post

স্বৈরাচার পতনে গণ অভ্যুত্থান

এইচ এম জোবায়ের

০৯ এপ্রিল ২০২৩

প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে ধপ করে জ্বলে ওঠে। একেবারে নিভে যাওয়ার এটা একটা পূর্বাভাস বা ‘সাইন-সিম্পটম’। স্বৈরাচারী শাসকের পতনও অনেকটা প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্তের অবস্থার মতো হয়। দুনিয়ার তাবৎ স্বৈরাচারদের পতন কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পথ গলিতেই হয়েছে। সরকার পতনের আগ মুহূর্তের কার্যকলাপও সব স্বৈরাচারের প্রায় অভিন্ন হয়ে থাকে। আজ স্বৈরাচারী শাসন এবং তার পতন কিভাবে কোন পথে হয় তা জানার চেষ্টা করবো। তার আগে সরকার নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বক্তব্যটা একটু জেনে নিই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্র এবং সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা। অধ্যাপক লাস্কি বলেছেন, ‘সরকার হলো রাষ্ট্রের মুখপাত্র। সরকার হলো একটি যন্ত্রবিশেষ। যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার কার‌্যাবলি সুসম্পন্ন করে থাকে।’ সরকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্র তার ইচ্ছাসমূহের বাস্তবায়ন ঘটায়। কেউ কেউ সরকারকে রাষ্ট্রের মস্তিষ্ক বলে থাকেন। সরকারই রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। সুতরাং সরকারের গতি-প্রকৃতির উপর রাষ্ট্রের সুনাম-সুখ্যাতি নির্ভর করে। সরকার পদ্ধতিতে গণতন্ত্র হলো- জনসাধারণের দ্বারা, জনসাধারণের কল্যাণের জন্য পরিচালিত ও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থার নাম। তাই সরকার যদি গণতান্ত্রিক হয় তবে তা রাষ্ট্রের প্রতিটি অর্গানের জন্য কল্যাণকর হতে পারে। পক্ষান্তরে সরকার যদি অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী হয় তবে তা সকলের জন্য বা অধিকাংশের জন্যই অকল্যাণ বয়ে আনে। একটি সরকারব্যবস্থাকে কখন আমরা গণতান্ত্রিক বলতে পারি? যে সরকারব্যবস্থায়- রাজনৈতিক সাম্যকে গুরুত্বদান করা হয়, শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তন হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনব্যবস্থা থাকে, সংখ্যালঘুর অধিকারের স্বীকৃতি ও রক্ষা হয়, শাসনতন্ত্র ও নিরপেক্ষ আদালতের প্রাধান্য থাকবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, ভোটদানের স্বীকৃতি ও বাস্তবায়ন থাকবে। থাকবে দল গঠন, মত প্রকাশ ও সমালোচনার অধিকার। উক্ত ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারসমূহ আইনগতভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এসব বৈশিষ্ট্যের মানদণ্ডে বিচার-বিশ্লেষণ করলে আমরা যে কোন দেশের সরকার গণতান্ত্রিক কি না তা বলে দিতে পারবো। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এবং জনপ্রিয় কোন সরকারও ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারে পরিণত হতে পারে। ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে স্বৈরতন্ত্রের অধীন শাসনব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশ এখন  স্বৈরশাসনের অধীন এবং সেখানে এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদণ্ড পর্যন্ত মানা হচ্ছে না। তাই জানা জরুরি যে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে কখন  স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। স্বৈরতান্ত্রিক সরকার চেনার লক্ষণসমূহ নি¤েœ আলোকপাত করা হলো। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং গণমাধ্যমকে ভয় দেখানো হলো তাদের প্রথম বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে তারা সরকারপন্থী গণমাধ্যম সৃষ্টি করে এবং সংবাদ প্রকাশে সেন্সর আরোপ করে। স্বাধীন মতপ্রকাশের সকল মাধ্যম কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করে। মিছিল ও সভা-সমাবেশসহ বিরোধীদের যেকোনো জমায়েতকে তারা রীতিমতো ভয় পায়। বিরোধীদের হয়রানি, মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার ও জেল-জরিমানা তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিরোধী মত দমনে তারা রাষ্ট্রীয় সকল বাহিনী এবং আদালতকে ব্যবহার করে। এর আগে নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে আইন-আদালত সরকারের ফরমায়েশি ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের বিচার বিভাগ সবসময় একপাক্ষিক রায় প্রদান করে। স্বৈরশাসন রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহের দলীয়করণ নিশ্চিত করে। ফলে রাষ্ট্রের কোনো অর্গান সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না। স্বৈরাচারী সরকার তার চারপাশে এমন কিছু খয়ের খাঁ পয়দা করে রাখে যারা সব সময় সব কাজে সরকারকে ভূয়সী প্রশংসা করতে থাকে। এরা ব্যক্তি ও গ্রুপ উভয়ই হয়ে থাকে। সরকার বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্ট এ গ্রুপগুলোকে বিশেষ রাজনৈতিক ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকে। এরা বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সুশীল, ব্যবসায়ী মহল বা প্রেশার গ্রুপ ও ইন্টারেস্ট গ্রুপের ব্যানারে স্বৈরাচারের পক্ষে কাজ করে। সরকার জনগণকে সর্বদা ‘জুজুর ভয়’ দেখাতে থাকে। তারা বলে, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য তাদের কোনো বিকল্প নাই। বিরোধীরা আসলে দেশ ও দেশের মানুষের ক্ষতি হবে, দেশের উন্নতি-অগ্রগতি থমকে দাঁড়াবে। একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে এরা সব থেকে বেশি ভয় পায়। ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতায় থাকার নানান ফন্দি ফিকির বের করে। আজ্ঞাবহ ও দলীয় অনুগত লোকদের মাধ্যমে নামকাওয়াস্তে নির্বাচন কমিশন গঠন করে, যাদের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় রাষ্ট্রের অন্যান্য অর্গান ও বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনকালীন সময়ে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয় যেখানে বিরোধীরা নির্বাচন করতে পারে না। ভীতিকর পরিবেশের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার নির্বাচন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয় এবং পুনরায় ক্ষমতায় বসে। 

মূলত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভবের সময়কাল ধরা হয় ১৬০০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত সময়কালকে। এই আধুনিকালেও মানুষ মানুষের অধিকার হরণ করে, কেড়ে নেয় ভোটাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। একসময় মানুষের প্রধানতম শত্রু ছিল বনের হিং¯্র জন্তু-জানোয়ার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এরপর মানুষ ধীরে ধীরে ক্ষমতাবান হয়ে উঠে এবং লোভ ও ক্ষমতা হয়ে উঠে মানুষের প্রধান শত্রু। ক্ষমতার লোভ মানুষকে সিংহের চেয়ে ভয়ঙ্কর, হায়েনার চেয়ে হিং¯্র, এবং বন্য কুকুরের চেয়ে উন্মত্ত করে তোলে। ফলে দেশে দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারদের অনেকে ক্ষমতার লোভ সামলাতে না পেরে প্রথমে একনায়কতন্ত্র তারপর  স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে ধাবিত হন। তারপর নিজের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য একে একে সম্ভাব্য সব প্রতিবন্ধকতা (!) দূর করতে মনোযোগী হন। ক্ষমতার লোভে তারা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। নিজের আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে বিরোধী দল পর্যন্ত সব জায়গায় নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত আচরণ করেন। স্বীয় প্রয়োজনে মানুষ হত্যা ও গুমসহ নানান নাটক মঞ্চায়ন করেন। 

রাষ্ট্রের চারটি উপাদানের একটি হলো সরকার। আর সরকারের উপাদান তিনটি। আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ। স্বৈরাচার এই তিনটি বিভাগের উপর নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন এবং প্রয়োজনবোধে আইন সংশোধন বা রদবদল করে থাকে। আইনসভা প্রণীত আইনের দ্বারাই শাসন ও বিচার বিভাগ পরিচালিত হয়ে থাকে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আইনসভা গঠিত হয়। স্বৈরশাসক আইনসভায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমত, তিনি দলীয় এমন লোকদের আইনসভায় যাওয়ার জন্য মনোনয়ন দেন যারা নিরঙ্কুশভাবে তার প্রতি অনুগত, অন্ধ অনুসারী। ক্ষেত্র বিশেষ তারাই মনোনয়ন পান যাদের পেশিশক্তি অন্যদের চেয়ে বেশি, বৈধ-অবৈধ অঢেল সম্পদের মালিক। দ্বিতীয়ত, তিনি এসব তথাকথিত আইন প্রণেতাদের দিয়ে এমনসব আইন পাস করিয়ে নেন যা সামগ্রিকভাবে দেশ ও মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে নিজ ও নিজ দলের কল্যাণে বেশি কাজে লাগে। দুনিয়ার অনেক স্বৈরশাসকই নিজের মসনদ টিকিয়ে রাখতে, গণতান্ত্রিক অধিকার ও চর্চাকে সংকুচিত করতে এবং বিরোধী দল-মত দমনে এমনসব আইন প্রণয়ন করেছে যা নিজ দেশের পাশাপাশি দুনিয়াব্যাপী কালো আইন হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে জাতীয়-আন্তর্জাতিক অনেকে সে রকমই একটি কালো আইন হিসেবে সমালোচনা করেছেন। শাসন বিভাগ বা নির্বাহী বিভাগের মূল কাজ হলো শাসন সংক্রান্ত কাজ। এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, আইন প্রণয়ন এবং বিচার সংক্রান্ত কাজও শাসন বিভাগকে করতে হয়। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ স্বাধীন হলেও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে নির্বাহী বিভাগের হাতে বাকি দুটি বিভাগ জিম্মি হয়ে পড়ে। আইন প্রণয়ন ও পাস, আইন প্রয়োগ ও রক্ষা সবই নির্বাহী বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। বিচার বিভাগের অনেক কাজের মধ্যে মূল কাজ হলো সংবিধানের ব্যাখ্যা প্রদান এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করা। দুনিয়ার সব স্বৈরাচারেরাই বিচার বিভাগকে কলুষিত করেছে, রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে আদালতকে ব্যবহার করেছে। বিচারক নিয়োগে অনিয়ম এবং আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার করা তাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এবার আসি দুনিয়াব্যাপী গণ আন্দোলন গণবিক্ষোভ এবং গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিছু স্বৈরাচারদের পতনের গল্পের দিকে। 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক বিশ্বের যেসব দেশে বিগত কয়েক দশকে গণ আন্দোলন-গণবিক্ষোভ হয়েছে সেগুলোর ওপর গবেষণা চালিয়েছেন। এই গবেষণার ভিত্তিতে তিনি বলেছেন, কোন জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যদি গণবিক্ষোভে যোগ দেন, তাতেই তারা সফল হতে পারেন। যদি কোনো দেশের লোকসংখ্যা ষোল কোটি হয় তবে আটচল্লিশ লক্ষ মানুষকে গণবিক্ষেভে ফেটে পড়তে হবে। বিগত কয়েক দশকে বিশ্বে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর সফল আন্দোলনের অনেক নজির আছে। ১৯৮০-এর দশকে কমিউনিস্ট শাসনামলের পোল্যান্ডে হয়েছিল সলিডারিটি আন্দোলন। এর নেতৃত্বে ছিল শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলো। চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশের পতন ঘটেছিল গণ আন্দোলনের মুখে। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয় সফল আন্দোলনের মাধ্যমে। একেবারে অতি সাম্প্রতিককালের উদাহারণও আছে। আরব বসন্তের সূচনালগ্নে তিউনিসিয়ায় স্বৈরশাসক জিনে আল-আবেদিন বেন আলীকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়। সেখানে এই গণ অভ্যুত্থানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘জেসমিন বিপ্লব’। আরব বসন্তের ধাক্কায় ২০১১ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে মিসরে হোসনে মোবারকের ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয়। ২০১১ সালেই পতন ঘটে লিবিয়ার একমাত্র স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির। তিনি ৪২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। সুদানে আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে ওমর আল-বশিরকে। একইভাবে আলজেরিয়ায় ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকাকে। আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে এসব সফল গণ আন্দোলন। আর এই আন্দোলনের পথ ধরে এসব দেশে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে।

শক্তি বা ক্ষমতা নদীর বহমান স্রােতের ন্যায়। কখনও কোনোকালে তা এক জায়গায় একজনের হাতে স্থির ছিল না। নমরুদ-ফেরাউনদের নাম আজ মানুষ ঘৃণাভরে স্মরণ করে। তাই ক্ষমতাকে চিরকাল আঁকড়ে ধরে থাকার মানসিকতা এক ধরনের বাতুল মানসিকতার পরিচয়, যা কখনোই সম্ভব নয়। বরং যতদিন ক্ষমতা থাকে ততদিন সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত কল্যাণ। 

লেখক : সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির