post

আমার যখন ফুরাবে দিন

ইয়াসিন মাহমুদ

১৯ জুলাই ২০২৩

এক.

সময়ের অতল গহ্বরে অতীত হয়ে যাই আমরা। কেবলই স্মৃতিসাগরে উঁকি মারে প্রিয়মুখ। প্রতিদিন আমাদের সামনে আমাদের প্রিয়জনেরা চলে যাচ্ছে। ভাবছি, আমিও চলে যাবো। কখন কে চলে যাবো, কখন কার ডাক আসে আমরা কেউই তা জানি না। যখন কারো জানাজা আদায় করি, তখন খুব কাছ থেকে অনুভব করি আমাকেও চলে যেতে হবে। কী করছি আমি! আমার কী করা উচিত- বিষয়টা খুব বেশি ভাবিয়ে তোলে। খানিক পরে আমার সে অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায়। সময় চলে যায়। বয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না। আমাদের জীবনে সময় যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা জীবনের সঙ্কটময় মুহূর্ত ছাড়া বোঝানো সম্ভব নয়। একটুখানি সময়ের জন্য কতই না আহাজারি! এত আহাজারির পরও কি কভু সেই সময় এবং সুযোগ ফিরে আসে?

দুই.

মহান আল্লাহ আমাদের হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছেন আল-কুরআন ও তাঁর নবীগণকে। আজ নবী নেই কিন্তু তাদের উত্তরসূরি হিসাবে রয়েছেন উলামায়ে কেরামগণ। সর্বদা তাঁরা আমাদেরকে সত্য ও সুন্দরের পথে আহ্বান করছেন। অথচ আমরা তা আমলে না নিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছি। আমরা তো সবাই-ই জানি, আমাদের মৃত্যু হবে। আমাদের সাথে কেউই যাবে না। আমাকে একাকী অন্ধকার গহিন কবরে থাকতে হবে। মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান দিবসে আবার হাজির হতে হবে। এই দুনিয়ার অর্জিত আমলই সেদিনের সম্বল। তবুও সেই সম্বল অর্জনে আমাদেও কোনো প্রতিযোগিতা নেই। নেই কোনো তৎপরতা। কেবল অবহেলা আর উদাসীনতাই যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অথচ সময়ও স্রােতের তালে ছুটে চলেছে অবিরত। তার জীরন নেই; নেই বিরতি ও বিশ্রাম। আমাদের জীবনও থেমে নেই। তবে একসময় জীবন থেমে যায়। আর থেমে যাওয়াই তার ধর্ম ও নিয়তি। এটা মহান আল্লাহর এক অমোঘ এবং শ্বাশত বিধানও বটে। এই বিধান পাশ কাটানোর শক্তি ও সামর্থ্য কারোরই নেই।

তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী? আমাদের কি কিছইু করার নেই? সামনে চলার মতো কোনো পথ নেই? নাকি চারিদিকে বন্ধ দুয়ার? হ্যা, করণীয় আছে। সামনে চলার পথও খোলা আছে। আর তা হলো- সময়ের কাজ সময়ে করা। প্রতিটি সময়ের সদ্ব্যবহার ও যথার্থ মূল্যায়ন করা। সময়ের কাঁটায় নিজেকে গড়ার কাজে মেলে ধরা। এর বিকল্প সহজ কোনো পথ দেখছি না আপাতত।


তিন.

দুনিয়া একটা মুসাফিরখানা। আমরা সবাই মুসাফির। পথিক। পথ চলাই আমাদের কাজ। পথের যেমন দুটি ধার থাকে। আমাদের চলার পথও তেমনি। কোন্ পথ কল্যাণ ও মুক্তির, কোন পথ শান্তি ও নাজাতের পথ; সেই পথ অন্বেষণ করা ও সেই পথের বাঁক ধরে হেঁটে হেঁটে মানজিলে পৌঁছানোই মূলত মুমিনের কাজ।

আমরা মানুষ। পাপে-তাপে আর ভুল-বিচ্যুতিতে ভরে গেছে আমাদের জীবনের খাতা। জেনে না জেনে প্রতিদিন কত অপরাধই তো করি আমরা। তবুও মহান প্রভু কত দয়াবান ও মেহেরবান। আমাদের এত অপরাধের কোনো বাদ-প্রতিবাদ তিনি করেন না। সাথে সাথে শাস্তি দেন না। বরং মমতার বন্ধনে আমাদেরকে বেঁধে রাখেন সারাবেলা। অনন্ত অসীম সেই মাবুদের কাছে করি প্রার্থনা-

তোমার দেয়া সেই আলোকিত পথ

যেই পথে খুঁজে পাই আসল কি মত

আজ শুধু ফরিয়াদ তোমার কাছে 

সেই পথে চলবার শক্তি দিও।

- কবি জাকির আবু জাফর


চার.

আজকের বর্তমানই আগামীকাল অতীত হয়ে যায়। ‘বর্তমান’ বলতে আদতে কিছু নেই। ‘বর্তমান’ শব্দটি উচ্চারণ করতে করতেই তা নিজেও অতীতের গর্ভে হারিয়ে যায়। এমন নশ্বর অযুত-লক্ষ-কোটি বর্তমানের সমষ্টিই মানবজীবন; মহাকালের কাছে যা নিতান্তই নগণ্য। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মানুষের জীবনের অতীতটা হচ্ছে একটা স্বপ্ন, ভবিষ্যৎটা হচ্ছে একটা আকাক্সক্ষা; আর মাঝখান থেকে সময় সব চলে যাচ্ছে।”

সময়ের চাকা সর্বদা দুরন্ত গতিতে ছুটছে তো ছুটছে। অবহেলা কিংবা অনাদরে আমাদের কত সময় যে চলে যায় তার হিসাব কষেছি কখনো? মূল্যহীন ভেবে যে সময়কে কাজে লাগায়নি, সেই সময়ই কিন্তু একদিন আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। আহা! সময় কত মূল্যবান। একটি সময়ের মুখোমুখি আমরা সকলে নতুনভাবে জীবনের সন্ধান করে ফিরি।

পাঁচ.

প্রভাতবেলায় সূর্য তার প্রখর দীপ্তি নিয়ে বিকিরণ ছড়ায়। দ্বি-প্রহরেও থাকে তার জ্যোতির পরাগ। বিকেলের সাথে সাথে ক্রমে ক্রমে কমতে থাকে ঝাঁজ। দিনের শেষ প্রান্তে এসে অস্তমিত হয় সে। চারিদিক আবার আন্ধারের ঘনঘোর দেখা যায়। বেলা ফুরাবার সাথে যেন সব নিঃস্তব্ধ। নিথর। কোলাহল মুক্ত। আমাদের জীবনও সূর্যের মতো। জীবন প্রভাতের মতো সারা জীবন আলো ঝলোমলো থাকে না। জীবন সায়াহ্নে এসে জীবন থমকে যায় অনেকখানি। থেমে যায় গতিপথ। তাই সময় ফুরিয়ে যাবার আগেই গুছিয়ে নিতে হয় গন্তব্যের সাজসজ্জা ও রসদ। প্রস্তুত রাখতে হয় নিজেকে। এমন প্রস্তুতি কেবলই সে পথযাত্রায় সাহসী ও ভয়হীন করে তোলে। প্রশান্তচিত্ত উতলা করে রবের সান্নিধ্যের আকাক্সক্ষা।


ছয়.

আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দিকে খেয়াল করি, আমাদের এই প্রজন্ম কতটুকু মনে রেখেছে তাদেরকে? পরবর্তী প্রজন্ম আমাদেরকেও মনে রাখবে না এটাই খুব স্বাভাবিক। মানে নিজের অর্জনটাই নিজেরই। বাকিটা অনিশ্চিত। ক্ষমতা, যশ, খ্যাতি সবই একদিন ব্যর্থ হবে; যেদিন আল্লাহর দরবারে নিজের আমল দিয়ে পার হতে হবে। সব হইচই-কোলাহল যেন নিবিড় শান্ত পরিবেশ। কোনো উচ্চবাচ্য নেই। আর সেদিন কোনো উচ্চবাচ্যও কাজে আসবে না। শুধু নিজের সঞ্চয় ছাড়া সেদিন পার হওয়া বড়ই মুশকিল। সে বিভীষিকাময় মহাদিনে শুধু আফসোস জমা হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন-

‘হায়! আমরা যদি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করতাম।’ (সূরা আহজাব: ৬৬)। অন্যত্র মহান আল্লাহ আরো বলেছেন- ‘হে আমার রব! আমাকে আবার ফেরত পাঠান। যাতে আমি সৎ কাজ করতে পারি, যা আগে করিনি।’ (সূরা মুমিনুন: ৯৯)।

একটা বিষয় খুব খেয়াল করেন, দুনিয়াবি কোনো কাজে যদি আমরা একবারের সুযোগে সফলতা অর্জন করতে ব্যর্থ হই; পুনরায় সুযোগদানের আবেদন করলে তা নাকচ হয়ে যায় সহসা। তাহলে কিয়ামত দিবসে আবার ফেরার আবেদন কতটা যুক্তিসঙ্গত? এখনই হিসেব মেলানোর সময়। নিজেই নিজের প্রস্তুতি নিতে হবে। সফলতার দ্বার খুঁজে বের করতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে মানজিলের দিকে।

ভয়াবহ সেই কঠিন সময়ে মহান প্রভুর কাছে প্রার্থনা-

আমার যখন ফুরাবে দিন 

আসবে গহিন রাতি

থেকো প্রভু এ জীবনে

হয়ে চির সাথী।

- তারিক মুনাওয়ার

লেখক : কবি ও গবেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির