সর্বশেষঃ
post

নজরুল সৃষ্টির প্রহেলিকা

অনুবাদ : খুরশীদ আলম বাবু

২৫ জুলাই ২০২২

কাজী নজরুল ইসলাম সারা জীবনে কতগুলো গান সৃজন করেছেন? কতগুলো গানে সুর সংযোজন করেছেন? এই রকম প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রায় চার হাজারের মতো। এই চার হাজারের মধ্যে এখন অবধি প্র্রায় দুই হাজার গান সংগ্রহ করা হয়েছে। আর অবশিষ্টরা হয়তো ধূসর পত্রিকার পাতায় অথবা অন্যান্য প্রকাশনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। আর কিছু গান গ্রামোফোনের রেকর্ডে সংকলিত ছাড়া তাদের অস্তিত্ব কোনোখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি কাজী নজরুল ইসলামের গানের এই আনুমানিক সংখ্যা এই কারণে উল্লেখ করলাম যাতে করে তাঁর প্রতিভার অসামান্যতার দিকটি বিবেচনা করা যেতে পারে। যে সমস্ত গান এখনো রেডিও টেলিভিশনে বাজানো হয় তার অধিকাংশেই চটুল সুর সংযোজন করা হয়েছে, মূল রচনা ও সুর ভালো করে সংযোজন করা হয়নি বলেই মনে হতে পারে গানগুলো সাহিত্যিক গুণে গুণান্বিত নয়। কিন্তু ভালো সুরকারের হাতে পড়লে অন্য গানের চেয়ে জমকালো গানে রূপান্তরিত হতে পারে।

এই কারণে বলছিলাম যে, গানের ব্যাকরণের উপর দক্ষতা ব্যতিরেকে কাজী নজরুলের সমগ্র সাহিত্যের উপর সর্বশেষ মূল্যায়ন করাটা খুব কঠিন। আমি প্রায় দু’বছর আগে এক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী লতা মুঙ্গেশকারের উদ্ধৃতি তুলে ধরে এই কথাই বলেছিলাম। লতা মুঙ্গেশকার বলেছিলেন, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানে সুর সংযোজনের ক্ষেত্রে যে ব্যাকরণগত দক্ষতা দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো অংশে তার তুলনীয় নন। আর এই জন্যই যে কোনো নিরপেক্ষ সমালোচকের কাছে সম্ভবত প্রশ্ন উঠতে পারে যে, কাজী নজরুল ইসলামকে কেবলমাত্র লেখক হিসেবে বিচার করাটা কি যুক্তিসঙ্গত হবে? নাকি এমনভাবে মূল্যায়ন করা হবে যেখানে সুরকার হিসেবে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিবেচনায় আনা যাবে না? কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা গান ছাড়া সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন, সেগুলোকে বিচারের আওতায় না আনলে মূল্যায়ন সত্যিকারভাবে ঠিক হবে না। নজরুল ইসলাম অনেক ধরনের কবিতা রচনা করেছেন, উপন্যাসও সৃজন করেছেন, লিখেছেন ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, এমনকি সমকালীন ঘটনাবলি নিয়ে সাংবাদিকতাধর্মী নিবন্ধও রয়েছে। এই সমস্ত সব্যসাচী রচনার মাধ্যমেই তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার বৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। এইগুলোর কোনোটাকেই চূড়ান্ত বলে বিশ্লেষণ করা যাবে না। কেবলমাত্র তার উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পের উপরে কিংবা নিদেনপক্ষে কবিতার উপর আলোচনা করে তার প্রতিভার বৈচিত্র্যময়তার কোনো সম্যক ধারণা লাভ করা কঠিন। কারণ এগুলো এককভাবে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনা নয়, যদিও তার কয়েকটি কবিতা এমনই অতুলনীয় যার সমকক্ষতা নেই বললেই চলে। এমনকি তার গল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে, কারণ সেগুলো কোনোক্রমেই শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় পড়ে না। তবুও এগুলোকে একত্রে মিলিয়ে পাঠকের সামনে একজন অসামান্য প্রতিভাবান লেখক হিসাবে কাজী নজরুল ইসলামকে দাঁড় করানো যায়। 

কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিকতাধর্মী রচনাগুলো কোনোক্রমেই তার চরিত্র বিরোধী নয়। তার সম্পাদকীয় কিংবা সাংবাদিকতাধর্মী অন্য যে কোনো প্রবন্ধ যা তার সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলো আমার কাছে তার চরিত্রের অসীম সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়েছে। কারণ এই ধরনের সাহসিকতাপূর্ণ নিবন্ধ তার অধীনস্থ কর্মচারীদের কাছে আশা করা যেত না। এই নিবন্ধসমূহ সৃজিত হয়েছিল সেই চল্লিশ দশকে, যখন কলকাতায় মুসলিম লীগের আন্দোলন ছিলো খুবই শক্তিশালী। আর কাজী নজরুল ইসলাম ফজলুল হকসহ অন্যান্য যে নেতাদের পক্ষে কাজ করেছিলেন তারা সবাই মুসলিম লীগের ঊর্ধ্বতন নেতাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এই কারণে আমরা দুঃখের সাথে বলতে পারি যে, নজরুলকে এমন এক জায়গায় রাখা হয়েছিল যারা মূলত মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করছিল। প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে, মুসলমানদের স্বার্থে বিজয় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দীন ও আকরম খাঁদের মধ্যে বিভক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিলো মানবতাবাদী বিপ্লবধর্মী, আর নজরুল ইসলাম যাদের কাছ থেকে সহযোগিতা লাভ করেছিলেন তাদেরকে ফজলুল হক বেশ কিছুকাল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবু কাজী নজরুল ইসলাম এইসব নিবন্ধ স্বভাবসিদ্ধভাবেই লিখেছিলেন। তবে কাজী নজরুল ইসলামকে এর জন্য দোষারোপ করা যায় না, কারণ এই ধরনের অনেক ব্যক্তি সেই সময় মুসলিম লীগের শিবিরেও ছিলো। 

আমি এর দ্বারা যা বলার চেষ্টা করছি সেটা হলো এই যে, সাংবাদিকতাধর্মী রচনা নজরুলের দৃঢ়চিত্ত বহুবিচিত্র ব্যক্তিত্বের একটি দিক মাত্র, কেননা রাজনৈতিকভাবে কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু রাজনীতিবিদদের দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন। তার অধিকাংশ সহযোগী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন, এমনকি তিনি হিন্দু মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন। সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সেই আমলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা সুভাস বসুর সঙ্গে। এমনকি যে গ্রামোফোন কোম্পানির কাছ থেকে গান রচনার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তিনিও ছিলেন হিন্দু। সেই কারণেই নজরুল ইসলাম তার সমকালীনে ইসলামে বিশ্বাসী হয়েও তার অনিশ্চয়তাময় অবস্থান অতিক্রম করতে পারেননি। বিশ্বব্যাপী মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য তার সম্ভাবনাময় ভ্রাতৃত্ববোধের কোনো কমতি ছিল না, যদিও তার প্রতিপক্ষরা কংগ্রেসী মন্ত্রীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের দাবি করে যাচ্ছিলো। কাজী নজরুল ইসলামের কাছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে বড় নেতা হিসেবে অভিনন্দন জানানোটা কঠিন কাজ ছিলো না। আসলে কলকাতার স্থানীয় রাজনীতি নজরুল ইসলামকে নাজিমুদ্দিন ও আকরাম খাঁ থেকে পৃথক করে দিয়েছিল। কিন্তু এতগুলো বছর পরে কেবলমাত্র রাজনৈতিক মতামতের ওপর ভিত্তি করে নজরুলকে বিচার করা সঠিক হবে না। তাকে অবশ্যই আমাদের শিল্পী এবং লেখক হিসেবে বিচার করতে হবে। এখন আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো তাঁর সৃষ্টিশীলতার অনেকগুলো দিক এড়িয়ে তার রচনাবলির কোনো প্রশংসনীয় দিক এড়িয়ে, কবি হিসেবে তার খ্যাতি মূলত দু’টি বিষয়বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। প্রথমত ইসলামের ইতিহাসের বিনির্মাণ, দ্বিতীয়ত উর্দু, পারসিয়ান, আরবির সমন্বয়ে নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ, যা বাংলা কাব্যসাহিত্যে পূর্বে ছিলো না। বিদ্রোহী কবি হিসেবে তার এই কাব্যভাষা সৃজনের দক্ষতায় তার সমতুল্য আর কেউ নেই। আমি মনে করি হজরত মুহাম্মদ সা.-এর জন্মদিনের উপরে তার কবিতা ‘আবির্ভাব’ এবং ওফাত দিবসের উপরে রচিত ‘তিরোভাব’-এ দু’টি কবিতায় তার বর্ণনাভঙ্গি, মানোভঙ্গি, এবং সাঙ্গিতিক রীতির এমন অপূর্ব আবেদন সৃষ্টি হয়েছে যা সত্যিকারভাবে নিঃশ্বাসবিহীন অবস্থার মধ্যে আমাদের পতিত করে। নজরুল ইসলামের আর একটি প্রধান কবিতা ‘কামাল পাশা’ সম্বন্ধেও একই ব্যাখ্যা খাটে। কিন্তু কবির অতিকথন আছে, যা পাঠকের বিরক্তি সৃষ্টি করে থাকে। ‘মোহরম’ কবিতার প্রথম ২০টি পঙক্তি সত্যিকার অর্থে অপূর্ব, কবি এই কবিতাতেও বাগাড়ম্বরতার কাছে। আত্মসমর্পণ করেছেন। কিন্তু কবিতা আসলে শুধু শব্দ নয়, শব্দের অধিক কিছু বটে, যদি সেটা নাই হতো তাহলে সুইনবার্ন, শেকসপিয়ার ও মিলটনের চেয়ে বড় কবি বনে যেতেন। তার কাছে শব্দ আসতো একেবারে জলপ্রপাতের মত, যাতে করে পাঠকেরা এক ধরনের উন্মাদনায় ভুগতো, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে এই উন্মাতাল সৃষ্টির ক্ষমতা ছিলো। আবার কিছু সেরা কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই অতিবিস্তারী মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি, যেখানে কবি তার বহুল আলোচিত জাঁকজমকপূর্ণ কাব্যভাষা অথবা পুনরাবৃত্তির কোনো উপাদান না দিয়েই সাদামাটা ভাষায় দারিদ্র্যের জীবনযন্ত্রণা তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন। সেই সঙ্গে তুলে ধরেছেন একজন দরিদ্র মানুষের আত্মার যন্ত্রণাকে যাতে করে একজন দরিদ্র মানুষ সচেতনভাবে পৃথিবীতে তার প্রতিবন্ধকতা থাকলেও গর্ববোধ করে থাকে। ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি সৃজিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী চৌদ্দ মাত্রায়, একেবারে আট-ছয় মাত্রার যে রীতিটি বাংলা সাহিত্যের আরেকজন অবিস্মরণীয় প্রতিভাবান কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে প্রবর্তন করেছেন। নজরুল ইসলাম খুব কমই এই রীতিটি তার কোনো কোনো কবিতায় ব্যবহার করেছেন। কবিতাটির বিষয়বস্তু ও কাব্যভাষা, উপমা ও কল্পনাময়তা সত্যিকার অর্থে অবিস্মরণীয়। এই একমাত্র কল্পনাময়তা দিয়েই ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম’, ‘কামাল পাশা’, ‘মোহররম’ ও ‘শাতিল আরব’ এর মতো কবিতাগুলো সত্যিকার ভাবে কবিতা হয়ে উঠেছে। এই কবিতাসমূহ অধিকাংশই প্রচলিত ছন্দে সৃজিত হলেও প্রত্যেকটি কবিতা কবির অসামান্য কাব্যময় ভাষার কারণে নতুন মাত্রায় রূপায়িত হয়েছে। ‘মোহররম’ কবিতার দুটি লাইনে যেভাবে পৃথিবীর অন্ধকার ও রক্তাক্ত পরিবেশ বোঝানোর জন্য শব্দের ব্যবহার করেছেন তা এক কথায় অবিস্মরণীয়। অন্ধকার দুনিয়াকে লালের বিপরীতে ব্যবহার করার মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র আমাদের মানসপটে ভেসে আসে। আবার মা ফাতেমার প্রিয় সন্তানকে লাল শব্দের ব্যবহারে বিশিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন।

এই ‘মোহররম’ কবিতার বেশ কয়েকটি পঙক্তিমালায় নজরুল দক্ষতার পরিচয় দিলেও মোটের উপর কবিতাটিতে নজরুলের দুর্বলতাও ফুটে উঠেছে। নজরুলের পুনরাবৃত্তির প্রবণতার যেন কোনো শেষ নেই, অথচ এই কথাগুলো নজরুল অনেক আগেই তার একই কবিতায় বলে গেছেন। এই একই দুর্বলতা তার বিখ্যাত কবিতা ‘কামাল পাশা’কে সাফল্য থেকে বিচ্যুত করেছে। এই কবিতায় মোটের উপর প্রথম বিশটি পঙক্তির পর আসলে কবির বলার কিছু ছিলো। কিন্তু তিনি একই বিষয়ের উপর ক্রমাগত ধ্বনির পরিবর্তন করছেন যতক্ষণ পর্যন্ত পাঠকরা পুনরাবৃত্তির বিষয়ে ধাতস্থ না হচ্ছেন, ধাতস্থ হলেই আবার শুরু করছেন। 

নজরুলের বেশ কিছু সেরা কবিতায় এই কারণে গীতিময়তা এসেছে যে, কবিতাগুলোকে গান করে গাওয়া যায়। এই ধরনের গীতিকবিতার প্রকৃতিই হলো ছোট ও সংহত ধাঁচের হওয়া। এক্ষেত্রে আমি তার ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ গীতিকবিতার উল্লেখ করবো। এই গীতি কবিতাটিতে এমন কিছু আধ্যাত্মিকতা কিংবা রহস্যময়তা আছে যার ব্যাখ্যা করা যাবে না : এর প্রথম পঙক্তিমালা এতোটাই মনোমুগ্ধকর যখন আমি পড়ি তখনই আমার ইংরেজ নাট্যকার ও কবি Shakespeare-এর একটি নাটকের দু’টি লাইন মনে করিয়ে দেয়-

Full fathom five thy father lies

Those are pearls that were his eyes,

Shakespeare-এর লাইনগুলো যে কেউ ধরে নিতে পারবেন। কারণ এগুলো Tempest থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। আসলে এই শব্দগুলি এমন কিছু না কিন্তু গানের সময়ে এই শব্দগুলো এমন মূর্তরূপ ধারণ করে থাকে যে তার বর্ণনা করাটা খুব কঠিন। ঠিক সেই রকমভাবে বুলবুলির প্রতি নজরুলের যে আবেদন তা শব্দগত দিক থেকে মূল্যহীন কোনো যুক্তিগত ব্যাখ্যায় না আসা গেলেও সঙ্গীত শ্রোতার হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে বারবার স্পর্শ করে, সেই অনির্বচনীয় অনুরণন বারবার আমাদের আহ্বান জানায় কবির বেদনার সাথে শরিক হতে। 

আমি কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি মাত্র গীতিকবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলাম। অন্যান্য গীতিকবিতার পঙক্তিমালার মধ্যেও একই ধরনের অবিস্মরণীয় চিত্রকল্পময় ভাষার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। মোদ্দা কথা, নজরুলের সৃজনশীলতার বৈশিষ্ট্যাবলি আমাদের সামনে যে সমান্তরাল প্রকৃতি খাড়া করে দেয় তাহলো তিনি চান পৃথিবী থেকে যাবতীয় অন্যায়-অবিচার অপসারিত হোক। তার প্রথম জনপ্রিয় কবিতা ‘বিদ্রোহী’ থেকে আরম্ভ করে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সমস্ত লেখায় তিনি অন্যায়কারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মহানায়ক। এই একটি কবিতাতেই লক্ষ্য করার বিষয়, তুলনামূলকভাবে সাদৃশ্যময় চিত্রকল্প, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা এমনভাবে জেঁকে বসেছে যার ফলে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতে এনে দিয়েছে ঘনসংবদ্ধতা। আসলে ‘বিদ্রোহী’ হলো শক্তির সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ যার শক্তিময়তায় আমাদের চমকে যেতে হয়, যার পরিসীমা সব সময় বেড়ে যায়, আর সব মিলিয়ে এমন এক অভিব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয় যার ভেতর দেশে এলোমেলোমির কোন চিহ্ন থাকে না। আর কাজী নজরুল ইসলামের এই একটি কবিতা যেখানে চিত্রকল্পের কোনো পুনরাবৃত্তি নেই, আপনি যদি শক্তিমান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বাণী প্রচার করার জন্য কবিতার বিষয়বস্তুতে চিত্রকল্পনাগুলোর ব্যবহার অনুমোদন করেন তাহলে দেখবেন সেখানে বৈশাখী ঝরে তীব্রতার পাশাপাশি আছে কিশোরী তন্বী তটিনীর জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যে বাণী এসেছে সেটি আসলে কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিন্তাধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। মুক্তছন্দের এই কবিতাটি যার পঙক্তিমালায় আয়তবান দুটি সিলেবল অথবা বর্ধিত হতে পারে ষোল থেকে আঠার মাত্রায়। যেখানে এই মাত্রাটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেখানেই পাঠকের কাছে চকিত চিন্তার সামগ্রী নিয়ে ইংরেজ কবি Shelly-র To A Skylark এর মত উপস্থিত হয়। কোনো কোনো জায়গায় ছন্দ পরিত্যক্ত বলে মনে হলেও কিন্তু এটাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন সেটাই কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, নজরুল ইসলাম তার যে কবিতাবলির মাধ্যমে জনগণের মাঝে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সেই সমস্ত কবিতাবলি কবিজীবনের সূচনাতেই লিখে ফেলেছিলেন-

এরপর তিনি এমন কিছু সৃজন করতে সক্ষম হননি যেগুলো তার চিন্তা-চেতনার ও মানসিক পরিপক্বতার নিদর্শন বলে গণ্য করা যাবে। আমি আগেই উল্লেখ করেছি বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা তার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল। নজরুল ইসলামকে যে কেউ দার্শনিক কবি বলতে দ্বিধা করবেন। দান্তে ও মিল্টনের রচনাবলি থেকে তাদের বিশ্বাস ও মতাদর্শ যেভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকে ঠিক সেইভাবে নজরুলের চিন্তাধারার উপর গুরুত্বারোপ করা দরকার। কারণ মিলটন ও দান্তে দুজনেই প্রাথমিক জীবনে খ্রিস্টিয়ান মতাদর্শে পরিচালিত হয়েছিলেন। দান্তের রচনাবলির ভিত্তি হলো ক্যাথলিক দর্শন ও মিলটনের রচনার মানসিক ভিত্তি হলো প্রটেস্ট্যান্ট নীতিমালা। কিন্তু একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি যদি তাদের কবিতার উপর সচেতনভাবে জোর দেন তাহলে দেখা যাবে বুদ্ধিময়তা তাদের কবিতাবলিকে গ্রাস করেছে। 

নজরুল ইসলামের অঙ্গীকার ছিল ন্যায়বিচার, সাম্য ও স্বাধীনতার চিন্তাধারার উপরে যার সঙ্গে বিশ্বাসের আবেগী সম্পর্ক ছিলো, যার অন্যতম ছিলো সুন্দরভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা। তিনি একজন পরিপূর্ণ কবি, তিনি কোনো দার্শনিক ছিলেন না, তিনি তাঁর চিন্তাধারাকে বাস্তবায়ন করার জন্য সতর্কতার সাথে কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর একমাত্র প্রতিপক্ষ হতে পারে পাশ্চাত্যের ইংরেজ কবি শেলী। যদিও এই তুলনামূলক আলোচনার অনেকে বিরোধিতা করেছেন। তবে যেভাবেই হোক না কেন একজন কবির কবিতার বিচার হবে তার পঙক্তিমালার গুণগত বিচারের উপর, দার্শনিকসুলভ ধ্যান-ধারণার উপর নয়, যা নজরুল ইসলাম তার কবিতায় ব্যবহার করেছেন। 

তিনি সেই সংখ্যাগুরু কবিদের থেকে ভিন্ন যারা সময় থেকে সময়ান্তরে কোনো কারণ ছাড়াই আজগুবি বিষয়ের উপর সৌন্দর্যের নামে জয়গান গেয়েছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনাবলির যে বৈশিষ্ট্য তার উপর ভিত্তি করে কয়েকটি মন্তব্য করা যায়। তিনি অধিকাংশ বাঙালি কবির মত মরমী কবি নন, যে সমস্ত কবি এমন আজগুবি বিশ্বাস ও চিন্তাধারার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে যার ফলে তাদের চিন্তাবিদ বলে দাবি করা হয়। কিছু গুরুগম্ভীর সমালোচক ইতস্তত বিক্ষিপ্ত উদাহরণ তুলে ধরে মরমী কবি বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করে থাকেন। 

কবি কাজী নজরুল নিশ্চিতভাবে একজন মরমী কবি নন, তিনি মরমিয়াবাদে ঝুঁকে পড়েছিলেন সাহিত্যিক জীবনের শেষ দিকে, যখন তার শরীর ও মন সব কিছু বিকল হয়ে পড়েছিল। আসলে সেই সময়টাতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লেখা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে শেষ বার ১৯৪২ সালে এক অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম তিনি তখন সম্পূর্ণ মরমিয়াবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশে এক বক্তৃতায় তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁজালো সমালোচনা করছিলেন যারা বক্তৃতায় বাধা সৃষ্টি করেছিল। তিনি সেই সুন্দরের কথা বলেছিলেন যার অঙ্গুলি হেলনে সমগ্র বিশ্ব পরিচালিত হয়। সেইসময় তিনি মরমিয়াবাদে এতই আত্মমগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, জাগতিক কোন বিষয়ে অনুপ্রেরণা পাচ্ছিলেন না। এই ঘটনার এক মাসের মধ্যে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। আমি কবি নজরুলের এই মরমিয়াবাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এটা প্রমাণ করতে চাচ্ছি না যে, এই মরমিয়াবাদ তার সৃজনশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। তিনি জীবনের ভালো দিকসমূহকে ভালোবাসতেন, ভালো খাদ্য, গান ও নারীদের প্রতি ছিলো অফুরন্ত ভালোবাসা। তিনি রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং শত্রুদের সাথে লড়াইটা উপভোগ করেছেন। আর যারাই তার সংস্পর্শে এসেছিলেন তারাই তাকে বিশাল হৃদ্যতাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অসামান্য ব্যক্তিত্ববোধ দিয়েই অজ¯্র লোকের প্রশংসা উপার্জন করেছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল মরমিয়াবাদের প্রতি আসক্তি কিংবা দরবেশ হওয়ার মাধ্যমে নয়, যে দরবেশ জীবনের জটিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নির্জনতার আশ্রয় খোঁজে- তিনি সেই রকম কোনোটাই ছিলেন না। তিনি একজন বুদ্ধিজীবীর মত মিছামিছি ভান করে জনগণের সঙ্গে মেলামেশার বিরোধী ছিলেন। তার সৃজনশীলতার বিচার-বিশ্লেষণে জীবনকে বাদ দেওয়া যাবে না। সময় যত গড়িয়েছে আমরা আবার তার এই জীবনের ঘটনাবলি থেকে সরে এসেছি। তার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তাঁর বক্তব্য থেকে জাগ্রত হয়েছে, আর এতে করে নজরুল ইসলামকে মূল্যায়ন করা ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। তার কবিতার বিরাট সমসাময়িকতা ক্ষণস্থায়ী জীবনীশক্তি এনে দিলেও সেটা সময়ের বিবর্তনে ধুয়ে মুছে যাবে না। তার কবিতার শক্তিময়তা কেউ যদি বুঝতে চায় তাহলে তাকে ষাট-সত্তর বছর আগে চলে যেতে হবে। আর সহানুভূতিশীল হতে হলে তাদের প্রতি যাদের জন্য তিনি চোখের জল ঝরিয়েছেন। কিন্তু তার সেরা কবিতার পঙক্তিমালা, এমনকি যে পঙক্তিমালার আয়ু ক্ষণস্থায়ী হয়েছে সেগুলোর। পুনরুজ্জীবন ঘটেছে ভাষার মাধুর্যময়তা, চিত্রকল্পের অসামান্যতার কারণে। সেই কারণে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তার অধিকাংশ ভালো কবিতাই হচ্ছে গীতিকবিতা, যা গানের মধ্যে সংস্থাপিত হয়েছে। কবি নজরুলের এই দুর্বলতার কারণ কি তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার তা অভাব? নাকি দরিদ্রতা? যে দারিদ্র্য তাকে বাধ্য করেছিল পত্রিকা অথবা ম্যাগাজিনের কিংবা গ্রামোফোন কোম্পানির মালিকের ফরমায়েশ অনুযায়ী কবিতা ও গানের বক্তব্য নির্ধারণ করতে? আমার মনে হয় এই অভিযোগের মধ্যে বহুলাংশে সত্যতা রয়েছে। তা না হলে কেন তিনি সেই দেব-দেবীর নামে গান সৃজন করলেন যার উপাসনা তিনি করতেন না। অবশ্য এই অভিযোগগুলো একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তার সমগ্র রচনাবলির দিকে আলোকপাত করে আমি আবার বলবো এটা কোনোভাবেই দুর্ঘটনা নয়! 

আরেকটা জিনিস আমাদের মনে রাখতে হবে নজরুল ইসলাম কোনোভাবেই একজন গ্রাম্য অশিক্ষিত লোক ছিলেন না। তিনি তাঁর পরিবেশ থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি স্বচেষ্টায় উর্দু, ফারসি ও আরবি এমনকি ইংলিশ ভাষাও আয়ত্তে এনেছিলেন। তিনি হাফিজ ও ওমর খৈয়াম অনুবাদ করেছেন, এমনকি ইকবালের ‘শিকোয়া ও জবাবে শিকোয়া’ও বাদ যায়নি। তিনি তার সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্যের উপর একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, সেই প্রবন্ধে তার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। আমি কয়েক বছর আগে ইংরেজিতে এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করতে গিয়ে  আশ্চর্য হয়ে যাই, ইউরোপীয় সাহিত্যের উপর, তার গল্প, উপন্যাস এবং নাটকের উপর তার পড়াশোনার পরিধি দেখে, কারণ এই সমস্ত লেখকের গল্প উপন্যাসের অনুবাদ তখনও বাংলাতে হয়নি। তিনি তুর্গেনিভ, টলস্টয়, ন্যুট হামসুন ও বার্নার্ড শ সম্পর্কে সাহিত্যিক মন্তব্য করেছেন তাদের মূল বই পড়ে। তিনি এই লেখকদের সাহিত্যকে তীক্ষè সমালোচক সত্তা দিয়ে দুটি ধারায় বিভক্ত করেছিলেন। একটি হলো রোমান্টিক ধারা ও আরেকটি হলো মননশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা। এই তুলনাটা যদি কারো অপছন্দ হয়, তাহলে আমি বলবো নজরুল ইসলাম তার সমকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী লেখকদের তুলনায় অনেক বেশি জ্ঞানী ছিলেন। নজরুল এই অভাবটা দূর করেছিলেন তার প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রতিভার মাধ্যমেই নয় শুধু, প্রচলিত শিক্ষাও তাকে কিছুটা সাহায্য করেছিল। তিনি যদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নিজেকে নিয়োজিত না রেখে একটি মাত্র বিষয়ে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করতেন তাহলে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতো না। নজরুলের এই ধরনের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তা হিতে বিপরীত হয়েছিল। সাহিত্যের বিভিন্ন দিকে যাওয়ার প্রবণতা যদি আটকানো যেতো তাহলে নজরুল কোনো একটি বিষয়ে তার সৃষ্টিশীলতার চরম উৎকর্ষ দেখাতে পারতেন। অপরদিকে এটাও সত্য যে সাহিত্যের বিভিন্ন দিকে যাওয়ার কারণে তাঁর প্রতিভার সামগ্রিক দিক কার্যকরী হবার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে। তাঁকে কেবলমাত্র একটি বিষয়ে আটকে রাখা যেত না। তাঁর সমকালীনে তাঁর মত অনেক বিশিষ্ট লেখক ছিলেন। নজরুলের সমকালীনে পাঠকেরা প্রত্যাশা করতেন একজন লেখক গল্প উপন্যাস কবিতা এমকি প্রবন্ধ রচনাতেও সক্ষম হবেন। নজরুলের মত সব্যসাচী লেখককে বাধা দেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। মনে রাখা দরকার যে, নজরুল ইসলাম তার সমকালীনে একজন শ্রেষ্ঠ লেখকই ছিলেন না, তিনি একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিও ছিলেন। তাঁর কিছু গীতিকবিতা ও দীর্ঘ কবিতার কিছু অংশ সাফল্যের চরম শীর্ষচূড়া স্পর্শ করেছে যা অন্য কোনো কবি এখন পর্যন্ত্র উপার্জন করতে সক্ষম হননি। সত্যি বলতে কি কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার প্রাণহীন রিক্ত কবিতার প্রসঙ্গে নতুন সুবাতাস এনেছিলেন। সকল নিন্দা সমালোচনাকে এড়িয়ে এই সমস্ত কবিতা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড বৈশাখী ঝড়ের মত উত্তাপ বয়ে আনবে। যারা তাকে হাঙ্গরের সাথে তুলনা করেছেন তারাও ভুল করেননি, তেমনভাবে যারা তাকে বেহিসেবী বিদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করেছেন তারাও সঠিক। কিন্তু তাকে এইভাবে অতিরঞ্জিতভাবে চিত্রিত করার কারণে পাশাপাশি তার কতগুলো গুণ আমাদের নজর এড়িয়ে যায়, যেমন তিনি ছিলেন একজন প্রকৃতিপ্রেমিক আর সহানুভূতিশীল ছিলেন সেই সমস্ত মানব সম্প্রদায়ের প্রতি যাদের অত্যাচারীর হাতে নিপীড়িত ও অন্যায়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। 

পরিশিষ্ট: 

১. কবি কাজী নজরুল ইসলাম গীতিকার না বড় কবি সেই প্রশ্নের মীমাংসা করতে সমালোচকরা সব সময়েই ব্যর্থ হয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু তাকে কবি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েও গানের জগতে ‘অক্ষয় ¯্রষ্টা’ বলে চিহ্নিত করেছেন। মুসলমানদের মধ্যে কবি গোলাম মোস্তফা বোধ করি সর্বপ্রথম এই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে তিনিও বিতর্কিত হয়ে যান। আজকাল কবি হিসেবে নজরুলকে মূল্যায়নের পরিবর্তে গান নিয়েই মাতামাতি লক্ষ্য করি। যার ফলে নজরুল-এর কবিতা ও গদ্য পাঠে তরুণ সাহিত্যকর্মীরা উৎসাহ বোধ করছেন না। ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন শুধু নয়, কবি বুদ্ধদেব বসুও বাংলা গানের জগতে নজরুলের স্থান বিশিষ্ট বলে মন্তব্য করতে দ্বিধা করেননি। তার মতামত যেন অনেকটা এই প্রবন্ধের প্রথম দিককার মন্তব্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বুদ্ধদেব বসু যখন বলেন- Nazrul introduced such new eiements of the older forms to effect a change in the direction of Bengal music as a whole. His best songs are his best poems and when considered in conjunction with his music stronger claim on posterity’s attention. সেই দিক থেকে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন নজরুল ইসলামের গানের উপর গুরুত্বারোপ করে বলে দিয়েছেন তথাকথিত পদ্ধতিতে নজরুলের সমালোচনা এখন নজরুল চর্চার জন্য বিপজ্জনক। 

২. নজরুল ইসলামের মরমী চিন্তাধারার বিষয়টা নাকচ করে দিয়েছেন ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন। কিন্তু কবি ও সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ মনে করেন নজরুল ইসলামের মরমিয়াবাদের দ্বারা প্রভাবিত কাব্যগ্রন্থ ‘নতুন চাঁদ’। তবে নজরুলের এই প্রবণতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে-তিনি জীবনের শেষ দিকে মরমিয়াবাদের উপর ঝুঁকে পড়েছিলেন। তবে লেখায় সেটা ধরা পড়েনি, কারণ এই ঘটনার পরপরই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান। বেঁচে থাকলে তার প্রভাব অবশ্যই পড়তো, কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। 

৩. কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর কবিতার উপর এমন চমৎকার অথচ নিরপেক্ষ আলোচনা খুব কমই আছে। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন নজরুল ইসলামের অন্যতম সফল কবিতা ‘বিদ্রোহী’র খুব ভক্ত ছিলেন বলে মনে হয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অসামান্য অনুবাদও করেছিলেন তিনি। অথচ কাজী আব্দুল ওদুদ ও মুস্তফা নূরউল ইসলাম এই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে অস্বাভাবিক দীর্ঘ বলে অভিহিত করেছেন। 

৪. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন বিশ্বসাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলের প্রতি তার বিচার করতে চেয়েছেন বটে কিন্তু তিনি কেন যেন নজরুলের দ্রোহমূলক কবিতার উপর খুব বেশি জোর দেননি। করলে ভালো করতেন। কারণ সামগ্রিকভাবে নজরুল বাংলা কবিতায় নতুন সুবাতাস আনার কথা বললেও সমসাময়িক দু-একজন কবির কবিতা থেকে উদাহরণ দিলে ভালো হতো। আজ মনে হয়, কবি নজরুল ইসলামের উত্থান না ঘটলে চল্লিশের বিশাল সমাজতান্ত্রিক কবি গোষ্ঠীর জাগরণের সম্ভাবনা কম ছিলো। যদিও বামপন্থীরা সেটা স্বীকার করতে আগ্রহী নন। কারণ নজরুল কখনো তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক কবি নন। নজরুল শুধুমাত্র ইসলামী কবিও ছিলেন না। ইসলামী কবিতা লেখা নজরুলের সৃজনশীলতার একটি বাঁকও বটে। 

কবি কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক মতাদর্শ কেবলমাত্র কৃষক প্রজা পার্টির একজন কর্মী কিংবা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ গুপ্তের স্বরাজ পার্টির সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। আসলে বাঙালি মুসলমানের স্বার্থ রক্ষাকারী হিসেবে যাকে উত্তম মনে হয়েছে তাকেই তিনি সমর্থন করেছেন। যে সুভাষ বসু তার অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি মুসলমানদের স্বার্থরক্ষাকারী ইবহমধষ চধপঃ চুক্তি দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর বাতিল করে দেন। আর সেটাই তাকে রাজনীতির প্রতি বিমুখ করে তোলে, ক্রমান্বয়ে গানের জগতে নিমজ্জিত হয়ে যান। নজরুল গবেষক কবি আবদুল কাদির সেটাই মনে করেন। অবশ্য এই মন্তব্যে কতখানি সত্যতা রয়েছে সেটাও এখন গবেষণার বিষয়।

সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের নাম আমার অজানা ছিলো না। কিন্তু তাঁর রচনাবলি কিংবা কোনো গ্রন্থ পাঠ করার সৌভাগ্য না হওয়ার কারণে বরাবরই তাঁর সম্বন্ধে তীব্র কৌতূহল ছিল। আসলে তিনি যে সময় মৃত্যুবরণ করেন তখন বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে সেটা খুব একটা আলোড়ন তুলেনি। আমার স্পষ্ট মনে পড়লে তাঁর ছাত্র ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মন্তব্য করেছিলেন এই বলে, তার মত এমন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি কী করে বিপথগামী হলো, তা বুঝতে পারলাম না। আমাদেরও বুঝতে অসুবিধা হয়, যখন দেখি পাকিস্তান আমলে তমদ্দুনপন্থি বুদ্ধিজীবী কিভাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে নব্য বাম ধারার এক শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী বনে গেলেন। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের মধ্যে আপসকামিতার কোনো লেশমাত্র ছিলো না। সে কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার উপর নেমে আসে নির্যাতনের ঝড়, ফলশ্রুতিতে তাঁকে দিতে হয়েছিল চরম শারীরিক মূল্য। সাজ্জাদ হোসায়েন ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্সে প্রথম শ্রেণি লাভ করে আয়ত্তে এনেছিলেন পোপ গোল্ড মেডেল, আর ১৯৪২ সালে এম এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন, পরে ডক্টরেট ডিগ্রি করেন ইংল্যান্ডের নটিংহাম ইউনিভার্সিটি থেকে Kipling in India নামে থিসিস করে, এই থিসিস এখনো কিপলিং-এর উপরে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ছিলেন হাই মাদ্রাসার ছাত্র, একজন মাদ্রাসার ছাত্র কিভাবে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণি পেল, সেই আমলে হিন্দু শিক্ষিত পরিবারে অনেক দিন যাবৎ সেটা ছিলো আলোচনার বিষয়। হিন্দু অধ্যাপকরা অবাক হতেন। বুদ্ধদেব বসুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম এ স্থান দখল করেছিলেন। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। তিনি বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে বাঙালি মুসলমানরা তাদের আত্মবিকাশের পথ খুঁজে পাবে। পাকিস্তান হওয়ার পর তার সেই প্রত্যাশা পরিপূরণ হয়নি; সেই কারণে পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর কোনো ভূমিকা না থাকলেও স্বাধীনতা বিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন এই রকম কোনো প্রমাণ খাওয়া যায় না। আমি একথাটা তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের লেখার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এই তথ্যটা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, পরবর্তী প্রজন্মের তরুণরা বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হন। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন বাংলা ভাষায় খুব কম প্রবন্ধ লিখেছেন, আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে লেখার চেয়ে পড়ার দিকেই তাঁর বেশি ঝোঁক ছিল। আর সেই কারণে প্রবন্ধসমূহ মানের দিক থেকেও এই উচ্চমানের হয়েছে। আর ইংরেজি ভাষার প্রবন্ধসমূহ সত্যি বলতে কি বিশ্বমানের, আমাদের দেশে লেখাপড়ার মান উন্নত হলে এই সমস্ত প্রবন্ধের যথাযথ মূল্যায়ন হতো। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, তিনি বাংলাদেশের গ্রাম্য পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানোর মাসিকতা আমাদের ভেতর এখনো জন্মায়নি। 

এবার আসা যাক অনুবাদ প্রসঙ্গে। ইংরেজিতে লেখা এই প্রবন্ধটির নাম ‘The Riddle of Nazrul Islam’। এই প্রবন্ধের অনুবাদকালে বেশ কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। প্রথমত, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন প্রচলিত অর্থে ইংরেজি লিখতেন না, একটু অলঙ্কার ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন, যার কারণে বারবার বাক্যগুলো পড়তে হয়েছে। বাক্যে ইডিয়ম ইডিয়ম ও ফ্রেজ-এর ব্যবহার যেন যথাযথ হয় তার দিকেও কঠোর দৃষ্টি ছিলো সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের। আলোচ্য প্রবন্ধটি তার উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রথমদিকে প্রবন্ধের ভাষা জটিল মনে হলেও সাহস করে ভেতরে প্রবেশ করলে আলাদা স্বাদ পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। মনে রাখা দরকার সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ছিলেন সত্যিকারের সাহিত্যরসিক। নিরপেক্ষতার শীর্ষ চূড়ায় অবস্থান করে নজরুলকে বিশ্লেষণ করেছেন, অনেকে তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ নাও করতে পারেন, কিন্তু একটু চিন্তা করলে বোঝা যাবে সেখানেও সহানুভূতির সুর ঝরে পড়েছে। একজন বড় কবি কিংবা মহৎ কবির অনেক দোষ থাকতে পারে, নজরুলেরও ছিল। কিন্তু আমাদের অনূদিত প্রবন্ধে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন কাজী নজরুল ইসলামের আসল অবদান তুলে ধরতে কোনো কসুর করেননি। কাজী আবদুল ওদুদ নজরুলকে যুগস্রষ্টা বলেছিলেন, আর সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন সুন্দর করে বললেন- Not only is Nazrul Islam a major writer one of the greatest in Bengali literature, but in some of the lyrics and some parts of his longer poems he reached heights which no one else attained. এখানে উল্লেখ করা দরকার, তিনি নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সফল অনুবাদক ছিলেন। এই অনুবাদ পড়লে তাঁর অনুবাদ করায় অসামান্য দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। অবশ্য নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার সাথে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের মিল ছিলো না। সেই কথা প্রবন্ধে সোজা করে না বললেও বোঝা যায়। তবে একথা ঠিক তাঁর সব মন্তব্যের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি, না হওয়াটাই স্বাভাবিক! কারণ কবিতার আলোচনায় কবিরাই ভালো দক্ষ। আমি প্রবন্ধটি নিয়ে গত এক বছর যাবৎ ভাবনা-চিন্তা করেছি, অনুবাদ করার বাসনা গুমরে মরছিল হৃদয়ের ভেতর দেশে, তাই অনুবাদ করলাম। প্রবন্ধটি আমি জনাব সাখাওয়াতউল্লাহ সিরাজ সম্পাদিত ‘ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন স্মারকগ্রন্থ’ থেকে নিয়েছি। এই মুহূর্তে আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। -অনুবাদক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির