সর্বশেষঃ
post

সালাত মানবিক সংস্কৃতির আলোকিত অধ্যায়

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

২৯ জুলাই ২০২২

প্রথম পর্ব

সালাত মুমিন জীবনে একটি অপরিহার্য ইবাদত। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে মুক্তির অন্যতম প্রধান সোপান এটি। সালাত আদায়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে বান্দার গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। বিচ্ছুরিত হয় মানবিক সংস্কৃতির বিশুদ্ধ আলো। নামাজের আরবি শব্দ সালাত। সালাত শব্দের শাব্দিক অর্থ দরূদ বা শুভকামনা করা, তাসবিহ বা পবিত্রতা বর্ণনা, রহমত বা দয়া, করুণা কামনা করা, ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। তা ছাড়া কথা এবং স্থান, কাল পাত্র ভেদে সালাত বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। সালাতের পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে- ‘নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ইবাদত আদায় করার নাম সালাত’। সুস্থ, বিবেকবান, বুদ্ধিসম্পন্ন, শারীরিক দিক দিয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিগণের ওপর সালাত আদায় করা অপরিহার্য। যারা পবিত্র আমেজ ও আবেগ-অনুভূতিতে জগতের সীমানা ভেদ করে আরশে আজিমে সিজদাহ পৌঁছাতে পারে, তারাই সালাতকে প্রাণবন্ত বা জীবন্ত করে তুলতে পারে। এমন নামাজই মানুষের চিন্তা-চেতনা ও ঈমানি জীবনকে পূর্ণতা দান করেন। যখন কোনো নামাজি ব্যক্তির জীবন থেকে এক ওয়াক্ত সালাত ক্বাজা হয়, তখন তার জীবনে শূন্যতা বোধ হয়। এই শূন্যতা তার মাঝে সৃষ্টি করে চরম মানসিক দুশ্চিন্তা। জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে পারলে মানসিক পরিতৃপ্তি আসে। এটাই ঈমান, এটাই বিশ্বাস, আত্মজিজ্ঞাসার জবাব। প্রকৃত আত্মজিজ্ঞাসার জবাব হলো আল্লাহর অস্তিত্বকে বিশ্বাস করা। এই বিশ্বাস একমাত্র সালাতের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। আর সালাতই হলো মানবিক সংস্কৃতি বিকাশের প্রধানতম সিঁড়ি।

জীবনের অপরিহার্য সংস্কৃতি সালাত

তাওহিদ ও রিসালাতের বিষয়ে সাক্ষ্যদানের পর একজন মুসলমানের প্রধানতম কর্তব্য হলো সালাত আদায় করা। সালাতের গুরুত্ব ইসলামী বিধানে সর্বাধিক। এটাকে ইসলামের মৌলিক ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনের জন্য ফরজ (সূরা নিসা : ১০৩)। তোমরা রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু কর।’ (সূরা বাকারা : ৪৩)। ‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সূরা আনকাবুত : ৪৫)। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে যত নিয়ামত দান করেছেন, সব নিয়ামতই জিবরাইল ফেরেশতার মাধ্যমে দান করেছেন। কেবল সালাত তিনি মিরাজের রজনীতে প্রিয় বন্ধু হজরত মুহাম্মদ সা.কে উপহারস্বরূপ প্রদান করেন। তাই ইসলামী শরিয়তে সালাতের গুরুত্ব ও ফজিলত অনেক বেশি। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘মুমিন ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত বর্জন করা।’ (মুসলিম)। আল্লাহর নিকট বান্দার আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হলো সালাত। সালাতের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভ করতে পারে। দিনরাত ৫ ওয়াক্ত সালাত সঠিকভাবে আদায় করলে মানুষ সব ধরনের পাপ থেকে রক্ষা পায়। 

কোনো ব্যক্তি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে এক কালিমার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার পরপরই রাসূল সা. তাকে সালাতের তালিম দিতেন। এমনকি রাসূল সা. আরবের বিভিন্ন গোত্রের নামে যেসব বাণী প্রেরণ করেছিলেন তাতে সালাত মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্যরূপে পুনঃপুন উল্লেখ করেছেন। তিনি নবুওয়াতের ২৩ বছরে সালাতের প্রতি অধিক তাগিদ করে গেছেন। ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্তে শেষ অসিয়তস্বরূপ সালাতের কথাই উল্লেখ করে বলেছিলেন সালাত এবং তোমাদের দাস-দাসীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। বুখারির একটি হাদিসে প্রিয়নবী সা. সালাতকে জাকাত, হজ এবং সাওম নামক রুকনের আগে স্থান দিয়ে ইরশাদ করেন, ইসলাম পাঁচটি বুনিয়াদের ওপর স্থাপিত। সেগুলো হলো ‘এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া, এক. আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই, হজরত মুহাম্মদ সা. আল্লাহ তায়ালার বান্দা ও রাসূল। দুই. পাবন্দীর সঙ্গে সালাত আদায় করা, তিন. জাকাত দেওয়া, চার. হজ করা, পাঁচ. রমাদানের রোজা রাখা’। সালাত প্রতিষ্ঠা মানে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা। সালাতকে অস্বীকার করা মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। রাসূলুল্লাহ সা. এ ব্যাপারে বলেছেন- ‘যে সালাতকে প্রতিষ্ঠা করল, সে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করল। আর যে সালাতকে বিনষ্ট করল, সে দ্বীনকেই বিনষ্ট করল’। 

হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে দশটি বিষয়ে অসিয়ত করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম বিষয় ছিলো, ‘কোনো অবস্থাতেই ফরজ সালাত ত্যাগ করা যাবে না। কেননা, যে ইচ্ছে করে ফরজ সালাত ত্যাগ করে, আল্লাহ তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন না’। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির এক ওয়াক্ত সালাত ক্বাজা হয়ে গেল তাহার সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত ধন দৌলত যেন লুণ্ঠিত হয়ে গেল’। রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যথারীতি সালাত আদায় করে আল্লাহ তায়ালা তার সালাতের বদলে, পাঁচটি বিশেষ সম্মান দান করেন। ১. নামাজির অভাব দূর করেন, ২. কবরের আজাব দূর করেন, ৩. কিয়ামতের দিন ডান হাতে আমলনামা দিবেন, ৪. বিদ্যুতের ন্যায় পুলসিরাত পার করবেন, ৫. যথারীতি সালাত আদায়কারী বিনা হিসেবে বেহেস্তে প্রবেশ করবেন। যে ব্যক্তি নামাজে অলসতা করে সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তায়ালা ১৪টি শাস্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। পাঁচটি ইহজগতে, তিনটি মৃত্যুর সময়ে, তিনটি কবরে ও তিনটি কবর হতে বের হবার পর হাশরের ময়দানে’।

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তির বাড়ির সামনে একটি নহর প্রবাহিত থাকে এবং সে প্রতিদিন ৫ বার ওই নহরে গোসল করে, তবে তার শরীরে কি কোনো ময়লা থাকবে? সাহাবাগণ বললেন, না থাকবে না। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের অবস্থা এরূপ যে, আল্লাহ তায়ালা তার বদৌলতে গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন। (বুখারি)। হযরত আবু যর রা. বলেন, একবার শীতকালে রাসূলুল্লাহ সা. বাইরে তাশরিফ আনলেন। তখন তিনি দেখলেন, গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ছে। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘হে আবু যর! মুসলমান বান্দা যখন ইখলাসের সঙ্গে সালাত আদায় করে তখন তার গুনাহসমূহ এমনভাবে ঝরে যায়, যেমনভাবে এই গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ছে।’ (মুসনাদে আহমদ)। রাসূলুল্লাহ সা. আরও বললেন, সালাত জান্নাতের চাবি। 

রাসূলুল্লাহ সা. সাত বছর বয়সে সন্তানদের সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়ার জন্য এবং দশ বছর বয়সে তা আদায় না করলে তাদের শাসন করার জন্য অভিভাবকদের আদেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে’। ইবাদতের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে সালাত বা নামাজ। শুদ্ধভাবে সালাত বা নামাজ আদায় আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের নিশ্চয়তা দেয়। ‘হযরত রাসূলে পাক সা. বলেছেন, আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আমার উম্মতের জন্য সালাত ফরজ করেছেন এবং রোজ হাশরে সর্বাগ্রে একমাত্র সালাতের হিসেব নেওয়া হবে।’ ‘যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামাজ) রুকু সিজদা ও অজু সমেত আদায় করল তার জন্য দোজখ হারাম হয়ে যায়।’ ‘দেহের জন্য যে রূপ রক্ত, দ্বীনের জন্য তেমন সালাত।’ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন- “অতএব সেসব নামাজির জন্য জাহান্নামের ‘ওয়ায়েল’ নামক কূপ নির্ধারিত হয়ে আছে, যারা স্বীয় সালাতে অমনোযাগী।” 

একজন মানুষ মুসলিম কি অমুসলিম তা সালাত দ্বারাই বাহ্যতভাবে চেনা যায়। সালাত দীনের খুঁটি। খুঁটি ব্যতিরেকে কোনো ইমারত যেমন টিকে থাকতে পারে না ঠিক তেমনিভাবে সালাত ব্যতিরেকে মানুষের ঈমান ও ইসলামও টিকে থাকতে পারে না। হযরত রাসূলে আরাবি সা. বলেন, ‘ইসলামের খুঁটি হচ্ছে সালাত, কিয়ামতের দিনে সর্বাগ্রে সালাতের হিসাবই গ্রহণ করা হবে’। তিনি আরও ইরশাদ করেন : ‘কিয়ামত দিবসে বান্দাদের কাছ থেকে সর্বপ্রথম যে জিনিস সম্পর্কীয় হিসাব গ্রহণ করা হবে সেটি হলো সালাত’। সালাতের হিসাব যদি ভালো ও মঙ্গলজনক হয় তবে সে সফলতা লাভ করবে। আর যদি মন্দ হয় তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (তিরমিজি) কোনো ব্যক্তির যদি জীবনে এক ওয়াক্ত সালাত ছুটে যায় তাহলে বুঝতে হবে তার জীবন থেকে অনেক বড় একটি অংশ ছুটে গেছে। হযরত নাওফাল ইবনে মুআবিয়া রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তির এক ওয়াক্ত সালাত ছুটে গেল তার যেন পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ সবকিছু লুণ্ঠিত হয়ে গেল। (তিরমিজি) সালাত এমন একটি বিধান যা শরিয়তের মাপকাঠি যে বয়স থেকে একজন ব্যক্তির ওপর বর্তায় তখন থেকে সবার সঙ্গে সমানভাবে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ নারী, পুরুষ, ধনী, নির্ধন, রাজা, প্রজা, আমলা, কর্মচারী, যুবক, বৃদ্ধ, সুস্থ, অসুস্থ-সবার ওপর সমানভাবে ফরজ। এটি এমন ইবাদত যা কোনো ব্যক্তি থেকে সামান্য জ্ঞান থাকা অবস্থায় কোনোভাবেই রহিত হয় না। এ ফরজ পালনে যদি দাঁড়ানোর মতো শক্তি না থাকে তা হলে বসে বসে হলেও আদায় করতে হয়। যদি বসে আদায় করার মতো শক্তিও না থাকে তা হলে শুয়ে হলেও আদায় করতে হয়। কারোর পক্ষে যদি মুখ দ্বারা শব্দ উচ্চারণ করা অসম্ভব হয় তাহলে হাতের ইশারা দ্বারা হলেও সালাত আদায় করতে হয়। যাত্রাপথে কোথাও যাত্রাবিরতি দিয়ে সালাত আদায় করার সুযোগ না থাকলে গাড়িতে চলার পথে হলেও সালাত আদায় করে নিতে হয়। যদি ব্যক্তি কোনো সাওয়ারির ওপর থাকে তাহলে সাওয়ারি যেদিকে মুখ করে চলছে সেদিকে ফিরে হলেও সালাত আদায় করে নিতে হয়। এক কথায় কোনো অবস্থাতেই সালাত মাফ নয়। তবে মহিলাদের বিশেষ অবস্থায় সালাত মাফ করা হয়েছে। সে সময় সালাত আদায় না করাই তাদের জন্য ইবাদত। 

সালাতে খুশু-খুজু মানবিক সংস্কৃতির প্রাণ

সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত। একদা এক লোক মসজিদে নববীতে প্রবেশ করল, রাসূলুল্লাহ সা. সেখানে বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. তার সালাত দেখে বললেন, ‘মনোযোগ সহকারে দাঁড়াও, অতঃপর রুকু কর। অতঃপর স্থির হয়ে বস। এরপর আবার সিজদা কর এবং সিজদায় গিয়ে স্থির হও। এভাবে বাকি রাকাতও সম্পন্ন করে সালাত শেষ কর।’ মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবু দাউদ ও জামে তিরমিজির বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি সালাতের রুকু সিজদায় পিঠ সোজা করে না, তার সালাত তার জন্য যথেষ্ট নয়।’ আর এক রেওয়ায়েত মতে, ‘যে পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি তার রুকু ও সিজদায় স্বীয় পিঠ সোজা না করবে। সে পর্যন্ত তার সালাত অসম্পূর্ণ থাকবে।’ আরেক হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চুরি হলো সালাতে চুরি করা।’ নিবেদন করা হলো, সালাতের কিভাবে চুরি করা হয়? তিনি বললেন, ‘যথাযথ নিয়মে রুকু-সিজদা আদায় না করা এবং সহিহ শুদ্ধভাবে ক্বিরাত না পড়া’। 

সুতরাং, সালাতে মনোযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সালাত এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এ ইবাদত আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার অনন্য একটি মাধ্যম। কিন্তু সালাত আদায়ে আমাদের মনোযোগের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। একনিষ্ঠতা ও খুশু-খুজু ছাড়া সালাত কখনো আল্লাহ কবুল করবেন না। সালাতে পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ সাধনে পাঁচটি কৌশল রয়েছে। 

প্রথমত, অন্তরের মধ্যে এই অনুভব করা যে এটা তার শেষ সালাত। মৃত্যু এমন একটি বিষয় যা কখন আসে বলা যায় না। দুনিয়া এখন গ্লোবাল ভিলেজের মাধ্যমে হাতের মুঠোয়, কিন্তু মৃত্যু এর বাহিরের একটি অজানা-অধরা বিষয়। সালাতে যখন দাঁড়াবে তখন এটা অনুভব করতে হবে এটাই বিদায়ী সালাত। রাসূল সা. বলেছেন, যখন তুমি সালাতে দাঁড়াও তখন তুমি বিদায়ী সালাত আদায় কর। (মুসনাদে আহমদ)। হতে পারে এটি জীবনের শেষ সালাত। 

দ্বিতীয়ত, এ অনুভব করা সালাত হলো আল্লাহর সঙ্গে বান্দার কথোপকথনের মাধ্যম। সালাতের মাধ্যমে গোলাম ও মনিবের মাঝে কথা বলা যায়। যদিও সেটা আমাদের শ্রবণ হয় না, তবুও এ মনোভাব ধারণ করতে হবে অন্তর দ্বারা আমরা কথা বলছি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দা যখন সালাত আদায় করে তখন তা আমি আধা-আধি ভাগ করি এবং তার কথার উত্তর দিয়ে থাকি। (বুখারি) বান্দা যখন বলে, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি এই বিশ্বজগতের মালিক। তখন আল্লাহ বলেন, বান্দা আমার প্রশংসা আদায় করেছে। এভাবে প্রতিটি কথার উত্তর দিয়ে থাকেন। এই অনুভবটা অন্তরের মধ্যে লালন করতে পারলে সালাতে মনোযোগ বৃদ্ধি হবে। 

তৃতীয়ত, ধীরস্থির হয়ে সালাত আদায় করা। সালাত মুমিন জীবনে সবরের শিক্ষা দেয়। সালাত নম্র-ভদ্র হয়ে বিনয়ের সাথে আদায় করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, মুমিনরা তাদের সালাতে বিনয়ী অবলম্বন করে। (সূরা মুমিনুন : ২) যত্নসহকারে সালাত আদায় না করলে সালাতে মনোযোগ সাধন হবে না। ক্বিরাত, রুকু ও সিজদায় ধীরস্থিরতা অবলম্বন করতে হবে। রাসূল সা. বলেছেন, লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চোর ওই ব্যক্তি যে, ধীরস্থিরভাবে সালাত আদায় করে না ও রুকু সিজদায় দেরি করে না। (তিবরানি) তাসবিহ তাহলিলগুলো অর্থসহ জানার মাধ্যমে ধীরস্থিরভাবে সালাত আদায় করতে হবে; যার ফলে মনোযোগ অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ার সুযোগ থাকবে না। 

চতুর্থত, এ অনুভব করা- আমি আল্লাহর সঙ্গে দেখা করছি। আল্লাহ তায়ালা সার্বক্ষণিক আমাদের প্রতি দৃষ্টি রাখেন কিন্তু দুনিয়ার কোনো চর্মচক্ষু দ্বারা তাকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব না। সালাতের ক্ষেত্রে রাসূল সা. বলেছেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এমনভাবে, যেন তাঁকে তুমি দেখতে পাচ্ছ। আর যদি দেখতে না পাও, তবে তিনি যেন তোমাকে দেখছেন। (বুখারি, মুসলিম) আল্লাহর সামনে যখন মাথানত করতে হয় তখন এই ভয়ে করতে হবে তিনি যেন আমাকে দেখতে পাচ্ছেন। পৃথিবীর সব চোখ এড়ানো যায় কিন্তু আল্লাহর চোখ কখনো এড়ানো সম্ভব নয়। বান্দা যখন সিজদা দেয় তখন আল্লাহর কুদরতি পায়ের উপরে সিজদা দেয়। সুতরাং এক্ষেত্রে খুবই সজাগ থাকতে হবে। এই অনুভব লালন করতে পারলে ভয় বৃদ্ধি পাবে ও পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ সাধন হবে। 

পঞ্চমত, পূর্ববর্তীদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। পূর্ববর্তী হলো- সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি, তাবে-তাবেইন ও বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার। কারণ তারা সর্বত্র আল্লাহকে বেশি ভয় করে এবং তাদের মতের ভিত্তিতে অসংখ্য মাসয়ালার সমাধান হয়ে থাকে। রাসূল সা. যেভাবে সালাত আদায় করতেন সাহাবায় কেরাম তা নিজ চোক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাদের থেকে ধারাবাহিকভাবে আলেমরা শিক্ষা লাভ করেছেন। তাদের এই শিক্ষার আলোকে দৈনন্দিন জীবনে অনুসরণ করতে পারলে খুশু-খুজু, বিনয়ীভাব ও পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ লাভ সম্ভব হবে। (চলবে)

লেখক : কবি ও গবেষক; প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির