post

দাওয়াতী কাজে সুন্দরভাবে কথা বলার গুরুত্ব

মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ইসলাম আল্লাহ তায়ালা মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন তাঁদের সকলেরই দায়িত্ব ছিল মানুষের নিকট ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী অপরিহার্য দায়িত্ব। এই প্রচার ও প্রসারের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে দাওয়াত। সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে দাওয়াতে সুন্দরভাবে কথা বলার গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকাজ করে এবং ঘোষণা করে যে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। (হে নবী!) সৎকাজ ও অসৎকাজ কখনো সমান নয়। তুমি অসৎকাজের নম্র-ভালোভাবে জবাব দাও, যা সবচেয়ে ভালো, তাহলে দেখবে যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে পরিণত হয়ে গেছে।’ (সূরা হা-মীম সাজদা, আয়াত : ৩৩-৩৪)  প্রকৃত দাওয়াত দানকারী তিনিই-যিনি মানুষকে দাওয়াত দেয়ার আগে নিজেকে আল্লাহর কাছে পেশ করে দেন, দাঈ হিসেবে নিজেকে পুরোপুরি সোপর্দ করে দেন। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে দাওয়াতি কাজে সফলতা লাভ করতে হলে দাওয়াতের পদ্ধতি আপডেট করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা ও চেতনা দিন দিন পরিবর্তন হচ্ছে। হাতের তালুতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ রাখা যেমন কঠিন তার চেয়েও বেশি কঠিন বর্তমান মানুষের কাছে দীনে হকের দাওয়াত পৌঁছানো। কারণ যুগের পরিবর্তনে মানুষের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, মানুষ তার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসর হচ্ছে। দাঈ হিসেবে সুন্দরভাবে কথা উপস্থাপন করা, লেখা সাবলীলভাবে পেশ করা এবং সর্বক্ষেত্রে অমায়িকভাবে দাওয়াতের মূল বিষয় উপস্থাপন করা সময়ের অনিবার্য দাবি। 

দাওয়াতী কাজের আবশ্যকীয়তা

এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে রাসূল সা.! তোমার ওপর তোমার প্রতিপালক যা অবতীর্ণ করেছেন তা মানুষের কাছে পৌঁছে দাও। যদি এ কাজ তুমি না কর তবে তোমার দ্বারা তার রিসালাতের দায়িত্ব পালনের হক আদায় করে হবে না। মানুষের অনিষ্টকারিতা থেকে আল্লাহ তোমাকে হেফাযত করবেন। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, তিনি কখনো কাফেরদেরকে তোমার মোকাবেলায় সফলতার পথ দেখাবেন না।’ (সূরা আল মায়িদা, আয়াত : ৬৭)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে চাদর আবৃত ব্যক্তি! উঠ ও ভয় প্রদর্শন কর এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।’ (সূরা আল মুদ্দাসসির, আয়াত: ১-৩)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন-সহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এ দীনকে অন্য সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন, চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন।’ (সূরা আস সফ, আয়াত: ৯) 

প্রকাশ্য ও গোপনে দাওয়াতী কাজ করা

আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠে দাওয়াত দিয়েছি। অতঃপর আমি ঘোষণা সহকারে প্রকাশ্যে তাদের কাছে দাওয়াত করেছি এবং তাদেরকে গোপনে চুপিসারেও দাওয়াত দিয়েছি।’ (সূরা নূহ, আয়াত: ৮-৯)

দিনে-রাতে সর্বাবস্থায় দাওয়াতী কাজ করা

আল কুরআনে এসেছে, ‘তিনি বলেন, হে প্রভু আমি আমার জাতিকে রাতে দিনে সর্বাবস্থায় দ্বীনের দিকে দাওয়াত দিয়েছি।’ (সূরা নুহ, আয়াত: ৫)

মহানবী সা.-এর অবর্তমানে দাওয়াতের এই গুরুভার তাঁর উম্মতের ওপর অর্পিত হয়েছে। সে কারণে এ মহান দায়িত্বে অবহেলা করা চলবে না, বরং তা পালন করতে হবে যথাযথভাবে। 

দাওয়াতী কাজের স্তর

এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. হতে শুনেছি, তিনি বলেন, তোমাদের কেউ অন্যায় কাজ দেখলে সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি এটা তার দ্বারা সম্ভব না হয়, তাহলে মুখ দ্বারা বাধা দেবে, তাও সম্ভব না হলে অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। আর এটাই হলো ঈমানের দুর্বলতম অবস্থা।’ সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৬; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ২১৭২; সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং ৫০০৮, ৫০০৯; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ২৮, ৭৫৫৯; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩০৬, ৩০৭; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১২৭৫, ৪০১৩; মুসনাদু আবী ইয়ালা, হাদীস নং ১০০৯, ১২০৩; মুসনাদুত ত্বায়ালিসী, হাদীস নং ২১৯৬; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৫৬৪৯; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ১১৪২, ৪৩৪২; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১১০৭২, ১১১৫০, ১১৪৬০, ১১৪৯২, ১১৫১৫, ১১৮৭৬; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৫৫২৪, ৫৫৫৬; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদীস নং ৫১৩৭; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহিব, হাদীস নং ২৩০২। 

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের সামাজিক জীবনে যেমন অনাচার, পাপাচার, দুর্নীতি, কুসংস্কার, অরাজকতা, ঘৃণ্য আচার-অনুষ্ঠান, জোর যার ক্ষমতা তার এবং নিন্দনীয় কার্যকলাপে পরিপূর্ণ ছিল, তেমনি বর্তমান সমাজব্যবস্থাও আমাদেরকে আইয়্যামে জাহিলিয়্যাতের সেই বর্বর সমাজচিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই জাহিলিয়াতের মূলোৎপাটনের জন্যই আল্লাহ তায়ালা মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সা.-কে প্রেরণ করেন। তিনি এসে মানবসমাজকে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশিত পথের দিকে আহবান করেন এবং জাহিলিয়াতের ঘোর অমানিশা থেকে মানুষকে রক্ষা করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যেমন আমরা তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য একজন রাসূল প্রেরণ করেছি, যিনি তোমাদের নিকটে আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান। আর যিনি তোমাদের জীবন পবিত্র-পরিশুদ্ধ করেন এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। তোমাদেরকে এমন সব বিষয় শিক্ষা দেন, যা তোমরা জানতে না।’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত : ১৫১) দাওয়াত দানের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার পালনকর্তার দিকে (মানুষকে) দাওয়াত দাও এবং তুমি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।’ (সূরা আল কাসাস, আয়াত : ৮৭)

তিনি আরো বলেন, ‘হে নবী বলুন! এটিই তো আমার পথ। আমি এবং আমার অনুসারীগণ ডাকি আল্লাহর পথে জাগ্রত জ্ঞানসহকারে (সুস্পষ্ট দলিল সহকারে)। আল্লাহ মহা পবিত্র। আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত : ১০৮)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আমরা তোমাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর পথে দাওয়াত দানকারী হিসেবে ও উজ্জ্বল প্রদীপ রূপে।’ (সূরা আল আহযাব, আয়াত : ৪৫-৪৬)। আমাদের সমাজও আজ জাহেলি যুগের ন্যায় অন্ধকারের অতল গহবরে নিমজ্জিত। মানবরচিত কোনো তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে তমসাচ্ছন্ন এই সমাজকে রক্ষা করা আদৌ সম্ভব নয়। একমাত্র মানবতার বন্ধু মুহাম্মাদ সা.-প্রদর্শিত পন্থায় দাওয়াত দানের মাধ্যমেই এ সমাজের উত্তরণের পথ উন্মোচিত হতে পারে। তাই রাসূল সা. নির্দেশিত পদ্ধতিতে মানবতাকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আহবান করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত জানা থাকলেও তোমরা তা পৌঁছিয়ে দাও। আর বনি ইসরাইলের কাহিনী বর্ণনা করো তাতে কোনো দোষ নেই। তবে যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারিত করে নিলো।’ সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৩২৭৪; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৬৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৬৪৮৬, ৬৮৮৮, ৭০০৬; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৬২৫৬; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ১০১৫৭, ১৯২১০; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ২৯১৭৫; শারহু মাআনিল আছার, হাদীস নং ৫৫৭০; আল মু’জামুস সগীর, হাদীস নং ৪৬২; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদীস নং ১৯৮।

দাওয়াতের কেন্দ্রবিন্দু হবে- ক) তাওহীদ খ) রিসালাত ও গ) আখিরাত

দাওয়াতী কাজের গুরুত্ব 

আল্লাহর পথে দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকাজ করে এবং ঘোষণা করে যে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। (হে নবী!) সৎকাজ ও অসৎকাজ কখনো সমান নয়। তুমি অসৎকাজের নম্র-ভালোভাবে জবাব দাও, যা সবচেয়ে ভালো, তাহলে দেখবে যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিলো, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে পরিণত হয়ে গেছে।’ (সূরা হা-মীম সাজদা, আয়াত : ৩৩-৩৪)

উপরিউক্ত আয়াতে দাওয়াতের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। এর ফলে পারস্পরিক শত্রুতা দূরীভূত হয় এবং বন্ধুত্ব ফিরে আসে। একে অপরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মহব্বত সৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘মুনযির ইবন জারির রা. তিনি তাঁর পিতার নিকট হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা একদা রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ছিলাম- রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, যে ব্যক্তি (দাওয়াতের মাধ্যমে) ইসলামের একটি উত্তম সুন্নাহ চালু করবে সে তার নেকি পাবে এবং ওই সুন্নাহর প্রতি মানুষ আমল করে যত নেকি পাবে, তাদের সমপরিমাণ নেকি তার আমলনামায় লেখা হবে। তবে তাদের কারো নেকি কম করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ আমল চালু করবে, সেজন্য তার পাপ রয়েছে। আর ওই মন্দ আমল করে যত লোক যে পরিমাণ পাপ অর্জন করবে, সবার সমপরিমাণ পাপ তার আমলনামায় লেখা হবে। তবে তাদের কারো পাপ এতটুকুও কম করা হবে না।’ সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৩৯৮, ৬৯৭৫; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-১৯১৫৬, ১৯১৭৪, সুনানুন নাসাঈ, হাদীস-২৫৫৪; মুসনাদুত ত্বায়ালিসী, হাদীস-৬৭০; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস-৯৮০৩; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস-২০৩, ২০৭; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস-৪৩০৭৮: মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস-২১০।

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, যে ব্যক্তি হিদায়াতের দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তিদের সমপরিমাণ নেকি রয়েছে। কিন্তু তাদের নেকি থেকে বিন্দু পরিমাণও হ্রাস করা হবে না। অপরদিকে যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তিদের সমপরিমাণ পাপ রয়েছে। কিন্তু তাদের পাপ থেকে বিন্দু পরিমাণও হ্রাস করা হবে না।’ সহীহ মুসলিম, হাদীস-৬৯৮০; জামিউত তিরমিযী, হাদীস-২৬৭৪; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস-৪৬১১; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-৯১৬০; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদীস-১১২; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস-২০৫, ২০৬; সুনানুদ দারিমী, হাদীস-৫১৩; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৪৩০৭৭; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদীস-১৫৮; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস-১১৮। সনদ : সহীহ।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আবু মাসউদ আল আনসারী রা. বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সা.-এর নিকট এসে বলল, আমার সওয়ারি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমাকে একটি সওয়ারি দান করুন। তিনি বললেন, সওয়ারি আমার কাছে নেই। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমি তাকে এমন লোকের কথা বলে দিতে পারি, যে তাকে সওয়ারির পশু দিতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে পথ দেখায় তার জন্য কল্যাণকর কাজ সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ পুরস্কার রয়েছে।’ সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৫০০৭; জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭১; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ৫১৩১; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ২৮৯, ১৬৬৮; মুসনাদুত ত্বায়ালিসী, হাদীস নং ৬১১; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ২০০৫৪; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৭০৮৪, ২২৩৩৯, ২২৩৫১; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ১০৮; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৭৬৫৫; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৪৩০৪১; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদীস নং ২০৯; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১১৫, ১১৬। সনদ : সহীহ।

দাওয়াতী কাজ না করার পরিণতি 

আল্লাহর পথে দাওয়াতি কাজ না করা ও দাওয়াতী কাজে অলসতাকারীর জন্য পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে। সহীহ হাদীসে এসেছে, ‘আবু বকর সিদ্দীক রা. হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই মানুষ যখন কোনো গর্হিত কাজ দেখে তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা না করে, অচিরেই আল্লাহ তাদের সকলকে শাস্তি দিবেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যখন কোনো সম্প্রদায়ের মাঝে পাপ হতে থাকে এবং প্রতিরোধ করতে সক্ষম ব্যক্তিরা প্রতিরোধ না করে, তখন আল্লাহ সকলকেই শাস্তি দেন।’ জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ২১৬৮, ৩০৫৭; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৫৩; সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং ৪৩৪০; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩০৫; মুসনাদু আবী ইয়ালা, হাদীস নং ১২৮, ১৩০, ৭০৯১; মুসনাদুল হুমাইদি, হাদীস নং ৩; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৭৫৫০; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৫৫৪৩, ৮৪৪৩; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদীস নং ৫১৪২; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ২৩১৭। সনদ : সহীহ।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘নুউমান ইবন বশীর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আল্লাহর বিধান পালনে অলসতাকারী ও অমান্যকারীর দৃষ্টান্ত ঐ লোকদের ন্যায় যারা লটারির মাধ্যমে কেউ জাহাজের ওপরে, কেউ জাহাজের নিচে স্থান পেল। তাদের মধ্যে যারা নিচে রয়েছে, তারা পানি আনার জন্য ওপরে গেলে ওপরের লোকদের কষ্ট হতো। কাজেই নিচের এক ব্যক্তি (পানি সংগ্রহের জন্য) একটি কুঠার নিয়ে নৌকার তলা ছিদ্র করতে আরম্ভ করল। তখন ওপরের লোকজন এসে বলল, তোমার কী হয়েছে? (তুমি নৌকা ছিদ্র করছ কেন?) সে বলল, ওপরে পানি আনতে গেলে তোমাদের কষ্ট হয়, আর পানি আমার একান্ত প্রয়োজন। এক্ষণে যদি তারা ঐ ব্যক্তিকে নৌকা ছিদ্র করতে বাধা দেয় তবে তারা তাকে এবং নিজেদেরকে রক্ষা করল। আর যদি তাকে নৌকা ছিদ্র করার কাজে ছেড়ে দেয় তবে তারা তাকে এবং নিজেদেরকে ধ্বংস করলো।’ সহিহুল বুখারী, হাদীস নং ২৫৪০; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩০১; আল মু’জামুল আওসাত্ব লিত ত্বাবারানী, হাদীস নং ৯৩১০; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৫১৩৮। সনদ : সহীহ।

আরেক হাদীসে এসেছে, ‘হুযাইফা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ দিবে এবং খারাপ কাজ হতে নিষেধ করবে। নতুবা অচিরে আল্লাহ তায়ালা নিজের পক্ষ হতে তোমাদের ওপর আজাব প্রেরণ করবেন। অতঃপর তোমরা (আজাব মুক্তির জন্য) তাঁর নিকটে দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল হবে না।’ জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ২১৬৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২৩৩০১, ২৩৩২৭; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ৭৫৫৮; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৫৫২৯, ৫৫৬২,  মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৫১৪০; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ২৩১৩। সনদ : সহীহ।

অন্য হাদীসে এসেছে, ‘জারির ইবন আব্দুল্লাহ রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো এক ব্যক্তি পাপে লিপ্ত হয়, আর সে সম্প্রদায়ের লোকেরা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে পরিবর্তন না করে, তখন তাদের মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ তায়ালার আজাব তাদের ওপর পতিত হবে।’ সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৪৩৪০, ৪৩৪১; সুনানু ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪০০৯; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩০০, ৩০২; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৯২৫৩; আল মু’জামুল কবীর লিত ত্বাবারানী, হাদীস নং ২৩৮২; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৫৫৩৫, মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৫১৪৩; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ২৩১৬। সনদ: সহীহ।

দাওয়াতী কাজে সুন্দরভাবে কথা বলার পদ্ধতি ও কৌশল

দাওয়াতি কাজের কৌশল ও পদ্ধতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ বিভিন্ন আয়াতে নির্দেশনা দিয়েছেন। 

১. বুদ্ধিমত্তার সাথে দাওয়াত দান : এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে দাওয়াত দাও প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক কর সর্বোত্তম পদ্ধতিতে।’ (সূরা আন নাহল, আয়াত : ১২৫)

এ আয়াতে দাওয়াতের তিনটি পদ্ধতি উল্লিখিত হয়েছে। যথা-১) হিকমত তথা আল কুরআন ও সহীহ হাদীসভিত্তিক দাওয়াত দেয়া। ২) উত্তম উপদেশ দেয়া। ৩) উত্তম পন্থায় বিতর্ক করা।

২. বিনয় ও মোলায়েম ভাষার মাধ্যমে দাওয়াত : এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দুইজন ফিরআউনের কাছে যাও। নিশ্চয় সে বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছে। তার সাথে কোমল-নম্রভাবে কথা বলবে। হয়তো সে উপদেশ কবুল করবে অথবা ভীত হবে।’ (সূরা ত্বাহা, আয়াত: ৪৩-৪৪)

৩. মন্দের মোকাবেলায় ভালো দিয়ে দাওয়াত : আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও অসৎকর্ম কখনো সমান নয়। প্রত্যুত্তর নম্রভাবে দাও, দেখবে তোমার শত্রুও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে পরিণত হয়েছে।’ (সূরা হামীম সাজদাহ, আয়াত : ৩৪)

৪. জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে দাওয়াতের পদ্ধতি আপডেট করা : আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সব বিষয়ের ইলম শিক্ষা দিয়েছেন। যুগ যুগান্তরে সে শিক্ষা উম্মাহকে অনুপ্রাণিত করবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘পড়, তোমার রব বড়ই অনুগ্রহশীল। যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।’ সূরা আল আলাক, আয়াত : ৩-৫)

৫. নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করার মাধ্যমে দাওয়াত

১. সাধারণ গণমানুষের নিকট দাওয়াত। 

২. চিঠি-পত্রের মাধ্যমে দাওয়াত। 

৩. বই পড়ানোর মাধ্যমে দাওয়াত। 

৪. সমস্যার সমাধান দেখিয়ে দাওয়াত। 

৫. মিডিয়ার মাধ্যমে দাওয়াত (প্রিন্টিং ও ইলেকট্রনিকস)। 

৬. ইন্টারনেট, ফেসবুক ও টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাওয়াত। 

৭. আল্লাহর ক্ষমতা মাহাত্ম্য প্রমাণের মাধ্যমে দাওয়াত।

৬. সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দাওয়াত : মানুষ সামাজিক জীব। সেহেতু মানুষের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে তার পাশে সহযোগিতার মাধ্যমে ইসলাম নির্দেশিত দাওয়াত দেয়া অধিক ফলপ্রসূ।

৭. জনগণের ভাষায় দাওয়াত দান করা : এ ব্যাপারে আল কুরআনে এসেছে, ‘এবং আমরা যেখানেই কোনো রাসূল প্রেরণ করেছি, তিনি তার জাতির জনগণের ভাষায়ই সে পয়গাম পৌঁছিয়েছেন, যেন তিনি তাদেরকে খুব ভালোভাবেই ভাব প্রকাশ করে বুঝাতে পারেন, অতঃপর আল্লাহ যাকে চান গোমরাহ করেন আর যাকে চান হিদায়াত দান করেন, তিনি প্রবল পরাক্রমশালী ও জ্ঞানী-কৌশলী।’ সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪

৮. সহজভাবে দাওয়াত প্রদান: এ ব্যাপারে সহিহ সনদে এসেছে, ‘আনাস ইবন মালিক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা (দীনের দাওয়াত) সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, বীতশ্রদ্ধ করো না।’ সহিহুল বুখারী, হাদীস নং ৬৯, ৫৭৭৪; সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬২৬; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১২৩৩৩, ১৩১৭৫; মুসনাদু আবী ইয়ালা, হাদীস নং ৪১৭২; মুসনাদুত ত্বায়ালিসী, হাদীস নং ২০৮৬; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ৫৩৬০, ৫৪২৯; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ২৬৭৪। সনদ : সহিহ।

৯. উদ্দেশ্যের পরিপন্থী পদ্ধতি পরিত্যাগ করা: ১) বাড়াবাড়ি ২) অহেতুক তর্ক-বিতর্ক ৩) ফতোয়াবাজি।

দাওয়াতী কাজে অংশগ্রহণকারীর গুণাবলি

দাওয়াতী কাজে অংশগ্রহণকারী দাঈর অনেক গুণাবলি থাকা আবশ্যক। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

সত্যবাদী হওয়া: আল্লাহর পথের দাঈকে অবশ্যই সত্যবাদী হতে হবে। দাঈর মধ্যে যদি মিথ্যার লেশমাত্র পাওয়া যায় তাহলে তার দাওয়াত ফলপ্রসূ হবে না। কুরআন ও হাদীসে সত্যবাদিতার বহু নির্দেশনা এসেছে এবং মু’মিনদেরকে সত্যবাদীদের সাথী হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।’ (সূরা আত-তওবা, আয়াত : ১১৯)

ধৈর্যশীল হওয়া: ধৈর্য অত্যন্ত মহৎ গুণ। আল্লাহর পথের দাঈদের এ মহৎ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। নতুবা দাওয়াত দানে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। কেননা আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে গেলে অনেক বিপদ-আপদ, বাধা-বিপত্তি আসতে পারে, সেক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথেই তা মোকাবিলা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। যাদের ওপরে কোনো বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমরা ফিরে যাব।’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৬)

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ধৈর্যশীল, তাঁরা তাদের পুরস্কার পাবে অঢেল-অগণিত।’ (সূরা আয যুমার, আয়াত : ১০)

কোমল স্বভাবের অধিকারী হওয়া : নম্রতা-ভদ্রতা ও কোমলতা আদর্শ মানুষের গুণ। দীনের দাঈর মধ্যে অবশ্যই এ গুণ থাকা বাঞ্ছনীয়। এ গুণের অধিকারী দাঈগণ দাওয়াতি কাজে সহজেই মানুষের মাঝে প্রভাব ফেলতে পারে। আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কোমলতা অর্জনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

রাসূলুল্লাহ সা.-কে আল্লাহ বলেন, ‘আর এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ যে, তোমার ব্যবহার তাদের প্রতি (অর্থাৎ স্বীয় উম্মতের প্রতি) বড্ড কোমল। নয়তো যদি তুমি কর্কশভাষী ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতে তাহলে তারা তোমার চারপাশ থেকে সরে যেত। কাজেই তুমি তাদের ত্রুটি ক্ষমা করে দাও ও তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করো এবং দীনের ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত কর। অতঃপর যখন তুমি স্থির সংকল্পবদ্ধ হবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

দ্বীনি কাজে একনিষ্ঠ হওয়া : দ্বীনি কাজে একনিষ্ঠতা ব্যতীত কখনো দাওয়াতী কাজে সফলতা আসবে না। আর ইখলাস বা একনিষ্ঠতা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, আমি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি।’ (সূরা আ যুমার, আয়াত : ১১)

কথায় ও কাজে মিল থাকা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল, যা নিজেরা কর না? তোমরা যা কর না তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক কাজ।’ (সূরা আস সফ, আয়াত : ২-৩) 

হাদীসে এসেছে, ‘আনাস ইবন মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, যখন আমাকে মিরাজের রাতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমি কিছু লোককে দেখলাম, যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কেটে দেয়া হচ্ছে। আমি বললাম, হে জিবরাঈল! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আপনার উম্মতের বক্তাগণ, যারা মানুষকে ভালো কাজের জন্য আদেশ করত এবং নিজেদেরকে ভুলে যেত, অথচ তারা কুরআন তিলাওয়াত করত। কিন্তু তারা চর্চা করত না।’ মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১২২১১, ১২৮৫৬, ১৩৪২১, ১৩৫১৫; মুসনাদু আবী ইয়ালা, হাদীস নং ৩৯৯২, ৩৯৯৬; মুসনাদুত ত্বায়ালিসী, হাদীস নং ২০৬০; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, হাদীস নং ৩৬৫৭৬; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং ১৭৭৩, ৪৯৬৬, ৪৯৬৭; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ২৯০২৬, ২৯১০৬, ৩১৮৫৬; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৫১৪৯; আত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ২৩২৭; সিলসিলাতুস সহিহাহ, হাদীস নং ২৯১। সনদ : সহিহ।

অন্যত্র হাদীসে এসেছে, ‘আবু ওয়াঈল রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ক্বিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এতে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। আর সে তা নিয়ে ঘুরতে থাকবে যেমনভাবে গাধা আটা পেষা জাঁতার সাথে ঘুরতে থাকে। জাহান্নামিরা তার নিকট একত্র হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবে, আপনি কি আমাদেরকে ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করতেন না? সে বলবে, হ্যাঁ। আমি তোমাদেরকে ভালো কাজের আদেশ করতাম, কিন্তু নিজে তা করতাম না। আর খারাপ কাজ হতে তোমাদেরকে নিষেধ করতাম, কিন্তু আমি নিজেই তা করতাম।’ সহিহুল বুখারী, হাদীস নং ৩০৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬৭৪; মুসনাদুল হুমাইদী, হাদীস নং ৫৪৭; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল, হাদীস নং ১৪৭৭০, ২৯০২৩; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৫১৩৯; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১২৪; সিলসিলাতুস সহিহা, হাদীস নং ২৯২। 

দাঈর আবশ্যকীয় অন্যান্য গুণাবলি

১. মর্যাদাবান ব্যক্তির মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে দাওয়াত দান। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দুইজন ফিরাউনের কাছে যাও, কেননা সে সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে গেছে। তার সাথে কোমল-নম্রভাবে কথা বলবে। হয়ত সে উপদেশ কবুল করবে ভীত হবে।’ (সূরা ত্বাহা, আয়াত : ৪৩-৪৪)

২. মন-মেজাজ দেখে পর্যায়ক্রমে পদক্ষেপ গ্রহণ

৩. প্রতিবাদী পরিবেশে নয়, অনুকূল পরিবেশে দাওয়াত প্রদান। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি যখন দেখবে যে, লোকেরা আমার আয়াতসমূহের মাঝে দোষ সন্ধান করছে তখন তাদের নিকট হতে সরে যাও যতক্ষণ না তারা এ প্রসঙ্গের কথাবার্তা বন্ধ করে অন্য কোনো প্রসঙ্গে মগ্ন হয়।’ (সূরা আল আনয়াম, আয়াত : ৬৮)

৪. অন্যমনস্ক ব্যক্তির কাছে দাওয়াত না দেয়া।

৫. যুক্তি-প্রমাণ ও দলিল পেশ করার সময় ব্যক্তির যোগ্যতা ও সক্ষমতার দিকে খেয়াল রাখা।

৬. প্রচার করার ক্ষেত্রে ‘প্রান্তিক’ শব্দ পরিহার করা দরকার।

৭. দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে ঊীঃৎবসব ড়িৎফ ব্যবহার না করা।

৮. কোনো মানুষকেই স্থায়ী দুশমন মনে না করা।

৯. কোনো মানুষকে অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন না করা।

১০. দাওয়াতি কাজে কৃত্রিমতা ও লৌকিকতা পরিহার করা।

১১. মানুষের ইতিবাচক দিকের প্রশংসা করা যায়।

দাওয়াতী কাজে বাধা আসবে

সত্য-ন্যায়ের পথে দাওয়াতি কাজে বাধা আসবেই। পৃথিবীতে সকল নবী-রাসূলদের দাওয়াতে প্রতিবন্ধকতা এসেছে। এসব বাধা আসতে পারে নি¤েœাক্ত পর্যায় থেকে- ক) রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং নিজের নফস এর পক্ষ থেকে বাধা আসবে। খ) জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পদ ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ) কখনো কখনো অপ্রাপ্তি কাক্সিক্ষত ফলাফল না পাওয়া অধৈর্যের কারণ হতে পারে।

দাওয়াত গ্রহণকারীর মন জয় করার বিশেষ পদ্ধতি

১. দাওয়াত গ্রহণকারীর সামনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে পেশ করা বা ভালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

২. মানুষের নাম তার নিজের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তাই যথাসম্ভব মানুষের নাম মনে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

৩. আপনি যাকে দাওয়াত দেবেন তাকে গুরুত্ব দিন ও এটা মন থেকেই করতে হবে।

৪. দাওয়াত গ্রহণকারী যে বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী, সে বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।

৫. ভালো শ্রোতা হতে হবে, দাওয়াত গ্রহণকারীকে কথা বলতে দিতে হবে।

দাওয়াতের ক্ষেত্র

ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত সর্বপেশার মানুষের নিকট পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে- ১) সকল ছাত্র, ২) প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারী, ৩) আত্মীয় স্বজন, ৪) নিজ পরিবার, ৫) প্রতিবেশীর মাঝে, ৬) সাধারণ জনগণের মাঝে, ৭) কর্মক্ষেত্রে, ৮) পেশাজীবীদের মাঝে, ৯) সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মাঝে ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে।

সমাপনী

অধুনা তমসাচ্ছন্ন এ সমাজ অজ্ঞতা, হীনতা, হিংসা-বিদ্বেষ, খুন-গুম, নগ্নতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার মতো জঘন্য পাপাচারে নিমজ্জিত। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অপসংস্কৃতির বিষবাষ্প। ইসলামবিরোধীদের মোকাবেলায় দ্বীনকে বিজয়ের জন্য দাওয়াতি কার্যক্রম বৃদ্ধি করা আবশ্যক। বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশে^ নাস্তিক, মুরতাদ ও ইহুদি খ্রিষ্টানসহ সব ইসলামবিরোধী শক্তি জ্ঞান, বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ইসলামবিরোধী যে মহা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার করছে তা মোকাবেলা করে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য আমাদের অত্যন্ত সুচিন্তিত, সময়োপযোগী ও ব্যাপকভিত্তিক দাওয়াতি কাজ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সমাজের এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহর পথে সুন্দরভাবে কথা বলে দাওয়াত দান করা মু’মিনের ঈমানী দায়িত্ব। এ কাজে সকল শ্রেণী-পেশাজীবী সকলকে এগিয়ে আসা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে দীনের দাওয়াতে সুন্দরভাবে কথা বলার সময়, শ্রম ও মেধা কুরবানি করার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

লেখক : আলেম, গবেষক ও সংগঠক

ফৎ.ধহধসনরৎধসঢ়ঁৎ@মসধরষ.পড়স

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির