সর্বশেষঃ
post

শহীদ আব্দুল মালেক এবং অদম্য এক রিল্যেরেস

আহসান হাবীব ইমরোজ

১৪ জুলাই ২০২২

শহীদ আব্দুল মালেকের জানাজা শেষ। শুভ্র কফিনে শয়ান সেই জ্যোতির্ময় নেতা। ক্ষোভ, শোক আর নীল বেদনার বঙ্গোপসাগর যেন আছড়ে পড়ছে সে সবুজ চত্বরে। কফিনের পাশে হিমালয়ের মতোই স্থির কয়েক যুবক। মুষ্টিবদ্ধ হাত, অস্ফুট কিন্তু কম্পিত ঠোঁট। তারা শহীদের স্বপ্নকে যেকোনো মূল্যে প্রস্ফুটিত করার শপথ নিচ্ছে। ৪৫ বছর পরের ঘটনা। ঢাকার এক সুদৃশ্য লাইব্রেরিতে এক প্রৌঢ় সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। অবলীলায় করছেন সেই ভয়াল ’৬৯-এর স্মৃতিচারণ। চোখে, ঠোঁটে যেন উনিশ-কুড়ি পেরোনো তারুণ্যের লেলিহান আভা।- আমার উপর দায়িত্ব এসেছিল- ফজলুল হক হলের শহীদ মালেকের রুমে তার সংগৃহীত বইয়ের তালিকা করতে। জিজ্ঞেষ করলাম-  কী পেলেন, স্যার? 

তিনি বললেন, প্রায় ৪ হাজারের উপরে বই ও ম্যাগাজিন পেয়েছি। শহীদ মালেক জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক কলাম লিখতেন। তাই রিডার্স ডাইজেস্টসহ আন্তর্জাতিক মানের অনেক ম্যাগাজিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন ও বিশ্লেষণ করতেন। তারা ক’জনা শহীদ মালেকের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, শাহজালালের কবুতরের ডানায় ভর করে সুনীল আসমানে। শাহমাখদুমের  জায়নামাজের মতোই বিস্তৃত মখমল সবুজ জমিনে আর খানজাহান আলীর দীঘির মতোই টলমল জলরাশি, নদী ও নোনা দরিয়ায়। 

দীর্ঘ চার যুগে তিনি ও তার সঙ্গীরা প্রায় চল্লিশের অধিক জেলা ঘুরেছেন। হাজারো, লাখো তরুণের হৃদয়ে ঝঙ্কার তুলেছেন। তাদেরকে জীবন্ত মালেক হওয়ার প্রণোদনা দিয়েছেন। শাহাদাতের মাত্র তেরো দিন আগে ১৯৬৯ সালের ২ আগস্ট শহীদ আব্দুল মালেক ‘নিপা’র উদ্যোগে আয়োজিত নূরখান কর্তৃক প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির উপর আলোচনা সভায় একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। শহীদ আব্দুল মালেকের সেই ভাষণটি হচ্ছে- নতুন ঘোষিত শিক্ষানীতির Ideological Basis সম্পর্কে এখানে আলোচনা হতে যাচ্ছে। এখানে এই Basis সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, Pakistan must aim at ideological unity, not at ideological vacuum it must impart a unique and integrated system of education which can impart a common set of cultural values based on the precepts of islam.’ 

আমার মনে হয় আজকে যারা এখানে আলোচনা করেছেন তাদের পক্ষ থেকে অনেকগুলো অযৌক্তিক বিষয়ের অবতারণাও করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ঈড়সসড়হ Common set of cultural values  বলতে হয়তো কেউ বুঝেছেন One set of cultural values কিন্তু তাদের এটা মনে রাখা দরকার যে, Common set of cultural values মানে One set of cultural values নয়। One set of cultural values সোভিয়েত রাশিয়াতে রয়েছে, যেখানে রয়েছে একটা Authoritarian society আর সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাষ্ট্রগুলো তাদের Culture-কে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে একটা One set of cultural values তৈরি করেছে। আমরা এটার বিরোধী। আমরা এখানে চাই Common set of cultural values not one set of cultural values.

এরপরে পরবর্তী পর্যায়ে আমি আলোচনা করতে চাই আসলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? আমি এখানে অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা না করে শুধুমাত্র মহাকবি Milton-এর একটা কথা আলোচনা করতে চাই। Milton বলেছিলেন, Education is the harmonious development of body, mind and soul.-এর body, mind and soul কোনো Ideology বা কোনো আদর্শ ছাড়া কী করে হতে পারে-যারা ldeological শিক্ষাব্যবস্থা চান না তাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা। 

এরপরে আমি আপনাদের সামনে যে জিনিসটা আলোচনা করতে চাই তা হলো Milton-এর এই সংজ্ঞাকে সামনে রেখে আমরা যদি দেখি, তবে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তি চেতনা এবং সঠিক ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করার মাধ্যমে জাতীয় চেতনা ও জাতীয় মতের সৃষ্টি করা। আর যারা শিক্ষার্থী রয়েছেন তাদের Mental, physical এবং Moral training দিয়ে তাদেরকে এমন একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাতে করে তারা ভবিষ্যতে জনসমষ্টির সাথে একটি Common cultural এবং Ideological basis-এর Bridge তৈরি করতে পারে এবং এরপর এখানকার যে আদর্শ রয়েছে সেটা যাতে ধীরে ধীরে ভবিষ্যতে Increase হতে পারে- এরকমই একটা পরিকল্পনা রয়েছে Milton-এর এই সংজ্ঞার ভেতর। 

ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থার যারা প্রবক্তা তারা আজ পাশ্চাত্য সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন যে, পাশ্চাত্য সমাজে Liberal education -এর নাম দিয়ে যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে সে ব্যবস্থায় শিক্ষিত আমেরিকার একজন Social Philosopher এবং Educationist নিজেই বলেছেন যে, Three kinds of progress are significant : Progress in knowledge and technology, progress in socialization of man and progress in spirituality. The last one in the most important” আর এই ভদ্রলোকের নাম হচ্ছে Albert schezer. তিনি যে বই লিখেছেন তার নাম হচ্ছে The Teaching of Reverence For Life. তিনি বর্তমান আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা Secular এবং Liberal শিক্ষাব্যবস্থা যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সেখানে একটা turning poitn-এ শিক্ষাকে Ideologically orient করার চেষ্টা করতে বলেছেন। এই ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন Our age must achieve spicitual renewal. A new renaissance must come- the renaissance in which mankind discovered that ethical action is the supreme truth and the supreme utilitarianism by which mankind will be liberated." এই Spiritual liberation ছাড়া Mankind -এর কোনো Liberal education হতে পারে না। তিনি এটা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। আমার মনে হয় আর কোনো কথা এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। এ জন্য যে পাশ্চাত্য ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা-তথা Liberal education-এ শিক্ষিত একজন ব্যক্তিই বর্তমান পাশ্চাত্য শিক্ষা সম্পর্কে এ কথাগুলো বলেছেন। 

আমার মনে হচ্ছে যে, পাকিস্তানের বুকে ২২ বছর পর্যন্ত এই Secular এবং ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। আজ এই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সমাজে এমন কতগুলো ম্যাকলের Brain child এবং Brown English তৈরি করেছে-যাদের মুখ থেকে আমরা ধর্মহীন শিক্ষার কথা শুনছি। কিন্তু জেনে রাখা দরকার, এ শিক্ষাব্যবস্থা যখন প্রবর্তন করা হয় আজ থেকে দেড়শ বছর আগে এবং যখন এই শিক্ষাব্যবস্থা Fail করলো মুসলমানদের মধ্যে তখন Sir william hunter-কে এর Assessment করতে দেওয়া হয়েছিল। উনি কী কথাগুলো বলেছিলেন দেখুন। তিনি বলেছেন, “The truth is that our system of public instruction is opposed to the tradition, unsuited to the requirements and hateful to the religion of mussalman.”  

যারা বলেন যে, ইসলামের Ideology কী তাদেরকে আমি বলবো যে, আপনি ইসলামের ইতিহাসের উপর পর্যালোচনা করুন। ইসলামের ইতিহাস দেখে তারপরে বলুন ইসলামের Ideology কী। ইসলামের Ideology বা ইসলামের culture -এর ভিত্তিতে যে সমাজ এবং Society গড়ে উঠেছিল, সেখানে স্থানীয় culture বা স্থানীয় সংস্কৃতিরও দাম ছিল এবং সেসব বিকশিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। Soviet Russia এর মত সেখানে One set of culture করা হয়নি, Common set of culture করা হয়েছিল। 

(এরপর তাঁর বক্তৃতার নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তাকে বক্তৃতা শেষ করতে হয়।)

শহীদ আব্দুল মালেক তাঁর বক্তব্যে বুঝাতে চেয়েছিলেন বর্তমান পৃথিবীতে বড় বড় অশান্তির মূল কারণ হলো শিক্ষিত নেতৃবৃন্দ। যাদের শিক্ষায় আল্লাহভীরুতা নেই, আখেরাতে জবাবদিহিতা নেই। স্রেফ রয়েছে দুনিয়াসর্বস্বতা। ফলে শিক্ষিত মানুষগুলোর মধ্যে মানবীয় গুণাবলির বিপরীতে দানবীয় চরিত্র সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার কোনো ঘাটতি না থাকলেও, সততা ও নৈতিকতার দিক থেকে তাদের অবস্থান অনেকটাই শূন্যের কোঠায়। এই মানুষগুলোই দুনিয়াতে ভদ্রবেশে সকল প্রকার শয়তানি অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। একটি দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করতে  কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক একক ও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর বিকল্প নেই। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের যেকোনো সরকারের জন্য তা অপরিহার্যও বটে। এই দাবিতে সোচ্চার শহীদ মালেকের স্বপ্নদীপ্ত কাফেলার অন্যতম প্রবীণ সদস্য প্রফেসর ড. মীর আকরামুজ্জামানের সৃষ্টিশীলতার প্লাবনে লাখো তরুণের জীবনে এসেছে জাগরণের জোয়ার। কবির ভাষায় বলতে গেলে;

প্রাণে প্রাণে সাহসের সম্ভার; / পিষে চলে বাধাভয় ঝঞ্ঝার- /

আলোকিত পৃথিবীর জন্য; / আধারের বুনিয়াদ ভাঙছে। 

কিন্তু ২০১৭তে এসে সেই নিশানবরদার, রিল্যেরেসের অন্যতম দৌড়বিদ থেমে গেলেন। রওনা হলেন পরম প্রভুর অসীম দরবারে। ’৬৯-এ শহীদ মালেকের কফিনের পাশে মুষ্টিবদ্ধ হাতে তিনিও ছিলেন। প্রফেসর ড. মীর আকরামুজ্জামান রেখে গেলেন তার রিল্যেরেসের ব্যাটনটি। 

- কারা আছেন, প্রফেসর আকরামের রেখে যাওয়া সেই ব্যাটনটি তুলে নেবেন? 

- কারা শহীদ মালেকের চেতনার বাতিঘর পানে দৌড়াবেন?

- নিজ জেলার জরাগ্রস্ত হাজারো যুবকের জীবনের প্রদীপ জ্বালবেন? 

- কারা শহরের হাজারো তরুণের তপ্ত প্রাণে আবেহায়াতের তরঙ্গ তুলবেন?

- কারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধির খরায় প্রজ্ঞার প্লাবন আনবেন?

নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর এই হিমালয়সম দায়িত্ব আমাদের সবার। এটি হতে পারে সদকায়ে জারিয়া; আখেরাতের কামিয়াবির দরিয়া। ইনশা-আল্লাহ

লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও মোটিভেশনাল স্পিকার

আপনার মন্তব্য লিখুন

abid ullah nayem

- 1 month ago

outstanding

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির