post

মাওলানা আব্দুস সুবহান একটি জীবন একটি ইতিহাস

প্রকৌশলী মো. নাঈম হোসেন

১৩ ডিসেম্বর ২০২৩

মাওলানা আব্দুস সুবহান একটি জীবন একটি ইতিহাস- কথাটা দিয়েই শুরু করতে চাই।

খুব ছোটবেলা থেকে নবী-রাসূলের জীবনী, সাহাবায়ে কেরামের জীবনী পড়ার সুবাদে সবসময় খুঁজতাম নবী-রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনকে অনুসরণ করে এরকম মানুষকে। এটা খুঁজতে গিয়ে আমার এই ছোট জীবনে যাদেরকে দেখেছি, তার মধ্যে আমার নানাজিকে বরাবরই একটু অন্যরকম মনে হয়েছে, যার ব্যবহারের মধ্যে আমি রাসূল সা.-এর ব্যবহারের প্র্যাক্টিক্যাল নমুনা খুঁজে পেতাম, যার উদারতা আমাকে ইসলামের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে অনুপ্রাণিত করেছে। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, জনপ্রিয় শিক্ষক, উদ্যোক্তা, ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মী, রাজনীতিবিদ সকল ক্ষেত্রেই ছিলেন শত সহস্র মানুষের রোল মডেল। তার বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য এই জীবনকে আলোচনা করার মতো যথেষ্ট যোগ্যতা ও জ্ঞান কোনোটিই আসলে আমার নেই। তারপরও তাকে সামনে থেকে যতটুকে দেখেছি সেটিই আমার দুর্বল লেখনীতে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

একজন স্বাপ্নিক মানুষ : নানাজিকে নিয়ে বলতে গেলে প্রথম যেটি আমার চোখের সামনে আসে সেটি হলো- একজন স্বাপ্নিক মানুষ। যিনি মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে, মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেন, স্বপ্ন দেখা শেখাতেন। নানাজির সাথে যতবার কথা বলেছি, ততবার মনে হয়েছে জীবনে বড় কিছু করতে স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন। তিনি তার জীবনে কত কত মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন তার হিসাব আমার জানা নেই। কিন্তু একান্তই আগ্রহ থেকে তাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এই যে এত কিছু করেছেন, কিভাবে করেছেন? দুটো কথায় উত্তর দিয়েছিলেন, স্বপ্ন দেখ আর আল্লাহকে সামনে রেখে কাজ কর, কাজ করতে করতে যেখানে তোমার ক্লান্তি চলে আসবে মনে রাখবে তোমার স্বপ্ন তোমাকে তোমার ক্লান্তি দূর করে তোমাকে নতুন উদ্দীপনায় কাজ করতে উৎসাহ ও শক্তি জোগাবে। তার করা মাদরাসা, মসজিদ, স্কুল, কলেজ ও ইয়াতিমখানাসহ সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আজ একথারই সাক্ষ্য দেয়। একবার নির্বাচনকালীন সময়ে পাবনাতে কোনো একটা গ্রামে নানাজির সাথে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে কিছু মানুষ আমাকে ডেকে বলেছিল, ‘মাওলানা যেই রাস্তা দিয়ে যায় যেখানে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নেয় (কথা কয়) সেটা হয়ে যায় (সেডা হয়া যায়), এই জন্য মাওলানারে আমাগর এলাকায় নিয়া আইছি।’ কথাগুলো এখনো কানে বাজে।

স্বল্পভাষী মানুষ : জীবনের ৫০ থেকে ৬০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে মানুষ যে খুব স্বল্পভাষী হয়ে রাজনীতির মতো এত বড় কাজ করতে পারে, তা নানাজিকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। আজকাল তো মানুষ কিছু করুক আর না করুক যেভাবে বলে বেড়ায়, নানাজিকে কখনো এত বেশি কথা বলতে দেখিনি। কেউ বললে জবাব দিতেন- এটা আমার দায়িত্ব। যখন কথা বলতেন মনে হতো হিসাব করে কথা বলছেন। নানাজির কাছে যখনই বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছি- খুব অল্প অথচ যথার্থ ভাষায় তার উত্তর দিতেন। একটা পরামর্শ প্রায়ই পেয়েছি- কথা বলার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা বলবে সেটাতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকবে। রুয়েটে দায়িত্ব পালন করার সময় নানাজির কাছে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ চেয়েছিলাম। বলেছিলেন, তোমার প্রত্যেক কর্মীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং খুব ভেবে চিনতে দায়িত্ব নিয়ে তাদেরকে পরামর্শ দেবে, আর যত বেশি পার- কোরআন ও সিরাত পড়বে এবং সেটা অনুসরণ করে চলবে।

নানাজি হিসেবে যেমন ছিলেন : ছোটবেলায় যতদূর মনে পড়ে, আমাদের বাড়ি ও নানাজির বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায়, তিনি যখন পাবনাতে আসতেন নিয়মিত সবাইকে নিয়ে নামায পড়তেন, নামায শেষে সবার খোঁজ খবর নিতেন, কখনো আমাদেরকে বিভিন্ন সূরা পড়তে বলতেন, ভুল হলে শুধরে দিতেন, ইংরেজিতে বক্তব্য দিতে বলতেন, বাংলায় বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দিতে বলতেন। এগুলো প্রকারান্তরে আমাদের মধ্যে ইসলামকে জানতে অনুপ্রাণিত করত। এরপর নামায শেষে হাঁটতে বেরিয়ে যেতেন। হাঁটার সময় ইসলামের বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করতেন, রাসূলের জীবনী শেয়ার করতেন, তাঁর ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস শেয়ার করতেন। বাসায় এসে সবার পড়ালেখার খোঁজ খবর নিতেন, পড়ালেখার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন। সময় পেলে সবার বাসায় যেতেন, নামায ও পড়ালখাসহ জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে সবসময়ই ভালো করার পরামর্শ দিতেন। আমিসহ আমাদের আত্মীয়-স্বজন সবার জন্য ছিলেন বটবৃক্ষের মতো।

বই পড়তে ও সংগ্রহ করতে ভালোবাসতেন : নানাজিকে দেখেছি সবসময়ই বই সংগ্রহ করতেন ও বই পড়তে ভালোবাসতেন। সুযোগ পেলেই কিছু লিখে রাখতেন। বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা তার বিশাল লাইব্রেরি দেখলেই বোঝা যেত। স্বাধীনতার পর দুর্বৃত্তরা তার লাইব্রেরি একবার পুড়িয়ে দিয়েছিল, বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। এরপর আবার বই সংগ্রহ করে বড় একটি লাইব্রেরি গড়েছেন। প্রায়ই একটা কথা বলতেন- লাইব্রেরি হলো মুসলিমদের হারানো সম্পদ, লাইব্রেরি হলো বাড়ির সৌন্দর্য। নানাজির দেয়া ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষা আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটি বই।

পাংচুয়ালিটি : নানাজি তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক- সকল ক্ষেত্রেই খুবই পাংচুয়াল ছিলেন। যখন যেভাবে যেসময় কমিটমেন্ট দিতেন সেটা পূরণ করতেন। এরকম অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। সেখান থেকে দু’টি শেয়ার করছি। নানাজি এমপি হওয়ার পরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলো। সেখানে সময় দেয়া ছিল বিকেল ৫টা। আমাদের দেশে আমরা প্রায়ই যেটা দেখি সাধারণত প্রধান অতিথি দেরি করে আসেন। এজন্য আয়োজকরা ভেবেছেন দেরি করে শুরু করবেন। কিন্তু নানাজি যেসময় দিয়েছিলেন ঠিক সে সময় পৌঁছে গিয়েছেন। অথচ কেউ হাজির হননি। যাই হোক সেদিন সবাই অনুরোধ করে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই প্রোগ্রাম শুরু করেছিলেন। এটার যে ইম্প্যাক্ট পড়েছিল সেটা হলো- ঐ দিনের পর থেকে ওই গ্রামের সকল লোকেরা এ ধরনের কোনো প্রোগ্রাম হলে, আর যদি সেখানে নানাজি থাকবেন এটা জানত সবাই প্রোগ্রামের নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই পৌঁছাত। আর একটি গল্প শুনেছি আমার মায়ের কাছে। নানাজি তার প্রফেশনাল লাইফের প্রথম দিকে পাবনাতে চাপা মসজিদে ইমামতি করতেন। সেখানে তিনি যতদিন ইমাম ছিলেন কোনদিনও নির্ধারিত সময়ের পরে উপস্থিত হননি, বরং নির্ধারিত সময়েই পৌঁছাতেন এবং এই মসজিদ ছিল বাসা থেকে এক ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার পথ। এই দীর্ঘ পথ নিয়মিত পাড়ি দিয়ে নানাজি ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন : নানাজি প্রথম চেয়ারম্যান হওয়ার পর, মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে তার কাছে আসতেন এবং তার সাধ্য অনুযায়ী মানুষকে সবসময় সহযোগিতা করতেন। একবার একজন লোকের চাকরি সংক্রান্ত একটা কাজে নানাজি সহযোগিতা করেছিলেন। এটার পরে লোকটা নানাজিকে টাকা, মাছ, মিষ্টি বিভিন্ন উপঢৌকন নিয়ে এসেছিলেন। এটা দেখে নানাজি সাথে সাথে বলেছিলেন- এটা নিয়ে যাও। আমি যা করেছি এটা আমার দায়িত্বের কারণে করেছি। এটার জন্য কোনো উপঢৌকন লাগবে না। তুমি এটা নিয়ে যাও। আরেকটা গল্প না শেয়ার করে পারছি না। নানাজিকে রাস্তা তৈরি করার কাজ দিয়েছিলেন। রাস্তা করা শেষে ৮০০ টাকা বেঁচে গিয়েছিল। নানাজি এই টাকা নিয়ে প্রশাসককে ফিরিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। প্রশাসক বলেছিলেন এই টাকা আপনি ফিরিয়ে এনেছেন কেন? তিনি বললেন এই টাকা আমার টাকা না। এটা জণগণের টাকা। এটা আপনি নিয়ে নিন। প্রশাসক বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন আর বলেছিলেন এরকম মানুষ এখনও আছে। নানাজি তার পুরো জীবনে অনেক সুযোগ পেয়েছিলেন, ক্ষমতা পেয়েছিলেন। চাইলেই অনেক কিছুই করতে পারতেন। কিন্তু তার জীবনের সারল্য এটাই বলে অর্থ নয়, সততা আর সারল্য জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

নানাজিকে নিয়ে আসলে আরো অনেক কথা বলার ছিল, তবে আজ শেষ যে কয়েকটি কথা বলে লেখা শেষ করতে চাই- নানাজি তার জীবনের শেষ কয়েকটি দিনে জালিমের কারাগারে থাকা অবস্থায় কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থতার পেছনে বড় কারণ ছিল অবহেলা আর অনীহা। যদিও এগুলো নিয়ে নানাজিকে কখনো কথা বলতে দেখিনি। তবে শেষ পর্যন্ত যখন চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকা মেডিক্যালে আনা হয়, তখনও ২৪ ঘণ্টাই নানাজির হাতে হাতকড়া পরানো থাকতো। এসময় কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে নানাজির সাথে থাকার সুযোগ হয়েছিল। এত কষ্ট আর নির্যাতনের মাঝেও নানাজিকে কখনো হতাশ হতে দেখিন, আফসোস করতে দেখিনি। বরং সবসময়ই আল্লাহর জিকির, কুরআন তেলাওয়াতের মাঝেই সময় পার করেছেন। এভাবে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই ঢাকা মেডিক্যাল হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত এই জার্নি শেষ করেন। আল্লাহ নানাজিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে জায়গা করে দিন।
আমিন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির