সর্বশেষঃ
post

দেউলিয়া শ্রীলঙ্কা বেপরোয়া উন্নয়নের অনিবার্য পরিণতি

কামরুজ্জামান বাবলু

০৬ জুন ২০২২

২০১১ সালের নভেম্বরে ১৭তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল মালদ্বীপের আদ্দু শহরে। শহর না বলে প্রত্যন্ত দ্বীপ বলাই যুক্তিযুক্ত। ভারত মহাসাগরের একেবারে গভীরে মালদ্বীপের রাজধানী মালে থেকেও ছোট বিমানে করে প্রায় দেড় ঘণ্টা অতিক্রম করে যেতে হয় সেই দ্বীপে। আমরা বাংলাদেশী বেশ কিছু সাংবাদিক সেই সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশে মালদ্বীপ গিয়েছিলাম। তবে, তখন আমরা শ্রীলঙ্কার সরকারি বিমান ‘মিহিন লঙ্কায়’ যাত্রা করেছিলাম যা ছিল অর্থনৈতিকভাবে আমাদের জন্য সাশ্রয়ী। অন্যদিকে, এই বিমানে করে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে ট্রানজিট নিয়ে মালদ্বীপ যেতে হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই একই সাথে শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের একটি সুযোগ পেয়ে যাই। 

পাসপোর্টে সার্ক স্টিকার থাকায় সেই যাত্রায় মালদ্বীপ থেকে ফেরার পথে আমি কোনো ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই সম্ভবত ৪ দিনের যাত্রাবিরতি নিয়েছিলাম শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে। বিমানবন্দর থেকে খানিকটা দূরে অনেকটা জঙ্গলের মধ্যে ‘গুডউড’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে রুম ভাড়া নিয়েছিলাম। তামিল টাইগার বিদ্রোহ দমনের পর দ্রুতগতিতে শ্রীলঙ্কার এগিয়ে যাবার অনেক গল্প শুনে দেশটি ঘুরে দেখার প্রবল আগ্রহ ছিল আমার মধ্যে। তাই কিছুটা ভয়-সঙ্কট নিয়েও একা একা দেশটি ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। 

বাংলাদেশের তুলনায় খাবার অনেক সস্তা পেলাম। হরেক রকম মুখরোচক মসলা দিয়ে তৈরি খাবারের টেস্ট ছিল অনেক বেশি। তবে, দেশটির বিশ্ববিখ্যাত চায়ের প্রশংসা করতেই হয়। সম্ভবত তখন প্রতি ডলারের বিপরীতে আমি শ্রীলঙ্কার ১০৯ রুপি পেয়েছিলাম। তখন প্রতি ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী ৭৮-৭৯ টাকা পেতাম। যাই হোক মালদ্বীপে খুব ব্যয়বহুল যাত্রা শেষে একেবারে সস্তায় সবকিছু করতে পেরে আমি খুবই উৎফুল্ল ছিলাম। 

তামিল টাইগার দমনের পর দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা দেশটির উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ দেখতে বের হলাম। সাথে নিলাম আমার এক শ্রীলঙ্কান সাংবাদিক বন্ধুকে। ট্রেন, বাস থেকে শুরু করে ওখানকার সব ধরনের লোকাল যানবাহনেই ঘুরলাম। বেশির ভাগ রাস্তাঘাটেই দেখতে পেলাম সংস্কারকাজ চলছে। চারদিকেই যেন উন্নয়নের ছোঁয়া। কিন্তু তখনও একটা জিনিস আমার খটকা লেগেছিল। ট্রেনে করে ঘোরার সময় অনেক গরিব বসতি দেখতে পেয়েছিলাম। কোনো ধরনের কেতাবি ফিরিস্তি না ঘেঁটেই তখন উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, ভেতরে ভেতরে দেশটিতে অনেক দরিদ্র মানুষের বসতি রয়েছে। 

শিক্ষা সূচকে তখনো শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু অনেক জায়গায়ই দেখলাম অতি সাধারণ ইংরেজিও অনেকেই বুঝতে পারছেন না। তবে, সবাই স্বতঃস্ফূর্ত হিন্দি বলছেন। একেবারে খেটে খাওয়া দিন-মজুর থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ অনর্গল হিন্দি বলছেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমি হিন্দিতে কথা বলা তো দূরের কথা হিন্দি ভাষা খুব সামান্যই বুঝতে পারতাম। ফলে সাধারণ মানুষের সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে কথা বলতে খুব অসুবিধার মধ্যে পড়েছিলাম। যাই হোক আমার বন্ধুর বদৌলতে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হই। তবে, দেশটিতে হিন্দি সংস্কৃতির আগ্রাসন যে অনেকটাই সফলতা পেয়েছে সে ব্যাপারটি আমি বেশ বুঝেছিলাম। আমার ধারণা হয়েছিল দেশটিতে ভারতীয় হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে সেখানে ভারতের আধিপত্যও শক্তিশালী হবে। 

তবে, ভেতরে ভেতরে সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে চীন একচ্ছত্রভাবে ঢুকে পড়ছে তা তখনো খুব একটা আমার উপলব্ধিতে আসেনি। দেশটির তখনকার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট ছিলেন কিছুদিন আগের জনরোষে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। ১৯৭০ সালে প্রথম নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য রাজাপাকসে ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি এ যাবৎ দু’বার প্রেসিডেন্ট এবং তিনবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

মাহিন্দা রাজাপাকসের মতো শক্তিশালী নেতার হাতে দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে, চারদিকে রাজাপাকসের জয়ধ্বনি, সেই দেশটি যে এভাবে দেউলিয়া হয়ে যাবে তা উপলব্ধি করা সত্যিই দুরূহ। ২০১১ সালে স্বচক্ষে যেভাবে শ্রীলঙ্কাকে দেখলাম, সেখানে পর্যটকদের ভিড় ও অন্যান্য কর্মযজ্ঞ এবং পরবর্তীতে রাজাপাকসের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ সফরের যেসব জৌলুসময় ভিডিও দেখা গেছে, তাতে কারো ঘুণাক্ষরে উপলব্ধি হয়নি যে অচিরেই তার এমন পরিণতি হবে। 

জটিল হিসাব-নিকাশের মারপ্যাঁচ এড়িয়ে সোজা ভাষায় বলতে গেলে- ক্ষমতা আর বিত্তের গরমে রাজাপাকসে ও তার ঘনিষ্ঠজনরা অনেকটাই বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন। বড় বড় সেতু, পোর্ট আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মুখে বড় বড় বুলি দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। দেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিমোহিত করে রেখেছিলেন। অন্যদিকে, ক্রমেই চীনের ঋণফাঁদের অতল গহবরে নিমজ্জিত হচ্ছিলেন। আর দুর্নীতির বদৌলতে কিছু লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছিল।  

রাজাপাকসে দেশটিকে সিঙ্গাপুর বানাতে গিয়ে হাতে নিয়েছিলেন শত শত মেগা প্রজেক্ট। ঋণ আর মূল্যস্ফীতি ব্যালান্স করতে না পেরে একের পর এক প্রজেক্টগুলোতে ধরা খেতে থাকেন এই শক্তিশালী নেতা। অনেকগুলো প্রজেক্টের কাজ মাঝপথেই থমকে যায়। কাগজের অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, সংবাদপত্র ছাপানো বন্ধ হয়ে যায় এবং চালের মূল্য কেজি প্রতি ৫০০ টাকা পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়। দেশটির প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন খাতে শুরু হয় হাহাকার, ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, ইলেকট্রিক বাতির পরিবর্তে কেরোসিনের কুপি জ্বালাতে হয় ঘরে ঘরে। অপরদিকে, বেকারত্ব আর আর্থিক দৈন্যদশায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অন্য দেশে চলে যান দেশটির যুবসমাজ। ভেঙে পড়ে দেশটির ব্যাংকিং কার্যক্রম, ভেঙে পড়ে এবং তলানিতে গিয়ে ঠেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। চীন, ইরান, কোরিয়া, ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনীতি চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। শেষমেশ দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান শক্তি নিজেদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। 

কল্পনাতীত জনরোষ

তামিল টাইগার বিদ্রোহ ও তা দমনের ইতিহাস ছাড়া শ্রীলঙ্কাকে খুব একটা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়নি। দেশটির আমজনতা এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ই অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী। শান্ত-স্বভাবের সেই মানুষগুলো কতটা ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন মনে মনে তা সত্যিই বিস্ময়কর। বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় পেটানোর ছবি ও ভিডিও সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। একজন সংসদ সদস্যের আত্মহত্যার খবরও শোনা যায়। যারা মাত্র কয়েকদিন আগে বাগাড়ম্বর করেছিলেন, তারা নাজেহাল হয়েছেন জনতার হাতে। এমনকি সরকারের চাটুকারিতা করে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নকারী সাংবাদিকের যে পরিস্থিতি দেখা গেছে তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। 

তবে, যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে না পেরে শ্রীলঙ্কার জনতা এতটা ফুঁসে উঠেছে। সেখানে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মিথ্যা-বানোয়াট মামলা দিয়ে হয়রানি ও ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে ডিজিটাল আইনে নাজেহালের মতো বহুবিধ অপরাধ এশিয়ার অন্য কিছু দেশের তুলনায় অনেক কম ছিল। এমনকি প্রায় ২৬ বছর ধরে চলমান মারাত্মক গৃহযুদ্ধ সত্ত্বেও অর্থনীতির উন্নতি অব্যাহত ছিল। মাথাপিছু জিডিপি ২০০৬ সালে ১,৪৩৬ মার্কিন ডলার থেকে ২০১৪ সালে ৩,৮১৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। 

তবে আয় বুঝে ব্যয় না করা এবং পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীপ্রীতির কুপ্রভাবে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ধস নামে। ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দেশটির বৈদেশিক ঋণ তিনগুণ বেড়ে যায়। সরকারি ঋণ জিডিপির অনুপাতে ১১৯ শতাংশে উঠে যায়। জিডিপির অনুপাতে বৈদেশিক ঋণ গিয়ে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশেরও বেশিতে। শুধুমাত্র দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে সমুদ্র ও বিমানবন্দরসহ অলাভজনক বিরাট বিরাট প্রকল্পের মধ্য দিয়ে ঋণের দায়ও বেড়ে যায়। ঋণ পরিশোধ বাবদ সরকারের রাজস্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি চলে যায়। চলতি ২০২২ সালেই দেশটির ৭ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি এড়াতে বেশি বেশি রুপি মুদ্রণ করে। ফলে মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পায়। এমনিতে ডাবল-ডিজিট মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের প্রাণ হয়ে পড়ে ওষ্ঠাগত। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল থেকে দেশটি সব বিদেশি ঋণের কিস্তি ফেরত দিতে পারবে না বলে নিজেই ঋণখেলাপি হিসেবে এক ব্যতিক্রমী ঘোষণা দেয়, যার কোনো নজির নেই এই অঞ্চলে। 

কাগজে-কলমের ফিরিস্তি দিয়ে অনেকেই দাবি করেন- শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি এক নয়। তাই বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তাদের বক্তব্য মোটাদাগে এমন  চীন, ভিয়েতনাম এবং ভারতকে ছাড়িয়ে উদীয়মান এশিয়ায় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে। কৃষি, রেমিট্যান্স এবং রফতানি (তৈরি পোশাকসহ) বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ। করোনা সঙ্কট থেকে দ্রুত গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের ১-৯ এপ্রিলে প্রবাসী আয় আগের বছরের ওই সময়ের তুলনায় ৭.৩% বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের মোট দায় জিডিপির ৩৮ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণের দায় ১৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বর্তমানে ৯০.৯৭ বিলিয়ন ডলার। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য যে ঋণ নেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতির তুলনা চলে না। বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ এখন মাত্র ২৯২ মার্কিন ডলার, কিন্তু শ্রীলঙ্কায় এটা ১,৬৫০ মার্কিন ডলার। 

এছাড়াও বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের বৃহৎ প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর নির্ভরশীল, সে কারণে এটি অনেক বেশি টেকসই। যেমন, মেট্রোরেলের যাত্রীরা সবাই বাংলাদেশী হবে। পদ্মাসেতু দিয়ে বাংলাদেশের যানবাহন চলাচল করবে। এগুলো ব্যবহার এবং এখান থেকে মুনাফা আসার জন্য বিদেশি কোনও পক্ষের উপর নির্ভরশীল নয় বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে বিষয়টি হচ্ছে তাদের বন্দরে বিদেশি জাহাজ আসতে হবে বা বড় ধরনের বিনিয়োগকৃত পর্যটন শিল্পে বিদেশি পর্যটক প্রয়োজন কিন্তু এ ধরনের কোনও প্রয়োজন বাংলাদেশি প্রকল্পগুলোর মধ্যে নেই।

নিরেট বাস্তবতা

কাগজে-কলমের এসব হিসাবে অনেকেই উৎফুল্ল, এমনকি বেশ ফুরফুরে মেজাজে। তবে, দেশের একজন অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে কেউ যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশ ঘুরে বেড়ান তিনি যা দেখতে পাবেন তা হলো সব জায়গায় এক ধরনের হাহাকার। দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতিতে নাজেহাল কোটি কোটি মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ। রাস্তাঘাটে ভিক্ষুকের ছড়াছড়ি। রাজধানী শহর ঢাকার যে কোনো প্রান্তে আপনি কোনো চায়ের স্টলের সামনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে চা খাবেন, দেখতে পাবেন এরই মধ্যে আপনার কাছে কয়েকজন ভিক্ষুক চলে আসবে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন  অনেক নারী বোরখা পরে, মুখ ঢেকে ভিক্ষা করছেন, চলন-বলন খেয়াল করলেই বোঝা যাবে তারা পেশাদার ভিক্ষুক নয়। অভাবের তাড়নায় ভিক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। 

সারাদেশে লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক শেয়ার রাইডের মাধ্যমে মোটরবাইকে যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা উপার্জন করছেন। এখন প্রায়ই শেয়ার রাইড করতে গিয়ে দেখা যায় বাইক আসার পর বাইকচালক রাইড ক্যানসেল করে কন্টাক্টে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। বলেন- “ভাই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই আয় দিয়ে পরিবার নিয়ে চলতে পারছি না।”

বাংলাদেশের তরুণ অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া বেশ খোলাখুলিভাবে বলেছেন শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে হতে পারে। তবে, কয়েক বছর সময়ের ব্যবধানে এটা হতে পারে। তার মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে যে পথে এগুচ্ছে তাতে আগামী ৫-৬ বছরের ব্যবধানে দেশটিতে শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হতে পারে। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে ‘খুবই ভয়ানক’ উল্লেখ করে বলেন, চীনের সহায়তার সম্পন্ন হওয়া বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্টগুলোর সফলতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। অনেকগুলো বড় প্রজেক্ট থেকে বাংলাদেশ বহু বছর কোনো বেনিফিট পাবেনা দাবি করে তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রামে নদীর নিচের টানেল, কক্সবাজারে রেললাইনসহ অনেক প্রজেক্টই ‘আনপ্রডাক্টিভ’ হবে। পায়রা সমুদ্রবন্দরের আর্থিক সফলতার সম্ভাবনা প্রায় ‘জিরো’ উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, এত টাকা এসব প্রজেক্টে কেন খরচ করা হয়েছে? উত্তরে তিনিই আবার বলেন, মেগা প্রকল্প সব সময়ই একটি দুর্নীতিবাজ সরকারের খুব পছন্দের। কারণ মেগা প্রকল্পে মেগা কমিশন পাওয়া যায়। এটা খুবই সিম্পল হিসাব। আজকে তারা যেই টাকা খরচ করছে এবং যেটা চুরি করছে সবই বাড়িয়ে দিচ্ছে দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ। দেশকে সেই ঋণ শোধ করতে হবে। 

আজ ব্যাংকগুলো ভেতরে ভেতরে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে বলে নানাবিধ খবর হর-হামেশা চোখে পড়ছে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। এক পিকে হালদার ভারতে আটকের পর বেরিয়ে এসেছে তিনি কিভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। আমার এক সাংবাদিক বন্ধু কয়েক দিন আগে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে জানান, সারা দেশে এমন কয়েক হাজার পিকে হালদার রয়েছে। বেশির ভাগ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও অন্যান্য রাজনীতিবিদদের পুরো পরিবার বিদেশে সেটেল্ড। সেখানে তারা বাড়ি-গাড়ি করেছেন। শুধু নিজে দেশে থেকে রাজনীতি করছেন, আর টাকা জমাচ্ছেন বিদেশে। ভেতরে ভেতরে দেশ খালি হয়ে যাচ্ছে। ক্যাসিনো সম্রাটের মতো লুটেরা দেশকে ভেতরে ভেতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। কাজেই কেতাবি ডাটা আর বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। তাছাড়া ওইসব কেতাবি ডাটা কতটা সত্য তা নিয়েও রয়েছে বিস্তর সংশয়। তাই কুতর্কে না গিয়ে সবার উচিত এখনই শ্রীলঙ্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে শোধরানো।

লেখক : সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির