সর্বশেষঃ
post

আদর্শপ্রীতি বনাম ব্যক্তিপ্রীতি

রেদওয়ান রাওয়াহা

১৪ ডিসেম্বর ২০২১

আমরা জানি, এক অসম যুদ্ধে মক্কার মুশরিক সম্প্রদায় বদরের প্রান্তরে মুসলিম মুজাহিদদের নিকটে পরাজয় বরণ করেছে। পরাজিত হওয়ার পর থেকেই মুসলমানদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের মানসিকতায় বন্য হায়েনার মতো উন্মাদ হয়ে ছিলো তারা। তাদের চোখে-মুখে হিংসা-ক্রোধ-ক্ষোভের উত্তাল লেলিহান শিখা বিরাজিতই থাকতো সব সময়, সর্বদা। তারা মুহাম্মাদ-সা.-এর নব-প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্র, এবং সে-রাষ্ট্রের সফলতা ও অগ্রযাত্রা কোনো ক্রমেই মানতে পারছিলো না। মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ সা. এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে সমূলে নাশ করার নানান ফন্দি-ফিকির তারা এঁটে যেতে লাগলো। সেই ধারাবাহিকতায় তারা ওহুদের প্রান্তর জুড়ে দেয় সম্মুখ-সমরে যুদ্ধ। সে যুদ্ধ ও যুদ্ধের কলাকৌশল আমরা জানি। তো যখন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো, ঝাঁপিয়ে পড়লো যখন মুশরিকরা মুসলিমদের ওপর, প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিম বীরযোদ্ধারা মুশরিকদেরকে বীরবিক্রমে প্রতিরোধ করে হারিয়ে দিতে পারলেও পরক্ষণেই মুসলিমগণ নিজেদের ছোট্ট একটা ভুলে পরাভূত হয়ে যায়। মূলত তৎকালীন মুশরিক সেনাপতি জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদই অতর্কিত আক্রমণ করে মুসলিমদের হারিয়ে দেয়। এরপর থেকে খুন আর জখম হতে থাকে মুসলিম মুজাহিদগণ। মুশরিকদের আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে মুসলিম বাহিনী একে একে আহত আর শাহাদাতের সরাব পান করছে। সেদিনের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলেন না রাসূল সা. নিজেও। সশরীরে ময়দানে যুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সা.। তাই তো মানবতার বন্ধু, মায়ার মহানবী মুহাম্মদ সা.-কে কাফিররা হত্যা করতে পেরেশান হয়ে আছে। একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে নবীজিকে হত্যা করতে যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। উতবাহ বিন আবু ওয়াক্কাস। এই হতভাগা রাসূল সা.-কে দেখেই হিং¯্র গতিতে পাথর দ্বারা আঘাত করলো। পাথরের আঘাতে একপাশে ঢলে পড়লেন প্রিয় নবীজি। সেই আঘাতে তাঁর ডান পাশের ওপর-নিচের চারটে দাঁত ভেঙে যায়। কোত্থেকে তেড়ে এসে আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী। এসেই আঘাত করে নবীজির কপাল বরাবর। ঘোড়সাওয়ারি বনি হারিছ গোত্রের ইবনে কামিয়াহ। আল্লাহর রাসূলকে পরখ করলো। প্রিয় নবীজির দেহ মুবারকে কাঁধ বরাবর তরবারি দিয়ে খুব জোরেশোরেই আঘাত করলো এই জালিম!১ ভীষণ রকম আহত রাসূলুল্লাহ সা.। বিপর্যস্ত মুসলিম বাহিনী। এর মধ্যে চারদিকে কাফিররা রটিয়ে দিলো যে মুহাম্মাদকে আমরা নিহত করে ফেলেছি! এমন সংবাদে ভীষণ রকম হতাশায় পড়ে গেলো মুসলমানগণ। দিগি¦দিক দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে সবাই। ভেঙে গেলো তাঁদের মনোবল পুরোপুরিই। হারিয়ে গেলো তাঁদের অবশিষ্ট সাহস এবং ধৈর্যও। দুঃখ-বেদনায় তাঁরা ভারাক্রান্ত মুজাহিদগণ প্রবল পেরেশানিতে পড়ে গেলেন। মুহাম্মাদ সা. মারা যাবেন, পৃথিবী থেকে চলে যাবেন; এটা যেনো তাঁরা মোটেও মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি এই মানুষটিকেই ভালোবাসে! এখন সেই মানুষটাকে হারাবার যে পীড়ন, যেই দুঃখ, সেই দুঃখ আর পেরেশানি থেকে তাঁরা যুদ্ধের সারঞ্জম ফলে রেখে কেউ কেউ চলে যতে লাগলেন এদিক-ওদিক। যাকে সামনে পায় তাকেই তারা জিজ্ঞেস করে তাঁদের প্রিয় নেতা-প্রিয় নবী সম্পর্কে, তিনি কি বেঁচে আছেন নাকি সত্যিই নিহত হয়েছেন। হঠাৎ কেউ একজন আল্লাহর নামের কসম করে বলে উঠলো, ‘যদি মুহাম্মাদ সা. সত্যিই নিহতই হয়ে থাকেন, তা হলে আমি আমার সকলকে আমার বংশধরদের হাতে সোপর্দ করে দেবো। এই সুযোগে মুনাফিকরাও থেমে নেই। তারাও মুসলমানদের ঈমানহারা করার কোশেশ করতে চেষ্টার ত্রুটি করছে না। তারা রসিয়ে রসিয়ে আগুনে ঘি ঢালার মতো আচরণ করতে লাগলো। বলতে লাগলো যে, মুহাম্মাদ যদি নবীই হবে, তা হলে মারা গেলো কেন? চলো আমরা পূর্ব-ধর্মে ফিরে যাই! কেউ কেউ এই বলে আওয়াজ তুললো, ‘চলো, আমরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর (মুনাফিক নেতা) কাছে ফিরে যাই, সে-ই আমাদেরকে মুশরিক নেতা আবু সুফিয়ান থেকে নিরাপত্তা নিয়ে দিবে!’২ সংশয়ক্লিষ্ট-রোগাক্রান্ত মুসলিমদের অন্তরের অবস্থা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ওহি-মারফতে জানিয়ে দিলেন তাঁর প্রিয় হাবিবকে! অবতীর্ণ করলেন সেই আয়াতে কারিমাহ, যেখানে বলা হয়েছে, ‘মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর রাসূল ছাড়া কিছুই না। তাঁর পূর্বেও তো বহু নবী-রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি যদি মারা যান, কিংবা নিহত করে ফেলা হয় তাঁকে; তা হলে তোমরা কি তোমাদের পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে যাবে? যদি তোমরা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাও তা হলে তোমরা আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। (বরং এতে তোমরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করবে) আল্লাহ অবশ্যই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)৩ ওহুদের ময়দানে এই যখন অবস্থা, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত যখন সকলের মন-মনন-ঈমান, তখন আনাস বিন নযর রা. মুজাহিদদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, মুহাম্মাদ সা. তো স্রেফ আল্লাহর একজন রাসূল কেবল। তিনি সকলকে বলতে লাগলেন, আল্লাহর রাসূল সা. যদি নিহতই হয়ে থাকে তা হলে তাঁর আল্লাহ তো নিহত হননি। আল্লাহর রাসূল নিহত হয়েছে, তোমরা বেঁচে থেকে কী করবা তা হলে? তিনি যে দ্বীনের জন্য জীবন দিয়েছেন তোমরা সেই দ্বীনের জন্য তোমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখো। সেই জিহাদ সংগ্রামে তোমরা লড়াই করো। শহীদ হও।৪ অনুরূপভাবে সেদিন সাবিত ইবনু দাহদাহ রা. নামক অন্য একজন সাহাবিও তাঁর নিজ কওমকে ডেকে ডেকে বলেন, ‘যদি মুহাম্মাদ সা. নিহত হয়ে থাকেন তবে এ কথা জেনে রাখো যে, আল্লাহ জীবিত আছেন। তিনি চিরঞ্জীব। তিনি অমর। তিনি মরতে পারেন না। তাঁর এমন ঈমান দীপ্ত ঘোষণা শুনে আনসারদের একদল তাঁর নেতৃত্বে মুশরিকদের বিপক্ষে পুনরায় জিহাদে অবতীর্ণ হন। এক পর্যায়ে তিনি শাহাদাতের পেয়ালা পানে ধন্য হন।৫ ইসলাম এসেছে আল্লাহর রাসূলের মাধ্যমে। আমাদের দুনিয়া-আখিরাতের মুক্তির জন্য, মানবতার স্বস্তি ও নিরাপত্তার জন্যই মুহাম্মাদ সা.-এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম নামক এক মহা নিয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন। তিনি চলে গেলেই যদি ইসলামের পথ থেকে সরে গিয়ে কুফরির পতাকাতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়, তাহলে ইসলামে আসার মানেটা কী? সে-জন্য আল্লাহ কিন্তু মুসলিমদের সতর্ক করেছেন। কড়া ধমক দিয়েছেন! পবিত্র কুরআনের সূরা আলে-ইমরানের ১৪৪ নাম্বার আয়াতটা আমাদেরকে কী সুন্দর আর স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে, ‘মুহাম্মাদ সা. ¯্রফে আল্লাহর একজন রাসূল। এ ছাড়া আর কিচ্ছু না। তাঁর মর্যাদার কারণ, তাঁকে অনুসরণ করার কারণ এটাই যে, তিনি আল্লাহর মনোনীত একজন বান্দা ও রাসূল। তিনি ওহিপ্রাপ্ত, রিসালাতের গুণে তিনি গুণান্বিত; এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ। এর বাইরে তিনি মানবীয় গুণাবলির ঊর্ধ্বেও নন, এবং এমনও নয় যে তিনি আল্লাহর গুণের কোনো কিছু প্রাপ্ত হয়েছেন, যার ফলে তাঁকে মৃত্যু গ্রাস করবে না।’৬ মুহাম্মাদ সা. আমাদের জন্য নিয়ে এসেছেন সত্য, নিয়ে এসেছেন আলো, এনেছেন আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক আমাদের জন্য মনোনীত জীবনব্যবস্থা, ‘দ্বীনুল ইসলাম’। কিন্তু এ-সত্য, এই দ্বীন কোনো ব্যক্তিনির্ভর নয়। গোত্র কিংবা গোষ্ঠী নির্ভরও নয়। এই প্রসঙ্গে ইমাম মওদূদী (রহ.) বলেন; ‘সত্যের প্রতি প্রেম যদি তোমাদের জন্য কোনো ব্যক্তিনির্ভর হয়, তোমাদের জন্য আল্লাহর দ্বীন যদি শুধু মুহাম্মাদ সা.-এর ব্যক্তিত্বের সাথেই সম্পর্কিত হয়, তোমাদের ইসলাম যদি এতটাই দুর্বল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে যে, মুহাম্মাদ সা. পৃথিবী থেকে বিদায় হওয়ার সাথে সাথেই তোমরা পূর্বেকার সেই কুফরির দিকে ফিরে যেতে চাও, যেই কুফরিকে পরিত্যাগ করে তোমরা ইসলামের আলোয় আশ্রয় গ্রহণ করেছো, তাহলে আল্লাহর এই মহান দ্বীন তোমাদের কোনো-ই প্রয়োজন অনুভব করছে না।’৭ এখন আমরা যারা আমাদের কোনো প্রিয় মানুষ, প্রিয় শাইখ, প্রিয় আলিম বা প্রিয় নেতার মৃত্যুতে, কিংবা তাঁদের কোনো বিচ্যুতিতে অথবা বৃহত্তর কোনো প্রয়োজনে তাঁদের স্থানান্তরে মন খারাপ করে, হতাশ হয়ে কিংবা কষ্ট পেয়ে ইসলামের পথ থেকে সরে যাই, আন্দোলনে-আমলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ি, তাহলে তা কতটুকু যৌক্তিক এবং শরিয়া সম্মত হতে পারে? আমরা যদি কোনো নেতা, কোনো ইমাম, কোনো আলিমকে বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে ভালোবাসি, সেই ভালোবাসাটা তো নিছক ইসলামের জন্যই হওয়া উচিত। ইসলামের মানদণ্ডের বাইরে গিয়ে আমি কিভাবে সেই মানুষকে চিন্তা করতে পারি? তাঁদের কারো প্রস্থানে কিংবা কারো ব্যক্তিগত জীবনের ভুলের জন্য যদি আমি আল্লাহর দ্বীনের পথ ছেড়ে দিই, ছেড়ে দিই আন্দোলন-সংগ্রাম-সংগঠনের কাজ; সেটা কি আদৌ সঠিক ও উচিত কাজ হবে? ইসলামের কনসেপ্টের সাথে কি তা আদৌ যায়? যেহেতু স্বয়ং আল্লাহর রাসূলের মর্যাদা আর আনুগত্য হচ্ছে আল্লাহর আনীত দ্বীনের জন্য, রিসালাতের বাহক হবার জন্য; সেহেতু আমরা যে সমস্ত ইসলামি নেতৃত্ব-দায়িত্বশীলদের ভালোবাসবো, তাঁদেরকে তো সেই রাসূলের আনীত দ্বীনের জন্যই ভালোবাসবো। তাই না? এখন তাঁরা কেউ যদি সেই দ্বীনবহির্ভূত কিছু করে ফেলে, তাহলে সে অভিমানে দ্বীনের কাজ ছেড়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো মানে হয়? ঈমানের স্বাদ তো সে ব্যক্তিই পাবে, যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসলেও আল্লাহর জন্য বাসবে, ঘৃণা বা প্রত্যাখ্যান করলেও আল্লাহর জন্য করবে। যেসমস্ত ইসলামি ব্যক্তিবর্গ, আলিম-ওলামা, ইসলামি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ; যারা জালিমদের জুলুমের শিকার হয়ে শহিদ হয়েছে, দুনিয়া থেকে চিরকালের তরে বিদায় হয়ে গেছে; আমাদের কি উচিত নয় তাদের রেখে যাওয়া স্বপ্ন ও কাজের আঞ্জাম দেয়ার জন্য কর্মতৎপরতা আরো দ্বিগুণ-তিগুণ গতিতে বাড়িয়ে দেওয়া? নাকি সেই পথ, সেই আদর্শ থেকে হারিয়ে যাওয়াটাই সমাধান? রাসূলের সিরাত এবং আল্লাহর কুরআন আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়? তার মানে কি প্রিয়জন বিয়োগের বেদনায় আমরা ব্যথিত হবো না? কারো বিচ্যুতিতে মন খারাপ হবে না? প্রিয় দায়িত্বশীলের পরিবর্তনে মনের কোণে হাহাকার কিংবা শূন্যতার সৃষ্টি হবে না? হ্যাঁ, হবে। অবশ্যই হবে। সবাই কি সব দুর্বলতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে? রক্তে মাংসে গড়া মানুষ বলেই তো মানুষের ভেতর দুর্বলতা ঘুরতে থাকে দুর্নিবার! আমরা তো দেখেছি আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদেরও তা হয়েছে, স্বয়ং উমর ইবনুল খাত্তাব রা.র ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছে।

২. ওহুদে আল্লাহর রাসূল সা. মারা যাবার বিষয়টি তো মিথ্যে রটনা ছিলো, কিন্তু যেদিন সত্যিই আল্লাহর রাসূল সা. পৃথিবীর মায়া পরিত্যাগ করে দুনিয়া থেকে চলে গেলেন, সেদিন বিষয়টি উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কানে যাওয়ার সাথে সাথেই তার কলিজায় কাঁপন ধরে গেছে যেনো! তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। এতো শক্তিমান আর কঠিন হৃদয়ের মানুষ উমর রা., আল্লাহর রাসূলের ইন্তেকাল তিনি মানতেই পারেননি প্রথমদিকে। সেই বাস্তবতায় তিনি এতটাই কষ্ট পেয়েছিলেন যে, তরবারি হাতে নিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, “যে ব্যক্তি বলবে মুহাম্মদ সা. ইন্তেকাল করেছেন, আমি তার মস্তিষ্ককে দ্বিখণ্ডিত করে দেবো!” যেহেতু আসহাবে রাসূলদের মতো উচ্চ মাকামের মানুষদেরও এমন দুর্বলতা হয়েছে বা এসেছে, সেহেতু আমাদের মতো মানুষের মধ্যেও বিরহ-ব্যথা, কষ্ট ও হতাশা আসাটা একেবারেই স্বাভাবিক। আমাদের মতো মানুষদেরও এরকম কিছুতে মনটা ভেঙে খানখান-টুকরো টুকরো হওয়াটাও স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যেনো সেই ব্যথাতুর মন থেকে আল-কুরআন ও ইসলামের পথ থেকে দূরে সরে না যাই, সে শিক্ষাটাও আল্লাহ তাঁর রাসূলের জীবনীর মাধ্যমে, কুরআনের মাধ্যমে আমাদের দিয়েছেন। এখান থেকে আমরা আরো একটা শিক্ষা পাই; তা হলো এই যে, পরবর্তী যাঁরা ইসলাম-ইসলামি আন্দোলনের ধারক-বাহক হবেন, ইসলামের পূর্ণ বুঝ যার বা যাদের আছে, পরবর্তীতে নেতৃত্বের জোয়াল যাঁর বা যাদের কাঁধে আসবে, তাঁরা ইসলামের প্রকৃতরূপ, সঠিক চিত্র-শিক্ষা এবং আসল বুঝটা যেনো অন্যদের সামনে উপস্থাপন করেন। যেভাবে করেছেন ওহুদের প্রান্তরে সাবিত ইবনু দাহদাহ এবং আনাস বিন নযর আনহুমা। আর আল্লাহর রাসূলের ইন্তেকালের পরে আবু বকর সিদ্দিক রা.।

৩. আল্লাহর রাসূল সা.-এর ইন্তেকালে যখন সাহাবায়ে কিরাম এবং স্বয়ং উমর রা.ও শোকে মুহ্যমান, মেনে নিতে পারেননি এমন বাস্তবতা, তখন আবু বকর রা. কৌশল অবলম্বন করে রাসূল সা.-এর মিম্বারে দাঁড়িয়ে যান, এবং ওহুদে অবতীর্ণ হওয়া সূরা আলে-ইমরানের ১৪৪ নাম্বার আয়াতটি তেলাওয়াত করে শুনান; যেখানে বলা হয়েছে, “আর মুহাম্মাদ সা. কেবল একজন রাসূল। তাঁর পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি তিনি মারা যান অথবা তাঁকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।” এই সাথে আরো একটি আয়াত তিলাওয়াত করেন,“নিশ্চয়ই তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশলী।” (সূরা যুমার : ৩৯)? সাথে তিনি ছোট্ট করে একটি বক্তৃতা করেন, সেখানে তিনি বলেন, “যারা মুহাম্মদ সা.-এর ইবাদাতকারী ছিলো, তারা জেনে রাখো, মুহাম্মদ সা. ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদাতকারী, তারা নিশ্চিত জেনে রাখো, আল্লাহ চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী।”৮ সাঈয়িদুনা আবু বকর রাদিয়াল্লাহুর এই সান্ত¡না এবং বাস্তবভিত্তিক এই বক্তৃতা, দায়িত্বশীলসুলভ এই ভূমিকা ও আচরণ দ্বারা সাঈয়িদুনা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কিভাবে কতটা দ্রুত প্রভাবিত হয়েছেন, কতটা কার্যকরী ছিলো আবু বকর রা.এর উক্ত ভূমিকা, তা দেখুন। “ইবনু আব্বাস রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আবু বকর রা. তা পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেনো জানতো না যে, আল্লাহ তা’আলা এরূপ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। এরপর সমস্ত সাহাবি তাঁর থেকে উক্ত আয়াত শিখে নিলেন। তখন সবাইকে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম। আমাকে সাঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহ.) জানিয়েছেন, ‘উমর রা. বলেছেন, আল্লাহর কসম! আমি যখন আবু বকর রা.কে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন ভীত হয়ে পড়লাম এবং আমার পা দুটো যেনো আমার ভার নিতে পারছিলো না, এমনকি আমি মাটিতে পড়ে গেলাম যখন শুনতে পেলাম যে, তিনি তিলাওয়াত করছেন যে নবী সা. ইন্তেকাল করেছেন।৯ এখন আমরা যারা সত্যের অনুসারী, দ্বীনের অনুগামী, দ্বীনের প্রচার-প্রসার এবং বিজয় যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য, সেহেতু আমরা ব্যক্তির থেকে বেশি প্রাধান্য দেবো সত্যকে, দ্বীনকে, আমাদের আদর্শকে। ব্যক্তির প্রতি মায়া-ভালোবাসা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সেই মায়া সেই টান যেনো আমাদেরকে সত্য থেকে টলাতে না পারে, অভিমান হোক বা অভিযোগ; তা হতে যেনো আমরা আল্লাহর পথ ছেড়ে না দিই। আন্দোলন-সংগ্রাম-সংগঠনে আমরা যেনো নিষ্ক্রিয় হয়ে না পড়ি। আমাদের গতি যেনো শ্লথ না হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ যারা আছেন, থাকবেন বা হবেন; তাদেরও কিছু ভূমিকা আছে বৈকি! সে ভূমিকা পালনের জন্য আমরা এ-বিষয় মনে রাখতে পারি যে, আমরা তো মানুষ, মানবিক দুর্বলতা মানুষেরই থাকবে। কারো প্রতি কারো একটু বেশি ভক্তি থাকবে, কারো প্রতি একটু মায়া-আনুগত্য বাড়তি থাকবে, দুর্বলতা থাকবে, কারো যোগ্যতা একটু বেশি থাকবে, কারো থাকবে একটু কম। কেউ একদিকে দক্ষ তো কেউ অন্যদিকে। এটাই মানুষের সমাজ। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। আর এ বিষয়টি মাথায় রেখেই দায়িত্বশীল ভাইদের চলা উচিত। সিনিয়র-জুনিয়র, সাবেক-বর্তমান কাউকে কোনো কিছু নিয়ে দোষারপ করে কিংবা পাল্টা অভিযোগ তুলে যেনো কাউকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে ঠেলে না দিই। দ্বীনের কাজে নিষ্ক্রিয় করে না দিই। ইসলাম ও ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠাকাক্সক্ষী দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের উচিত ওহুদের ময়দানে সাবিত ইবনু দাহদাহ এবং আনাস বিন নযরের যেই ভূমিকা ছিলো, আল্লাহর রাসূলের ওফাতের পর আবু বকর রা.-এর যে ভূমিকা ছিলো, সেই কালজয়ী দায়িত্বশীলসুলভ ভূমিকা গ্রহণ করতে চেষ্টা করা। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন!

তথ্যসূত্র ১. আর-রাহিকুল মাখতুম-৩০৯ পৃষ্ঠা ২. তাফসীরে তাবারী-৬ষ্ঠ খণ্ড ৩. তাফসীরে আহসানুল বায়ান ৪. তাফসীরে তাবারী- ৬ষ্ঠ খণ্ড ৫. আসসিরাতুল হালাবিয়াহ- ২ খণ্ড ৬. তাফসীরে আহসানুল বায়ান ৭. তাফহীমুল কুরআন ৮. সহীহ বুখারী-৩৬৬৮ ৯. সহীহ বুখারী- ৪৪৫৪

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির