যুক্তিবাদী আমেরিকার সন্ধানে -ড. মুহাম্মদ ইকবাল হোছাইন

আজ থেকে আড়াই শত বছর পূর্বে সংযুক্ত আমেরিকার গঠন ছিল বিশ্ববাসীর জন্য বিস্ময়কর চমক। অনেক কাঠখড়ি পুড়িয়ে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে ঐক্যবদ্ধ আমেরিকা বিশ্বসভ্যতায় অনেক অবদান রেখেছে এ কথা সত্যি। তবে আমেরিকার গ্রেট হওয়ার উল্টো দিকে তথা মানবতার বিপরীতমুখী কর্মকান্ডেও কম জড়ায়নি। আমেরিকা গঠনের পর ১৮৬১ সালে সিভিল ওয়ারে জড়িয়ে ইউনিয়ন ও ফেডারেসির মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে প্রায় আট লক্ষ লোকের যে হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল এর দায়-দায়িত্বের সদুত্তর এখনো ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ পূর্ব-এশিয়ার যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষের হত্যাযজ্ঞসহ ব্যাপক ধ্বংসলীলার দায়-দায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক চলছে এখনো। আর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসাকে পুঁজি করার জন্য যেভাবে যুদ্ধের বিস্তার করা হচ্ছে, তেলসম্পদ যে অবৈধ উপায়ে লুণ্ঠন করা হচ্ছে, আরব-ইসরাইল যুদ্ধকে যেভাবে প্রলম্বিত করা হচ্ছে এর কারণ পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারলেও সমাধানের সদুত্তর এখনো তারা জানে না। আমেরিকার এ সম্প্রসারণবাদী চরিত্রের কথা নতুনভাবে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে ইউরোপ ও আমেরিকারসহ যেসব রাষ্ট্রে মাইগ্রেশন হয় সেসব দেশের ভূমিপুত্রদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ সর্বদা পরিলক্ষিত হয়। তবে সরকারগুলো বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এসব ক্ষোভ প্রশমিত রাখে। ব্রিটেনের রাজনীতিতে ইমিগ্রেশন একটি বড় ইস্যু। ২০১৭ সালের মার্চ থেকে যে ব্রেক্সিট কার্যক্রম শুরু করার জন্য পার্লামেন্ট অনুমতি দিয়েছে এর একটি বড় কারণ অভিবাসন। ইউরোপীয় আইনের সুযোগে সেনজেন কাট্রিভুক্ত দেশ হতে স্রোতের মতো মানুষ ব্রিটেনের শ্রমবাজার ও আর্থিক সামাজিক বেনিফিট নেয়ার জন্য ঢুকে পড়েছে, যা মূল ব্রিটিশরা কখনোই মেনে নিতে পারেনি। তাদের কথা হলো এৎবধঃ ইৎরঃধরহ ভড়ৎ ইৎরঃরংয চবড়ঢ়ষব. গণভোটে ব্রেক্সিট পাস হওয়ায় যুবসমাজের মধ্যে ক্ষোভ পরিলক্ষিত হলেও অর্থনীতিতে সুবাতাস বইছে বলেই মনে হয়। এ সুবাতাস প্রধানমন্ত্রী ‘তেরেসা মে’কে ব্রেক্সিট দ্রুত শুরু করার ব্যাপারে উৎসাহ জুগাচ্ছে নিঃসন্দেহে। এমনিভাবে জার্মানিতে ইমিগ্রেশনবিরোধী মতামত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল সিরিয়ান রিফিউজিদের গ্রহণ করায় স্থানীয় নির্বাচনে তার দলের ভরাডুবি হয়েছে। ইউরোপিয়ান অন্যান্য দেশেও একই অবস্থা। ইউরোপে যখন ইমিগ্রেশন নিয়ে এরূপ বিপরীতমুখী অবস্থান সে অবস্থায় আমেরিকার নির্বাচনে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ট্রাম্প ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ শ্লোগানটি তুরুপের তাসের ন্যায় কাজ করে।
এটা সত্য পৃথিবীর যেকোনো স্থানে অভিবাসীরা কর্মঠ হয়। কারণ ব্যক্তি বা পরিবারের প্রয়োজনেই মানুষ প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে অজানা স্থানে বা দেশে চলে যায়। এতে যে কত কষ্ট কেবল যারা অভিবাসী হয়েছেন তারাই বলতে পারবেন। আমি নিজের গবেষণার জন্য কিছুদিন লন্ডনে ছিলাম। বর্তমানে সেমিনার সিম্পোজিয়ামে মাঝে মধ্যে দেশের বাইরে যেতে হয়। সামান্য এ কয়দিনের জন্যই মন কেঁদে ওঠে নিজ মাতৃভূমি ও পরিবারের জন্য। রাসূল (সা) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার সময় বারবার মক্কার দিকে তাকিয়ে অন্তরে যে ব্যথা অনুভব করেছিলেন সে কথাতো আমরা জানি। সুতরাং কেউ নিজের সখে মাতৃভূমি বা জন্মভূমি ছাড়ে না। সারা পৃথিবী থেকে প্রয়োজনেই অভিবাসীরা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আমেরিকাতে অভিবাসী হয়েছে। এখনো হচ্ছে। এ অভিবাসনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে যারা আমেরিকায় গেছেন তাদের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ শতাংশ। সারা পৃথিবীতে আজকের আমেরিকা প্রভাবশালী আমেরিকা হয়ে ওঠার পেছনে এসব ইমিগ্র্যান্ট অভিবাসীদের অনেক অবদান। পৃথিবীর আইটি সেক্টরের গর্ব সিলিকন ভ্যালির বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, কর্মচারী, কর্মকর্তা প্রায় সকলেই অভিবাসী। এ সিলিকন ভ্যালিকে নিয়ে আমেরিকা কিন্তু গর্ব করে। এমনিভাবে নাসাতে অনেক বিজ্ঞানী নতুন নতুন গবেষণায় নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন তারাও উপমহাদেশের অধিবাসী। যে কথা বলছিলাম, এসব অভিবাসীকে নিয়ে এখন চলছে বড় রাজনীতি। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই এক নির্বাহী আদেশে ৭টি মুসলিম দেশের অধিবাসীদের নিজ দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি আমেরিকার মূল্যবোধ। আমেরিকাতো সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের চেতনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা স্ট্যাচু অব লিবার্টির মূল বাণী। এ বাণীর বিপরীতে এ নির্বাহী আদেশ আমেরিকাবাসী মেনে নেয়নি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সে অন্য কথা। কেউ জঙ্গিবাদের সাথে থাকলে বা আইএসের সাথে থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন আছে, নিয়মনীতি আছে, নিয়মের আলোকেই তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়। কিন্তু এ জুজুর ভয় দেখিয়ে সাতটি মুসলিম দেশের মানুষের আমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করে দেয়ার নির্বাহী আদেশ কতটুকু যুক্তিপূর্ণ ছিল তা খতিয়ে দেখা দরকার। আর তা আমেরিকার সংবিধানেরও পরিপন্থী। যে কারণে সমগ্র আমেরিকায় মানুষ জেগে উঠল। এসব মানবতাবাদী সাধারণ মানুষ ধন্যবাদ পাবার উপযুক্ত। তাদের কারণে আমেরিকা গ্রেট অবস্থানে আছে। সংবিধান রক্ষায় এগিয়ে এলো কোর্ট। বারবার আপিল করেও সরকার পরাস্ত হয়ে এখন নাকি ট্রাম্প অন্য পথ ধরছেন আবারো তাদেরকে কিভাবে নিষিদ্ধ করা যায়। কিন্তু তাতে কি লাভ হবে? আমার মনে হয় না। তাতে বর্তমান প্রেসিডেন্টের মর্যাদা ক্ষুণœ হবে বৈকি!
বারবার একটি প্রশ্ন সবার মাঝে ঘুরে ফিরে আসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কে হলো তাকে নিয়ে এতো মাতামাতি কেন? অন্য দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী নিয়ে তো আমরা এতো আলোচনা করি না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কে হলো বা বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি চীনের প্রেসিডেন্ট কে হলো অথবা অর্থনৈতিক বাঘ বলে পরিচিত জাপান কে শাসন করছে তা নিয়ে তো আমরা এতো পর্যালোচনা করি না। তাহলে আমেরিকাকে নিয়ে কেন এতো পর্যালোচনা? এর উত্তর আমি আমার আরেকটি লেখায় কিছুটা দিয়েছি। আমার সীমিত জ্ঞানে যতটুকু জানি পৃথিবীতে সব সময়ই কিছু আইকন শক্তি ছিল যারা অন্য সকলের জন্য আকর্ষণীয় অবস্থানে থাকতো। একসময় পৃথিবীতে রোমের একক দাপট ছিল, তারও পূর্বে গ্রিকরা ক্ষমতা শিক্ষা-সভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতো, তারও পূর্বে মিসরের ফারাউ রাজবংশ, তারও পূর্বে যদি আমরা যাই তাহলে ইউফ্রেটিসকেন্দ্রিক সভ্যতায় বিশ্ব নেতৃত্ব খুঁজে পাবো। ইসলামের আগমনের সময় রোম ও পারস্য বিশ্ব আসনে সমান ক্ষমতাসম্পন্ন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের উভয়ের শাসকদের রাসূল (সা) ইসলামের দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামী শক্তির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ডেপ্লোমেসির পরিভাষায় এটাকে ‘স্ট্র ইন দা উইন্ড’ বলে অভিহিত করা হয়। পরবর্তীতে অনেক হাত পেরিয়ে বিশ শতকে এসে আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়। অবশ্য এর পেছনে আমেরিকানদের অনেক শ্রম কষ্ট ও দেশগঠনে আত্মনিয়োগ করতে হয়েছে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করতে গিয়ে অনেক সিভিল ওয়ারের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেক কষ্টের অর্জন এ আমেরিকাকে গঠনে সারা পৃথিবীর মামুষের সাথে বাঙালিদের অবদানও কম নয়। তারাও নিজ রক্তকে পানি করে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছেন এবং আমেরিকা গঠনে অবদান রাখছেন। সারা পৃথিবীর অভিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচিত আমেরিকা সারা বিশ্বের মানবিক মূল্যবোধ, মানুষের অধিকার রক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন সর্বোপরি যা কল্যাণকর সকল দিকের বিবেচনায় রেখে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে বলেই আমরা মনে করি। যে কারণে কোথাও মানবাধিকারের লঙ্ঘন হলে, কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার হলে সবাই তাকিয়ে থাকে আমেরিকা কি বলে, তা জানার জন্য। আমেরিকার জনগণের পক্ষ থেকে সারা পৃথিবীর দরিদ্র মানুষের জন্য প্রতি বছর যে সহায়তা আসে তাতে পৃথিবীর দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের অনেক উপকার হয় বৈকি। এমন আরো অনেক ভালো দিক আছে যেসব কারণে আমেরিকাকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় পৃথিবীর মানুষ একটি দায়িত্বশীল অবস্থানে দেখতে চায়। যে অবস্থানটি চীন বা রাশিয়া করতে পারেনি। পরাশক্তি থাকার সময় রাশিয়া অবশ্য ওয়ারশো জোটের রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে এসব রাষ্ট্রে তাদের অবস্থানও ভালো ছিল। কিন্তু তা ছিল কেবল আদর্শকেন্দ্রিক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তারা হারিয়ে গেছে। আর চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে কেবল অগ্রসরই হয়েছে। বিশ্ব মানবতার উন্নয়নে তাদের অবদান মূল্যায়নের সময় আসেনি। আমেরিকা ধ্বংসও করছে আবার গড়ছেও। কেবল ধ্বংসের কথাগুলো বললে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। সুতরাং আমাদের উচিত হবে দেশটির বর্তমান প্রশাসনকে আমেরিকা শতবর্ষের গড়ে ওঠা মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে বিশ্বকে অস্থির নয় আরো শান্তিপূর্ণ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। কোন কোন পত্রিকায় খবর এসেছে কয়েকটি দেশের অভিবাসন বন্ধের কারণে আমেরিকায় ধর্মীয় চেতনা বেড়ে যেতে পারে। সকল বিমানবন্দরে আটকে যাওয়া মুসলমানরা যেভাবে সারিবদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করেছেন তা অনেকের মনে দাগ কেটেছে। কয়েকটি মসজিদে আগুন দেওয়া হলে এর পুনর্নির্মাণে মুসলিম ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের লোকেরা অর্থায়ন করছে এমনকি নাস্তিকরাও অর্থ ডোনেশন দিয়েছে। সুতরাং ট্রাম্প প্রশাসনকে এটা বুঝতে হবে একটি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো আমেরিকাকে পেছনে নেয়া এতো সহজ নয়। বরং বিশ্বের যেখানে মানবতাবিধ্বংসী কর্মকান্ড চলছে, নিজেদের স্বার্থে সা¤্রাজ্যবাদীরা যুদ্ব বা দ্বন্দ্ব বাধিয়ে রাখছে তা নিরসনে আজ আমেরিকাকে আরো কার্যকর হতে হবে। যুক্তিবাদী আমেরিকাকে আরো যুক্তিবাদী হওয়ার দিকে অগ্রসরের মধ্যেই কল্যাণ ও সমৃদ্ধি খুঁজতে হবে। পজিটিভ কাজের মাধ্যমেই আমেরিকাকে পৃথিবীর মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে হবে।