সর্বশেষঃ
post

জীবনের এই সময়ে দাঁড়িয়ে

ইয়াসিন মাহমুদ

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২

সময় ও স্রােত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। একান্ত আপন গতিতে চলমান ও বহমান। কেউ তাকে গুরুত্ব দিক বা না দিক সে তারই গতিপথে নিজস্ব ধ্যানে ধাবমান। ক্রমাগত আগুয়ান। কেউ সময়ের মূল্য দিয়ে জীবন ও আত্মগঠনে সফল হয়। আবার কেউ অলস সময় পার করে করে কাটিয়ে দেয় জীবনভর। বেকার সময় পার করা মানুষটি নিজেকে যতই চালাক কিংবা বুদ্ধিমান ভাবুক না কেন অবশেষে সময়ের অভিসম্পাতে খেই হারিয়ে ফেলে। জীবনে নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। যে ঘন কালো অন্ধকার থেকে আর উঠে আসতে পারে না আলোর মুখোমুখি। এ প্রসঙ্গে কবি মতিউর রহমান মল্লিকের একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি তুলে ধরতে চাই- কালের কলস ভরে প্রত্যয় নিয়ে চলে যারা অবিরাম তারাতো চায় না কভু কালের কপোল তলে কোনো বিশ্রাম শুধু সেই ধৈর্যের ঋণ অবিকল রয়ে রয়ে যায়। [প্রাণের ভেতর প্রাণ/ সময় বয়ে যায়- পৃ. ৩১]

দুই. ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়’- এ প্রবাদটি আমাদের অধিকাংশেরই জানা। প্রবাদটির মর্মার্থ- মূলত সময়কে ধারণ করা। সময়ের কাজ সময়ে সম্পন্ন করা। আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন পর্যালোচনা করলে এ কথা দ্বিধাহীনভাবে বলতে হবে- জীবনে সময়ের মূল্য অপরিসীম। অনিবার্য। সময় মতো যে কাজটি খুব অল্প সময়ে করা সম্ভব, সুলভমূল্যে যে জিনিসটি পাবার কথা। অসময়ে আপনার দরকারি সেই কাজটি কিংবা বস্তুটি সংগ্রহ করা অথবা সম্পন্ন করা বড়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। একমাত্র কারণই হলো সময়কে অবহেলা করা। সময়ের মূল্য দিতে না পারা। এ ব্যাপারে আপনাদের সবারই পরিচিত একটি গল্প শেয়ার করতে চাই। এক বনে দুই ব্যাঙ ছিলো। তারা দু’জনই খুব দুষ্টু ছিলো। তবে তাদের মধ্যে একটি ছিলো একটু শান্ত আর বুদ্ধিদীপ্ত। খুব ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে সিদ্ধহস্ত। অপরটি ছিল একটু উচ্ছল প্রকৃতির তবে অলস। একদিন শীতকালে কোনক্রমে হঠাৎ লাফিয়ে ব্যাঙ দুটি একটি গরম, ফুটন্ত পানির পাত্রে পড়ে যায়। শীতের মধ্যে প্রথমে গরম পানিতে তারা আরাম অনুভব করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে গরম অনুভূতি বাড়তে থাকায় তারা সেখান থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকে। বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাঙটি যে কোনোভাবেই গরম পানি থেকে উদ্ধার পেতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু অলস ব্যাঙটি চেষ্টা করে, তবে আবার যে লাফিয়ে পড়তে হবে, সেটা ভাবে না। বরং সঙ্গীটিকে নিষেধ করে, অত লাফালাফি ভালো নয়, গরমে থাক, আরামে থাক। সে বুঝতে চায় না, সময়ের সাথে সাথে এই গরম যে তার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে, উঠবে। কিন্তু অন্য ব্যাঙটি যেভাবে হঠাৎ লাফিয়ে গরম পানিতে পড়েছিলো ঠিক সেই একইভাবে পানি অসহনীয় গরম হয়ে উঠবার আগেই তা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে পরিত্রাণ পায়। তারপর একটু শান্ত হয়ে সঙ্গী ব্যাঙটিকে খুঁজলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সে গরম পানিতে সিদ্ধ হয়ে পানির সাথে মিশে গেছে। শত চেষ্টাতেও তার দ্রবীভূত তারল্য শরীর গরম পানি থেকে আলাদা করতে পারে না।

তিন. সময়ের সমষ্টিই আমাদের জীবন। আর আমাদের এই জীবনের যাত্রাভিযান সীমিত সময়ের অথচ আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি না। আমরা অনেক সময় ভেবে থাকি, আমার বয়স আর কতইবা হলো। সামনে দেখা যাবে। দেখি- ভেবেচিন্তে নিই। এদিকে ক্যারিয়ার গোছানোকে উপলক্ষ করে আমরা কেউ কেউ জীবনকে একটি নির্দিষ্ট স্টেশনে স্টপিজ দিই। আর জীবনের অন্য সকল ক্ষেত্রে নিজের সম্পৃক্ততাকে অযথা মনে করি। নিজেকে সকল কাজ থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখি। আর ভাবি সামনে তো বহুত সময় আছে। চাকরি থেকে অবসরে যেয়ে নিজেকে আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠভাবে সঁপে দিবো। এভাবে যেতে যেতেই একসময় থেমে যায় জীবন। মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যেতে হয় পৃথিবী ছেড়ে। আল্লাহকে দেয়ার মতো সময় আর হয়ে ওঠে না আদৌ। কি নির্মম নিষ্ঠুর নিয়তি ঘটে যায় কারো কারো জীবনে।

চার. আমরা আমাদের প্রতিদিনের রুটিনে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করে থাকি। আমরা আমাদের জীবনকে উপভোগ করতে বন্ধুর সাথে আড্ডায় মেতে উঠি। আমরা বন্ধুকে পেতে অপেক্ষা করি। সময়ক্ষেপণ করি। এটা নিশ্চয় ভালোলাগা কিংবা ভালোবাসা থেকে। নিজের প্রয়োজনে কিংবা বন্ধুর প্রয়োজনে। কিন্তু সময় কি আদৌ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বন্ধুর মতো। নিশ্চয় না। সময় একটি ধারালো তরবারির ন্যায়। যদি তাকে না কাটা হয়, সে আপনাকে কেটে ফেলবে। সময় অনেকটাই প্রতিশোধপরায়ণ। তাই সময়কে কাজে লাগানো বুদ্ধিমানদের কাজ। জীবনের মতোই মৃত্যুও একবারই আসে। ব্যত্যয় ঘটার সম্ভাবনা নেই। নো কম্প্রোমাইজ। সে কাউকে ছাড় কিংবা ছেড়ে দেয় না। দেয়ার সুযোগও নেই। তাই জীবনের মতো মৃত্যুর জন্যই প্রস্তুত থাকা বাঞ্ছনীয়। জীবন আছে বলেই সময়। সময়ের মূল্য। মৃত্যু ব্যক্তির জন্য সময়ানুবর্তিতার প্রয়োজন হয় না। তবে জীবনে সময়ের মূল্য না দিলে মরণ আমাদের নিকট উপস্থিত হলে আমরা যতই কাকুতি মিনতি করি না কেন কোন লাভ হবে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন- এমনকি যখন তাদের (অবিশ^াসী ও পাপীদের) কারো কাছে মৃত্যু এসে হাজির হয় তখন সে বলে: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে আবার দুনিয়ায় পাঠান। (সূরা মুমিনুন : ৯৯) সেদিন আল্লাহ বলবেন- অনেক সময় দিয়েছি। জীবনে দীর্ঘ হায়াত পেয়েছো। অথচ তোমরা মৃত্যু ও পরকাল সম্পর্কে গাফেল ছিলে। তোমরা জাহান্নামের আযাব নিয়ে নানা কটূক্তি করেছো। আমার দ্বীনকে অস্বীকার করেছো। আর সেদিন খারিজ করা হবে বান্দার সকল আবেদন। কারণ দুনিয়ার জীবনই মানুষের পরকাল গোছানোর মোক্ষম সময়। যারা খেল তামাশায় মত্ত থেকে দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে খাও দাও ফুর্তি করো। দুনিয়াটা মস্ত বড়। এমন স্লোগানে বিশ^াসী হয়ে দিনাতি পাত করবে। পরকালে তারা তো চোখে শর্ষে ফুল দেখবে এটাই স্বাভাবিক। আর নেকির খাতায় দেখবে কেবল বিরাণভূমি। ধূ ধূ বালুচর।

পাঁচ. আসলে মানুষ কতটা মরে জন্ম- মৃত্যু এইসব সময়ের পাশফেরা আতঙ্কের ছায়া বিস্তার যেমন রাতকে মিছে মিছে ভয়ের মনে হয় সেই কবে থেকে আমরা ঝুলে আছি জীবনের সাথে মৃত্যু দিকে অনন্ত অনন্তকাল। [জীবনের সাথে, ঘাসফুল বেদনা/ গোলাম মোহাম্মদ]

প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। জীবন আছে যার মৃত্যু তার অবধারিত। তবে কখন কার মৃত্যুর ডাক আসবে কেউ তা জানে না। এটিই একমাত্র ব্যতিক্রমধর্মী ও রহস্যজনক ঘটনা। যে রহস্য আজো কেউ উদঘাটন করতে সক্ষম হইনি। জন্মের সাথে সাথেই যেন মৃত্যুর প্রস্তুতি এ যেন এক অনিবার্য অভিষেক। তাই সময়ের অবহেলা কিংবা অবজ্ঞার কোনো সুযোগ নেই। আমরা অনেক সময় আজকের কাজ আগামীকালের জন্য জমা রেখে দিই। আদৌ যেমন গতকাল আর ফিরে আসে না। তেমনি আগামীকালও আসে না। আজ শুধু আমারই। আজ কেবলই কাজের সময়। সুতরাং আমার আজকের দিনটিকে আলোয় আলোয় ভরে তোলার চেতনাকে শাণিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে এসেছে- আবু সুলাইমান দারানি বলেন: ‘যার আজকের দিন গতকালের চেয়ে ভালো হলো না, সে ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সিফাতুস সাফাওয়া : ৪/২৩০)

ছয়. বরফ খণ্ডের মতো আমাদের জীবনায়ু প্রতিদিনই ক্ষয়ে যাচ্ছে। গলতে গলতে বরফ খণ্ডটি একসময় যেমন নিঃশেষ হয়ে যায়। আমাদেরও একই অবস্থা। সময় বয়ে যেতে যেতে আমরা হারিয়ে যাবো সময়ের অন্ধকারে। আর কোন দিন ফিরবো না বা ফিরতে পারবো না এই ধরাধামে। তাই জীবনের এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকেরই উচিত সময়কে মূল্যায়ন করা। সম্মান করা। সময়ের গুরুত্ব আমাদের জীবনে প্রতিফলিত করা। সময়কে কাজে লাগিয়ে হয়ে উঠি সময়ের কাছে এক অনিবার্য ব্যক্তিত্ব। ইতিহাসের আলোকিত কিংবা আলোচিত অনুষঙ্গ। সময়কে অবহেলা করলে আজকের আরাম আগামীকালকের জন্য সেটি বড়ই বেদনাদায়ক ও অসহ্য যন্ত্রণার কারণ।

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন- যে জন দিবসে মনের হরষে জ¦ালায় মোমের বাতি আশু গৃহে তার রহিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি। লেখক : কবি ও গবেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির