সর্বশেষঃ
post

কুরআনুল কারীমের বর্ণনায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এম মুহাম্মদ আব্দুল গাফ্্ফার

৩০ জানুয়ারি ২০২২

মানুষের দৃষ্টিতে যা ধরা পড়ে এবং যা ধরা পড়ে না সবকিছুই মহান রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি। তাঁর সৃষ্টির বাইরে কোনোকিছু কল্পনা করার অবকাশ মাত্রও নেই। তিনি সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে তৈরি করে তাকে চিন্তা-গবেষণা করার শক্তি দান করেছেন। তিনি পৃথিবীকে বিভিন্ন উপকরণে সাজিয়ে মানুষের বসবাস উপযোগী করে বনি আদমকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন খিলাফাতের দায়িত্ব দিয়ে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন ‘সে আল্লাহ যিনি তোমাদের জন্য মাটির শয্যা বিছিয়ে দিয়েছেন, আকাশকে ছাদ হিসেবে তৈরি করে দিয়েছেন, ঊর্ধ্বদেশ হতে পানি বর্ষণ করেছেন এবং উহার সাহায্যে নানা প্রকার ফল উৎপন্ন করে তোমাদের জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন, অতএব তোমরা এসব কথা জান, তখন অন্য কাউকে আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বীকার করো না।’ (সূরা বাকারা : ২২)।

পবিত্র কুরআনুল কারীমের বহু জায়গায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সৃষ্টির উদাহরণ উপস্থাপন করে এ বিশ্বপ্রকৃতি যে তাঁরই সৃষ্টি তা সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন ‘নিজেদের প্রথম সৃষ্টিলাভকে তো তোমরা জান, তা হলে তোমরা কেন শিক্ষা লাভ করবে না? তোমরা কি কখনো চিন্তা বিবেচনা করে দেখেছো, তোমরা যে বীজ বপন করো উহা হতে তোমরা ফসল উৎপাদন করো কিংবা উহার উৎপাদনকারী আমি?’ (সূরা ওয়াকিয়া : ৬২-৬৪)।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত হতে হলে আবহাওয়া বিজ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা ও চর্চার কোনো বিকল্প নেই। বায়ুমণ্ডলবিষয়ক আবহাওয়া বিজ্ঞান ভূ-পৃষ্ঠ প্রকৃতির স্থিতিশীলতা নির্ভর, তাই আবহাওয়াবিদরা ভূপদার্থবিদ্যা বিষয়ক ভূমিকম্প এর পর্যবেক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট। ধূলিঝড়, টর্নেডোসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের জানমাল ও অন্যান্য জীব। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন ‘তোমরা কি নিশ্চিত হয়েছো যে, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীর কোথাও ভূগর্ভস্থ করবেন না কিংবা তোমাদের ওপর কঙ্কর বর্ষণকারী ঘূর্ণিঝড় প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা তোমাদের কোনো কর্মবিধায়ক পাবে না।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৬৮)। আবহাওয়া তথা বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন হাদিস তথা ইসলাম যা বলেছে সেটা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। এ কথা বাস্তব সত্য যে, আজকালকার বৈজ্ঞানিক সমাধান যাই হোক না কেন ইসলাম তার অনুগামী নয় কখনো, বরং বিজ্ঞানকেই বারবার ফিরে আসতে হয়েছে ইসলামের কাছে। বিজ্ঞান আজ যা শত বছরের গবেষণায় প্রমাণ করছে তা কোন প্রতিষ্ঠানিক গবেষণা ব্যতীত ইসলাম তথ্যগত ব্যুৎপত্তিসহ বর্ণনা করেছে বহু পূর্বে।

মুসলিম জাতি মূলত বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা ও তার পরিপূর্ণতার বিপ্লব সংঘটিত করেছিল মহাগ্রন্থ আল কুরআনের প্রাণশক্তি বলেই এ প্রসঙ্গে Dr. Hartwig Herschfeld Zvi New Researches in to the Composition and Exegesis of the Quran বইয়ে লিখেছেন We must not be surprised to find the Quran regarded as the fountain head of the all sciences. Every subject connected with heaven of earth, human life, commerce and various trades are occasionally touched upon and this gave rise to the production of numerous monographs forming commentaries on parts of the holy book. মহান রাব্বুল আলামিনের বাণী কুরআনে এভাবে এসেছে ‘ওয়াল কুরআনুল হাকীম’ অর্থাৎ কুরআন বিজ্ঞানময়। আজকের বিজ্ঞানের চরমোৎকর্ষকালেও আল কুরআনের কোনো কথাকেই বিজ্ঞান অসার প্রমাণ করতে পারেনি। তাই ডক্টর মরিস বুকাইলি তার বিখ্যাত বই বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞানে লিখেছেন ‘কুরআনে এমন একটা বক্তব্যও নেই যে বক্তব্যকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিচারে খণ্ডন করা যেতে পারে।’ ল্যাটিন জার্মানসহ প্রচুর বিদেশী ভাষায় কুরআনুল কারীমের অনুবাদ হয় এবং তারা কুরআন গবেষণার মাধ্যমে অজ¯্র বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও আবিষ্কার পৃথিবীকে উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। কুরআনুল কারীমের বহু জায়গায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর সৃষ্টি রহস্যের বর্ণনা দিয়েছেন। মূলত আবহাওয়া বিজ্ঞানে সে সমস্ত বিষয়াবলি নিয়ে আবহাওয়াবিদেরা গবেষণা করে থাকেন সেগুলোই প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত তত্ত্ব ও তথ্য সম্ভার। যে কথা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি তা হলো প্রকৃতি নিজস্ব কোন সত্তা নয় এটা মহান রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি এবং তাঁর নির্দেশ মোতাবেকই তা চলতে বাধ্য। এ ব্যাপারে যে বিষয়টা এখানে উল্লেখ করতে চাই তা হলো আকাশে বিদ্যুৎ চমকের পরপরই উচ্চস্বরে যে শব্দ হয় যাকে বজ্রধ্বনি বলে অভিহিত করা হয় এবং বিদুৎ চমকানোর সময় বিদুৎচ্ছটার পথে বায়ু হঠাৎ উষ্ণ হয়ে আয়তনে বেড়ে উঠে তাতে বিকট শব্দ হয়। এ ধরনের বৈদ্যুতিক চাপ কিভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে তা বিজ্ঞানীরা পরিপূর্ণভাবে আজও অনুধাবন করতে সক্ষম হননি। মেঘের এ গর্জন সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন ‘মেঘের গর্জন তাঁরই প্রশংসাসহকারে তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করে, আর ফিরিশতাগণ তাঁর আতঙ্কে কম্পিত হয়ে তাঁর তাসবিহ পড়ে। তিনি গর্জনকারী বজ্রকে পাঠান এবং (অনেক সময়) তা যার ওপর চান ঠিক সে অবস্থায়ই নিক্ষেপ করেন .......।’ (সূরা রাদ : ১৩)। এর পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বজ্রপাতের পূর্বক্ষণে যে বিদ্যুৎ চমকায় এ সম্পর্কে ঘোষণা করেন ‘তিনিই তোমাদের সামনে বিদ্যুৎ চমকিয়ে থাকেন, যা দেখে তোমাদের মনে ভীতির উদ্রেক হয় আর আশাও জাগে, তিনিই পানিভরা মেঘের সঞ্চার করেন।’ (সূরা রাদ : ১২)।

আবহাওয়া তথা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিঝর বলে কোন শব্দ বা তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া দুরূহ, অথচ পবিত্র কুরআনুল কারীম আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে এ সংক্রান্ত পরিষ্কার তথ্য দিয়েছে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে ঘোষণা করেন ‘অতঃপর এর ওপর এক অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিঝর আপতিত হয় ও তা জ্বলে যায়।’ (সূরা বাকারা : ২৬৬)। এ কথা সত্য যে মরুভূমিতে সংঘটিত এ প্রকারের ঝড়কে ‘লুহাওয়া’ও বলা হয়ে থাকে। প্রবলবেগে ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস প্রবাহিত হবার সময় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের পারিপার্শ্বিক বাতাস ঘর্ষণ খেয়ে বিদ্যুৎচ্ছটার সৃষ্টি করে ও তাতে বিচ্ছুরিত হয় আলোকরশ্মি; আর একে বলা হয় ‘সেন্ট এলমার ফায়ার।’ ১৯৬০ সালের চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ উপকূলের এবং ১৯৯১ এর প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সময় মানুষ এ রকম অগ্নিঝড় দেখতে পায় যাতে বৃক্ষরাজির পাতা পল্লব পুড়ে যায়। বিদ্যুৎ, বর্জ্র, মেঘ, পানি এগুলো আল কুরআনের বর্ণনায় অসংখ্যবার এসেছে। মানুষের কুফরি ও অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ প্রাকৃতিক গজব নাজিল করে বহু জনপদ, শস্যক্ষেত ও বসবাসের পরিবেশকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। পানি বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে বাঁধ দিতে হয় এবং তা প্রবল বন্যার দরুন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এ কথাও কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন ‘সবার জন্য তাদের বসবাসের স্থানেই একটি চিহ্ন বর্তমান ছিল, দুটি (সারাদেশেই) বাগান ডানে ও বামে। তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দেয়া রিজিক খাও এবং তাঁর শোকরগোজারি করো, দেশ খুবই উত্তম পবিত্র এবং পরোয়ারদিগার হলেন ক্ষমাশীল। কিন্তু তবু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো, শেষ পর্যন্ত আমি তাদের ওপর বাঁধভাঙা বন্যা পাঠিয়ে দিলাম ......।’ (সূরা সাবা: ১৫, ১৬)।

এভাবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর সৃষ্টি মাখলুকাতের একটি বিশেষ মাখলুকাত প্রকৃতিকে দিয়ে পৃথিবীর মানুষের সামনে অনেক নিদর্শন তথা দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর প্রকৃতিকে আবহাওয়ার রূপ বৈচিত্র্য পরিবর্তন করে বিভিন্নভাবে মানুষের শিক্ষার উপকরণ তৈরি করেছেন। বাতাস মানুষসহ সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণকর আবার অকল্যাণকরও হতে পারে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন ‘তিনি (বৃষ্টির পূর্বে) সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন...।’ (সূরা রূম : ৪৬)। আল্লাহ তায়ালা আবার ঘোষণা করেন ‘আমি এমন বায়ু প্রেরণ করি যার ফলে তারা শস্যকে হলদে হয়ে যেতে দেখে, তখন তারা নিশ্চয়ই অকৃতজ্ঞ হয়।’ (সূরা রূম : ৫১)। বিশ্ব প্রকৃতিতে এসব কর্মকাণ্ড অহরহ ঘটে চলেছে, আর এগুলো মহান রাব্বুল আলামিনের চাক্ষুষ নিদর্শন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনসহ প্রায় সবাই এ তত্ত্বে বিশ্বাসী যে বিশ্ব ভূমণ্ডল প্রতি নিয়ত প্রশস্ত হচ্ছে আর পবিত্র কুরআন বলেছে আকাশ ও পৃথিবী সংযুক্ত ছিল আল্লাহ তা পৃথক করেছেন। আর পানি হতে কী কী আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন তারও বর্ণনা রয়েছে। এ মর্মে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন সে লোকেরা যারা অস্বীকার করেছে তারা কি চিন্তা করে না যে, এ আকাশ ও পৃথিবী সবকিছুই মিলিত অবস্থায় ছিল, পরে আমি এগুলোকে আলাদা আলাদা করে দিয়েছি? এবং পানি হতে প্রত্যেক জীবন্ত জিনিসকে সৃষ্টি করেছি? তারা কী স্বীকার করে না?’ (সূরা আম্বিয়া : ৩০)।

মহান রাব্বুল আলামিনের এসব অকাট্য বাণী সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে গবেষণার দিকে উৎসাহিত উদ্বুদ্ধ করবে তাতে আর সন্দেহ কী? এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন তিনি আসমান ও যমিনের সমস্ত জিনিসকেই তোমাদের জন্য অধীন নিয়ন্ত্রিত করেছেন, সবকিছুই তাঁর নিজের নিকট হতে, এতে বড়ই নিদর্শন রয়েছে সে লোকদের জন্য যারা চিন্তাভাবনা গবেষণা করতে অভ্যস্ত।’ (সূরা জাসিয়া : ১৩)। বিশ্বে একমাত্র আল্লাহ মানুষকেই চিন্তা গবেষণা করে আল্লাহর সৃষ্টি প্রকৃতি থেকে নিত্য নুতন তত্ত্ব আবিষ্কার ও তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষমতা দান করেছেন। মানুষ পৃথিবীতে প্রকৃতিকে ব্যবহার করে যা কিছু করুক না কেন সকল ক্ষেত্রে প্রয়োজন মহান রাব্বুল আলামিনের শ্রেষ্ঠত্বের গুণগান করা। প্রকৃতির সবকিছুই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সৃষ্টি করেছেন এবং মানবজাতির খেদমতের জন্য নিয়োজিত করেছেন। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন ‘রাত্রি দিনের পার্থক্যে, আবর্তনে, আর সে আহারে যা আল্লাহ আসমান হতে নাজিল করেন পরে উহার সাহায্যে মৃত যমিন জীবন্ত করে দেন; আর বাতাসের আবর্তে বিপুল নিদর্শন রয়েছে সে লোকদের জন্য যারা বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। এসব হলো আল্লাহর নিদর্শন, যেগুলিকে আমি তোমার সামনে যথাযথভাবে বর্ণনা করছি, এখন আল্লাহ এবং তাঁর আয়াতসমূহের পরে আর কোন কথাটি আছে যার প্রতি লোকেরা বিশ্বাস স্থাপন করবে?’ (সূরা জাসিয়া : ৫-৬)।

পৃথিবীতে বিজ্ঞানের যত গবেষণা তথা আবিষ্কার হয়েছে কোনোটাই আল্লাহর সৃষ্টি প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে হয়নি। আধুনিক বিশ্বে রসায়ন, পদার্থ, ফলিত পদার্থ, মহাকাশ ও আলোক বিজ্ঞানসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যেসব গবেষণা ও উদ্ভাবন হয়েছে এগুলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি করা উপায় উপকরণের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী মুসলিম বিজ্ঞানীগণ বিজ্ঞান গবেষণার বৈচিত্র্যময় শাখা সমূহের ভিত্তি রচনা করে তার অনেক ক্ষেত্রেই অসামান্য অবদান রাখেন।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিষয় পর্যালোচনা করতে গিয়ে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলীর রা. সোনা তৈরির গবেষণালব্ধ ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন দশম শতাব্দীর অন্যতম রসায়ন শাস্ত্রবিদ মাহরারিস। হযরত আলীর রা. এ দক্ষতার উত্তরাধিকারী ছিলেন প্রখ্যাত অহি লেখক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম কূটনীতিবিদ তথা বনি উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠতা খলিফা হযরত মুআবিয়ার রা. পৌত্র খালিদ বিন ইয়াযিদ। মুসলিম বিশ্বে তাকেই প্রথম সার্থক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানী হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইবনে নাদিম তাঁর ফিহরিস্তি গ্রন্থে খালিদ বিন ইয়াযিদের ৪টি বিজ্ঞানবিষয়ক বইয়ের উল্লেখ করেছেন। বইগুলো হলো কিতাবুল হারারাত, সাহিফাতিল কবীর, সাহিফাতিস সগির এবং ওয়াসিয়াতিহি ইলা ইবনিহি ফিস সানআ।

ইসলামের প্রাথমিক শতাব্দীর পর বিজ্ঞান ও গবেষণার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। যেটার স্থায়িত্বকাল ছিল ৩৫০ বছর অর্থাৎ ৭৫০ থেকে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দ বা তার কিছু বেশি সময়। এ সময়েই বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী জাবির বিন হাইয়ান, আল কিন্দি, রাজী, খারেজমী, ফারাবী, আল বিরুনী, আলী ইবনে ঈসা ইবনুল হাইছামসহ বহু সংখ্যক মুসলিম বিজ্ঞানীগণের বিজ্ঞান গগনে আবির্ভাব ঘটে। তাদের বিজ্ঞান ভাবনার ওপর রচিত মহামূল্যবান গ্রন্থসমূহ বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রসমূহে পঠিত হতো। ইবনে সীনার গ্রন্থাবলী বিশেষ করে কানুন ফিততীব খ্রিষ্টানেরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাইবেল হিসেবে গণ্য করতো যা পাঁচ শতাধিক কাল পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পাঠ্য ছিল। পবিত্র কুরআন হাদিস তথা ইসলামী দর্শনকে আত্মস্থ করে মুসলিম বিজ্ঞানীগণ পৃথিবীর মানুষকে অনেক অজানার সন্ধানে যাত্রার পাথেয় জুগিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ঘোষণার নিগূঢ় তত্ত্ব উদঘাটন করতে গিয়ে মুসলিম মনীষীগণ পৃথিবীসহ গোটা সৃষ্টিলোকের অন্যান্য ক্ষেত্রসমূহের বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রকৃতিতে বিদ্যমান অনেক কিছুই আবিষ্কার করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সৃষ্টি এ পৃথিবীই কিভাবে প্রকৃতিগতভাবে স্থিতিতে রয়েছে এ সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন ‘তিনি পৃথিবীতে পর্বতের নোঙরসমূহ গভীরভাবে গেড়ে দিয়েছেন, যেন পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে হেলতে দুলতে না পারে, তিনি নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন এবং স্বাভাবিক পথও বানিয়ে দিয়েছেন যেন তোমরা পথের সন্ধান পেতে পারো।’ (সূরা নাহল : ১৫)। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এসব তত্ত্ব তথা তথ্যাদি তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের জন্য প্রযুক্তি বিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান, ওজোন স্তরসহ অসংখ্য বিষয় উদ্ভাবনের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

বর্তমান আধুনিক পৃথিবীতে মুসলমানগণ গবেষণা, বিজ্ঞান চর্চা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে অনেক পিছিয়ে থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের অবদান মোটেই অস্বীকার করা যায় না। এ প্রসঙ্গে নভেল বিজয়ী পাকিস্তানের বিজ্ঞানী ডক্টর আব্দুস সালাম, বাংলাদেশের ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানী ডক্টর কুদরতে খোদা, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক আব্দুল্লাহ আল মুতীসহ অনেকেই বিজ্ঞান জগতের অনেক তথ্যপূর্ণ বিষয়ের ওপর অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাদের গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চার বিষয়ও যে প্রকৃতির সামগ্রিক উপাদান থেকে সংগৃহীত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কয়েকদিন পূর্বে একটি তথ্য মাধ্যমের খবরে জানতে পারলাম ফাতিমা নামের একজন মহিলা বিজ্ঞানী মঙ্গল গ্রহে পৌঁছার নিমিত্তে বর্তমানের দ্রুতগতির রকেটের চাইতে দশগুণ বেশি গতিসম্পন্ন রকেট আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। তাঁর এ গবেষণার মূল উপকরণ আল্লাহর সৃষ্টি প্রাকৃতিক নিদর্শন সূর্যের আলোর গতি।

শব্দের গতির চেয়ে আলোর গতি যে অনেক বেশি তা বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানীদের অনেক আগেই মুসলিম বিজ্ঞানীগণ আবিষ্কার করে গেছেন। ইবনে হাইছাম, আল বিরুনী ও ইবনে সিনা ১১ শতকে প্রমাণ করেছিলেন যে, আলোর গতি শব্দের গতির চেয়ে দ্রুত। আমি যে কথাটি বুঝাতে চাচ্ছি তা হলো এই প্রকৃতি মহান রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি আর তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীমে প্রকৃতির ব্যবহার ও তা থেকে মানুষের উপকার লাভের কথা বলেছেন। কাজেই এ কথা স্বীকার করবার কোনো কারণ নেই যে, ইসলাম বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজ তথা বাস্তবতা বিবর্জিত শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব কোনো ধর্ম। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে Science without religion is lame and religion without science is blind (দ্রষ্টব্য, Philip Frank Einstin, Page, 342-47). বিখ্যাত ঐতিহাসিক Briffanlt তার Making of Humanity গ্রন্থে দীর্ঘ আলোচনান্তে উল্লেখ করেছেন For although there is not a single aspect of European growth in which the decisive influence of Islamic culture is not traceable, nowhere is it so clear and momentous as in the genesis of that power which constitutes the permanent distinctive force of the modern world and the supreme source of its victory- natural science and the scientific spirit. (সূত্র: বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, ইসলামের ইতিহাস ও অন্যান্য গ্রন্থ)। মহান রাব্বুল আলামিন মুসলিম জাহানকে আবার তৌহিদবাদী বিজ্ঞান গবেষকদের দ্বারা সমৃদ্ধ করুন এ প্রার্থনাই করি।

লেখক: সদস্য, দারুল ইসলাম ট্রাস্ট, সিরাজগঞ্জ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির