post

আল্লাহর ভালোবাসা যাদের জন্য

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

২৯ মে ২০২৩

الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاء وَالضَّرَّاء وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

অনুবাদ

যারা স্বচ্ছল এবং অসচ্ছল উভয় অবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করে, রাগের সময় রাগ সংবরণ করে ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল;  আল্লাহ সেই সমস্ত মুহসিন বান্দাদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আল ইমরান : ১৩৪)


নামকরণ

এ সূরার ৩৩ নং আয়াতে  اٰلَ عِمْرٰنَ শব্দ থেকে এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে আল ইমরান। এ সূরার আরেক নাম আয-যাহরাহ বা আলোকচ্ছটা। (সহিহ মুসলিম : ৮০৪) এছাড়াও এ সূরাকে সূরা তাইবাহ, আল-কানুয, আল-আমান, আল-মুজাদালাহ, আল-ইস্তেগফার, আল-মানিয়াহ ইত্যাদি নাম দেওয়া হয়েছে। 


নাজিলের সময়কাল

সূরা আল ইমরান আল কুরআনুল কারিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম সূরা এতে ২০ রুকু ও ২০০ আয়াত রয়েছে। এ সূরাটি চারটি ভাষণে নাজিল হয়েছে।

১. সূরার শুরু হতে চতুর্থ রুকুর প্রথম দু আয়াত পর্যন্ত বদর যুদ্ধের পরপরই নাজিল হয়েছে।

২. আর اِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰۤی اٰدَمَ وَ نُوْحًا وَّ اٰلَ اِبْرٰهِیْمَ  وَ اٰلَ عِمْرٰنَ عَلَی الْعٰلَمِیْنَ থেকে শুরু করে ৬ষ্ঠ রুকু পর্যন্ত ৯ম হিজরিতে নাজিল হয়। 

৩. তৃতীয় অংশ তথা ৭ম রুকু হতে ১২তম রুকু পর্যন্ত প্রথম ভাষণের পরপরই নাজিল হয়।

৪. চতুর্থ অংশটি ১৩তম রুকু হতে সূরার শেষ পর্যন্ত ওহুদ যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ওহুদের ঘটনা সম্পর্কে নাজিল হয়।


সূরার আলোচ্য বিষয়

অত্র সূরার কথাগুলো বিশেষ করে দুটি দলের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। প্রথমদল আহলে কিতাব তথা ইহুদি নাসারা। আর দ্বিতীয় দল হজরত মুহাম্মদ সা.-এর অনুসারি তথা মুসলমানগণ। এই সূরার শুরুতেই মহান আল্লাহর একত্ববাদ, তার গুণাবলি এবং বৃহৎ চারটি গ্রন্থ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এরপর তার অসীম ক্ষমতা ও মাতৃগর্ভে সন্তানের আকৃতি প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এরপর মুহকাম এবং মুতাশাবিহ, মুতাশাবিহকে অকপটে অস্বীকার করে নেওয়া সঠিক পথে স্থির থাকার প্রার্থনা, শেষ দিবসের উপস্থিতি, কাফেরদের পরিণাম, ফেরাউনদের দৃষ্টান্ত, দুনিয়ার মোহ, মনোনীত দ্বীন ইসলাম, সব কিছু আল্লাহর হাতে, ইমরানের ঘটনা জাকারিয়ার প্রার্থনা মারইয়ামের প্রতিপালন, ঈসা আ. -এর আবির্ভাব, তার মুজিজা, তাকে আকাশে উত্তোলন, হজরত ঈসা আ.-এর দৃষ্টান্ত হজরত আদম (আ), আহলে কিতাবদের ষড়যন্ত্র, সর্বপ্রথম ইবাদাতের ঘর কাবা শরীফ, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, ইহুদিরদের লাঞ্ছনা, বদর যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য, সুদ, মুত্তাকীদের আলামত, সুখে-দুঃখে দান খয়রাত, ক্রোধ-দমন, পাপের অনুশোচনা করে ক্ষমা চাওয়া। 

এরপর ওহুদ যুদ্ধের ঘটনা, ওহুদে বিপর্যয়, ওহুদে মুনাফিকদের কার্যকলাপ, পরামর্শ, দৃঢ় মনোবল, রাসূলের আগমন রহমত স্বরূপ, শহীদের অনাবিল জীবন, উত্তম-অধমের মধ্যে পার্থক্য, ইহুদিদের দৃষ্টান্ত, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মুসলমানের ধৈর্য ও আল্লাহভীরুতা, মহান আল্লাহর সৃষ্টির নির্দেশনাবলি সব সময় তার স্মরণ, তার নিকট প্রার্থনা, বান্দার ডাকে আল্লাহর সাড়া, পাপ মোচনের অঙ্গীকার। কাফেরদের পরিণাম, মুমিনদের অনাবিল সুখ-শান্তির কথা, কিছু আহলে কিতাবের মহৎগুণ এবং সব শেষে মুসলমানদের ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আল্লাহভীরুতার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। 


ঐতিহাসিক পটভূমি

বদর যুদ্ধে ঈমানদারগণ বিজয় লাভ করলেও সমগ্র আরবের বিরোধী শক্তিগুলো এতে সজাগ ও সচেতন হয়ে উঠেছিল। এমতাবস্থায় মুসলমানরা নিরন্তর ভীতি ও অস্থিরতার মধ্যে ছিল। সকল বিরোধী শক্তি একজোট হয়ে যেন মুসলমানদের এ ক্ষুদ্র দলটিকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে এমন আশংকা বিরাজমান ছিল। এদিকে মদিনার অর্থনৈতিক অবস্থার উপরও এর প্রভাব পড়েছিল। 

হিজরতের পর মদিনার আশেপাশের চুক্তিবদ্ধ ইহুদী গোত্রগুলোও মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তির প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করতে লাগলো। বদর যুদ্ধের পর তারা কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রগুলোকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই উস্কানী দিতে লাগলো। মুনাফিক ও মক্কার কুরাইশ গোত্রগুলোও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অগণিত ষড়যন্ত্র করতে লাগলো। এমনকি রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রাণ নাশের আশঙ্কাও মুসলমানদের অন্তরে দেখা দিতে থাকে। এ সময় মুসলমানরা সবসময় সশস্ত্র থাকতো। অতঃপর ওহুদ যুদ্ধেই মুনাফিকদের পরিচিতি সুষ্পষ্ট হয়ে উঠলো। যুদ্ধ চলাকালে তারা মুসলমানদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির কোনো প্রচেষ্টাই বাদ রাখেনি। ওহুদের বিপর্যয়ে মুনাফিকদের হাত থাকলেও মুসলমানদের নিজেদের দুর্বলতাও ছিল যা মুসলমানদের তখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতিতে একান্তই স্বাভাবিক ছিল। 


সূরার ফজিলত

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন- ‘তোমরা কুরআন পাঠ করো। কারণ, তা পাঠকারীর জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি আলোকচ্ছটাময় সূরা বাকারাহ ও আলে-ইমরান পড়; কেননা, এ দুটি সূরা কিয়ামতের দিন এমনভাবে আসবে যেন দুটি মেঘখন্ড অথবা দুটি ছায়া অথবা দু’ঝাক পাখির মত। তারা এসে এ দু’সূরা পাঠকারীদের পক্ষ নেবে।’ (সহিহ মুসলিম : ৮০৪)। 

অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘কিয়ামতের দিন কুরআন আসবে যারা কুরআনের উপর আমল করেছে, তাদের পক্ষ হয়ে। তখন সূরা আল-বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান থাকবে সবার অগ্রে।’ (সহিহ মুসলিম : ৮০৫)।


আয়াত সংশ্লিষ্ট বিষয়

আলোচ্য আয়াতের আগের দুটি আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করলে রহমত করা হবে। এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে, মাগফিরাতের জন্য ও জান্নাতের জন্য ছুটে আসো, জান্নাত তো মুহসিনদের জন্যই প্রস্তত করা হয়েছে। আর এখানে ১৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক জান্নাতিদের তিনটি গুণের কথা বলেছেন। যেমন সচ্ছল অবস্থায় থাকো কিংবা অসচ্ছল অবস্থায় থাকো সর্বাবস্থায় ব্যয় করো। এরপর বলা হয়েছে, ক্রোধ দমন করো এবং ক্ষমা প্রদর্শন করো। এই তিনটি মৌলিক গুণ জান্নাতে যেতে হলে মুহসিনদের অবশ্যই থাকতে হবে।


আয়াতের ব্যাখ্যা

১ম গুণ : আল্লাহ তায়ালা মুহসিনদের ১ম গুণাবলি সম্পর্কে বলেন-

الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاء وَالضَّرَّاء 

অর্থাৎ যারা স্বচ্ছলতা ও অভাবের মধ্যে ব্যয় করে।

মুহসিন তারাই, যারা আল্লাহ তায়ালার পথে স্বীয় অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে অভ্যস্ত। স্বচ্ছলতা হোক কিংবা অভাব-অনটন হোক, সর্বাবস্থায় তারা সাধ্যানুযায়ী ব্যয় কার্য অব্যাহত রাখে। বেশি হলে বেশি এবং কম হলে কমই ব্যয় করে। এতে একদিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তিও আল্লাহ্র পথে ব্যয় করতে নিজেকে মুক্ত মনে করবে না এবং সৌভাগ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখবে না। অপর দিকে আয়াতে এ নির্দেশও রয়েছে যে, অভাব-অনটনেও সাধ্যানুযায়ী ব্যয়কার্য অব্যাহত রাখলে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করার কল্যাণকর অভ্যাসটি বিনষ্ট হবে না। সম্ভবত: এর বরকতে আল্লাহ্ তায়ালা আর্থিক স্বচ্ছলতা ও স্বাচ্ছন্দ্য দান করতে পারেন। স্বচ্ছলতা ও অভাব-অনটন উল্লেখ করার আরও একটি রহস্য সম্ভবত: এই যে, এ দু’অবস্থায়ই মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায়। অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য হলে আরাম-আয়েশে ডুবে মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায়। অপরদিকে অভাব-অনটন থাকলে প্রায়ই সে চিন্তামগ্ন হয়ে আল্লাহ্র প্রতি গাফেল হয়ে পড়ে। আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ্র প্রিয় বান্দারা আরাম-আয়েশেও আল্লাহকে ভুলে না কিংবা বিপদাপদেও আল্লাহ্র প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে না।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَا تُنْفِقُوْا مِنْ خَيْرٍ فَلِاَنْفُسِكُمْ وَمَا تُنْفِقُوْنَ اِلاَّ ابْتِغَٓاءَ وَجْهِ اللهِ وَمَا تُنْفِقُوْا مِنْ خَيْرٍ يُّوَفَّ اِلَيْكُمْ وَاَنْتُمْ لاَ تُظْلَمُوْنَ.

“তোমরা যে ধন-সম্পদ ব্যয় করো, তা তোমাদের নিজেদের জন্য। তোমরা তো শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্যই ব্যয় করে থাক। তোমরা যে ধন-সম্পদ ব্যয় কর, তার প্রতিদান তোমাদেরকে পুরোপুরিভাবে প্রদান করা হবে। তোমাদের প্রতি অবিচার করা হবে না।” (সূরা বাক্বারা : ২৭২)।

আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, একবার একলোক রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো, হে আল্লাহর রাসুল! সা. দান-সাদকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাওয়াব কোন সাদকায়? তিনি বললেন, তুমি এমন অবস্থায় দান করবে যে, তুমি (শারীরিকভাবে) সুস্থ; ধন-সম্পদের প্রতি লোভ আছে; অভাব-অনটনকে ভয় করছো এবং ধন-সম্পদের আশাও পোষণ করছো। (ওই অবস্থায় এ আশংকায়) তুমি দান করার ব্যাপারে এমন কার্পণ্য করো না যে, শেষে মৃত্যুর সময় এসে যায়। আর তখন তুমি এটা ঘোষণা কর যে, এ পরিমাণ অমুকের এবং সে পরিমাণ অমুকের। অথচ অমুকের জন্য সে মাল আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

وَعَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ ؓ : اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ ، قَالَ  مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِّنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ اِلاَّ عِزًّا ، وَمَا تَوَاضَعَ اَحَدٌ لِلّٰه ِ اِلاَّ رَفَعَهُ اللهُ.

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহর পথে দান-খায়রাতে সম্পদ কমে না। যাকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমার গুণে সমৃদ্ধ করেন, তাকে নিশ্চয়ই সম্মান দিয়ে ধন্য করেন। যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্য বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে, মহা মহিমাময় আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। (রিয়াদুস সালেহীন : ৫৬১)।

২য় গুণ : মুহসিন বান্দাদের ২য় গুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ   অর্থাৎ রাগ সংবরণকারী

রাগ বা ক্রোধ মানুষের জীবনের অন্যতম  একটি মন্দ দিক। কারো রাগ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাগান্বিত মানুষ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে সে অন্যের ওপর অবলীলায় অত্যাচার-অবিচার করে বসে। রাগ মানবিক আবেগেরই অংশ। তবে অনিয়ন্ত্রিত রাগ মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। কেননা তা নানান সমস্যা সৃষ্টি করে। হাদিসে এসেছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ  أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : ‏"‏ لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ ‏"‏‏.‏ 

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। (তিনি বলেন,) রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : প্রকৃত বলবান ও বীর পুরুষ সে নয়, যে কুস্তিতে কাউকে হারিয়ে দেয়। বরং প্রকৃত বীর পুরুষ সে, যে ক্রোধের সময় নিজকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে (অর্থাৎ যে ক্রোধ সংবরণে সক্ষম সে প্রকৃত বীর পুরুষ)। (সহিহ বুখারি : ৬১১৪)।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَجُلاً قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصِنِي‏.‏ قَالَ : ‏

"لاَ تَغْضَبْ‏"‏‏.‏ فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ : ‏"‏لاَ تَغْضَبْ‏"‏‏.‏


আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। (তিনি বলেন,) জনৈক ব্যক্তি নবী সা. কে বললো, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, ক্রোধানি¦ত হয়ো না। লোকটি বারবার তার অনুরোধের পুনরাবৃত্তি করলে নবী সা.-ও প্রতিবারই  বলতে  থাকলেন : ক্রোধানি¦ত হয়ো না। (সহিহ বুখারি : ৬১১৬)। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ) বর্ণনা করেন, নবীজি সা. আমাদের আরও উপদেশ দিয়েছেন, ‘যদি তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তবে তাকে নীরব থাকতে দাও।’ যদি কোনো ব্যক্তি শান্ত বা নীরব হওয়ার চেষ্টা করে, তবে এটা অবশ্যই তাকে মারামারি কিংবা কটু কথা বলায় বাধা প্রদান করবে।

  জীবনের এক কঠিনতম সময়ে আমাদের প্রিয় নবীজি সা. তায়েফে গিয়েছিলেন, আশা করেছিলেন তায়েফবাসী তাঁর কথা শুনবে, তাঁকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু সহযোগিতার পরিবর্তে তিনি পেলেন অপমান। তাঁর শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পায়ে গিয়ে জমাট বাঁধল। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে একজন ফেরেশতা এলেন। ফেরেশতা তায়েফের দুপাশের পাহাড় এক করে দিয়ে তায়েফবাসীকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু দয়াল নবী সা.-এর উত্তর ছিল, ‘ (না, তা হতে পারে না) বরং আমি আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশে এমন সন্তান দেবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে শরিক করবে না।’(সহিহ বুখারি : ৪৫৪)। রাগ সংবরণকারীর মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো রাগকে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হওয়া সত্বেও দমন করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সমস্ত সৃষ্টিকুলের সামনে ডেকে যে কোনো হুর পছন্দ করে নেওয়ার অধিকার দিবেন।”  (ইবন মাজাহ : ৪১৮৬)। অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “আল্লাহর কাছে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রাগ সংবরণ করার চেয়ে বড়ো কোন সংবরণে বেশী সওয়াবের নেই।” (ইবন মাজাহ : ৪১৮৯)।


রাগ কীভাবে দমন করবেন

শয়তান মানুষের বিনাশ ও ধ্বংসের মধ্যে আনন্দ পায়। শয়তানের চতুর্মূখী কুমন্ত্রণায় পড়ে মানুষ যাবতীয় অন্যায় কর্মে লিপ্ত হয়। শয়তানের অস্ত্রগুলোর মধ্যে প্রচ- রাগ বা ক্রোধ অন্যতম। প্রচ- রাগের সময় করণীয় সম্পর্কে রাসূল সা. যেসব আমলের কথা বলেছেন, সেগুলো হলো-

১. আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা : শয়তানের শত্রুতার কবল থেকে নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁরই নিকট আশ্রয় চাইতে বলেছেন। এ ব্যাপারে বেশ কিছু হাদিস রয়েছে। উসমান ইবনু আবু শায়বা রা. ও সুলায়মান ইবনু সুরাদ রা. থেকে বর্ণিত। একবার রাসূল সা.-এর সামনে দু’ব্যক্তি পাগলামী করছিল। আমরাও তার কাছে বসা ছিলাম। তারা এতটা রাগান্বিত হয়ে পরষ্পরকে গালি দিচ্ছিল যে, তাদের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল। তখন রাসূল সা. বললেন- ‘আমি একটি কালেমা জানি, যদি এ লোকটি তা পড়তো, তাহলে তার ক্রোধ চলে যেত। অর্থাৎ যদি লোকটি “আউযুবিল্লাহি মিনাশশাইতানির রাজীম” পড়তো।’ তখন লোকেরা সে ব্যক্তিকে বলল, ‘রাসূল সা. কী বলেছেন, তা কি তুমি শুনছো না?’ সে বললো- ‘আমি নিশ্চয়ই পাগল নই।’ (সহিহ বুখারি : ৫৯৮৫)।

২. শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন : রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, “যখন তোমাদের কারো রাগ উঠে, তখন যদি সে দাঁড়ানো থাকে, তবে যেন বসে পড়ে। যদি তাতে রাগ চলে যায়, তাহলে তো ভালো। আর যদি না যায়, তবে শুয়ে পড়বে।” (সুনানে আবি দাউদ : ৪৭৮৪)।

৩. ওজু করা : নবী করিম সা. ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে (আসে)। আর শয়তান আগুনের তৈরি। নিশ্চয় পানির দ্বারা আগুন নির্বাপিত হয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়, সে যেন অজু করে।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৪৭৮৬)।

৪. চুপ থাকা : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘তোমরা শিক্ষা দাও এবং সহজ করো। কঠিন করো না। যখন তুমি রাগান্বিত হও তখন চুপ থাকো; যখন রাগান্বিত হও তখন চুপ থাকো; যখন রাগান্বিত হও তখন চুপ থাকো।’ (মুসনাদে আহমদ : ৪৭৮৬)।

সব রাগ নিন্দনীয় নয়

রাগ নিন্দনীয় বিষয় হলেও সব রাগ দোষনীয় নয়। এমন কিছু রাগ রয়েছে, যা প্রশংসনীয়। মূলত রাগ দুই প্রকার- 

১. নিন্দনীয় রাগ : নিন্দনীয় রাগ হলো সেই সব জাগতিক রাগ, যার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সা. উম্মতকে সতর্ক করেছেন। যেমনটি উপর্যুক্ত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

২. প্রশংসনীয় রাগ : যেসব রাগ আল্লাহ, তার রাসূল সা. ও দ্বীনের স্বার্থে করা হয়, তা প্রশংসনীয় রাগ। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা. কখনো ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারোর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে কেউ মহান আল্লাহর নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে ফেললে, তার জন্য যথাবিহিত শাস্তির ব্যবস্থা করতেন।’ (আল জামে বাইনাস সাহিহাইন: ৩১৮৪)।

‘আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী সা. আমার নিকট আসেন। এ সময় আমার ঘরে একখানা পর্দা লটকানো ছিল, এতে জীব-জন্তুর অনেকগুলো ছবি ছিল। তা দেখামাত্র রাগে নবী সা.-এর চেহারার রং লাল হয়ে গেল। তিনি পর্দাটি হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেন। ‘আয়েশা রা. আরো বলেন, নবী সা. এও বলেছেন, যারা এসব প্রাণীর ছবি তৈরি করে, কিয়ামাতের দিন সবচেয়ে বেশি আজাব তাদেরকেই দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি : ৬১০৯)।


৩য় গুণ : মুহসিন বান্দাদের ৩য় গুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ   অর্থাৎ মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া।

অপরের ভুলত্রুটি ক্ষমা করা এবং অন্যের অসদাচরণের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করা মুমিনের অনন্য একটি গুণ। এই গুণ বা বৈশিষ্ট্য অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ খুব সহজেই সবার প্রিয় হয়ে উঠতে পারে এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দা হিসেবে মনোনীত হতে পারে। আল্লাহ বলেন-

وَ جَزٰٓؤُا سَیِّئَۃٍ  سَیِّئَۃٌ  مِّثْلُهَا ۚ فَمَنْ عَفَا وَ اَصْلَحَ  فَاَجْرُہٗ  عَلَی اللّٰهِ ؕ اِنَّہٗ  لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیْنَ 

মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ এবং যে ক্ষমা করে দেয় ও সংশোধন করে নেয়, তার বিনিময় আল্লাহর নিকট আছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা শূরা : ৪০)। রাসূল সা. বলেন, তোমরা আল্লাহ তায়ালার অসহায় বান্দাদের সঙ্গে দয়ার আচরণ করো, তোমাদের প্রতিও সদয় আচরণ করা হবে। অন্যের দোষ-ক্রটি ক্ষমার চোখে দেখো, তোমাদের ভুল ক্রটিও আল্লাহ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। (মুসনাদে আহমদ : ৭০৪১)।


 ক্ষমা করলে কারও মর্যাদা কমে না। বরং বহু গুণে ক্ষমাশীল ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সা. বলেন, সদকা করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে, তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮)।


   অন্যকে ক্ষমা করা এবং তার ভুলের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করার প্রায়োগিক উজ্জ্বল উদাহরণ ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সা.। তাঁর প্রশস্ত উদারতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বিখ্যাত সাহাবি আনাস রা. বলেন, আমি নবীজির সঙ্গে হাঁটছিলাম। তাঁর পরনে ছিল একটি নাজরানি (ইয়েমেনি) চাদর, মোটা কাপড় বিশিষ্ট। এক বেদুইন তাঁর কাছে এসে সেই চাদর ধরে সজোরে টান দিল। আমি দেখলাম মোটা কাপড়ের ঘষায় নবীজির কাঁধে দাগ বসে গেল। লোকটি কর্কশস্বরে তাঁকে বলল, ‘আল্লাহর যে মাল তোমার কাছে আছে তা থেকে আমাকে কিছু দিতে বলো!’ নবীজি সা. লোকটির দিকে ফিরে তাকালেন এবং মুচকি হাসলেন। এরপর তাকে কিছু দেওয়ার আদেশ করলেন। (সহিহ বুখারি : ৩১৪৯)।

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে- وَاللّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ আর আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালবাসেন। অর্থাৎ যাদের মধ্যে এসব গুণাবলি থাকবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের ভালবাসবেন।


শিক্ষা

১. ধনী-গরীব সকলের জন্যই সাধ্য সামর্থ অনুযায়ী দান সদকা করা। যাতে ধনীরা যেন সম্পদের মোহে আল্লাহকে ভুলে না যায় আর গরীবরা যেন অভাবে আল্লাহকে ভুলে না যায়।

২. রাগ সংবরণ করা।

৩. মানুষকে ক্ষমা করা।

৪. বিনয়ী আচরণ করার চেষ্টা করা।


 লেখক : প্রভাষক, সিটি মডেল কলেজ, ঢাকা


আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির