post

জান্নাতের আরেক মেহমান শহীদ আবিদ বিন ইসলাম

১১ জুন ২০১৩

মুহাম্মদ ইসমাঈল

শহীদ আবিদ বিন ইসলাম। আহ্ আজকে যদি আমার জন্য এই জায়গাটা হতো তাহলে নিজেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সঁপে দিতে পারতাম। এদেশের ছাত্রসমাজের প্রিয় কাফেলা, মেধাবী ছাত্রদের প্রিয় ঠিকানা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ছাত্রসংগঠনের নাম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৩৬ বছরে প্রতিটি ক্যাম্পাস, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে, নগরে-বন্দরে অন্ধকার জনপদকে আলোকিত করে তুলেছে। বিনিময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে জেল-জুলুম নির্যাতন এবং হামলা-মামলা সহ্য করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। অসংখ্য ভাই আহত হয়েছেন, অনেক ভাই পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবনযাপন করেছেন। মানুষ মরে গেলে দুনিয়া ছেড়ে চলে যায় কিন্তু তাঁর আদর্শ, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও শিষ্ঠাচার সবকিছুই তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, শিক্ষকমণ্ডলী, আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, আন্দোলনের সঙ্গী-সাথী এবং দায়িত্বশীলের মনে বারবার নাড়া দেয়। শহীদ আবিদ বিন ইসলামের কথা আমার মনে বারবার সকাল- সন্ধ্যা নাড়া দিচ্ছে, কারণ ৩ ফেব্রুয়ারি আমি আবিদ বিন ইসলাম যে ওয়ার্ডে কাজ করেন সে ওয়ার্ডের মাসিক সাথী বৈঠকে গিয়েছিলাম। এর একদিন পরই ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি শাহাদত বরণ করেছেন। সেদিন সাথী বৈঠকে দেখলাম শহীদ আবিদ বিন ইসলাম অন্য সাথী ভাইদের রিপোর্টের ওপর বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং পরামর্শ দেন। আর একটা আমাকে প্রশ্ন করে, বগুড়ায় চারজন ভাইয়ের শাহাদতের প্রতিবাদে ৩১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণ সন্ধ্যায় আগ্রাবাদ ছোট পুল থেকে বড়পুল বিক্ষোভ মিছিল করেছিল। ঐ মিছিলে ব্যাপক গাড়ি, দোকানপাট ভাঙচুর হয়, এ ব্যাপারে সংগঠনের সিদ্ধান্ত কী ছিল? আমি এ প্রশ্নের উত্তর বুঝিয়ে দিয়ে সাথী বৈঠকের শেষপর্যায়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বললাম আজকে যারা দ্বীন বিজয়ের জন্য সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, দেশ-বিদেশে তাফসির পেশ করেছেন এবং যার বক্তব্য শুনে অনেক অমুসলিম মুসলমান হয়েছেন তাদেরকে কারাগারের অন্ধকারে দিন যাপন করতে হচ্ছে। ঐ সকল জামায়াত নেতা এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ছাত্র-আন্দোলন সম্পাদক শামসুল আলম গোলাপ ভাইসহ সকল নেতা কর্মীর মুক্তির আন্দোলনের জন্য হয়তো আমাদের মধ্যে হতেও শহীদ হতে হবে। মহান আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় বান্দাদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন। তাই একদিন পরই জান্নাতের আর এক মেহমান হয়ে গেলেন শহীদ আবিদ বিন ইসলাম। অথচ শহীদ আবিদ বিন ইসলাম যে মিছিলে শহীদ হলেন সেই মিছিলে আমিও ছিলাম। শাহাদতের তামান্নয় উজ্জীবিত হয়ে ইসলামী আন্দোলনকে বেগবান করতে গিয়ে অনেক ভাই শহীদ হয়েছেন। দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পদত্যাগ, কেয়ারটেকার সরকার পুর্নবহাল, অবৈধ ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আজম, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলীসহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে মুক্তির দাবি এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার রায় বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে। উক্ত কর্মসূচি সফল করার জন্য ৫ ফেব্রুয়ারি বেলা ১টায় চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড়ে ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণ বিক্ষোভ মিছিলের সিদ্ধান্ত নেয়। বেলা ১টায় মিছিল শুরুর সাথে সাথে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীরের সারাদেশ-ব্যাপী জামায়াত-শিবির প্রতিরোধের উসকানিতে পুলিশ সেই মিছিলে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ১৪৪তম শহীদ ইমরান খানের জীবন দিতে হলো। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ১৪৪তম শহীদ ইমরান খানের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণ সন্ধ্যা ৭টায় দেওয়ান হাট থেকে আগ্রাবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে। ঐ মিছিলেও পুলিশ গুলি চালায়। প্রায় ৫০-৬০টি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করার ফলে আকাশ-বাতাস অন্ধকারে ছেয়ে যায়। পুলিশের গুলির আওয়াজে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করেন, জামায়াত-শিবিরের শামিম, সাজ্জাদ ও সরোয়ার ভাইসহ প্রায় ৪০-৫০ জন আহত হন। মাথা ও পায়ে গুলি বিদ্ধ হয়ে শহীদ আবিদ বিন ইসলাম ভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ওখান থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ বাহিনী আমার ভাইয়ের চোখ উপড়ে ফেলে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে ডবলমুরিং থানা পুলিশ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। হাসপাতালে পৌঁছলে কর্তব্যরত ডাক্তার শহীদ আবিদ বিন ইসলাম ভাইকে মৃত ঘোষণা করেন। শহীদের পিতা-মাতার আদরের সন্তান হারিয়ে পরিবারে যেন খাঁ খাঁ করছে। সে চিরচেনা স্বর আর পড়ার টেবিলে পড়া মুখস্থ করেন না। ভোর বিহানে বাবা ও বড় ভাইকে সাথে নিয়ে নামাজ পড়বেন না এবং সঙ্গী সাথীদের কুরআন হাদিসের কথা এবং নামাজ রোজার কথা আর কখনো তিনি বলবেন না। তিনি এখন শাহাদতের অমিয় পিয়ালা পান করে জান্নাতের মেহমান হয়ে চিরনিদ্রায় আল্লাহর দরবারে পাড়ি জমিয়েছেন। আমার প্রিয় আবিদ বিন ইসলামের শাহাদতের কথা শোনামাত্র চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারিনি। তিনি প্রতিবেশীদের একজন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হিসেবে সবার কাছে প্রিয় ছিলেন। আমি শহীদের গর্বিত পিতা-মাতা, প্রতিবেশী ও দায়িত্বশীলের কাছ থেকে জানতে পারলাম তিনি কোন সময় কাউকে গালমন্দ কিংবা কটু কথা বলতেন না। তিনি বাস্তবে ছিলেন একজন খোদাভীরু, সৎ, নিষ্ঠাবান ও সৎচরিত্রের অধিকারী। এমন আমল ও আখলাক মহান আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে তাঁর জান্নাতি বান্দাদের মাঝেই কেবল দান করেন। তিনি সর্বদা মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। তাই বলে তিনি বাতিলের কাছে হকের বিসর্জন দিতেন না। শহীদ আবিদ বিন ইসলাম এদেশের মানবতার জন্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। আছে শুধু তার রেখে যাওয়া অজস্র স্মৃতির ভাণ্ডার। আমাদের প্রিয় ভাইকে যারা শহীদ করেছে দুনিয়াতে হয়তোবা তাদের বিচার হবে না। কিন্তু তাদেরকে আল্লাহতায়ালা অবশ্যই আখিরাতের আদালতে বিচারের সম্মুখীন করবেনই করবেন। চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার মা-বাবার অপরিমেয় আদরে লালিত ছেলে শহীদ আবিদ বিন ইসলাম। শহীদ আবিদ বিন ইসলাম এমন প্রকৃতির ছিলেন যখনই তাকে কোন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত দেয়া হতো, সাথে সাথে তা হাসিমুখে মেনে নিতেন। সবার আগে কিভাবে কাজটি শেষ করা যায় এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন। সময়মতো সকল কাজে তিনি উপস্থিত হতেন, এমনকি প্রত্যেকটি মিছিলেও। ইসলামী ছাত্রশিবিরের জনশক্তিদের কাছে শহীদের পিতার প্রত্যাশা ইসলামী আন্দোলনকে বেগবান করা,শহীদ আবিদ বিন ইসলামের রেখে যাওয়া কাজ শেষ করা এবং জামায়াত- শিবিরের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মুক্তির আন্দোলনের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে। শহীদ আবিদ বিন ইসলাম সবাইকে ডিঙিয়ে আমাদেরকে পেছনে ফেলে চলে গেলেন সামনে। মহান আল্লাহতায়ালা তাকে শাহাদতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং আমাদের সকলকেই শহীদি প্রেরণা নিয়ে দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্টায় সম্পৃক্ত থাকার তৌফিক দিন আমিন। লেখক : প্রকাশনা সম্পাদক বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির