাতায় বঙ্গভঙ্গরদের বিষাদময় পরিবেশে। এতে সভাপতিত্ব করেন ভগ্নহৃদয় ও ভগ্নস্বাস্থ্য নবাব সলিমুল্লাহ। বঙ্গভঙ্গরদে আহত নবাব সলিমুল্লাহ প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে অবসর নেন। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি চলে গেলেন কিন্তু জাগিয়ে গেলেন নির্যাতিত জাতিকে।
(চলবে)