সুখের আশায় আগুনে পুড়ছে উড়াল-পাখির ডানা -হারুন ইবনে শাহাদাত

জেমস ব্রাউনের সেই বিখ্যাত গানIt’s A Man’s Man’s Man’s World (এই একজন মানুষ, মানুষ নিয়েই মানুষের পৃথিবী) সহজ কথায় A Man is a worldঅর্থাৎ একজন মানুষই এক একটা পৃথিবী। যদিও টাকার অঙ্কে মানুষের মূল্যমান নির্ণয় করা যায় না। তারপরও মানুষ মানুষকে পণ্য করে। নামমাত্র দামে বিক্রি করে মা-বাবা, সন্তান, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়তমা প্রেয়সীর ভালোবাসার মানুষ নামে এক একটা পৃথিবীকে। আইনবিদ্যার অতি আদি সূত্রমতে, একজন মানুষকে হত্যা করা পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করার সমান অপরাধ। এর মানে পৃথিবীর মতোই মূল্যবান এই দুনিয়াকে ফুলে-ফলে সাজানোর কারিগর একজন মানুষ। সেই মানুষকে পণ্য বানিয়ে এই সভ্য দুনিয়াতেও ব্যবসা করছে একদল নরপশু। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ফর্টিফাই রাইটসের তথ্য মতে, গত ২০১৩ থেকে নিয়ে ২০১৫ এই তিন বছরে চার দেশীয় অর্থাৎ বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার চক্রগুলোর মধ্যে লেনদেন হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। অপর এক হিসাবে শুধু ২০১৫ সালেই প্রথম তিন মাসে শুধু বাংলাদেশেই প্রায় ২৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। থাইল্যান্ডভিত্তিক সংগঠন ফ্রিল্যান্ড ফাউন্ডেশন বলেছে, একটি নৌকায় কোনোভাবে ৪০০ জনকে তুলতে পারলে পাচারকারীরা ছয় কোটি টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করতে পারে। বাংলাদেশীরা মুক্তিপণ বাবদ প্রত্যেকে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা দিয়ে থাকেন।
মানবশিশু ও নারীদেরকেই শুধু চুরি করে অবৈধ পথে দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছে না। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় বেকার তরুণদেরকেও বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। পাচাররোধে মানবপাচার আইন ২০১২-এর সঠিক প্রয়োগ এবং সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে এ সংখ্যা কমে আসতে পারে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘মানবপাচারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। মানবপাচার আইনের সঠিক ব্যবহার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তৎপর হলে মানবপাচার কমে আসবে।’ বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি বলেন, ‘মানুষ অভাবের তাড়নায় নারী-পুরুষ বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। কিন্তু দালালরা নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করছে বা বিক্রি করে দিচ্ছে। তাই প্রথমে দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারিভাবে মানুষকে বিদেশে যাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে হবে। এ ছাড়া পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’
মাসিক অর্থবাজার ২০১৫ জুন সংখ্যায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদকের লেখা একটি প্রতিবেদন সূত্রে প্রকাশ, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই বাড়ছে মানবপাচার বাণিজ্য। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) পৃথিবীব্যাপী মানবপাচার এবং উদ্বাস্তুদের হিসাব রাখে। সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালের পর পৃথিবীতে শরণার্থীর সংখ্যা এখন যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। মানবপাচারের ঘটনা এসব শরণার্থী শিবির থেকে বেশি ঘটছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর নানা কারণে সাড়ে চার কোটি লোক শরণার্থীর খাতায় নাম লেখাচ্ছে। এর মধ্যে সাড়ে নয় লাখ লোক বৈধ উপায়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিচ্ছে এবং দুই কোটি ৮৮ লাখ লোক নিজ দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে যাচ্ছে। নিজ দেশে উদ্বাস্তু হচ্ছে প্রতি বছর দেড় কোটি লোক। বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সুদান, কংগো, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে উদ্বাস্তু হচ্ছে বেশি। উদ্বাস্তুদের ৫৫ শতাংশই যুদ্ধবিগ্রহের কারণে দেশ ত্যাগ করছে বলে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিসংগঠন আইএসের কারণেও অনেকে নিজ দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন।
বিবিসির সূত্র উল্লেখ করে ২৪ নভেম্বর ২০১৬ সংখ্যায় দৈনিক জনকণ্ঠ লিখেছে, ‘ভারতে প্রতি বছর যতজন মানবপাচারের শিকার হয়, তাদের একটা বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গের নারী অথবা নাবালিকা। পুলিশের দেয়া এক হিসাবে কলকাতার লাগোয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা থেকেই গত তিন বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ১২ হাজার লোক। ধারণা করা হয়, এদের বেশির ভাগকেই পাচার করে দেয়া হয়েছে- কাউকে দেহ ব্যবসায় নামানো হয়েছে, কাউকে ভিক্ষাবৃত্তিতে। খবর বিবিসির। দক্ষিণ ২৪ পরগণা থেকে এই ব্যাপক সংখ্যায় নারী পাচার রুখতে স্কুলছাত্রী এবং তাদের মায়েদের সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে সেখানকার পুলিশ। নারী পুলিশ কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো স্কুলে গিয়ে বোঝাচ্ছে কিভাবে সমৃদ্ধির লোভ দিয়ে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে পাচারকারীরা। সেরকমই এক সচেতনতা শিবিরে গিয়ে কথা হয় পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে, যাকে পাচার করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল দিল্লিতে। ‘বছর দেড়েক আগে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পেছন থেকে একটা ছেলে এসে আমার মুখে কিছু চেপে ধরে, তারপর আমার আর হুঁশ ছিল না।’
গত বছরের ৩০ জুলাই দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, দেশে ৪ বছরে ৫ হাজার ৯৯২ জন মানবপাচারের শিকার হয়। প্রতিবেদনটিকে আরো বলা হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ৯৯২ জন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের হিউম্যান ট্রাফিকিং মনিটরিং সেলের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। পাচার হওয়া মানুষের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৪ হাজার ৪৫০ জন। যা চার বছরে মোট পাচার হওয়া মানুষের ৭৪ শতাংশ। একই সময়ে পাচারের শিকার হওয়াদের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার জন নারী। যা মোট পাচার হওয়া মানুষের ১৭ শতাংশ। আর চার বছরে পাচার হওয়াদের মধ্যে ৫৪২ জন শিশু রয়েছে, যা মোট পাচার হওয়া মানুষের ৯ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১২ সালে মানব পাচারবিষয়ক আইন হওয়ার পর চার বছরে (২০১৫ সাল পর্যন্ত) ২ হাজার ৪২৯ জন মনুষ পাচার হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। এর মধ্যে ২০১২ সালে ৩৪২ জন, ২০১৩ সালে ৩৭৭ জন, ২০১৪ সালে ৬৮২ জন ও ২০১৫ সালে ১ হাজার ২৮ জন।’
পাচার হওয়া এই মানুষগুলোর কারো স্থান হয় বিদেশের কারাগারে, কেউ বন্দী শ্রমদাস হিসেবে বাধ্য হন বেগার খাটতে, শিশুদের হত্যা করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা হয়, নারীদের বিক্রি করে দেয় পতিতালয়ে। গত ২০১৫ সালের ২৯ মে দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সমুদ্রপথে মানবপাচারে আন্তঃদেশীয় সিন্ডিকেট বছরে প্রায় এক হাজার সাতশ কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা করছে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া সীমান্তে গণকবর আবিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক তোলপাড়ের পর থাইল্যান্ড এই হিসাব নির্ধারণ করেছে। থাইল্যান্ডের এই হিসাব বাংলাদেশ সরকারের কাছেও পৌঁছেছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পাচারকারী সিন্ডিকেট কাজ করছে।’
গণকবর আবিষ্কৃত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করলে তৎপরতা শুরু হয়। কক্সবাজার, টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপসহ গোটা উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২০টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২০১৪ সালে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পাচার হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পাচার হয়েছে ২৫ হাজার। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মানবপাচারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এই ব্যবসায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানবপাচারের সিন্ডিকেটগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যকেও জড়িত করে ফেলেছে। তাদের কাছেও অর্থের লেনদেন হয়। একদা শুধু বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকেরাই মানবপাচারের মাধ্যমে বিদেশ যেত। এখন সারা দেশ থেকে দালালদের মাধ্যমে লোক নেয়া হচ্ছে।’
গত বছরের ৩০ জুলাই সমকাল লিখেছে, ‘মানবপাচারের শিকারের ৭৪ শতাংশই পুরুষ। এ ছাড়া পাচারের শিকার হওয়ার মধ্যে রয়েছে ১৭ শতাংশ নারী ও ৯ শতাংশ শিশু।’
চাকরির নামে বিদেশে পাচার হওয়া মানুষদের দুঃখ-কষ্টের চিত্র তুলে ধরা হয়ে গত বছরের ৮ আগস্ট বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ‘সাগর কিংবা বিমান কোনো পথেই মালয়েশিয়ায় মানবপাচার যেন বন্ধ নেই। অনেকটা ফ্রিস্টাইলে মানবপাচার হচ্ছে মালয়েশিয়ায়। আর এসব অবৈধ অভিবাসীরা মালয়েশিয়ায় কাজ পেলেও পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে এখন নিঃস্ব অনেকেই। কেউবা লোক মারফত ভিসা পারমিট করে বৈধ হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা শুধু অবৈধ বা ভিসা ছাড়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের। আর এই অবৈধ শ্রমিকদের চিহ্নিত করে একটি মানবপাচার চক্র বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে এসব মানবপাচারকারী চক্র বাংলাদেশিদের করে বেড়াচ্ছেন নানা হয়রানি। অবৈধতার সুযোগ নিয়ে ভিসা পারমিট ও পাসপোর্ট করে দেয়ার কথা বলে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আর এতে প্রতারিত হচ্ছেন মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বিভিন্ন পেশার প্রবাসী বাংলাদেশিরা। জাল ভিসা, ভুয়া পারমিট বানিয়ে প্রতারণার জাল পেতেছে ওই চক্রটি। চক্রের সদস্যরা সারা দিনই মালয়েশিয়ার বাংলা টাউন, চায়না টাউন, হানিফ মার্কেট, জিএম প্লাজা, কেএলসি টাওয়ার বা আশপাশ এলাকায় ঘোরাঘুরি করে বাংলাদেশিদের প্রতারণার জালে আটকায়। আর এসব চক্রের মিষ্টি কথায় আকৃষ্ট হয়ে জালে ধরা দেন শত শত বাংলাদেশি। এমনই একটি পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার উত্তর খামের এলাকার মো. ছানাউল্লাহ। শুধু সর্বস্ব খুইয়েছেন তা নয়, জেল খেটে জীবন মরণাপন্ন বানিয়ে এখন দেশে এসে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। দীর্ঘ সাত মাসের জেলজীবনে ইলেকট্রিক শকও দিয়েছে মালয়েশিয়া কারাগার। শুধু ছানাউল্লাহ নন, অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের ভাগ্যে ঘটেছে এমন মর্মান্তিক ঘটনা। ভুক্তভোগী ছানাউল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এস এম সহিদ নামের মানবপাচারকারীর মাধ্যমে গত বছরের কোরবানি ঈদের সময় কাজের সন্ধানে মালয়েশিয়া আসি। কিন্তু এখানে আসার পর জানতে পারি আমাকে পিসি (অন্যজনের পাসপোর্টে ছবি লাগিয়ে) ভিসা দিয়ে আনা হয়েছে। বৈধভাবে আসার টাকা খরচ করে হয়েছি অবৈধ। পাচারকারী এস এম সহিদ আমার আত্মীয় হওয়ার পরও এমনটা করেছেন। কিন্তু চুপি চুপি মাস দুয়েক কাজ করার পর ধরা পড়ি মালয়েশিয়ান পুলিশের হাতে। পরে সাত মাস জেল খাটতে হয়। মালয়েশিয়ার জেলজীবন কতটা ভয়ানক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। জেলে থাকার সময় আমাকে রতান দিয়েছে। রতান হচ্ছে পিঠের মেরুদণ্ডের ঠিক নিচের অংশে ইলেকট্রিক শক দেয়া। এই শক দেয়ার পর ওই ব্যক্তি বেঁচে থাকলে বাকি জীবনে কাজ করার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেন। অনেক চিকিৎসা করিয়েও শরীরের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, শুধু সহিদই নয়, সঙ্গে রয়েছে তার ছোট ভাই মতি রায়হান। মালয়েশিয়ার চক্রটি পরিচালনা করেন মতি। ছানাউল্লাহর মতো এমন শত শত বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন, যারা এই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে এখন নিঃস্ব। তেমনি নরসিংদীর মনোহরদীর কোচেরচর এলাকার খোরশেদ। কাপাসিয়ার বারিষাব ইউনিয়নের গাওরাইট এলাকার ইব্রাহিম। ইব্রাহিম বলেন, ‘আমাকেও জাল ভিসা দিয়ে মালয়েশিয়া পাঠায় ওই চক্র। কিন্তু মালয়েশিয়ায় সহিদের ভাই মতি আমাকে রিসিভ করে তার কেএল জসকো সুপার মার্কেট এলাকার বাসায় আটকে রাখেন। পরে বাড়িতে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করে। মতি বলেন, টাকা না দিলে তিনি পুলিশে ধরিয়ে দেবেন। অথবা চীনাদের হাতে দিয়ে দেবেন। শুধু এরাই নয়, কাপাসিয়ার কান্দানিয়া গ্রামের মো. বিল্লাল, বারিষাবর পেচুরদিয়ার সামসুদ্দিনের ছেলে মাজহারুল, কান্দানিয়া গ্রামের কাশেম, চাপাত গ্রামের সোহরাব, বরহর গ্রামের রহমানের ছেলে রুহুল আমিন আবদুল্লাহ, রানীগঞ্জ এলাকার বালু ব্যবসায়ী জহিরের ভাগ্নে আলমগীর হোসেন, ফুলবাড়িয়ার ইউনুছ মার্কেট এলাকার মো. শামীম, কান্দানিয়া গ্রামের রাসেল, রাউেকানা গ্রামের সবুজ, পাকিয়াব গ্রামের সোহাগ, রাজেন্দ্রপুরের সোহেল, বড়হরের আবদল্লাহর মতো শত শত বাংলাদেশি রয়েছেন, যারা পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত সামসুদ্দিন বলেন, ‘আমি আমার ছেলে মাজহারুলকে সহিদের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা দিয়ে এনেছি। কিন্তু তাকে জাল ভিসা দেয়া হয়েছে। এ জন্য সহিদকে ফোন দিলে সে নানা হুমকি দিচ্ছে।’ এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু মানবপাচার নয়, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে বড় বড় সোনার চোরাচালানও আসছে বাংলাদেশে। আর এই সিন্ডিকেটের মূল নায়ক সহোদর দুই ভাই এস এম সহিদ ও মতি রায়হান। এই চক্রটির সাঙ্কেতিক নাম হলো এস এম। আর এই বাহিনী খোদ রাজধানী ঢাকায় গড়ে তুলেছে মানবপাচার ও সোনা চোরাচালানের সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক। নিজেরাই গড়ে তুলেছেন এক ভয়াবহ মানবপাচারের সিন্ডিকেট। এদের রয়েছে দেশের ৬৪ জেলাতেই নিজস্ব সিন্ডিকেট। রয়েছে পাড়া-মহল্লায় দালাল। আর এসব দালাল মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহীদের এনে জড়ো করেন গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায়। কাপাসিয়া শহরের ঝুমকা স্টুডিওতে তারা নিজেরাই বানিয়েছেন একটি মালয়েশিয়াগামী যাত্রীস্থল। তারা গাজীপুর শহরের কোর্ট বিল্ডিং এলাকার হাক্কানী হাউজিং প্রকল্পের একটি ফ্ল্যাটে মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করে। এ ছাড়া একাধিক নিজস্ব হলরুমে রাখেন মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের। আর এসব মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের তারা কক্সবাজারের টেকনাফ দিয়ে সাগরপথে কিংবা শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে বিমানপথে পাচার করেন। এসব পাচারের জন্য নিজেরাই পাসপোর্ট-ভিসা তৈরি করেন তারা। পাসপোর্টে নিজেরাই সিল মেরে ভিসা লাগান। আর এসব ভিসা লাগাতে যেতে হয় না মালয়েশিয়া হাইকমিশন বা সংশ্লিষ্ট কোনো অফিসে। নিজেরাই ভিসা লাগানোর সব সরঞ্জামাদি বানিয়ে নিজেরাই ভিসা লাগান মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের পাসপোর্টে। আর এসব নকল ভিসা লাগানো পাসপোর্ট দেখিয়ে অনায়াসেই মালয়েশিয়াতে পাঠানো হয় হাজার হাজার বাংলাদেশীদের। প্রতি মাসে অন্তত ১৫০-২৫০ জন পাঠিয়ে থাকেন এভাবে। শুধু কী নকল ভিসা-পাসপোর্টই বানান তা নয়। এই সিন্ডিকেট নিজেরা একেকটি পিসি পাসপোর্ট দিয়ে অন্তত শ’খানেক মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের বিমানবন্দর দিয়ে মালয়েশিয়া পাচার করছেন। আর এসব অবৈধভাবে মানবপাচারের সিন্ডিকেট তৈরি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। শুধু কী তাই। মালয়েশিয়াতে এদের রয়েছে কয়েকটি টর্চার সেল। এসব টর্চার সেলে নিয়ে যাত্রীদের আটকে রাখেন দিনের পর দিন। মোটা অঙ্কের টাকা না দেওয়া পর্যন্ত আটক রাখা সাধারণ যাত্রীদেরকে করা হয় নানা ধরনের নির্যাতন। এমনকি এসব মানুষকে দিনের পর দিন না খাইয়েও রাখা হয় টর্চার সেলে। যাও দু-একজন টাকা দিয়ে নির্যাতন থেকে রেহাই পেতেন। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হতো না তাদের। কারণ তাদের পরে মালয়েশিয়ার গভীর জঙ্গলে, পাহাড়ে নিয়ে কাজ করানো হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে সাধারণ মানুষদের ফুসলিয়ে নিয়ে গেলেও এসব যাত্রীর কাছ থেকে পাসপোর্ট-ভিসা কেড়ে নেয় ওই সিন্ডিকেট। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া অচেনা মালয়েশিয়াতে বিপাকে পড়েন মালয়েশিয়াগামী ওই যাত্রীরা। শুধু তাই নয়, মালয়েশিয়া নিয়ে কাজ দেয়ার কথা থাকলেও কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দেয়নি। সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে এক অমানবিক জীবনযাপন করতে হচ্ছে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়া হাজার হাজার সাধারণ মানুষের।’
(সূত্র: বাংলাদেশ  প্রতিদিন, ৮ আগস্ট, ২০১৬)

প্রবাসী শ্রমিকরা নিজেদের রক্ত পানি করে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠান। জমি-জমা ঘটিবাটি বিক্রি করে পাড়ি জমানোর পর অনেকে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেন। কেউ কেউ ফিরেন লাশ হয়ে। দৈনিক বণিক বার্তা গত ৫ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে দেনার টাকায় মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন কক্সবাজার সদর উপজেলার পশ্চিম পোকখালী গ্রামের জামাল হোসেন। কথা ছিল, সচ্ছলতা ফিরলে ফিরে আসবেন তিনিও। কিন্তু সচ্ছল হয়ে তার আর ফেরা হয়নি। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ফিরেছেন লাশ হয়ে। শুধু জামাল হোসেনই নন, ২০১৬ সালে এভাবে লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন কক্সবাজারের ৪৩ প্রবাসী। এভাবে বিদেশে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ নিহতের পরিবারই তা পায়নি। কক্সবাজারের নিহত ৪৩ জনের মধ্যে মাত্র ১১ জনের পরিবার এ সহায়তা পেয়েছে। তবে সহায়তাপ্রাপ্তদের মধ্যে দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণকারী কোনো শ্রমিকের পরিবার নেই। এতে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন পার করছে সহায়তা না পাওয়া পরিবারগুলো।’ ২০১৪ সালের ২৯ জুন বিবিসির এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ‘বাংলাদেশের শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী বলছেন, গত পাঁচ বছরে বিদেশে কর্মরত অবস্থায় মারা যাওয়া প্রায় ১৫ হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।’
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসী শ্রমিকদের মরদেহ দেশে পাঠানোর খরচ বহন করে থাকে। ওই বোর্ডের দেয়া তথ্য মতে, ১৯৯৩ সাল থেকে সর্বমোট ২১ হাজার ২২৯ জনের মরদেহ দেশে পাঠানো বাবদ ৫৮ কোটি ৯৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ৯ হাজার ৭৫৪ জন শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণ বাবদ ওই বোর্ডের তহবিল থেকে অনুদান পেয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রশাসনিক ধীরগতি, হয়রানিসহ নানা কারণে বেশির ভাগ শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবপাচারকারী দালালচক্র প্রতারণার মাধ্যমে নিহতদের ক্ষতিপূরণের টাকায় হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামের নিরীহ দরিদ্র শোকার্ত স্বজনরা ক্ষতি পূরণ পাওয়ার কথা জানতেও পারেন না। যারা জানতে পারেন তাদেরও নয়-ছয় বুঝিয়ে সামান্য কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাকি টাকা মেরে দেয় পাচারকারী চক্র। সচেতনতা সৃষ্টি, আইনের কঠোর প্রয়োগ, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে এই সঙ্কট উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। তা না হলে সুখের আশায় বিদেশে উড়াল দেয়া মানুষের সুখস্বপ্ন পুড়তেই থাকবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক