সর্বশেষঃ
post

ধর্মের প্রাসঙ্গিকতা

ড. ইউসুফ আল-কারযাভী \ অনুবাদ : রাহাত বিন সায়েফ চৌধুরী

১৪ নভেম্বর ২০২২

ধর্ম মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা। মানুষের মন, আত্মা ও ব্যক্তিগতভাবে মানুষের প্রকৃতিগত চাহিদা পূরণে এবং সামাজিক নীতি-নৈতিকতা নির্ধারণে ধর্মের বিকল্প নেই। ধর্মের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে সাধারণত ধর্ম বলতে কী বুঝায় এবং বিশেষত ইসলামে ধর্ম বলতে আমরা কী বুঝি সেটা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। খুবই সংক্ষেপে এখানে আমরা ড. আবদুল্লাহ দিরাজ এর বই, ‘Religion (Al-Din) থেকে প্রাপ্ত সংজ্ঞা উল্লেখ করছি। দিরাজের প্রদত্ত সংজ্ঞা পৃথিবীর প্রায় সবগুলো ধর্মকেই সংজ্ঞায়িত করে, ‘ধর্ম হচ্ছে এমন এক বা একাধিক সত্তায় বিশ্বাস করা, যা সর্বোচ্চ এবং অদেখা, যার ইচ্ছাশক্তি ও উপলব্ধি আছে এবং যে এই পৃথিবী পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও পৃথিবীতে মানুষের সকল কাজের খবর রাখে। এই বিশ্বাস মানুষকে ভয় ও ভালোবাসা নিয়ে অতিপ্রাকৃত শক্তির আরাধনা করতে তাড়িত করে এবং মানুষের মধ্যে ভক্তি ও আরাধনার ভাব জাগিয়ে তোলে। সংক্ষেপে বলতে গেলে ধর্ম হচ্ছে ঐশ্বরিক সত্তায় বিশ্বাস, যা মানুষের মনে শ্রদ্ধা সহকারে ভক্তি ও আরাধনার (পূজা) ভাব জাগ্রত করে। 

এই সংজ্ঞায় মূলত ধর্মের মনস্তাত্তি¡ক দিককে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বাহ্যিক দিক থেকে ধর্ম হচ্ছে কিছু তাত্তি¡ক আইন-কানুনের সমষ্টি। যা অতিপ্রাকৃত সত্তার গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে এবং কিভাবে সেই সত্তার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় তার সবগুলো দিক আলোচনা করে। এই সংজ্ঞা ঐশ্বরিক, পৌত্তলিক বা প্রকৃতি পূজা, সব ধর্মকেই সংজ্ঞায়িত করে। কারণ পবিত্র কুরআনেও এগুলোকে ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন আমার জন্য। (১০৯:০৬)। এ আনুগত্য (ইসলাম) ছাড়া যে ব্যক্তি অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতে চায় তার সে পদ্ধতি কখনোই গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ব্যর্থ, আশাহত ও বঞ্চিত। (৩:৮৫)। মুসলিম বিশেষজ্ঞগণ ধর্মকে ঐশ্বরিক দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখেন, যা চিন্তাশীল মানুষকে স্বেচ্ছায় এমন সব কাজ করতেন উৎসাহিত করে যা তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণকর। 

ঐশ্বরিক ধর্মগুলোর একতা

বিশেষজ্ঞগণ ধর্মকে মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত করেন, ঐশ্বরিক ধর্ম এবং প্রাকৃতিক ধর্ম। ঐশ্বরিক ধর্ম বলতে বুঝায়, ঈশ্বর প্রদত্ত কিতাবের মাধ্যমে পাওয়া ধর্মসমূহ। আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন ও পরিচলনার জন্য বিভিন্ন আসমানি কিতাব দিয়েছেন। যেমন- ইহুদিদের জন্য মূসা (আ)-এর মাধ্যমে তাওরাত, খ্রিষ্টানদের জন্য ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে ইঞ্জিল এবং সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ সা.-এর মধ্যমে কুরআন। কুরআন হচ্ছে ইসলামের ধর্মগ্রন্থ। মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই কুরআনকে সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই অন্যান্য ঐশ্বরিক ধর্মগ্রন্থের চেয়ে ইসলাম এখানে একটু আলাদা। শুধু কুরআন নয়, এর পাশাপাশি ইসলামের অন্যতম উৎস হাদিস, সুন্নাহও সংরক্ষিত। কারণ এটাই পৃথিবীর সর্বশেষ ঐশ্বরিক ধর্ম। এ কারণেই ইসলামের মৌলিক উৎস এখনো বিকৃতির বা পরিবর্তনের অভিযোগ থেকে মুক্ত। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের উৎস আল্লাহর পক্ষ থেকে সংরক্ষণের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাই এর বেশিরভাগ উৎসসমূহ প্রায় হারিয়ে গেছে বা বিকৃত হয়ে গেছে।

প্রকৃতিবাদী ধর্ম বা মানবরচিত ধর্মগুলো হচ্ছে পার্থিব, ঐশ্বরিক নয়। এগুলোর প্রবক্তা মানুষ, আল্লাহ নন। যেমন চীন ও জাপানের বৌদ্ধ ধর্ম, ভারতের হিন্দু ধর্ম। প্রাচীন ভারতের পুরোহিত তন্ত্র এবং এশিয়া বা আফ্রিকার অন্যান্য ধর্মসমূহ। হয়তো এগুলোরও কোনো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ছিলো, যা হারিয়ে গেছে (পুরোহিত তন্ত্র), অথবা এগুলো পুরোপুরি মানুষের তৈরি (বৌদ্ধ ধর্ম)। কিছু মতবাদগত পার্থক্য বাদ দিলে ঐশ্বরিক ধর্মগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই এক। যদিও আবির্ভাবের সময়ের পার্থক্যের কারণে নিয়মনীতিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। 

তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই সব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং (হে মুহাম্মাদ) যা এখন আমি তোমার কাছে অহির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম আমি ইবরাহিম (আ), মূসা (আ) ও ঈসাকে (আ)। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দ্বীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরস্পর ভিন্ন হয়ো না। (হে মুহাম্মাদ) এই কথাটিই এসব মুশরিকের কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় যার দিকে তুমি তাদের আহবান জানাচ্ছো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আপন করে নেন এবং তিনি তাদেরকেই নিজের কাছে আসার পথ দেখান যারা তাঁর প্রতি রুজু করে। (৪২:১৩)। তারপর হে মুহাম্মদ! তোমাদের প্রতি এ কিতাব নাজিল করেছি, যা সত্য নিয়ে এসেছে এবং আল কিতাবের মধ্য থেকে তার সামনে যা কিছু বর্তমান আছে তার সত্যতা প্রমাণকারী ও তার সংরক্ষক। কাজেই তুমি আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী লোকদের বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা করো এবং যে সত্য তোমার কাছে এসেছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি শরিয়াত ও একটি কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে রেখেছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে একই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তার মধ্যে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য এমনটি করেছেন। কাজেই সৎকাজে একে অপরের চাইতে অগ্রবর্তী হবার চেষ্টা করো। শেষ পর্যন্ত তোমাদের সবাইকে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। তারপর তিনি সেই প্রকৃত সত্যটি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যে ব্যাপারে তোমরা মতবিরোধ করে আসছিলে। (৫:৪৮)। কুরআন আরও বলে যে, ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে আসমানি কিতাব ও নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন-জীবনবিধান। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তারা এ দ্বীন থেকে সরে গিয়ে যেসব বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, সেগুলো অবলম্বনের এছাড়া আর কোনো কারণই ছিল না যে, প্রকৃত জ্ঞান এসে যাওয়ার পর তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করার জন্য এমনটি করেছে। আর যে কেউ আল্লাহর হিদায়াতের আনুগত্য করতে অস্বীকার করে, তার কাছ থেকে হিসাব নিতে আল্লাহর মোটেই দেরি হয় না। (৩:১৯)। কুরআনের বর্ণনা অনুয়ায়ী প্রত্যেক নবী রাসূলই মুসলিম ছিলেন এবং তারা ইসলামেরই প্রচারক ছিলেন। 

ইব্রাহিম ইহুদি ছিল না, খ্রিস্টানও ছিল না বরং সে তো ছিল একজন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং সে কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইবরাহিমের যারা অনুসরণ করেছে তারাই তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক রাখার অধিকারী। (৩:৬৭)। ঐ একই পথে চলার জন্য সে তার সন্তানদের উপদেশ দিয়েছিল এবং এরই উপদেশ দিয়েছিল ইয়াকুবও তার সন্তানদেরকে। সে বলেছিল, আমার সন্তানেরা! আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীনটিই পছন্দ করেছেন। কাজেই আমৃত্যু তোমরা মুসলিম থেকো। (২:১৩২)। মুসা তার কওমকে বললো, হে লোকেরা! যদি তোমরা সত্যিই আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে থাকো তাহলে তার ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম-আত্মসমর্úণনকারী হও। (১০:৮৪)। যখন ঈসা অনুভব করলো, ইসরাইল কুফরি ও অস্বীকার করতে উদ্যোগী হয়েছে, সে বললো: কে হবে আল্লাহর পথে আমার সাহায্যকারী? হাওয়ারিগণ বললো: আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। সাক্ষী থাকো, আমরা মুসলিম (আল্লাহ্র সামনে আনুগত্যের শির নতকারী) (৩:৫২)

আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সা.-কে সেই ইসলাম প্রচারেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যাতে তিনি ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাগুলো আবার তুলে ধরেন এবং যুগে যুগে যে শিক্ষাগুলো বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে বিবৃত হয়েছে সেগুলো যথাযথ জায়গায় স্থাপন করেন। তাছাড়া কুরআন অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃত সত্যকে উদঘাটন করেছে এবং এগুলোর প্রকৃত শিক্ষাকে তোলে ধরেছে। কুরআন ঐশ্বরিক ধর্মগুলোর ধারাবাহিকতার পরিপূর্ণতা দিয়েছে, সমাপ্তি টেনেছে রাসূল আগমনের ধারাবাহিকতায়। কারণ, মানুষ তার প্রাথমিক স্তরসমূহ অতিক্রম করেছে এবং চিন্তা ও ভাষার পরিপক্বতা অর্জন করেছে। এই পটভ‚মিতে যদি আমরা মুহাম্মদ সা.কে কুরআন কিভাবে সম্বোধন করেছে তা দেখি।

তারপর হে মুহাম্মদ! তোমাদের প্রতি এ কিতাব নাজিল করেছি, যা সত্য নিয়ে এসেছে এবং আল কিতাবের মধ্য থেকে তার সামনে যা কিছু বর্তমান আছে তার সত্যতা প্রমাণকারী ও তার সংরক্ষক। কাজেই তুমি আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী লোকদের বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা করো এবং যে সত্য তোমার কাছে এসেছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।- তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি শরিয়াত ও একটি কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে রেখেছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে একই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তার মধ্যে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য এমনটি করেছেন। কাজেই সৎকাজে একে অপরের চাইতে অগ্রবর্তী হবার চেষ্টা করো। শেষ পর্যন্ত তোমাদের সবাইকে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। তারপর তিনি সেই প্রকৃত সত্যটি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যে ব্যাপারে তোমরা মতবিরোধ করে আসছিলে। (৫:৪৮)

ধর্মের জন্য মানুষের প্রকৃতিগত আকাক্সক্ষা

সাধারণভাবে ধর্ম হচ্ছে মানুষের একটি মানবিক চাহিদা। বিশেষত ইসলাম মানুষের মৌলিক সত্তার বিকাশে সহায়ক। ইসলাম মানুষকে তার জীবনের প্রকৃত অর্থ জানায় এবং মানবজাতির আগমনের কারণ ব্যাখ্যা করে। যা মানুষের একটি মৌলিক জিজ্ঞাসা। আমরা এখানে অতি সংক্ষেপে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা না করেই দেখানোর চেষ্টা করবো যে, ধর্ম মানুষের একটি মৌলিক এবং স্বাভাবিক চাহিদা।

মানুষ তার অস্তিত্বের কারণ জানতে আগ্রহী

মানুষের স্বভাবতই একটা জীবনদর্শন প্রয়োজন, যা তার নিজেকে জানা এবং তার চারপাশের পৃথিবীকে জানার আগ্রহ থেকে তৈরি হয়। কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ জানতে চায় যার জন্য মানুষ দর্শনের আশ্রয় নেয় কিন্তু দর্শন এর যথাযথ সমাধান দিতে ব্যর্থ। মানুষের উৎপত্তি কাল থেকে কিছু প্রশ্ন মানুষকে তাড়া করছে, কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাবো? কেনো এসেছি? 

১. মানুষ বিস্মিত হয়, কোথা থেকে এই বিশাল পৃথিবী ও আমার আবির্ভাব? আমি কি নিজে নিজে এসেছি, নাকি এর পেছনে কোনো স্রষ্টা আছেন, যিনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। তিনি কে? আমার সাথে তাঁর সম্পর্ক কী? আর এই বিশাল বিশ্ব, তার ভ‚মি, আকাশ, পশুপাখি, গাছপালা এবং পানি বা এই গ্রহ-নক্ষত্র এরা কি নিজে নিজেই তৈরি হয়েছে, নাকি এর পেছনে কোনো সার্বভৌম সত্তা আছেন?

২. এই জীবনের শেষে কী হবে? মৃত্যুর পর কী হবে? এই পৃথিবী নামক গ্রহের সফর শেষে আমরা কোথায় যাবো? ছোট্ট এই জীবনের জন্ম-মৃত্যুর বাহিরে কী কিছু নাই? যে সকল মানুষ অন্যের ভালোর জন্য জীবন উৎসর্গ করে, আর হিং¯্র ও ধূর্ত মানুষ, তারা নিজের স্বার্থে অন্যের জীবন নিয়ে নেয়। তারা সবাই কি সমান পরিণতি ভোগ করবে? মৃত্যু দিয়ে কি জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে? নাকি মৃত্যুর পর আরেকটা জীবন আছে, যেখানে ভালো মানুষেরা তাদের কাজের প্রতিদান পাবে, আর খারাপ মানুষেরা পাবে শাস্তি?

৩. কেন পৃথিবীতে মানুষকে আনা হলো? মানুষকে কেন মন ও ইচ্ছাশক্তি দেওয়া হয়েছে, যা অন্য প্রাণী থেকে তাকে আলাদা করেছে। এই পৃথিবী ও জান্নাতের সবকিছু কেন মানুষের সেবায় নিয়োজিত? তাহলে কি মানুষের এই পৃথিবীতে আসার কোনো উদ্দেশ্য আছে? তার জীবনের কোনো লক্ষ্য আছে? নাকি সে অন্যান্য পশুর মতো খেয়েদেয়ে একসময় মরে যাওয়ার জন্যই এসেছে? যদি এই জীবনের কোনো উদ্দেশ্য থাকে তাহলে সেটা কী? কিভাবে সেটা জানা যায়?

এই প্রশ্নগুলো যুগে যুগে মানুষের মনে জেগেছে এবং মানুষ এগুলোর এমন উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে যা তার বিবেক ও হৃদয়কে শান্ত করবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায় ধর্মের মাধ্যমে, ধর্মীয় বিশ্বাসের আশ্রয়ে। ধর্মই মানুষকে জানায় এই পৃথিবীতে সে হঠাৎ আসেনি বা মানুষ নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়নি, বরং একজন মহান ¯্রষ্টা তাকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি তার প্রভু। যে প্রভু তাকে তৈরি করেছেন, সুন্দর একটা কাঠামো দিয়েছেন, জীবন ধারণের যথাযথ ক্ষমতা দিয়েছেন। দেহের ভিতরে রূহ দিয়েছেন, শুনা, দেখা, বুঝা এবং চিন্তা করার সক্ষমতা দিয়েছেন। সব ধরনের আশীর্বাদ দিয়ে মায়ের পেট থেকে জন্ম দিয়ে মানুষকে তিনি ধন্য করেছেন। আমি কি তোমাদেরকে এক নগণ্য পানি থেকে সৃষ্টি করিনি। এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তা স্থাপন করেছিলাম না? তাহলে দেখো, আমি তা করতে পেরেছি। অতএব আমি অত্যন্ত নিপুণ ক্ষমতাধর। (৭৭:২০-২৩)

এই বিশাল বিশ্ব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বা দুর্ঘটনার ফল নয়। মানুষের মতোই এটা আল্লাহর এক সৃষ্টি। এ পৃথিবী তার ইচ্ছেমত বা কোনো লক্ষ্য ছাড়াই চলছে না। বরং এটা অনেক সূ²াতিসূ² হিসেব মেনে, ঐশ্বরিক নির্দেশনা অনুযায়ী চলছে। এটা মানুষের জন্য আল্লাহর একটা বড় দান। মানুষ যাতে অনেক কিছু উপভোগ করতে পারে এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহ নিয়ে ভাবতে পারে। যে সকল নিদর্শন তাকে তার রবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে (৩:১৯০)। যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং সমতা কায়েম করেছেন। যিনি তাকদির গড়েছেন তারপর পথ দেখিয়েছেন। (৮৭:২-৩) এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ তার সাথে এই মহাবিশ্বের সম্পর্ক এবং মহান স্রষ্টা আল্লাহর অস্তিত্ব সে অনুধাবন করতে পারে। ফলে সে অন্যান্য মানুষ ও সৃষ্টির সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে একটা সুন্দর সহাবস্থান তৈরি করতে পারে।

ধর্মই মানুষকে জানায় যে জীবন ও মৃত্যুর পরে কী আছে। ধর্ম জানায় মৃত্যু মানে জীবনের পরিসমাপ্তি বা ধ্বংস না, মৃত্যু ভিন্ন একটা জগতে যাওয়ার ব্যবস্থা মাত্র। যেখানে প্রত্যেক মানুষকেই জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই চিরস্থায়ী জগতে মানুষের দুনিয়ায় করা কোনো কাজই হারিয়ে যাবে না। কেউই তার পৃথিবীর ক্ষমতা ও দাপট দেখিয়ে সেখানে পার পাবে না। সেদিন লোকেরা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় ফিরে আসবে, যাতে তাদের কৃতকর্ম তাদেরকে দেখানো যায়। তারপর যে অতি অল্প পরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখে নেবে। এবং যে অতি অল্প পরিমাণ খারাপ কাজ করবে সে তা দেখে নেবে। (৯৯: ৬-৮)। যদি মানুষ এটা বিশ্বাস করে তাহলে সে তার চিন্তাকে সেই চিরস্থায়ী জীবনের দিকে নিবন্ধ করে জীবনধারণ করবে এবং তার কাছে মৃত্যু হলো, একটা জগৎ থেকে অন্য জগতে স্থানান্তর মাত্র। ধর্মই মানুষকে জানায় কেন তাকে তৈরি করা হয়েছে এবং কেনইবা তাকে অন্যান্য সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্ম মানুষকে তার জীবনের উদ্দেশ্য অনুধাবন এবং তার জীবনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের তাড়না দেয়। ধর্মই জানায় যে তাকে এমনি এমনি সৃষ্টি করা হয়নি এবং তাকে এমনি এমনি কোনো জবাবদিহিতা ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হবে না। 

মানুষকে আল্লাহর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। যাতে মানুষ আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী এই পৃথিবী কে আবাদ করে এবং সে সকল কাজ করে যা আল্লাহ পছন্দ করেন। পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত জিনিস যেন মানুষ আবিষ্কার করে এবং সে সেসব খাবার খাবে যা তার স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। একজন ব্যক্তির কোনো অধিকার নেই যে, সে আরেকজনের অধিকার হরণ করবে বা কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করবে। শুধু মাত্র আল্লাহই যা-ইচ্ছা করার অধিকার রাখেন। আল্লাহর প্রথম অধিকার হচ্ছে মানুষ কেবলমাত্র তাঁর ইবাদত করবে। মানুষ সেভাবে ইবাদত করবে যেভাবে নবী-রাসূলগণ করতে শিখিয়েছেন। যুগে যুগে নবী রাসূলগণ এসে মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন এবং ভালো কাজের ভালো ফলাফলের আশ্বাস দিয়েছেন। যারা তাদের জীবনে যথাযথভাবে আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালন করবে, যে দায়িত্ব তাকে পরীক্ষা করার জন্য ও মর্যাদা দেয়ার জন্য দেওয়া হয়েছে। তাহলে মৃত্যুর পরবতী জীবনে তারা এর পরিপূর্ণ প্রতিদান পাবে। 

সেদিন আসবে, যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের ফল সামনে উপস্থিত পাবে, তা ভালো কাজই হোক আর মন্দ কাজ। সেদিন মানুষ কামনা করবে, হায়! যদি এখনো এই দিন এর থেকে অনেক দূরে অবস্থান করতো! আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের সত্তার ভয় দেখাচ্ছেন। আর তিনি নিজের বান্দাদের গভীর শুভাকাক্সক্ষী। (৩:৩০)

এভাবেই মানুষ তার এই পৃথিবীতে আগমনের উদ্দেশ্য ও তার লক্ষ্য বুঝতে পারে। এটা একমাত্র সেই স্রষ্টার পক্ষে জানানো সম্ভব যিনি মানুষের জীবন ও এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা। যে ব্যক্তি ধর্মহীন জীবন যাপন করে, যে আল্লাহ বা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, সে আসলে বঞ্চিত ও দুর্ভাগা। সে নিজেকে একটা পশুর বাহিরে অন্য কিছু ভাবতে পারে না, সে নিজেকে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী থেকে আলাদা করতে পারে না। খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দ উপভোগ করা ছাড়া, তার সামনে কোনে উদ্দেশ্য থাকে না। তারা পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের কারণ, সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে অজ্ঞ। এই ব্যক্তি খুবই হতভাগা এবং তার জীবন খুবই তুচ্ছ ও মূল্যহীন। কারণ, তাকে জীবন দেওয়া হয়েছে কিন্তু সে জানেই না কেন তাকে এই জীবন দেওয়া হয়েছে, কার দয়ায় সে এই পৃথিবীতে এসেছে। সে বাঁচে কিন্তু সে জানে না সে কেন বেঁচে আছে। সে মরে কিন্তু জানে না মরার পর কী আছে অথবা তাকে কেন মরতে হয়। সে জন্ম, মৃত্যু, জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের মধ্যে বাস করে। এই সকল ব্যক্তি সমপর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- বরং আখেরাতের জ্ঞানই তাদের থেকে হারিয়ে গেছে। উপরন্তু তারা সে ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে রয়েছে। আসলে তারা সে ব্যাপারে অন্ধ। (২৭:৬৬)। এরকম অনিশ্চয়তা এবং জীবনের পরম সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করা খুবই কষ্টের। সম্পদের প্রাচুর্য, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, কিংবা উচ্চ সামাজিক মর্যাদা, এই কষ্ট একটুও কমাতে পারে না। ওমর খৈয়ামের মতো কবি তাঁর বিখ্যাত কাব্যে তোলে ধরেছেন যে, তিনি কী অন্তর্জ্বালা অনুভব করছেন, যখন তিনি জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। অন্যদিকে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আত্মবিশ্বাসের সাথে তাঁর প্রশান্তির কথা জানিয়েছেন, ‘আমাদেরকে এক অমর সত্তা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, আমরা শুধু এক ঘর থেকে অন্য ঘরে প্রত্যাবর্তন করি।’ প্রথমত নিজেকে জানা এবং পৃথিবীতে তার আগমনের কারণ জানার আগ্রহ থেকেই মানুষ ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। মহান রবের অনস্বীকার্য অস্তিত্ব, একত্ব এবং পূর্ণাঙ্গতা তাকে ধর্ম নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। সে জীবনের চরম সত্য বা জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে গিয়েই আল্লাহকে জানে এবং মানে। 

ধর্ম মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা

আমরা ধর্মের বৌদ্ধিক (বুদ্ধিবৃত্তিক) প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যে আলোচনা করেছি এর সংযুক্তি হিসেবে বলা যায়, মানুষ নিছক একটি কম্পিউটার বা যন্ত্র নয়। মানুষ জন্মগতভাবেই ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ধর্ম মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা। আধুনিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী মানুষ, বুদ্ধি, আত্মা, মন ও চেতনার সমষ্টি। এভাবেই তাকে সাজানো হয়েছে, এটাই তার স্বভাব। এই স্বভাবের কারণেই, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, বিলাসিতা ও ভোগ তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না, আর না পারে তার সত্তা ও বুদ্ধির তৃষ্ণা মেটাতে। এগুলো তার আত্মার প্রশান্তি দিতে পারে না, দিতে পারে না জীবনের কোনো অর্থ। 

মোহাম্মদ ফরিদ ওয়াজিদ, অগাস্ট সাইটেক ((August Sietec)) এর বই, 'The Philosophy of Religions' থেকে উদ্ধৃতি টেনেছেন, ‘আমি কেনো ধার্মিক? যখনই আমি এই প্রশ্ন উত্থাপন করি, একটি দ্ব্যর্থহীন উত্তর আমার মনে আসে। আমি ধার্মিক কারণ আমি এর বাহিরে কিছু হতে পারবো না; ধার্মিক হওয়া আমার নৈতিকতা ও স্বভাবের অংশ। তারা বলে এটা নিছক এক ঐতিহ্যের চর্চা বা ব্যক্তিগত চাহিদা ও চর্চার ফল। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি এবং বারবার একই উত্তর পাই যে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এটাকে একপাশে সরিয়ে রাখাই শ্রেয়।’ 

এটা মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয় যে ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ সবসময় সব জায়গায় ছিলো। ‘আদিম’ বা ‘আধুনিক’- যাই বলেন না কেনো- পৃথিবীর সকল মহাদেশ, প্রাচীন বা সমকালীন- সকল সমাজে, ধর্ম ছিলো, আছে। যদিও বেশিরভাগ মানুষ একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে ভুলের মধ্যে রয়েছে। গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুটার্ক লিখেছেন, ‘ইতিহাসে আমি এমন অনেক শহর পেয়েছি যেখানে দুর্গ নেই, প্রাসাদ নেই, বিদ্যালয় নেই, কিন্তু এমন কোনো শহর পাইনি, যেখানে কোনো প্রার্থনাগৃহ নেই।’ কুরআন ধর্মকে একটা বিশ্বাস হিসেবে দেখে, যা মানুষের স্বভাবজাত। 

কাজেই (হে নবী এবং নবীর অনুসারীবৃন্দ) একনিষ্ঠ হয়ে নিজের চেহারা এ দ্বীনের দিকে স্থির নিবদ্ধ করে দাও। আল্লাহ মানুষকে যে প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছেন তার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। আল্লাহর তৈরি সৃষ্টিকাঠামো পরিবর্তন করা যেতে পারে না। এটিই পুরোপুরি সঠিক ও যথার্থ দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। (৩০:৩০)

মানুষের আত্মিক শক্তি ও মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন

এখানে ধর্মের প্রয়োজনীয়তার আরও একটি দিক রয়েছে- যা মানুষের জীবন থেকেই সৃষ্টি হয়Ñ আশা এবং দুঃখ। এটা মানুষের স্বভাব যে মানুষ তার সঙ্কট এবং কষ্টের সময় এমন কাউকে চায়, যে সর্বশক্তিমান এবং চিরন্তন। সে যখন এমন কিছু বা এমন কাউকে হারায় যাকে সে ভালোবাসে, অথবা সে যদি কোনো লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় বা দুর্ভাগ্যবশত সে হেরা যায়, তখন একমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসই তাকে সাহস, শক্তি, ধৈর্য, সমবেদনা এবং সহযোগিতা ও সমর্থন জোগায়। 

আল্লাহর ক্ষমা, শাস্তি ও পুরস্কার দেওয়ার ক্ষমতা এবং আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে মানসিক শক্তি, আত্মার প্রশান্তি এবং তাকে বাঁচার আশা দেয়। তাকে আশাবাদী করে তোলে এবং পৃথিবীকে দেখত এক ব্যাপকতর ও সূ² দৃষ্টি দেয়। এই ভেবে সে সকল দুঃখ-কষ্ট মেনে নিতে পারে যে, এগুলো এই ছোট্ট জীবনের অংশ মাত্র। দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থ, সন্তান এবং পৃথিবীর সকল কিছুর মালিকানাও তাকে সেই প্রশান্তি, সান্ত¡না ও আশা দিতে পারে না, যা ধর্ম দেয়। ইসলামের দ্বিতীয় খালিফা হজরত উমর রা. বলতেন, ‘যখনই কোনো বিপদ আসে, আমি তার সাথে সাথে আল্লাহর চারটি অনুগ্রহ দেখতে পাই। প্রথমত, এটা আমার বিশ্বাসের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, দ্বিতীয়ত, এটা আমার সাধ্যের বাহিরে না, তৃতীয়ত, এর মধ্যে আমি একধরনের তৃপ্তি পাই, চতুর্থত, আল্লাহ আমাকে অবশ্যই এর প্রতিদান দিবেন।’ 

একজন অবিশ্বাসী মানুষ বিপদে পড়লে হতাশ হয়ে পড়ে এবং মানসিক যাতনায় ভোগে। সে বিভ্রান্ত হয়, এবং চারদিকে শুধু হতাশাই দেখে। তার অবস্থা গল্পের (Racayak) সেই ব্যক্তির মতো হয়, যে তার রাজাকে গোপনে হত্যা করে এবং গল্পের শেষের দিকে ধরা পড়ে। তখন তার চার হাত-পা চারটি ঘোড়ার সাথে বেঁধে, চারদিকে ছুটিয়ে দেওয়া হয়। এই ভয়ঙ্কর শারীরিক শাস্তির সাথে, একজন অবিশ্বাসী ব্যক্তির মানসিক শাস্তির তুলনা করা যায়। বরং মানসিক কষ্টটা এর চেয়েও বেশি। অবিশ্বাসীরা এক অবিচ্ছেদ্য মানসিক পীড়া এবং অসীম অশান্তির মাঝে বসবাস করে। নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদীদের মাঝে কেন বেশি মানসিক বিকার ও ভারসাম্য হারানোর ঘটনা ঘটে এর একটা উত্তর হচ্ছে এটি। যেকোনো দুর্ঘটনায় তারা খুব সহজেই ভেঙে পড়ে এবং হতাশ হয়। একথা সবারই জানা যে, এসকল লোকদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেশি দেখা যায় বা এরা শুধু মরার মতো একটা জীবন পার করে যায়। 

এখানে আমরা আর্নল্ড টয়েনবিকে উল্লেখ করছি, ‘ধর্ম মানুষের এক গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শক্তি; এটা আমরা হরহামেশাই দেখি যে, বিশ্বাসের অনুপস্থিতি একজন ব্যক্তিকে এমন এক মানসিক কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয় যা তাকে অসুস্থ করে ফেলে। অন্যদিকে, ধার্মিক ব্যক্তি তার ধর্ম থেকে যে প্রশান্তি পায় তা তাকে অন্য কেউ দিতে পারে না।’ ড. কার্ল ব্যাঙ্গ (Dr. Carl Bang) বলেন, ‘গত ত্রিশ বছর ধরে, পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে যত রোগী আমার চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের অসুস্থতার মূল কারণ হচ্ছে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ঘাটতি। তারা তখনই সুস্থতা ফিরে পেয়েছেন, যখন তারা তাদের বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছেন। নিজের মধ্যে কিছুটা দোদুল্যমানতা থাকা সত্তে¡ও উইলিয়াম জেমস্ স্বীকার করেন, ‘নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সকল দুশ্চিন্তার মহৌষধ হচ্ছে বিশ্বাস।’ 

ড. ব্রিয়াল (Dr. Brial) আমাদের এ নিশ্চয়তা দেন যে, ‘একজন সত্যিকারের ধার্মিক কখনো মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে না।’ ডেল কার্নেগি বলেন, ‘মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পেরেছেন, ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং বিশ্বাসের অবিচলতা যে কোনো দুশ্চিন্তা ও মানসিক বিকার থেকে রক্ষা করতে পারে।’ এ বক্তব্যের জোরালো সমর্থন পাওয়া যায়, ড. হেনরি (Dr. Henry) এর বই ''Back to Faith'' থেকে, যেখানে তিনি এরকম অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন যা তিনি একজন মনোরোগ চিকিৎসক হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছেন। 

সামাজিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় ধর্ম

ধর্মের চতুর্থ প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে সামাজিক। সমাজে কিছু নীতি-নৈতিকতা থাকে, যা মানুষকে সমাজের সদস্য হিসেবে পালন করে যেতে হয়। যার জন্য কোনো আইন কানুন করা যায় না, পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা থাকে না, দেওয়া হয় না কোনো শাস্তি বা পুরস্কার। সামাজিক সম্পর্কগুলো কিছু নিয়ম মেনে চলে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক তার সীমা-পরিসীমা মেনে চলেন, নিজের স্বার্থ রক্ষায় অন্যের স্বার্থে আঘাত করেন না। বিশেষ করে সাময়িক কোনো সুবিধা পাওয়ার জন্য সমাজের কোনো ক্ষতি করেন না। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শুধু আদালতের আইনকানুন দিয়ে এসব নিয়ম-নীতি রক্ষা করা সম্ভব নয়। আদালতের আইন মানুষ এরকম স্ব-প্রণোদিত হয়ে পালন করে না বা আদালতকে ফাঁকি দেওয়া খুব কঠিন কাজ না। এজন্য স্ব-প্রণোদনা এবং নৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক, যেখানে নিজের উচিত-অনুচিত বিচারের বিবেকবোধ থাকবে। এমন সক্রিয় বিবেচনা বোধ, যা নিজে নিজেই কথা বলবে এবং ব্যক্তিকে সর্বদা ভালো কাজের জন্য তাড়িত করবে। 

অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায় যে, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ভালো কাজ করা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করার তাড়না দিতে ধর্মের কোনো বিকল্প নেই। এ সময়ের একজন ইংরেজ বিচারক বলেন, ‘নৈতিকতা ছাড়া কোনো আইন নাই এবং বিশ্বাস ছাড়া কোনো নৈতিকতা নাই’। ভলতেয়ার বলেছেন, ‘যদি কোনো স্রষ্টা না থাকতেন, তবে আমাদের অবশ্যই একজন স্রষ্টা তৈরি করে নিতে হতো’। তিনি একটু মজা করেই বলেছেন, ‘আমি কেন স্রষ্টায় অবিশ্বাস করবো, যদি তিনি না থাকতেন তবে আমার স্ত্রী আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতো এবং আমার চাকর আমার কাজে ফাঁকি দিতো’। প্লুটার্ক বলেন যে, ‘ভ‚মি ছাড়া একটা শহর তৈরির চিন্তা সম্ভব হলেও, স্রষ্টার অস্তিত্ব ছাড়া একটা রাষ্ট্র পরিচালনা অসম্ভব।’ অবিশ্বাসীরাও যদি মেনে নেয় যে, ধর্ম বা স্রষ্টায় বিশ্বাস এবং আখিরাতে শাস্তির ভয় ও পুরস্কারের আশা ছাড়া জীবনে কোনো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা অসম্ভব, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। 

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

লেখক : আন্তর্জাতিক ইসলামিক স্কলার্স

অনুবাদক : শিক্ষার্থী, শাবিপ্রবি

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির