post

বিকল্পের খোঁজে

রেদওয়ান রাওয়াহা

৩০ এপ্রিল ২০২৩

যা বলতে চেয়েছি 

 কিছু মানুষ আছেন, যাদেরকে কিছু বলা যায় না, কিছু স্বাভাবিক বিষয়ও জানানো যায় না। দেওয়া যায় না কোনো পরামর্শও। তাদেরকে কিছু জানানো হলে তারা কমন একটা ডায়ালগ ছুড়ে দেন এই বলে যে- বিকল্প দিন। মোটামুটি বুঝজ্ঞান হবার পর থেকেই কিছু কিছু মানুষের পক্ষ থেকে এই কমন ডায়ালগটা শুনতে পাচ্ছি, বা মাঝে মধ্যে নিজেও সে ডায়ালগটার মুখোমুখি হয়েছি বা এখনো হচ্ছি। কেন যেন মানুষের এ একটা বদ অভ্যেস হয়ে গেছে যে, কিছু থেকে কিছু বললেই তারা বলে- বিকল্প দিন। কিছু বললেই কেবল বিকল্প চায় তারা। কার কাছে চায়? আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছেই চায়। অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা স্বয়ং তাঁর পক্ষ থেকে সেই সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বেই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের মাধ্যমে বিকল্প দিয়ে রেখেছেন আমাদের জন্য। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের তো উচিত ছিল সেই বিকল্পটাকেই নিজ থেকেই খুঁজে নেওয়া। অনুসন্ধান করে নেওয়া এবং সেটা খুব সুন্দর করে মানুষের সামনে হাজির করা। আল্লাহর দেওয়া বিকল্পটাকেই নিজের জীবনে এবং আমাদের সার্বিক জীবনে বাস্তবায়ন করা। কিন্তু না, আমরা সেটা তো করিই না, বরং ভুল আর বিদআতে ডুবে থাকি। ভ্রান্তি আর গোমরাহিতে মজে থাকি। কুফরি আর জাহিলিয়াতে লিপ্ত থাকি। অথচ কেউ যখন আমাদের এ ভুলটা ধরিয়ে দেন, আমাদের এই ভ্রান্তির ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক করে তোলেন, তখনই কেবল আমরা কথিত বিকল্প তালাশ করি। তা-ও তাচ্ছিল্যের সাথেই করি। এবং নিজের ভুলটাকে জাস্টিফিকেশনের জন্যই তা করি। 


সবকিছুরই কি বিকল্প হয়?

   এই যে সব কিছুতে এবং সবকিছুর বিকল্প খোঁজা, এটা একটা বাজে কাজ বা ভুল কাজ। আসলে চিন্তা করে দেখুন তো, পৃথিবীতে সবকিছুরই কি বিকল্প আছে? মায়ের বিকল্প কি কখনো চাচি ফুফু মামি বা খালা হতে পারে? বাবার বিকল্প কি চাচা মামা কিংবা ভাই হতে পারে? এভাবে চিন্তা করলে অনেক বস্তু, অনেক ব্যক্তি বা অনেক কিছুরই বিকল্প এই দুনিয়ায় নেই। তবুও আমাদেরকে যখন হক্কানি-রব্বানি আলিমগণ আমাদের ভুল কাজ, অন্যায় কাজ নিয়ে সচেতন করেন, তখন আমাদের মুসলিম নামধারী বহু ভাইবোনই রেগেমেগে বলে ওঠেন- হুজুরদের কাজ নেই। তারা শুধু বিদআত-হারাম এসবই ফতোয়া দিয়ে বেড়ায়, কোনো বিকল্প দেয় না। আমি দীর্ঘদিন পূর্বে ফেসবুকে এবং বিভিন্ন ব্লগে এই কথাটা বলে এসেছি যে, বিকল্প দেয় না কেন আলিমরা; এ কথা যারা বলেন, তাঁরা আসলে এটা কেন ভাবে না যে, আলিমদের হাতে এখন কোন ক্ষমতাটা আছে? আলিমরা বৈশ্বিকভাবেই বৈরিতার শিকার। আলিমরা বিকল্প দিতে পারে না ঠিক আছে, কিন্তু অন্তত আপনাকে এখনো কোনটা হালাল-কোনটা হারাম, কোনটা বিদআত-কোনটা ইবাদাত; এটা তো জানাতে পারছে। এর জন্যও তো কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। শুকরিয়া আদায় করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলিমরা শুধু হারাম হারাম বলে, বিকল্প দেয় না। বিকল্প কি আলিমরাই দেবে? নাকি স্বয়ং আল্লাহ নিজেই বিকল্প দেবেন? আসলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বয়ং নিজেই বিকল্প দিয়ে রেখেছেন? হারাম রিলেশনের (বিয়ে বহির্ভূত প্রেম-ভালোবাসা, জিনা-ব্যভিচার, সমকামিতা) বিকল্প হিসেবে আল্লাহ নিজেই বিয়ে দিয়ে রেখেছেন। সুদের বিকল্প হিসেবে দিয়ে রেখেছেন ব্যবসা। অনেকে বলেন সুদের বিকল্প করজে হাসানা, এটা মোটাদাগে পুরোপুরি ঠিক নয়। কুরআন আমাদেরকে বলছে সুদ হারাম, বিপরীতে ব্যবসা হালাল। (সূরা বাকারা : ২৭৫)। এভাবে অশ্লীল কবিতা-গান হারাম, আর আল্লাহর পথে আহ্বান করে, এমন কবিতা হালাল। সঙ্গীত হালাল, বিপরীতে বাদ্যযন্ত্র-যুক্ত মিউজিক হারাম। রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি প্রেরিত হয়েছিই মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টকে ধ্বংস করতে”। (আবু দাউদ : ৬৭৪)। একইভাবে আল্লাহ শিরকের বিকল্প দিয়েছেন তাওহিদকে। গায়রুল্লাহর বা তাগুতের দাসত্বের বিকল্প এক আল্লাহর ইবাদাতকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন- أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ। জাহিলিয়্যাতের বিকল্প হিসেবে দিয়েছেন কালজয়ী আদর্শ আলোকময় আল-ইসলামকে। কাফির-মুশরিকদের যে আনন্দ-উৎসব, সেগুলোর বিকল্প হিসেবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য বছরের দুটো জাঁকজমক উৎসব ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর দিয়েছেন। এভাবে অপব্যয়ের বিকল্প মিতব্যয়িতা, কৃপণতার বিকল্প দানশীলতা, অলসতার বিকল্প কর্মচঞ্চলতার নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা।


  সোজা কথায় যত বিকল্প দরকার, যত কিছুর বিকল্প প্রয়োজন, সবকিছুর বিকল্পই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর তরফ থেকে দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু আপনি বিকল্প বলতে যদি বুঝেন জাহিলিয়াতের সাথে আপস করা, জাহিলিয়াতের খাঁচার ভেতর চেপেচুপে ইসলামকে একটু স্থান দেওয়া; তাহলে স্যরি ভাই- আপনাকে হতাশ হতে হবে! কারণ এই ধরনের বিকল্প অন্তত আল্লাহর দ্বীনে নেই। কিংবা বিকল্প বলতে যদি বুঝেন যে- নাচের বিকল্প হিসেবে সুস্থ ধারার নাচ দরকার বা ইসলামী নাচ দরকার, কমিউনিজমের বিকল্প হিসেবে ইসলামী কমিউনিজম, পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে যদি খোঁজেন ইসলামী পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্রের বিকল্প যদি খোঁজেন ইসলামী সমাজতন্ত্র, এভাবে মদের বিকল্প হিসেবে যদি চান ইসলামী মদ; তাহলে বিশ্বাস করুন ভাই! আপনাকে ইসলাম নিয়ে জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে হতাশ হতে হবে। আল্লাহর দ্বীন এত হালকা আর অন্য বাতিল মতাদর্শের প্রতি মুখাপেক্ষী জিনিসের নাম নয়। আপনার চাওয়া এরকম কথিত বিকল্প আল্লাহর দ্বীনে নেই। হ্যাঁ, সেটা আপনার খায়েশাত নামক যে দ্বীন, সে দ্বীনে থাকতে পারে। কিংবা দিলের পূজা করে, এমন মানুষের দ্বীনেও থাকতে পারে, তবে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনিত দ্বীনে এরকম কথিত কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ দেননি।

   ইসলামে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে গাইরুল্লাহর দাসত্ব, নিজ নফসের গোলামিসহ সর্বপ্রকার দাসত্ব ও গোলামির জিঞ্জিরকে ছিন্ন করেই প্রবেশ করতে হবে। একজন বুদ্ধিমান মুসলিম ব্যক্তির নিদর্শনও তা। মানে নিজের নফসের যে খায়েশ, সে খায়েশের টুটি চেপে ধরে একনিষ্ঠভাবে পরকালের জন্য কাজ করে যাওয়াটা আরকি। স্বয়ং আমাদের প্রিয় আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, “সে ব্যক্তিই বুদ্ধিমান, যে নিজের নফসের দাসত্বকে পরিত্যাগ করে, এবং পরকালের জন্য আমল করে।” (তিরমিজি : ৩৯৭৬)।


সিরাত আল মুস্তাকিম : আল্লাহর তরফ থেকে দেওয়া বিকল্প 

  আমরা বলছিলাম আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা স্বয়ং নিজেই তাঁর পক্ষ থেকে আজ হতে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বেই বিকল্প দিয়ে রেখেছেন আমাদের জন্য। এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বিকল্প হিসেবে কী দিয়েছেন? এর জবাব আমরা ওপরে দিয়ে এসেছি। তবুও স্পেসিফিকভাবে বললে এভাবে বলা যায়- একজন মুসলিম মানেই জানে-মানে এবং বিশ্বাস করে যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিকল্প হিসেবে আমাদের জন্য ইসলাম নামক এক ত্রুটিহীন ও পরিপূর্ণ জীবন চলার ব্যবস্থা দিয়েছেন। চলুন, আমরা এর জবাবটা প্রমাণসহ জানার জন্য পবিত্র কুরআনুল কারিম থেকেই ঘুরে আসি। কুরআনুল কারিমের সূরা মায়েদায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেন- الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

অর্থাৎ, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম; আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” (সূরা আল-মায়েদা : ০৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, لَّا تَعۡبُدُوا الشَّیۡطٰنَ ۚ  اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ-وَّ اَنِ اعۡبُدُوۡنِیۡ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسۡتَقِیۡمٌ

অর্থাৎ, “তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না। কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। আর আমারই ইবাদাত করো, এটাই সরল পথ।” (সূরা ইয়াসিন : ৬০-৬১)। সূরা ইসরায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেন, إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا 

অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই এই কুরআন সর্বশ্রেষ্ঠ পথ নির্দেশ করে এবং সৎ কর্মপরায়ণ ঈমানদারদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।” (সূরা আল-ইসরা : ৯)। এছাড়াও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনের অগণিত জায়গায় তাগুত বর্জন করে তাগুতের দাসত্বের বদলে আল্লাহর ইবাদাত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর পক্ষ থেকে দেওয়া বিকল্পটা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যুগে যুগে তিনি প্রত্যেকটা জাতির কাছে রাসূলও পাঠিয়েছেন বলে তাঁর কালামের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়েছেন। যেমন কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে- وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ  অর্থাৎ, “আল্লাহর ইবাদাত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমরা তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” (সূরা আন-নাহল : ৩৬)।

  ওপরে উল্লিখিত আয়াতগুলোর প্রথম আয়াতটির একেবারে প্রথম অংশটির প্রতি লক্ষ্য করে দেখুন। যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বলেছেন- أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ অর্থাৎ, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। এ অংশের ব্যাখ্যায় উস্তাদ সাঈয়েদ আবুল আলা মওদুদী রহিমাহুল্লাহ বলেন, “দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দেবার অর্থই হচ্ছে তাকে একটি স্বতন্ত্র চিন্তা ও কর্ম-ব্যবস্থা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছে। তার মধ্যে জীবনের সমস্ত প্রশ্নের নীতিগত বা বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়। হেদায়াত ও পথনির্দেশ লাভ করার জন্য এখন আর কোনো অবস্থাতেই তার বাইরে যাবার প্রয়োজন নেই।” (তাফহিমুল কুরআন: সূরা মায়েদা, টীকা-১৬)। এরপর একই আয়াতের পরের যে অংশটুকু, সেটায় খেয়াল করুন, যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেছেন- وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম। এই যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমাদেরকে যে পরিপূর্ণ দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা দিলেন, তিনি শুধু তা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এটাকেই তথা এ দ্বীনকেই তিনি একমাত্র বিকল্প হিসেবেই নির্ধারিত করলেন। সবকিছু মোকাবিলার একমাত্র অস্ত্র হিসেবে হাজির করলেন এ দ্বীনকেই। পাশাপাশি তিনি এটাও বলে দিয়েছেন যে, এই বিকল্প (আল্লাহর দেওয়া দ্বীন আল-ইসলাম) যে ব্যক্তি অনুসরণ করবে না, সে ব্যক্তি উভয় জাহানেই ক্ষতিগ্রস্তদের কাতারে শামিল থাকবে। তার কাছ থেকে তার অনুসরণীয় বিষয় (ইসলাম বাদে ভিন্ন কিছু) কস্মিণকালেও গ্রহণ করা হবে না। পবিত্র কুরআনুল কারিমের মাধ্যমে আমাদেরকে আমাদের মহান রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমাদেরকে জানাচ্ছে- وَ مَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡهُ  وَ هُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ  الۡخٰسِرِیۡنَ অর্থাৎ, “যে ব্যক্তিই ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অবলম্বন করতে চাইবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না। এবং আখিরাতে সে মহা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান : ৮৫)। কী আশ্চর্য! এতো সুন্দর ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও, এরকম উত্তম বিকল্প থাকার পরও নিজেকে মুসলিম দাবি করা ব্যক্তিটিই জাহিলিয়াতের সাথে মোকাবিলার প্রত্যেকটা বিষয়েই বিকল্প খোঁজ করে।


বিদআতই কি বিকল্প?

  আল্লাহর দেওয়া, রাসূল (সা.)-এর প্রদর্শন করা পথ ইসলাম আমাদের সামনে হাজির থাকার পরও যারা কেবল বিকল্পের অনুসন্ধানে ব্যতিব্যস্ত, কথায় কথায় যারা “বিকল্প বিকল্প” বলে গলাটা শুকিয়ে কাঠ করে ফেলেন, তাদের এহেন ব্যতিব্যস্ততা দেখে স্বভাবতই আমাদের মনে প্রশ্ন জেগে ওঠে- তাহলে বিদআতই কি বিকল্প? আল্লাহর দেওয়া দ্বীন আল-ইসলাম কি যথেষ্ট না আমাদের জন্য? রাসূল (সা.) যা এনেছেন আমাদের জন্য, তা কি পর্যাপ্ত নয়? অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর কালামে খুব মায়াবিভাবে বলেছেন, রাসূল যা আনে, তোমরা তা ধরো। আর যা নিষেধ করেন, সেটা প্রত্যাখ্যান করো। ( সূরা : আল হাশর-০৮)।

  আমরা জানি আল্লাহ বলছেন আল্লাহর দেওয়া দ্বীন আল-ইসলামই আমাদের জন্য যথেষ্ট। রাসূলের আনীত বিধানই আমাদের জন্য একেবারে পরিপূর্ণ। কারণ, আমাদের জন্য উত্তম কোনটা, ভালো কোন বিষয়টা, তা আল্লাহই ভালো জানেন। এবং রাসূলের মাধ্যমে তা আমাদেরকে জানিয়েও দিয়েছেন। যেমন, একটা হাদিস আছে এরকম- ‘প্রত্যেক নবীর জন্যই জরুরি যে, তিনি তাঁর উম্মতকে সেই কাজ বাতলে দেবেন, যা তিনি তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো বলে জানবেন। (মুসলিম: ৪৮৮২)। এছাড়াও আমরা আরো জানি যে, বিদআত হচ্ছে ভ্রষ্টতা। সহিহ বুখারিতে প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) এর বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব। আর সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শ। সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো, (দ্বীনের মধ্যে) নব-উদ্ভাবিত বিষয়। (দ্বীনের মধ্যে) নব-উদ্ভাবিত সবকিছুই বিদআত। (বুখারি : ৭২৭৭)। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, “এমন কোনো জিনিস নেই, যা আমি তোমাদেরকে আদেশ করিনি, অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে তা আদেশ করেছেন এবং এমন কোনো জিনিস নেই, যা আমি তোমাদেরকে নিষেধ করিনি, অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে তা নিষেধ করেছেন।’’ (বাইহাকি : ১৩৮২৫)। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আরেকটা হাদিস আছে, যেখানে তিনি বলেছেন- قَالَ رَسُولُ اللهِ   ﷺ    مَنْ أحْدَثَ في أمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ  /  مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ   عَلَيهِ أمرُنا فَهُوَ رَدٌّ  অর্থাৎ, “রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোনো নতুন কথা উদ্ভাবন করলো, যা তার মধ্যে নেই, বা যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত”। (বুখারি- ২৬৯৭, মুসলিম-৪৫৮৯)।

    আমাদের সালাফে সালেহিনগণও এ ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করে গেছেন। যেমন ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে নতুন কিছু শুরু করে এবং এর মধ্যে মঙ্গল অবলোকন করে, তবে সে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর এ ধারণা করলো যে, তিনি তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করেননি। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। সুতরাং সে সময় যেসব বিষয় দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তা আজও দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হবে না।” (ফাতহুল কুবিল মাতিন: ১ম খ-, ৮৬)। ইসলামী দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম, ইলমের দুনিয়ার এক মহাসাগর, ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘এ উম্মতের ওপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ হলো আল্লাহ তাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করেছেন। সুতরাং তারা দ্বীনের ব্যাপারে অন্য বিধানের বা অন্য কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৭ম খ-, পৃষ্ঠা-৭১৫)। বর্তমান সময়ের অন্যতম একজন গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ মরহুম ড. ইউসুফ আল কারজাভীও তাঁর ইসলামের হালাল-হারামের বিধানের মধ্যে স্পষ্ট করে মতামত দিয়েছেন যে, যদি কেউ ভালো নিয়তে ভুল করে, ভালো উদ্দেশ্যেও হারাম কাজ করে, তবুও ভুল ভুলই থাকবে। হারাম হারামই থাকবে। (ইসলামে হালাল হারামের বিধান : ৪৯-৫১)।

   সুতরাং যারা সব কথায় কেবল ‘বিকল্প বিকল্প’ বলে স্লোগান তোলেন, তারা এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিপূর্ণ এক সত্য দ্বীন থাকার পরেও সবকিছুতে এরকম বিকল্প খোঁজার প্রবণতাই মূলত আমাদেরকে বিদআতের রাহুগ্রাসে নিক্ষিপ্ত করে। আমাদের মন-মস্তিষ্ক, উদ্দেশ্য-আদর্শ ও কর্ম থেকে মৌলিক চিন্তা, মৌলিক কাজ, মৌলিক তমদ্দুনকে আড়াল করে রাখে, বা দূরে সরিয়ে রাখে।


বিকল্প পথ পরিহারের ব্যাপারে সতর্কতা

  আল্লাহ তাআলা জাহিলিয়াতের বিপরীত ইসলাম নামক যে সত্য এক দ্বীন দিয়েছেন, সে দ্বীন ছেড়ে অন্যপথে যাবার ব্যাপারে নানানভাবে সতর্ক করেছেন। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে ইসলাম ছাড়া অন্যকোনো পথ অবলম্বন করলে, আল্লাহর রাসূল নির্দেশ দেননি, আল্লাহর দেওয়া দ্বীনে নেই; এমন কিছু কেউ যদি অনুসরণ করে, তবে তাঁর থেকে তো কস্মিণকালেও গ্রহণ করা হবে না। সেটা আল্লাহর কাছে, তাঁর রাসূলের কাছে একেবারেই প্রত্যাখ্যাত একটা বিষয়। যা আমরা ওপরে নানাভবে আলোচনা করেছি। এর বাইরেও আল্লাহর অনেক বাণী, নবীজির অনেকগুলো হাদিস আছে, যেখানে কুফরির বিকল্প বা বিপরীতে আল্লাহ যে আলোকময় দ্বীন দিয়েছেন, সে দ্বীন ছেড়ে অন্যত্র যাবার ব্যাপারে নানানভাবে সতর্ক করা হয়েছে। নানাবিধ শক্তপোক্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে। যেমন সহিহ মুসলিমে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) খুবই স্পষ্টভাবে বলেছেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন, এ উম্মতের যে কেউ ইহুদি হোক বা খ্রিস্টান, যে আমার কথা শুনবে অতঃপর আমি যে রিসালাত নিয়ে এসেছি তার প্রতি ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে সে নিশ্চয়ই জাহান্নামের অধিবাসী হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৭৯)। পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘বলে দাও, আমি কি তোমাদের বলে দেব, কর্মে কারা সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারা সে সকল লোক, পার্থিব জীবনে যাদের সমস্ত দৌড়-ঝাঁপ সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, অথচ তারা মনে করে তারা খুবই ভালো কাজ করছে। (সূরা কাহফ : ১০৩-১০৪)।

  আমরা দুনিয়ায় আসার আগে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের রূহগুলোকে একত্র করে জিজ্ঞেস করেছিলেন- “আমি কি তোমাদের রব নই? আমরা তখন এর জবাবে বলে এসেছি, “হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব”। (সূরা আরাফ : ১৭২)। এখন যারা দুনিয়ায় এসে নানাবিধ ভোগ-বিলাসে, দুনিয়ার মোহ ও ধোঁকায় পড়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওতাআলাকে দেওয়া সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে, তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পরিপক্ব করার পরও ভেঙে ফেলে এবং যে সম্পর্ক রক্ষা করতে তিনি আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে; বস্তুত এমন সব লোকই অতি ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা বাকারা : ২৭)। পবিত্র কুরআনের অন্য আরেকটি আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে জানাচ্ছেন- وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيماً فَاتَّبِعُوهُ وَلا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ  অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ। সুতরাং এ পথেরই অনুসরণ করো এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।” (সূরা আল-আনআম : ১৫৩)। 


বিকল্প পথে চলার জন্য প্রার্থনা 

  আমরা আল্লাহর দেওয়া ইসলাম নামক যে নিয়ামত পেলাম, শিরকের বিকল্প যে তাওহিদের পথ পেলাম, সে পথে চলার জন্য আল্লাহর কাছে অবিরত প্রার্থনাও করে যাই। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে আমরা আল্লাহর কাছে বলি- 

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ

অর্থাৎ, “আমাদেরকে সরল-সঠিক সঠিক পথ দেখান। তাদের পথ, যাদেরকে আপনি অনুগ্রহ দান করেছেন।” (সূরা ফাতিহা : ৬-৭)। প্র্যখ্যাত সাহাবি মুআয ইবনে জাবাল (রা.) একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আমাকে কিছু নসিহা করুন। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না।’ এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমাকে আরো বেশি নসিহা করুন। নবীজি (সা.) বললেন, ‘পাপের পরে নেকির কাজ করবে।’ অতঃপর তিনি আরও নসিহা করার আবেদন জানালে আল্লাহর রাসূল বললেন, ‘দ্বীনের ওপর অটল থাকো এবং তোমার চরিত্রকে উত্তম করে গড়ে তোলো’। (সিলসিলাতুস সহিহাহ : ১২২৮)। শুধু মুয়াজ ইবনে জাবাল-ই নয়, ইসলামের চতুর্থ খলিফা, আমিরুল মুমিনীন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও আমাদের প্রিয় নবী রাসূল (সা.) আল্লাহর দেওয়া বিকল্প পথে থাকতে এই দুআ শিখিয়ে দিয়েছেন- اللَّهُمَّ اهْدِنِىْ وَسَدِّدْنِىْ وَاذْكُرْ بِالْهُدَى هِدَايَتَكَ الطَّرِيقَ وَالسَّدَادِ سَدَادَ السَّهْمِ ‏‏ অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে সুপথ প্রদর্শন করো এবং আমাকে সরল পথে পরিচালিত করো।’ (মুসলিম : ৬৬৬৩)।

আমাদের প্রিয় নবী কি শুধু সাহাবিদেরকেই শিক্ষা দিতেন? না, স্বয়ং তিনি নিজেও আল্লাহর কাছে এভাবে দুআ করতেন- اللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى  অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে সঠিক পথের নির্দেশনা, পরহেজগারিতা, পবিত্রতা ও সচ্ছলতার প্রার্থনা করছি। (মিশকাতুল মাসাবিহ : ২৪৮৪)। উম্মাহর পরবর্তী প্রজন্ম, তথা আমাদের সালাফগণও এই সিলসিলাটা জারি রেখেছেন। তারাও আল্লাহর কাছে এভাবে দু’আ করতেন। ইমাম হাসান বসরি (রহ.) আল্লাহর কাছে এই বলে দুআ করতেন- اللهم أنت ربنا، فارزقنا الاستقامة  ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের রব। তুমি আমাদেরকে তোমার দ্বীনের উপর অটল থাকার তাওফিক দাও।’ (তাফসিরে ইবনু কাসির : সূরা হামিম সাজদা-৩০)।


   অতএব আমরাও কথায় কথায় বিকল্প না চেয়ে আল্লাহর দেওয়া যে বিকল্প, সে বিকল্প পথে চলতে আল্লাহর আছে এভাবেই প্রার্থনা করি- رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ অর্থ, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করার পর আমাদের অন্তরগুলোকে পুনরায় বাঁকা করে দিও না। আর তুমি আমাদেরকে তোমার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ প্রদান করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বাধিক দানকারী।’ (সূরা ইমরান : ০৮)। এ কথাগুলোই যেন কবি গোলাম মোস্তফার কলমে ফুটে ওঠেছে। তিনি প্রার্থনা নামক কবিতায় লিখেছেন-

সরল সঠিক পুণ্য পন্থা

মোদের দাও গো বলি,

চালাও সে পথে, যে-পথে তোমার

প্রিয়জন গেছে চলি।

যে পথে তোমার চির-অভিশাপ

যে পথে ভ্রান্তি, চির-পরিতাপ

হে মহাচালক, মোদের কখনো

করো না সে পথগামী।                                                                                                                                                      

লেখক : সহকারী সম্পাদক, প্রেরণা।

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির