post

ফিলিস্তিন সঙ্কট : সমাধান কোন পথে

হারুন ইবনে শাহাদাত

১৩ ডিসেম্বর ২০২৩

ফিলিস্তিনের মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে প্রায় পৌনে একশত বছর ধরে। তারা নিজ দেশে পরবাসী। অতি সম্প্রতি অবরুদ্ধ অবস্থায় মুক্তিসংগ্রাম করছেন গাজার বীর হামাস যোদ্ধারা। অথচ পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম দেশের রাষ্ট্রনায়করা ক্ষমতার লোভে পরাশক্তিগুলোর পদলেহনে ব্যস্ত। কারণ তাদের হৃদয়ের ঈমানী শক্তি মৃতপ্রায়। রাষ্ট্রনায়কদের প্রভাবে মুসলিম দেশগুলোর অধিকাংশ নাগরিক ভ্রান্তির বেড়োাজালে পড়ে আত্মপরিচয় বিস্মৃত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য পরাশক্তিগুলো জানে মুসলিম জাতি আসলে এক ঘুমন্ত সিংহ। যদি কখনো ঘুম ভাঙে পৃথিবীর নেতৃত্ব আবার তাদের হাতে চলে যাবে। তাদের এই ধারণা যে মিথ্যে নয়, তার প্রমাণ দিচ্ছেন পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ জনপদ গাজাবাসী। তারা শুধু ইসরাইল নয় বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর অন্তরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছেন। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করছেন। তাদের প্রত্যয়, “শির দেগা নাহি দেগা আমামা”। 

বিবিসিতে প্রকাশিত এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সর্বশেষ (গত ৩রা ডিসেম্বর ২০২৩) খবরে বলা হয়েছে, ‘স্থলপথে অভিযান চালাতে দক্ষিণ গাজায় ঢুকে পড়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। আকাশপথে হামলার পাশাপাশি ট্যাংক নিয়ে সেখানে অভিযান চালানো হচ্ছে। গাজা নগরীতে হামাসের একজন কমান্ডারকে হত্যার কথা জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী পরিচালিত রেডিওতে বলা হয়েছে, খান ইউনিসের উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালানো হচ্ছে। খান ইউনিসের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে স্থল হামলায় অংশ নেওয়া একটি ট্যাংকের ছবি বিবিসির কাছে এসেছে। বিবিসি ওই ছবির সত্যতা যাচাই করে দেখেছে।

ইবরাহিম আ. এর প্রকৃত উত্তরসূরি মুসলিমরা

ব্রিটানিকার তথ্যানুসারে গাজা ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত ছোটো একটি নগর রাষ্ট্র। এখানে আছে মাত্র চারটি শহর, আটটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির ও এগারোটি গ্রাম। প্রায় ১৭ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার ইসরাইলি ইহুদি বাকিরা  ফিলিস্তিনি মুসলিম। গাজা ভূখ-ের পশ্চিমে রয়েছে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে মিসর এবং উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে ইসরাইল। প্রতিদিন নতুন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের এখানে পুনর্বাসন করতে ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিদের বাড়ি-ঘর দখল করছে। ইহুদিদের ভিত্তিহীন দাবি এটি তাদের ‘পূর্ব পুরুষ ইবাহিম আ. এর পবিত্র ভূমি। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের দেওয়া ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’। কারণ তারা ইবরাহিম আ.-এর বংশধর। তাদের দাবি এই ধর্মীয় ও সাধারণ মানবাধিকার দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই মিথ্যা। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তারাই ইবরাহিম আ.-এর বংশধর বা উত্তরসূরি যারা তাঁর আদর্শের যথাযথ অনুসারী। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ইবরাহিমের সাথে ঘনিষ্ঠতার সর্বাপেক্ষা বেশি হকদার লোক তারা, যারা তাঁর অনুসরণ করেছে এবং এই নবী (অর্থাৎ শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং সেই সকল লোক, যারা ঈমান এনেছে। আর আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক।’ আদর্শ ত্যাগ করলে তিনি কারো ঔরসজাত হলেও আর ওয়ারিশ থাকেন না। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ১১৪ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর ইবরাহিমের নিজ পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা তো কেবল সেই প্রতিশ্রুতির কারণে ছিল, যা সে তার সাথে করেছিল। অতঃপর যখন তার নিকট এ সুস্পষ্ট হলো যে, সে (পিতা) আল্লাহর দুশমন, তখন সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিলো। বাস্তবিকই ইবরাহিম ছিল অতিশয় কোমল হৃদয়, সহনশীল।’

ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থগুলোও সাক্ষ্য দিচ্ছে তারা যথাযথভাবে নবীদের অনুসরণ করেনি এবং করছে না। বরং অসংখ্য নবীকে হত্যা করেছে। যেমন: স্বয়ং প্রভু ইশুয়াকে বলেন, ‘বনি ইসরাইলরা ভুল করেছে, তারা আমার ওয়াদার বিরুদ্ধাচরণ করেছে যা তাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম এবং তারা হারামকে গ্রহণ করেছে। তারা চুরি করেছে এবং তারা অস্বীকার করেছে।” (ইয়াশুয়া: ৭:১১)

এমন অসংখ্য বাক্য তাদের ধর্ম গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।

সাধারণ মানবাধিকারের দৃষ্টিতেও ইহুদিরা অপরাধী এবং জবর দখলকারী, লুটেরা। তারা অন্যের ভূমি জোর করে দখল করে তাদের উৎখাত করে অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থাৎ ইসরাইল একটি জারজ রাষ্ট্র- এ কথা বললেও ভুল বলা হবে না। জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ‘ধারা-১২: কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিংবা তাঁর গৃহ, পরিবার ও চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়ালখুশিমতো হস্তক্ষেপ কিংবা তাঁর সুনাম ও সম্মানের ওপর আঘাত করা চলবে না। এ ধরনের হস্তক্ষেপ বা আঘাতের বিরুদ্ধে আ‌ইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রত্যেকের‌ই রয়েছে। ধারা-১৩: ১. নিজ রাষ্ট্রের চৌহদ্দির মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং বসবাস করার অধিকার প্রত্যেকের‌ই রয়েছে। ২. প্রত্যেকের‌ই নিজ দেশসহ যে কোনো দেশ পরিত্যাগ এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার রয়েছে।’ তারা শুধু স্বাধীন চলাফেরার অধিকার নয় কিংবা গৃহের গোপনীয়তাই নয় বসতবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করছে। বৈধ অধিবাসী নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধদের হত্যা করেছে।

পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন জ্বলছে

ইহুদিদের আগ্রাসনে পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন জ্বলছে। বিশ্ববাসী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। কেউ কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে। কারো হৃদয় জ্বলছে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৭ সালের মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে স্বাধীন ফিলিস্তিনের অধিকাংশ ভূমি দখল করে নিয়েছে ইহুদিরা। এর পর থেকে এক দিনের জন্যও আগ্রাসন বন্ধ করেনি ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির নামে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিয়েছে। এই অবসরে এঁকেছে নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের ছক। অথচ আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো ইহুদিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার ঘটনাকে বড়ো করে দেখাচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এটি স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে, কোনো কারণ ছাড়াই ইসরাইলে হামলা করেনি হামাস। ফিলিস্তিনি জনগণ পৌনে এক শতাব্দী  ধরে দখলদারিত্বের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় বসবাস করে আসছেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেছেন। অবশ্য এই বক্তব্য দেওয়ার কারণে তিনি ইহুদি লবির রোষে পড়েছেন।

ইহুদিদের ষড়যন্ত্রের কারণে মধ্যপ্রাচ্য শান্ত হচ্ছেই না। ইসরাইল নামের বিষফোঁড়া গোটা আরব-বিশ্বকে তুষের আগুনের মতো জ্বালাচ্ছে ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হলেও এই সঙ্কট সৃষ্টির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশ্লেষকদের সামনে চলে আসে ১০৯৫-১২৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলমান পশ্চিমা বিশ্বের হিংসাত্মক ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস। ক্রুসেড শেষে ধর্মযুদ্ধের আবুরণ খুলে তার ওপর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের চাদর পরিয়ে নতুন নামে বিশ্ব জুড়ে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার নীলনকশা এঁকেছে তথাকথিত পাশ্চাত্য সভ্য দুনিয়া। এই নীল নকশা বাস্তবায়নে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের কাজে লাগিয়ে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার যে কূটকৌশল তারা গ্রহণ করেছে তারই খেসারত দিচ্ছে আজ গোটা মুসলিম বিশ্ব। মুসলিম দুনিয়ার তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল নেতারা পাশ্চাত্য দুনিয়ার এই কূটকৌশল বুঝতে তো পারছেই না, বরং তাদের ক্রীড়নক হিসেবে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেরাই ধ্বংস হচ্ছে।

ইসরাইলের শক্তির উৎস

ইসরাইল এত শক্তি কোথায় পায় সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে চারটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে: ১. ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে পশ্চিমা সাহায্য ২. ইসরাইলের নিজস্ব গবেষণাগারে তৈরি উন্নত আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ৩. জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং তা ব্যবহারে ইহুদী জাতির অধ্যবসায় ও আগ্রহ  ৪. গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ।

তবে এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও গবেষকরা মনে করেন, আরব বিশ্বের অনৈক্য, বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক, আরব দেশগুলোর অগণতান্ত্রিক সরকার এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বিমুখতাও এজন্য অনেকাংশে দায়ী। একনায়ক স্বৈরাচারী শাসকরা সবসময় ব্যস্ত থাকেন নিজেদের গদি বাঁচানোর চিন্তায়। তাই ফিলিস্তিনের প্রতি ততটুকুই সহযোগিতার হাত বাড়ায়, যতটুকুতে তাদের ক্ষমতার মসনদ অটুট থাকবে বলে মনে করেন।

ইসরাইল সৃষ্টির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

অবৈধ জায়েনবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল সৃষ্টির ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মুসলিম, খ্রিস্টান এমন কি নিরপেক্ষ ইহুদীরাও মনে করেন, এটি পশ্চিমাবিশ্ব ও আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় প্রতিষ্ঠিত একটি বিষফোঁড়া। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যায়, অত্যাচার ও জুলুমের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রের সৃষ্টি। এর অস্তিÍত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং বিকাশে ইসরাইল ও তার মিত্ররা প্রতিনিয়ত যুদ্ধাপরাধ করছে। 

বিবিসি’র সূত্রে ইসরাইল সৃষ্টির ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো,‘ফিলিস্তিনের গাজা থেকে দুই মাইল উত্তরে কিবুটস এলাকা। এখানে ১৯৩০-এর দশকে পোল্যান্ড থেকে আসা ইহুদিরা কৃষি খামার গড়ে তুলেছিল। ইহুদিদের পাশেই ছিল ফিলিস্তিনি আরবদের বসবাস। সেখানে আরবদের কৃষি খামার ছিল। তারা কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করছিল। সে সময় মুসলমান এবং ইহুদিদের মধ্যে সম্পর্ক মোটামুটি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পারলো যে তারা ধীরে ধীরে জমি হারাচ্ছে। ইহুদিরা দলে দলে সেখানে আসে এবং জমি ক্রয় করতে থাকে।

১৮৯৭ সাল থেকেই ইহুদিরা চেয়েছিল নিজেদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভূমি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে তুরস্কের সেনাদের হাত থেকে জেরুসালেম দখল করে ব্রিটেন। তখন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য সহায়তা করবে। ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার জেমস বেলফোর বিষয়টি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদি আন্দোলনের নেতা ব্যারন রটসচাইল্ডকে।

তৎকালীন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সে চিঠি বেলফোর ডিক্লারেশন হিসেবে পরিচিত। ইহুদিদের কাছে ব্রিটেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ফিলিস্তিনের জমিতে তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ করে দিবে। যদিও রোমান সময় থেকে ইহুদিদের ছোট্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী সে জায়গায় বসবাস করতো। ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সেটি তাদের একটি নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের ভাবনাকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। ১৯৩৩ সালের পর থেকে জার্মানির শাসক হিটলার ইহুদিদের প্রতি কঠোর হতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে জাহাজে করে হাজার হাজার ইহুদি অভিবাসী ফিলিস্তিনি ভূখ-ে আসতে থাকে। তখন ফিলিস্তিনি আরবরা বুঝতে পারে যে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। ফিলিস্তিনি আরবরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্রোহ করে। তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল ব্রিটিশ সৈন্য এবং ইহুদি নাগরিকরা। কিন্তু আরবদের সে বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করেছে ব্রিটিশ সৈন্যরা। ফিলিস্তিনদের ওপর ব্রিটিশ সৈন্যরা এতো কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছিল যে আরব সমাজে ভাঙন তৈরি হয়েছিল।

ইহুদিরা তাদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনে বদ্ধপরিকর ছিল। ব্রিটেনের সহায়তায় সে অনুযায়ী তারা কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে ব্রিটেন চেয়েছিল হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান জোরালো করতে। সেজন্য আরব এবং ইহুদি- দুপক্ষকেই হাতে রাখতে চেয়েছে ব্রিটেন।

১৯৩৯ সালের মাঝামাঝি ব্রিটেনের সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়েছিল পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পঁচাত্তর হাজার ইহুদি অভিবাসী আসবে ফিলিস্তিনি ভূখ-ে। অর্থাৎ সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছিল। ব্রিটেনের এ ধরনের পরিকল্পনাকে ভালোভাবে নেয়নি ইহুদিরা। তারা একই সাথে ব্রিটেন এবং হিটলারের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা করে। তখন ৩২ হাজার ইহুদি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। সেখান থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে ইহুদি সৈন্যরা ব্রিটেন এবং আরবদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের বাহিনীর দ্বারা লাখ লাখ ইহুদি হত্যাকা-ের পর নতুন আরেক বাস্তবতা তৈরি হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর যেসব ইহুদি বেঁচে ছিল তাদের জন্য কী করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তখন ফিলিস্তিনি ভূখ-ে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা আরো জোরালো হয়। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইসরাইল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। মি. ট্রুম্যান চেয়েছিলেন হিটলারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক লক্ষ ইহুদিকে অতি দ্রুত ফিলিস্তিনের ভূখ-ে জায়গা দেওয়া হোক। কিন্তু ব্রিটেন বুঝতে পারছিল যে এতো বিপুল সংখ্যক ইহুদিদের ফিলিস্তিনি ভূখ-ে নিয়ে গেলে সেখানে গৃহযুদ্ধ হবে। 

এ সময় ইহুদিদের সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ সৈন্যদের ওপর ফিলিস্তিনের বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালানো শুরু করে। তখন ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে জাহাজে বোঝাই হয়ে আসা হাজার হাজার ইহুদিদের বাধা দেয় ব্রিটিশ বাহিনী। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। ইহুদি সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ বাহিনীর ওপর তাদের আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ব্রিটেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। তখন সমাধানের জন্য ব্রিটেনের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এরপর বাধ্য হয়ে ব্রিটেন বিষয়টিকে জাতিসংঘে নিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে ফিলিস্তিনের ভূখ-ে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি আরবদের জন্য। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনি ভূখ-কে দ্বিখ-িত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দ্বিখ-িত করার প্রস্তাব পাস করে ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদিবাদীদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবেই ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল জন্ম হয়। ইহুদিরা মোট ভূখ-ের মাত্র ১০ শতাংশের মালিক হলেও তাদের দেওয়া হয় মোট জমির প্রায় অর্ধেক। কিন্তু আরবদের জনসংখ্যা এবং জমির মালিকানা ছিল ইহুদিদের দ্বিগুণ।’

বিবিসি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এটি মুসলমানদের স্বার্থের পক্ষের প্রতিষ্ঠান নয়, তারপরও এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই ‘ইসরাইল একটি অবৈধ, জারজ রাষ্ট্র’। মধ্যপ্রাচ্যে সংকট জিইয়ে রাখা এবং তরল সোনা খ্যাত জ্বালানি তেল লুটের পশ্চিমা ও আমেরিকার স্বার্থ অব্যাহত রাখতেই তারা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায় না। এই সত্য উপলব্ধি করে মুসলিম বিশ্বকে সমাধান খুঁজতে হবে। তা না হলে সমাধানের জন্য ইমাম মেহেদী আ. এর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

সমাধানের পথ

মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ এবং ইসলামী আদর্শের বাস্তব অনুসারী নেতৃত্ব ছাড়া এই সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়। ইসলাম একটি কালজয়ী আদর্শ। সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয় ইসলাম। মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রনায়ক, ওলামা ও নেতাদের মাঝে এই সত্যের অনুশীলন বাড়ালে মুসলিম তরুণরা সঠিক পথ খুঁজে পাবে। ইহুদি ষড়যন্ত্রে জঙ্গিবাদ ফাঁদ ও বিভিন্ন ফেরকার বেড়োাজাল থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মুসলিম বিশ্বের তরুণদের মাঝে ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার অনুশীলন বাড়াতে হবে। শ্রীলঙ্কা, ভারত, কাশ্মির, মিয়ানমার, চীনের উইঘুর এবং বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ঠ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নির্যাতিত মুসলমানদের পক্ষে মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দকে পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে। উল্লিখিত দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং নির্যাতিত মুসলমানদের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে এক যোগে কাজ করতে হবে। ভালোবাসার বন্ধনে গোটা বিশ্বমানবতাকে বুকে টেনে নিতে না পারলে কোনো সঙ্কটেরই সমাধান হবে না। 

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক 

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির