post

সম্রাট বাবর : ফারগানা উজবেকিস্তান ও তাঁর সাহিত্য

মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস

১৯ এপ্রিল ২০২৪

জহিরউদ্দীন মুহম্মদ জালালউদ্দীন বাবর মাতুল কুলের দিক থেকে মোঙ্গল বীর চেঙ্গিজ খানের চতুর্দশ ও পিতৃকুলের দিক থেকে তাইমুর লঙ্গের পঞ্চম অধস্তন ছিলেন। প্রশ্ন হলো চেঙ্গিজ তো মুসলিম ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্ববিধ্বংসী দুশমন। তাহলে তার অধস্তন বাবর ছিলেন হানাফি মাজহাবভুক্ত সুন্নি মুসলিম-এটা কিভাবে সম্ভব হলো?

চেঙ্গিজের মুসলিম বিশ্ববিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে প্রবল বিক্ষুব্ধ তাঁর দ্বিতীয় পুত্র চুগতাই খান বুঝেছিলেন শত শত বছরের সাধনালব্ধ অমূল্য সভ্যতা-সংস্কৃতির ধ্বংসসাধন মানবজাতিকেই ধ্বংস করে দেবে। তিনি এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। পবিত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এক নতুন বংশধারার পত্তন করেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলমান।

তার বংশধারা চুগতাই খানাত নামে সুপ্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। তিনি ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির একটি ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি এমনই প্রজারঞ্জক ও জনপ্রিয় শাসক হয়ে ওঠেন যে, তাঁর শাসনাধীনের মানুষেরা নিষ্ঠাবান মুসলিম হয়ে ওঠেন। শুধু তাই নয়;  তাঁর রাজ্যের প্রচলিত তুর্কি  ভাষা ‘চুগতাই তুর্কি’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। তার রাজ্যের সংস্কৃতি চুগতাই সংস্কৃতি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। রাজ্যের অনেক কিছুর সঙ্গে চুগতাই নাম জুড়ে যায়। উল্লেখ্য যে, বাবর এবং তার বংশধরদের মাতৃভাষা ছিল চুগতাই তুর্কি। বাবর তার আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবরী’ লেখেন তাঁর মাতৃভাষা চুগতাই তুর্কিতে। বলাবাহুল্য, আজও তিনি চুগতাই তুর্কি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি এবং সাহিত্যিক।  দেশের নামানুসারে বর্তমানে ওই ভাষাটির নাম উজবেক ভাষা। 

অতি অদ্ভুত ও মজার ব্যাপার হলো বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলে ভারত তথা বিশ্ব ইতিহাসে সুপরিচিত হলেও তিনি তাঁর জন্মভূমি, বর্তমান উজবেকিস্তানে উজবেক ভাষার বহুমুখী প্রতিভাধর কবি ও সাহিত্যিক রূপে সম্মানিত এবং সে দেশে বাবরের সাহিত্যিক মর্যাদা ভারতে রবীন্দ্রনাথের মতো। ওই দেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সর্বনিম্ন স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত তার রচনাবলি ওই ভাষার প্রামাণ্য রচনা ও সাহিত্য হিসেবে অতীব মর্যাদার সঙ্গে পড়ানো হয়।

বহুভাষাবিদ ও বিষয়বিদ মনীষী বাবর

বাবর এক হাতে মসি এবং আরেক হাতে অসি নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার যে, তিনি তার সার্থক এবং বিস্ময়কর সদুপযোগ ঘটিয়েছিলেন। মসি দিয়ে যুগান্তকারী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তো অসি দিয়ে ভুবন জয় করেছেন। বাবরের আত্মজীবনী পড়লে বোঝা যায় তিনি এক বিস্ময়কর মনীষার অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে ভাষাবিদ পণ্ডিত, ভূগোলবিদ, নৃতত্ত্ববিদ, কাব্য-সাহিত্য বিশারদ, সমরতত্ত্ববিদ, লিপি বিশারদ ও ধর্মতত্ত্ববিদ। তার পত্রাবলি অত্যন্ত উচ্চমানসম্পন্ন সাহিত্য। পুত্র হুমায়ুনকে লেখা তার পত্রাবলিতে একজন আদর্শ পিতা, মনীষী ও উপদেশকরূপে প্রতিভাত হন।

তিনি একাধিক ভাষা জানতেন। নিজের মাতৃভাষা ছাড়াও তিনি উত্তম রূপে আরবি-ফার্সি ভাষা জানতেন। ওই যুগে আরবি ছিল জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার প্রধান ভাষা। ফার্সি ভাষা কাব্যিক ও সাহিত্যিক উৎকর্ষতায় আকাশ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। বাবর ইচ্ছা করলে তাঁর আত্মকথা ফারসিতে লিখতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা না করে মাতৃভাষা চুগতাই তুর্কি ভাষায় লিখেছিলেন। ওই সময় চুগতাই সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে অত্যন্ত চড়ড়ৎ ছিল। জনৈক চুগতাইভাষী বিশিষ্ট পণ্ডিত তাঁকে ঠিকই চিনেছিলেন এবং তাঁকে মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনার পরামর্শ দিয়েছিলেন, আর বাবর সেই পরামর্শ শিরোধার্য করে ওই ভাষাতেই সাহিত্যচর্চা করেন এবং তাকে উচ্চস্তরের সাহিত্যচর্চার বাহন করে তুলেছিলেন। এর ফলে তিনি চুগতাই ভাষার ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি রূপে অমর-অক্ষয়-অব্যয় হয়ে আছেন।

লিপিবিশারদ বাবর 

এশিয়া-আফ্রিকার আরব বলয়ের দেশগুলোসহ সমগ্র মধ্য এশিয়ার অনেকগুলো দেশ ইসলাম গ্রহণ করার পর ওই দেশগুলোতে ভাষাসাহিত্যের  ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে যায়। অনেক দেশ কালান্তরে আরবীকে মাতৃভাষারূপে গ্রহণ করে। যারা তা করেনি, তারা তাদের প্রচলিত ভাষার অতীত লিপিগুলো বদল করে আরবী লিপি গ্রহণ করে। অতিরিক্ত ধ্বনির ক্ষেত্রে আরবীর সঙ্গে মিলিয়ে নতুন নতুন লিপি উদ্ভাবন করে। ইরানসহ মধ্য এশিয়ার ক্ষেত্রে এ কথা সমানভাবে সত্য। বাবরের মাতৃভাষা চুগতাই তুর্কির ক্ষেত্রে এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। উত্তরাধিকার সূত্রে বাবর ওই ভাষা-লিপিই পেয়েছিলেন। এই ভাষা ছিল ব্যাপকভাবে আরবী-ফার্সী প্রভাবিত লিপি। ধ্বনিবিশারদ বাবর ওই ভাষার আদি লিপি মূল ধ্বনিসহ সংস্কার করে সেটিকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাষাভাষী সমাজ তা মেনে নেয়নি; বরং প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। পরে, বাবর দুঃখ করে বলেছিলেন, মানুষ তার ভাষার লিপিকেও ধর্মগ্রন্থের মতো পবিত্র মনে করে। কোনো অবস্থাতেই তার পরিবর্তন স্বীকার করে না।

তাইমুরী ঘরানার উজ্জ্বল রত্ন বাবর এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। স্বদেশে-স্বভূমে তিনি মহান কবি ও সাহিত্যিক বলে সম্মানিত, কিন্তু সেখান থেকে হাজার মাইল দূরের ভারতে তিনি মহিমান্বিত মোগল সাম্রাজ্যাধিপতি। মোগল রাজবংশের শাসন ভারতে কয়েক শ’ বছর স্থায়ী হয়। এই রাজবংশ পাক-ভারত-বাঙলা উপমহাদেশকে সমকালীন সময়ের  চেয়ে কয়েক শ’বছর এগিয়ে দিয়েছে। যে ঋণ উপমহাদেশবাসী কোনোদিন শোধ কতে পারবে না। 

লেখক : কথাসাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অনুবাদক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির