post

খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও বৈদেশিক ঋণঝুঁকিতে বাংলাদেশ

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান

২৬ জানুয়ারি ২০২৪

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, বৈশ্বিক মহামারী, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতালিপ্সা, আদর্শের দ্বন্দ্ব, শ্রেণি সংগ্রাম, সামরিক অবরোধ ও আণবিক-পারমাণবিক, সামরিক যুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খাদ্য উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জননিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই সাথে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদী ভাঙন, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মন্দপ্রভাবে দেশে খাদ্য উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা হ্রাস পেয়ে থাকে। উল্লিখিত কারণে বিভিন্ন দেশে খাদ্যের চাহিদা পূরণের অক্ষমতায় পুষ্টিহীনতা ও দরিদ্রতার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যার কুপ্রভাবে নাগরিকদের মনে এক প্রকার হতাশার প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে মানসিক ব্যাধিগ্রস্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার দরুন মনুষ্যত্ব লোপ পায়। অবশেষে দেশের একশ্রেণির নাগরিকরা জীবন জীবিকার তাগিদে উপায়ান্তর না পেয়ে নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়।

এতে করে সে দেশগুলোতে মানবিক মূল্যবোধের পরিবর্তে অমানবিক কর্মকাণ্ডের মাত্রা মাত্রাতিরিক্ততায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। চুরি, ডাকাতি ছিনতাই, রাহাজানি, খুন, গুম হ্যাকিংসহ সাইবার অপরাধসহ নানা রকম বে-আইনি কার্যকলাপের অপরাধীরা জেল-হাজতবাসী হতে থাকে। এর ফলে কর্মক্ষম এবং প্রজননে সক্ষম নাগরিকরা সম্পূর্ণভাবে বেকার হয়ে পড়ে। এতে করে রাষ্ট্রের কোষাগারের খরচ বাড়তে থাকে। অপরদিকে সে সব পরিবারে নেমে আসে হতাশা খাদ্যাভাব আর দরিদ্রতা। শেষ অবধি সে দেশসমূহ দিনে দিনে খাদ্য উৎপাদন, নিরাপত্তা ও বৈদেশিক ঋণঝুঁকিতে জড়িয়ে পড়ে অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে দুর্নাম ছড়িয়ে উন্নয়নের উপাত্ত কমাতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। এসব বিষয় নিয়ে সারা বিশ্বের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা খুব দ্রুতই বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জমানায় বর্তমান বিশ্বে আশি কোটি মানুষ এখনো ক্ষুধার্ত। অপরদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবসম্পদ উন্নয়ন, মানবাধিকার সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত নিরসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যয়বহুল সেমিনার, সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ইত্যাদি সংস্থা দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্য উৎপাদন, বাজারজাত, সংরক্ষণ, আমদানি, রফতানি ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। এতকিছুর পরও এসব সমস্যার আশানুরূপ সুরাহার লক্ষণ নেই বললেই চলে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ে এসব সংস্থা উল্লেখযোগ্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলে সারা বিশ্বের শিশুসহ কয়েককোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তা ও জননিরাপত্তায় মানবেতরভাবে দিনাতিপাত করতে হতো না। এখনও কোন কোন রাষ্ট্র খাদ্য মজুদ করে রাখে এবং মেয়াদপূর্তি হলে তা সাগরে ফেলে দেয়ার খবর জানা যায়। অপরদিকে সোমালিয়া হার্জেগোবেনিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বা অঞ্চলে পুষ্টিহীন কঙ্কালসার শিশুসহ অগণিত বনি আদম জীবন মৃত্যুও সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন, বণ্টন, আমদানি-রফতানির বিষয়ে মানবিক সংহতির পুনরুজ্জীবন ঘটানো ছাড়া বিশ্বে শান্তি সমৃদ্ধি, অগ্রগতি এবং টেকসই উন্নয়নের যতই তর্জন-গর্জন করা হোক না কেন তা হালে পানি পাবার নয়। অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি রোধ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্টক বিজনেস বন্ধ করতে হবে। অলস টাকা কমিয়ে এনে সুদমুক্ত ঋণদানের মাধ্যমে আধুনিক কারিগরি কৃষি উৎপাদনে অধিক সংখ্যক জনবলকে নিয়োজিত করতে হবে। ব্যাংক খাতে তারল্য সঙ্কট কমাতে হবে। কৃষিজাত কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির জন্য কর্মক্ষম বেকারদের কারিগরি দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করে মাঠে নামাতে হবে। গত ৩০ নভেম্বর ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এক্সপ্রো সিটিতে কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস (কপ-২৮) এর শুভ উদ্বোধন করা হয়। এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেন ১৯৮ দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। এতে জাতিসঙ্ঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই কনভেনশনে বরাবরের ন্যায় যোগদান করে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে উদ্ভূত ক্ষতির মধ্যে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, সমুদ্রের অ্যাসিডিফিকেশন, হিমবাহ পশ্চাদপসরণ, লবণাক্ততা, জমি ও বন অবক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং মরুকরণের মতো ধীরগতির ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্তি বিবেচনা করা হয়।

গ্লোবাল অন অ্যাডাপটেশন, প্যারিস চুক্তির ৭.১ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ছিল, বিশ্বের অভিযোজিত ক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থিাতশীলতা জোরদারসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাসকল্পে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ। অপরদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন হ্রাস, করোনার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মন্দাভাব এবং বিশ্বের শীর্ষ খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর খাদ্য রফতানি নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় বিশ^বাসীকে রীতিমতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে রাশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকা দেশগুলো ভারতীয় চাল ও গমের ওপর নির্ভরশীল। ভারত চাল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞায় বিশ^বাজারে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ভারত ভাবছে, ভূরাজনৈতিক ও জলবায়ু পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি, খারাপ আবহাওয়াসহ নানা কারণে দেশটি চাল রফতানি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। যে কারণে এফএওর সূচক অনুসারে ২০২২ সালের শর্ত থেকে বিশ^ব্যাপী খাদ্যমূল্য সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যা এক দশকে দেখা যায়নি। সেই সাথে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, হাইতি, চিলি ও বলিভিয়ায় প্রতিকূল আবহাওয়াজনিত কারণে ফসলের স্বাভাবিক ফলন কমে যায়, এর ফলে এ সব দেশসহ বিভিন্ন দেশে খাদ্যসঙ্কটের প্রভাব বিস্তার করে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের আগে বিশ্বব্যাপী গমের রফতানির ৩৪ শতাংশ, বার্লিও ২৭ শতাংশ, ভুট্টার ১৭ শতাংশ ও সূর্যমুখী তেলের ৫৫ শতাংশ পূরণ করত। শুধু তাই নয় উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য তাদের খাদ্যপণ্য সরবরাহের ৫০ শতাংশই পেত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। পরবর্তীকালে যুদ্ধ বাধলে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার সামরিক অবরোধের ফলে ২০২২ সালের মাঝা মাঝিতে ইউক্রেনের রফতানি এক প্রকার বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য পরে জাতিসঙ্ঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় কিয়েভের মধ্যে যুগান্তকারী শস্য চুক্তি করে মস্কো। এই চুক্তির পরে ২০২২ সালের জুলাই ও ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ইউক্রেন থেকে ৩ কোটি ২০ লাখ মেট্রিকটন ভুট্টা ও গম এবং অন্যান্য শস্য রফতানি করা হয়। এরপর ১৭ জুলাই রাশিয়া নবায়ন না করায় ইউক্রেনের শস্য রফতানি আবার হুমকির মধ্যে পড়ে।

২০২২ সালের মে মাস থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি ১৯ লাখ মানুষ চরমভাবে খাদ্য নিরাপত্তায় ভুগছে। গত ১০ নভেম্বর ২০২৩ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের এ সংস্থাটির গ্লোবাল ইনফরমেশন অ্যান্ড আর্লি ওয়ারনিং সিস্টেম অন ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার কান্ট্রিব্রিফ অনুসারে গত মার্চ-এপ্রিলে খাদ্যনিরাপত্তায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ছিল ৮৯ লাখ। প্রতিদেনে বলা হয়েছে, ফসল ভালো হওয়ায় বাজারে খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা বেড়েছে, তবে ক্রমাগত উচ্চখাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে সবার খাবারের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কম আয়ের মানুষ ক্রয় ক্ষমতা হারাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কাটাতে ৪০ কোটি ডলার দেবে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যে টাকায় বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশেষ করে কৃষি, পানিসম্পদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, নগর ও প্রান্তিক জনসাধারণের সুবিধার্থে নানাবিধ সংস্কার কর্মকাণ্ড এবং সর্বোপরি সুশাসন সেক্টরে আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়ন করতে পারলে জীবনমান উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করবে।

উল্লেখ্য স্বাধীনতা লাভের পর অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে সদস্যপদ লাভের পর থেকে এ যাবৎ বাংলাদেশকে এডিপি ৩০৩ কোটি ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ডলার ঋণসহায়তা এবং ৫ কোটি ৭১ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে। (সূত্র দেশ রূপান্তর ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ সংখ্যার ৮ এর পৃষ্ঠা)। তবে এ টাকা সঠিক খাতে যথাযথভাবে বিনিয়োগ হয়েছে কিনা সে বিষয়ে দেশের বিভিন্ন মহলের সচেতন নাগরিকদের নিকট থেকে যথেষ্ট অভিযোগ ও সন্দেহ প্রকাশ পেয়েছে। এবারের সহায়তার মোট অংকের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হয় কিনা দেখা যাক।

গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩ শনিবার রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে আয়োজিত বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা বিষয়ক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিডিপি) জানিয়েছে ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল- এই পনেরো বছরে ব্যাংক খাত থেকে নানা অনিয়মের মাধ্যমে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অর্থ লোপাট করা হয়েছে ২০১৪ সালের পর থেকে। বিশেষ করে সঙ্ঘবদ্ধ এক শ্রেণির ব্যক্তিদের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের ১২ শতাংশের বেশি অর্থ লোপাট করা হয়েছে যা দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় পৌনে ২ শতাংশ। সিডিপির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিতে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের ব্যাংক খাত এখন ব্যক্তি স্বার্থের হাতে জিম্মি।’ ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে বৈষম্য আরো প্রকট হচ্ছে। মোট কথা বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংক খাত বৈকল্য অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সিপিডি। তথ্যসূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ১০০ কোটি বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণগ্রস্ত। এর মধ্যে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশী ঋণের পরিমাণ ৭৯ বিলিয়ন ডলার। বিদেশী ঋণের মাত্রা বেড়েছে ২০১৮ সালের পর থেকে। এই ঋণের পরিমাণ ও সুদাসল কতটা বিপজ্জনক তা সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক অনেক অর্থনীতিবিদরাও অনুমান করতে পারবেন না। অর্থাৎ বাংলাদেশ দিনে দিনে কঠিন ঋণের ফাঁদে আটকে পড়ছে। যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বৈদেশিক রেমিট্যান্স বা দেশীয় পণ্যসামগ্রী বিদেশে রফতানি করে সে আয় থেকে এই এত বড় ঋণের বোঝা নামানো আদৌ সম্ভব নয়।

আমাদের এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় অর্থাৎ ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে বাঙলা অঞ্চলসহ ভারতবর্ষের প্রায় ৪০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করেন। শুধু খাবার অভাবে এত পরিমাণ মানুষ মারা যাওয়ার স্মৃতি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্য উৎপাদনে অনুপ্রেরণা জোগায়। এরপর স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের করুণ চিত্র এখন অসংখ্য মানুষের চোখে ভাসছে। বাংলাদেশ বিশে^র তৃতীয় বৃহত্তম খাদ্য আমদানিকারক দেশ। এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৯৩.৩ মিলিয়ন টন কৃষিপণ্য উৎপাদন করেছে, কিন্তু খাদ্য উৎপাদন এর সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে কোনো ভারসাম্য নেই যে কারণে ২০২৪ সালের শুরুতেই বিশ^ বাজার থেকে প্রায় ১২.৫ মিলিয়ন টন খাদ্যপণ্য আমদানি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে খাদ্য রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান তলানির দিকে। সুতরাং বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ কথাটি বাস্তবতা বিবর্জিত মনে করেন দেশের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক বুদ্ধিজীবীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে, গত সেপ্টেম্বরে খাদ্যস্ফীতি কমলেও তা অক্টোবরে ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়। এটি ২০১২-১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুসারে ২০২১ সালে সুষম খাবারে এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ পঞ্চম। ২০২১ সালের হিসাব অনুসারে দেশে ১১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ সুষম খাবার খেতে পারে না। অর্থাৎ দরিদ্রতার কারণে খাবার খাওয়ার সামর্থ্য নেই ৬৬.১ শতাংশ মানুষের। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেক বলেছে, মুদ্রস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। গত ১৯ নভেম্বর ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেক)-এর আয়োজনে “বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্বেগের জায়গা ও করণীয় শীর্ষক সেমিনারে এ উদ্বেগ জানানো হয়েছে। অপরদিকে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে জানা যায়, জলবায়ু উস্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত বছরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৭১ লাখের বেশি বাংলাদেশী। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা এক কোটি ৩৩ লাখে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।

গত ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে আজকের পত্রিকার ডেস্কের রিপোর্টে জানা যায়, খাদ্যনিরাপত্তায় সু-খবর নেই বাংলাদেশের। তবে অন্য একটি দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশের কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার। ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তির সংখ্যা এখন এক হাজার ২৮৩ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে এক হাজার ১৪৮ জন ছিল সেখানে মাত্র কয়েক বছরেই বেড়েছে ১৩৫ জন। সেই সাথে তুলনালকভাবে পাল্লা দিয়ে ৫০ গুণ থেকে ৭০ গুণ বাড়ছে ভিক্ষুক, সর্বহারা, ছিন্নমূল, হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা। এতে করে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তথা শ্রেণি সংগ্রামের সম্ভাবনা হু হু করে বাড়ছে। যার ভবিষ্যৎ পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ। এ থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো সম্পদের সুষম বণ্টন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে জাকাতের আইন চালু করে তা কার্যকর করে সুষম অর্থব্যবস্থা চালু করা ছাড়া এ গ্যাঁড়াকল থেকে বাঁচার কোনো পথ নেই। তবে দেশে খাদ্য উৎপাদনে সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষির যন্ত্রপাতি সহজলভ্যতায় ভর্তুকি দিয়ে হলেও তা স্বয়ংসম্পূর্ণ করা অপরিহার্য। সেই সাথে আরো কিছু বিষয়ে নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে, তা হলো- বৈশি^ক সঙ্কট মোকাবেলায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্প্রীতিবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ^ব্যাপী বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানে সকল রাষ্ট্র প্রধান বা তার প্রতিনিধিদের একযোগে এগিয়ে এসে সর্বাগ্রে ক্ষুধামুক্ত বিশ^ গড়ার মিশনে অবতীর্ণ হতে হবে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়- বিশে^ ৮০ কোটি মানুষ ক্ষুধার্থ। আর বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার অবস্থা অস্বাভাবিক। প্রকট তারল্য সঙ্কটে ধারদেনা করে চলছে দেশের ব্যাংকিং খাত। দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়াল ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ। ব্যয় যৌক্তিকীকরণ ও ঋণব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি কমানোর পরামর্শ আইএমএফের। দেশে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় সোয়া কোটি মানুষ। দেশে ২৭ লাখ ৫১ হাজার মানুষ উচ্চ দারিদ্র্র্যের শিকার। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাসস্থান হারাবে। দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ১২ কেটি ১০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে পারেন না। সূত্র- দৈনিক প্রথম আলো ৬ ই জুলাই ২০২৩। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেক)-এর এক জরিপে জানা যায়, মুদ্রস্ফীতির চাপে দেশে ৭৪ শতাংশ নিম্ন আয়ের পরিবার ধার-দেনা করে জীবন যাপন করছে। ৩৫ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। ৯০ শতাংশ পরিবার অর্থনৈতিক চাপে তাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন করেছে। ৯৬ শতাংশ পরিবার গোশত এবং ৮৮ শতাংশ পরিবার মাছ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। খাদ্য পণ্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সক্ষমতা হারিয়েছে অধিকাংশ পরিবার। সূত্র: ভোরের কাগজ-৩০ মার্চ ২০২৩। ২০১৬ সালের মে মাসে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিএফআই এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৪ সালেই পাচারের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। যা দিয়ে দেশের দু-অর্থ বছরের বাজেট ব্যয় করা সম্ভব। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএনবির বার্ষিক রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়েছিল, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে পাঁচ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা বা ৬৬ কোটি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ জমা পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে এই অর্থ নাকি বৈধভাবে জমা পড়েনি।

কারা এইসব অ্যাকাউন্টের মালিক সে সম্পর্কেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য প্রকাশ করে না। সেই সুবাদে বিশে^র চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ বা কালো টাকার মালিকরা তাদের অবৈধ টাকা বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে জমিয়ে থাকে। শুধূ এই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকেই নয় এসব কালো টাকার কুমির বুর্জোয়ারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা ও জার্মানিসহ আরো কিছু দেশে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করে রেখেছে বলে জিএফআই এর আলোচনায় উঠে এসেছে। অপরদিকে দেশে নদীমাতৃকতা কমে গিয়ে মরুকরণ হচ্ছে। বেকার সংখ্যা বাড়ছে। মন্দ ও অশ্লীল সংস্কৃতির সহজলভ্যতা বাড়ছে। অপরদিকে চা, চিনি, চামড়া, পাটশিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন মৎস্য ও বস্ত্র শিল্প ধ্বংসের পথে। রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে বিদেশ থেকে বাংলাদেশের দক্ষ ও অদক্ষ জনবল একের পর এক ফেরত আসছে, রেমিট্যান্স কমে আসছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আরও কিছু বিষয় যেমন- অর্থনীতি, কৃষি তথা জননিরাপত্তা ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে। সেগুলো হলো- গণতন্ত্রের দুর্বৃত্তায়ন, ক্ষমতার দাপট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মাদক, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার নামে রমরমা ব্যবসা, খাদ্য ও ওষুধে কেমিক্যালসহ ভেজাল মিশ্রণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ ইত্যাদি।

লেখক : গবেষক, পরিবেশবিদ ও ইতিহাসবিদ
[email protected]

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির