সর্বশেষঃ
post

আস্থার সীমাবদ্ধতা ও নেতৃত্বের সংকট উত্তরণ ভাবনা

রাশেদুল ইসলাম

০১ নভেম্বর ২০২২

মুসলিম দুনিয়া দিন দিন ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে জন্ম হারের ভিত্তিতে এ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে মুসলিম জাতিকে সর্বপ্রধান জাতি হিসেবে দেখাচ্ছে। এর পাশাপাশি ইসলামিক কনসেপ্ট নিয়ে চিন্তা করে ইসলামের সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অমুসলিমরা ব্যাপক হারে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির গ্যারাকলে পড়ে মানুষ তার স্বকীয়তা হারানোর ভয়ে সতর্ক হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখছে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের বিষয়ে মানুষের আগ্রহ মূলত শুরু হয়েছে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে। অর্থাৎ যখন মানুষ তার মনুষত্বের সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকেও ছিটকে পড়েছে, দিনে দিনে একা একটা বস্তু হয়ে পড়েছে; তখন অবলম্বন খোঁজার চ‚ড়ান্ত চেষ্টা করার উদ্যোগী হওয়াকে দায়িত্ব মনে করছে।

আমাদের দেশেও এর দেখা মেলে উচ্চশিক্ষিত মহলে। প্রথমত, নিজের ক্যারিয়ার গড়ার দিকে মনযোগ দিতে গিয়ে সমাজ এমনকি পরিবারের সদস্যদের দিকেও খেয়াল রাখার ফুসরত মেলে না। দ্বিতীয়ত, সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত দেখে জীবনাবসানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে নিজ চারপাশ শূন্য করে ফেলে। শেষ বয়সে পরিবার ও সমাজ থেকে নিজকে মোটামুটি বিচ্ছিন্ন অবস্থানে আবিষ্কার করে।

মানুষ যে এই পরিস্থিতি ফেইস করবে, এটা মহান আল্লাহর ফিতরাত। তিনি মানুষকে এরকম পরিস্থিতিতে ফেলেই পরীক্ষা করে থাকেন। বস্তুবাদী চিন্তার পরিবেশ কায়েমে শয়তানের সুবিশাল এই তৎপরতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলার জন্য মহান আল্লাহর অমীয় ও সার্বজনীন বিধান অনুযায়ী জীবন প্রতিষ্ঠার কাজ পরিকল্পনা হওয়ার কথা মানুষের। তা না করে অধিকাংশ মানুষ নিজকে জাহান্নামের লাকড়ি হিসেবে তৈরি করছে এবং এটি দায়িত্ব নিয়েই। কিন্তু এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ কী? যারা আমাদের (মুসলিমদের) নেতৃত্বের আসনে আছেন, তাদের টাস্ক তো তারা নিজ কাঁধে নিয়েই চলছেন, তারপরও কেনো এমনটা হচ্ছে?

উপরোক্ত মৌলিক এই বিষয়টি বিবেচনা করলে আমরা বিশেষভাবে যা দেখতে পাবো, তা হলো- আমাদের নেতৃত্ব বেশ কিছু মৌলিক সংকটের মধ্য দিয়ে নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে স্বকীয়তার মানদণ্ড নির্ধারণে ঘাটতির কারণে সংকটগুলো প্রকট আকার ধারন করছে। মুসলিম বিশ্বকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করার জন্য যে ছঁকে এগুনো প্রয়োজন, তা ঠিকই আছে কিন্তু কী সব কারণে এই পথ ধরে এগুনো যাচ্ছে না। জাতিকে পরিচালনার নেতৃত্বদানকারীরা নিজেরাও এর প্রাতিষ্ঠানিকতা দিতে হিমশিম অবস্থায় বিচরণ করছে। এ আলোচনায় আমরা সেরকম কিছু সংকট নিয়ে আলোচনা করবো এবং সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবো।

নেতৃত্বের মৌলিক সংকট

এক. চিন্তার সংকট :

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরাই দ্বিধাগ্রস্থ। আমাদের মনন আজ পরিচালিত হয় আধুনিকতাবাদের পশ্চিমা ধাঁচে, যা বিশ^াসে ফাটল ধরায়। ফলাফল হিসেবে বুদ্ধিহীনতা এবং আত্মপ্রত্যয়হীনতার প্রস্ফ‚টন বাড়ে। এককথায় ধ্যানধারণা এবং মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত অঙ্গনে শূন্যতা তৈরি করছে। একজন মানুষের মৌলিক মানবিক সত্তার বেড়ে ওঠার কিছু স্বাভাবিক দিক থাকে, যার উপর মূল্যবোধ তৈরি হয়। তা থেকে আমরা কিছুটা দূরে অবস্থান করছি। এর বড় কারণ, আমরা ধার করা উপজীব্য নিয়ে দিনাতিপাত করছি। যে মূল্যবোধের উপর গোটা মুসলিম দাঁড়াবে, তা তৈরির জন্য আমার উদ্যোগহীনতা আমাকেই একসময় উপহাস করে। এভাবে নিজকে একটা বস্তুবাদী ছকে চলা ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দেখতে পাচ্ছি আমরা। 

দুই. ঈমানের উপর টিকে থাকার সংকট :

ঈমান হলো মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর অসীম রাজত্বের নিয়ামকসমূহকে মুখে স্বীকার অন্তরে ধারণ এবং নির্ধারিত নির্দেশে কাজে পরিণত করার নাম। কিন্তু চিন্তার রাজ্যে ফাটল থাকায় মহান আল্লাহর নিয়মনীতির বাইরের একটা জগৎ যখন আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন ঈমানি দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। নিজ জ্ঞান ও চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারণে মহান আল্লাহর ফিতরাতকে কিছুটা বিশ্বাস করতে পারলেও তার উপর টিকে থাকা কঠিন, এমন মনোভাব তখন অন্তরে উঁকি দেয়। 

তিন. ইসলামী সমাজব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট :

চিন্তাধারার সংকট আমাদের এমন এক নিম্ন পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে, যেখানে সত্য-মিথ্যা একাকার। আমাদেরকে সামাজিকভাবে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এক অভিন্ন সংস্কৃতি চর্চায় অভ্যস্ত করে ফেলেছে। আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা যেখানে উপেক্ষিত। 

এই সংকট নতুন নয়, খোলাফায়ে রাশেদার যুগাবসানের পর মুসলিমদের জন্য চরম সময়ের শুরুটা সমাজব্যবস্থায় হামলার মধ্য দিয়ে হয়। বিশ^ব্যবস্থাকে নতুন একটি মোড়কে সমাজ চেনানো হয়, যেখানে সাদা-কালো, উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ রহিতকরণের ইসলামী শিক্ষার সাথে সাথে নারী-পুরুষের মধ্যকার যে পার্থক্য তা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে করে নারীকে পোষাক-আশাকে, কাজে-কর্মে পুরুষের সমান দেখতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। হয়েছেও তাই। আজ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান এতোটাই উন্মুক্ত যে, নারীকে নিয়ে কুরআনিক নির্দেশনাকেও অমানবিক-বৈষম্য ঠাওরানো হয় অবলীলায়।

এসবের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সন্তান লালন-পালন, ঘর সামলানো, আয়-রোজগারের ক্ষেত্রে। যেহেতু সমাজে নারী ও পুরুষ সমান, তাই তাদের যে কেউ এসব কাজ করার অধিকার রাখতে পারে এবং এ ধরনের কাজ আলোচনার ভিত্তিতে উভয় করতে পারে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে, নারী ঘরের বাইরে অবস্থানের সুযোগ পাচ্ছে। নির্ধারিত গণ্ডির বাইরের ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ রাখাকে অন্যায় মনে করা হচ্ছে না। এবং এসব ক্ষেত্রে নারীর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে নারী স্বাধীনতাকে সামনে আনা হচ্ছে। তখন আর সামাজিক বন্ধন-সম্পর্কের নৈতিক/অনৈতিক বাছবিচার বিবেচনায় থাকে না। 

এখানে বলে রাখা জরুরি যে, এই সমাজব্যবস্থার চিত্র আধুনিক সময়ে ভয়াবহতায় রূপ নিয়েছে। সামাজিক বন্ধন, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির অমিয় ধারা যেটা ইসলাম আমাদের দেখিয়েছে, তাকে উপেক্ষা করে মানুষ আধুনিক সাজতে গিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতিকে ভুলে পশ্চিমা অমুসলিম সমাজের সাথে নিজেকে মেলাচ্ছে। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আদৌ কি বর্তমান প্রজন্ম ইসলামী সমাজ সম্পর্কে অবহিত বা অবগত (?) এই প্রশ্নের উত্তরটি বেশ কষ্টের। কারণ, নবুয়তি জিন্দেগির ২৩ বছরে মুহাম্মদ সা. এবং তাকে ফুলে ফলে সুশোভিত করার ক্ষেত্রে খোলাফায়ে রাশেদার প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে ইসলামী সমাজের রূপরেখাকে একেবারেই আমরা ভুলতে বসেছি। এ বিষয়ে জানবার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ-উপকরণের সমাহার থাকার কথা, তার অনুপস্থিতিকে উপেক্ষা করা যায় না।

এসব কারণে ইসলাম নিয়ে এবং ইসলামী সমাজব্যবস্থা নিয়ে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে যে, পনেরোশত বছর আগের ইসলাম কী করে আজকের সমাজ কীভাবে চলবে তার ধারণা দেবে!

চার. জ্ঞানের সংকট :

আমরা উপরে সমাজব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট বিষয়ে যেমনটা বলছিলাম, তার মূলে রয়েছে জ্ঞানের সংকট। এই সংকট আজ সকল সংকটের মূলে পরিণত হয়েছে। সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা, জৈবিক চাহিদা পূরণ, সকল ক্ষেত্রেই জ্ঞানের সংকট। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষ এবং অশিক্ষিত কিংবা কম শিক্ষিত মানুষের মধ্যে অবশ্যই তফাৎ রয়েছে। 

সাধারণত শিক্ষিত মানুষরা দেখে জেনে বুঝে কোনো ব্যাপারে মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষিত হওয়ার সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে। আপনি শিক্ষিত মানেই আপনাকে সব বিষয়ে জানতে হবে; তার প্রয়োজন নেই। একান্ত পেশাদারিত্বের জন্য আপনি জ্ঞানী হোন, অভিজ্ঞ হোন; যথেষ্ট। বাকি সব বিষয় ধার করা জ্ঞান দিয়ে চালিয়ে দেবেন। হচ্ছেটাও তাই। কারণ ব্যবস্থাই এরকম। 

আধুনিক বিশে^ সময় অপচয়ের আরেক সংজ্ঞা আমাদের সামনে আনা হয়েছে যে, প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করেও সময় অপচয় করা যায়। যে কারণে আপনি প্রয়োজনকে প্রায়োরিটির আলোকে সাজাবেন। এককথায় একটি জাতিকে প্রয়োজন নিয়ে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া। আরো সংক্ষেপে বলতে গেলে বুদ্ধিহীনতার দিকে ঠেলে দেওয়া।

পাঁচ. পাঠের সংকট :

এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ যখন সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.কে নবুয়ত দিয়ে পাঠাচ্ছিলেন, তখন প্রথম যে শব্দ দিয়ে নির্দেশ করেছিলেন তা হলো পড়ো (ইক্বরা)। মোদ্দাকথা কোনোকিছু জানতে হলে পড়তে হবে। কিন্তু বর্তমানে পড়ার প্রয়োজনীয়তা গৌণ করে দেখানো-শেখানো হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মানুষ যে পরিমাণ বিশ্লেষণী ক্ষমতা রাখেন, পড়াশোনা তারচেয়ে অনেক কম রাখেন। মানে পড়াশোনা ছাড়াও সে চলতে পারেন, কোনো ব্যাপারে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারেন। এর একটি বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে, জীবনের বিভিন্ন ভাগে (পরিণত বয়সেও) সিদ্ধান্তে ও পদক্ষেপে ব্যাপক পরিবর্তন। জ্ঞানের সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত ভুল করার ঘটনা সামনে আসে।

এই সংকটের মূল কারণ হচ্ছে, জ্ঞানার্জনের জন্য পাঠের বিকল্প পদ্ধতি সামনে হাজির। মুখে মুখে শুনে, ভিডিও দেখে জ্ঞান সংকট দূর করতে সচেষ্ট আমরা। আবার বলতে গেলে কুরআনের বিরুদ্ধে তথা আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে এটা একটা বড় চক্রান্ত বটে। আল্লাহ বলেছেন পড়তে, আমরা পড়া ছাড়াই জ্ঞানার্জন করার উদ্যোগ নিচ্ছি।

পাঠের এই সংকট শুধুমাত্র আমজনতার মধ্যে, এমনটি নয়। এই সংকট শিক্ষিত সমাজে প্রবল হতে শুরু করেছে। কারণ আমাদের সামনে পাঠের বিকল্প উপকরণের সয়লাব। এতো ব্যাপক আকারে এবং দ্রæত এসব উপকরণের সম্প্রসারণ হচ্ছে যে, মানুষ প্রয়োজনবোধ করবার পূর্বেই তা পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব উপকরণ কতোটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে কেউ চিন্তা করার ফুসরত পাচ্ছেন না। এভাবেই সংকট ঘনীভ‚ত হচ্ছে।

নেতৃত্বের মৌলিক সংকট দূরীকরণে করণীয়

এক. জীবনের মূল লক্ষ্য উপলব্ধিতে আনয়ন : এই পৃথিবীতে একজন মানুষের আগমনের উদ্দেশ্য কী, কী লক্ষ্য নিয়ে আমরা এই দুনিয়ায় বিচরণ করবো, এ বিষয়ে মানুষ যেন উদাসীন থাকতে না পারে তার জন্য আম্বিয়ায়ে কেরামদের মহান আল্লাহ পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতদের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি রেখে গেছেন। আর আল্লাহর ফরমুলা অনুযায়ী প্রতিনিয়ত এসকল দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ আম্বিয়ায়ে কেরামদের অনুপস্থিতেও মানুষকে সঠিক পথ পাওয়ার জন্য দিক নির্দেশ করে যাবে।

নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের একান্ত অনুসারী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মেসেজকে বিশেষভাবে অবহিত করে গেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত করবেন যে, প্রত্যেক মানুষ তার জীবনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এসেছেন এখানে বিচরণ করছেন। আর তা হলো মহান আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা। এর মানে হলো আল্লাহর এই জমিনে আল্লাহর নির্দেশে আল্লাহর দেখানো পাথে আল্লাহর সার্বজনীন দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাওয়া।

এই বিষয়টি যখন কোনো মানুষের উপলব্ধিতে থাকবে, তখন তার দ্বারা কোনো অনর্থবহ কাজ করা সম্ভব নয়। সেই সাথে অগোছালো অবাস্তব কাজ থেকে সে দূরে থাকবে। অর্থাৎ জীবনকে গুছিয়ে পরিচালনার একটা বড় সুযোগ তার সামনে অবারিত থাকবে। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে আমরা অধিকাংশ মানুষ দূরে থাকি বা অবহিত নই বলে উদাসীন। 

বর্তমানে আমাদের জনসমাজের যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং যারা পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব দেবেন বলে তৈরি হচ্ছেন, তাদেরকে এসব অজ্ঞতা এবং উদাসীনতা থেকে বের হতে হবে। কারণ যৌক্তিক কর্মহীন-লক্ষ্যহীন জীবন সংকট বৃদ্ধির কারণ। নেতৃবৃন্দ নিজেই সেই সংকটে যখন আবর্তিত হতে থাকবে, তখন তার পক্ষে জাতির দিক নির্দেশ করা তো অবান্তর বিষয়ে পরিণত হয়। তাই সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার পথে নিজ জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা অত্যন্ত জরুরি।

দুই. জাহেলিয়াতের ক্ষতি সম্পর্কে উদাসীনতা দূরীকরণ : লক্ষ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া এবং লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া, উভয় ক্ষেত্রে বড় বাঁধা জাহেলিয়াত। সংকট আলোচনায় আমরা এ বিষয়ে অবগত হয়েছি যে, মূর্খতার দিকে মানুষকে ঠেলে দেওয়ার সকল আয়োজন আজকের আধুনিক সমাজে পর্যাপ্ত। সংক্ষেপে চরম শব্দ দিয়ে আখ্যায়িত করা যায়। অর্থাৎ চরম জহেলিয়াতের কবলে রয়েছেন আজকের সমাজ, নেতৃত্ব।

আমরা যেখানে-যেভাবে অবস্থান করলে আমাদের স্বকীয়তা-পরিচয় হারাবো, সেখানে জেনেশুনে অবস্থান করতে পারি না। বর্তমানে ন্যায়-অন্যায় বোধের যে গণ্ডি, তা অধিকাংশে মুছে ফেলা হয়েছে। একজন মানুষ কিছু অন্যায় করতেই পারেন। এটা মানব জীবনে ঘটতেই পারে, এমনটা বোঝানো হচ্ছে। জীবনে কিছু মিথ্যার সংস্পর্শ থাকতেই পারে। এটাই জীবন, এমনটা সার ধরা হচ্ছে।

এই যে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়বোধকে সহজীকরণ করা হচ্ছে, আসলে এসবের মধ্য দিয়ে চরম অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আমাদেরকে। আগামীর নেতৃত্বকে এই জাহেলিয়াতের কবল থেকে বের হওয়ার সক্ষমতা রাখতে হবে। নচেৎ জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তর ধারণা থাকা সত্যেও লক্ষ্য অর্জনে চরম ব্যর্থতা অনিবার্য। সুতরাং আমাদের চারপাশে এই জাহেলিয়াত কতোটুকু শেকড় গেড়েছে, এর বিস্তৃতি কী পরিমাণ এবং তা থেকে বের হওয়ার পথ কী; তা নির্ণয় করার অদম্য উদ্যোগ এখনই নেওয়া জরুরি।

তিন. পাঠের সংকট দূরীকরণ : জ্ঞানের সীমাবব্ধতা দূর করতে পারলে মানুষ তার সঠিক লক্ষ্যও জানতে পারবে, লক্ষ্য অর্জনের পথে হাটার পদ্ধতিও জানতে পারবে। তাই জ্ঞানের সংকটের মূল জায়গায় আমাদের কাজ করা জরুরি। এক্ষেত্রে পাঠের সংকট দূরীকরণই সঠিক সমাধান।

পাঠের সংকট দূরীকরণে যে তিনটি বিষয় সবচেয়ে উপযোগী হতে পারে, তা হলো:

- পাঠ পরিকল্পনা। যা আমাদের জীবনোপলব্ধিতে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করে।

- পাঠাভ্যাস। যা অবাঞ্ছিত কাজ থেকে দূরে রাখে।

- পাঠ মূল্যায়ন। যা ময়দানে পদক্ষেপে সহায়তা করে।

তবে পাঠ পরিকল্পনার ব্যাপারে সচেতনতা প্রয়োজন। আমি কী পড়বো, কেন পড়বো এটা না জেনে এগুলে ভুল পাঠে অর্জিত জ্ঞান জীবনের লক্ষ্য হাসিলের পরিবর্তে জীবনকে দূর্বিষহ করতে পারে। আজকের সমাজে পাঠের সংকটে এটি নতুনমাত্রার সংযোজনা। আমরা আমাদের পাঠ উপকরণে নানাবিধ বই রাখলেও কুরআনকে রাখি না। অবশ্য এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআন কিংবা অকাট্য গ্রন্থগুলোর ভাষা আমাদের অজানা থাকায় আমরা মূল মর্মার্থ থেকে দূরে অবস্থান করছি। তাই পাঠের সংকট দূরীকরণে এটিও বিশেষ বিবেচনার বিষয়।

পরিশেষে যে বিষয়টি নেতৃত্বকে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে মনে করি তা হলো, সংকট সম্পর্কে সতর্ক হওয়া। আমাদের চারপাশ এতোটাই জমকালো এবং এতো অনুষঙ্গে ভরপুর। কখন কোনদিক থেকে আমি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি, তা বুঝে ওঠার পূর্বেই আরো অনেক ক্ষতিকর অনুষঙ্গ আমাদের সামনে হাজির হয়। তাই আপাত সংকট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে তা থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা এবং পরবর্তী সংকট কী হতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করাই বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বের পরিচয় হবে।

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির