post

হতাশার কালোমেঘ রবের নৈকট্য লাভের হাতছানি

তৌহিদুল ইসলাম আকবর

১৭ এপ্রিল ২০২৪

একখণ্ড কালো মেঘের মতো অনেক সময় হতাশা আমাদের হৃদয়ের আকাশে জমে থাকে। যা আমাদের পেরেশান করে তোলে। এর ফলে আমরা পিছিয়ে যাই আমাদের আসল কাজ থেকে। এজন্য সামনের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে আপনার হতাশা এখনি ঝেড়ে ফেলুন, আর রবের নৈকট্য লাভে নিজেকে প্রস্তুত করুন। আল্লাহ তায়ালা হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-

হে নবী! আপনি বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেরে ওপর যুলুম করেছ। তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। (সূরা জুমার, আয়াত : ৫৩)

আল্লাহ তায়ালার পানে ধাবিত হলে তিনি সকল প্রকার অপরাধ ও পাপ মিটিয়ে দেবেন। যার ফলে প্রশান্তিতে হৃদয় পূর্ণ হয়ে যাবে। আবু হুরায়রাহ (রা.) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি সেইরূপ, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি, যখন যে আমাকে স্মরণ করে। আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার তওবায় তোমারে মধ্যে সেই ব্যক্তি অপেক্ষা বেশি খুশি হন, যে তার মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া বাহন ফিরে পায়।” (বুখারী ও মুসলিম)

আল্লাহ তায়ালা  মূসা আলাইহিস সালামের এক  অনুসারীর  ব্যাপারে সংবাদ দিয়ে বলেন-

অর্থাৎ “আমি আমার ব্যাপার আল্লাহকে সোপর্দ করছি। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন। অতঃপর আল্লাহ তাকে ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন এবং কঠিন শাস্তি ফিরআউন সম্প্রায়কে গ্রাস করল।” (সূরা আল মুমিন, আয়াত : ৪৪-৪৫)

কখনো বিষণ্ন হবেন না

আল্লাহর দিকে আপনার অগ্রসর যদি মন্থর হয়, তবুও আপনি ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম  যে এখনো যাত্রাই শুরু করেনি। তাই আপনি বিষণ্ন হবেন না। হতাশাকে মাড়িয়ে রবের দিকে ফিরে আসা মুমিনদেরকে আল্লাহ তায়ালা বারবার অভয় দিয়ে বলেন-

আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে কিংবা নিজের প্রতি যুলুম করবে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে পাবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা নিসা, আয়াত : ১১০)

মালেক ইবনে দিনার বলেন; আমি হাসান বসরীর সাথে একটি জানাজায় ছিলাম। তিনি শুনতে পেলেন একজন আরেকজনকে বলছে, এই মৃত ব্যক্তি কে? হাসান বসরী বলে উঠলেন; এই মৃত্য ব্যক্তি আমি আর তুমি। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আমার জন্য এরচেয়ে উত্তম উপদেশ আর কী হতে পারে?  যদি আমার হৃদয়ের স্পন্দন বাকি থাকে। কিন্তু তুমি যদি কোনো জীবিতকে ডাকো তাহলেই তাকে শোনাতে পারবে। কিন্তু তুমি যাকে ডাকছো, সে তো মৃত! কাজেই পাগলামি এবার বন্ধ করো। অনুতপ্ত হওয়ার দিন আসার আগেই। অর্থ সম্পদ বিসর্জন ও আত্মীয়-স্বজনের বিচ্ছেদের জন্য এখনি কেঁদে নিন এবং ঘুমন্তদের সারি থেকে ওঠে আল্লাহকে বলুন; হে আমার রব, আমি অনুতপ্ত!  উদ্দেশ্য হাতছাড়া হওয়ার আগেই মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হোন। কবরগুলোকে জিজ্ঞেস করুন তার অধিবাসীদের সম্পর্কে। কবরবাসীদের ব্যাপারে কবরগুলোকে জিজ্ঞেস করুন। যৌবনের পর কি বার্ধক্য ছাড়া আর কিছু আছে? সুস্থতার পর কি আছে রুগ্ণতা ছাড়া? আজকে আপনি আনন্দ ফুর্তি করছেন? আগামীকাল হয়তো আপনি কবরের অধিবাসী হয়ে যাবেন। আজকে আপনি ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে আছেন। আগামীকাল হয়তো আপনি মৃত্যুবরণ করবেন। হ্যাঁ এটাই সত্যি! হে সুস্থতা নিয়ে অহংকারী ব্যক্তি!  আপনি কি দেখেননি, কোনো অসুস্থতা ছাড়াই কত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে? হে দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন ব্যক্তি!  কোনো কারণ ছাড়াই মৃত্যুবরণ করতে আপনি কাউকে দেখেননি? আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি কবরে একাই থাকবেন। আপনাকে মাটিচাপা দিয়ে আসা হবে। আপনার সুঠাম দেহে কীটপতঙ্গ বাসা বাঁধবে। তখন শুধুই আপনি আমলের ওপর নির্ভরশীল হবেন। আপনার পূর্বে যারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তার থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। আমার রবের রুবুবিয়াতের কসম করে বলছি আপনি অনুতপ্ত হবেন। আপনি নামাজ না পড়ার কারণে অনুতপ্ত হবেন। আপনি সেদিন অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করার কারণে অনুতপ্ত হবেন, আফসোস করবেন। কিন্তু সেদিন আপনার এই অনুতপ্ত হওয়া কোনো কাজে আসবে না। 

আর সেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, ‘হে আমারে রব, আমারেকে বের করে নিন, আমরা পূর্বে যে আমল করতাম, তার পরিবর্তে আমরা নেক আমল করব।’ (আল্লাহ বলবেন) ‘আমি কি তোমারেকে এতটা বয়স দিইনি যে, তখন কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল। কাজেই তোমরা আজাব আস্বাদন কর, আর জালিমের কোনো সাহায্যকারী নেই।

কাজেই সুনিশ্চিত সেই মৃত্যুর জন্য পাথেয় প্রস্তুত করুন। কারণ মৃত্যুর সময় সবার জন্য নির্ধারিত। জীবনে যত গুনাহ করেছেন তার জন্য তাওবা করুন। চির নিদ্রায় শায়িত হওয়ার আগেই সতর্ক হোন। যদি আপনি কোনো পাথেয় ছাড়াই আখেরাতের সফর শুরু করেন, তাহলে আপনি অনুতপ্ত হবেন। অন্যথায় হঠাৎ যদি ডাক এসে যায় তাহলে আপনি হতভাগ্য বলে বিবেচিত হবেন। আপনি কি এমন লোকের সফরসঙ্গী হতে চান? যাদের পাথেয় রয়েছে, কিন্তু আপনার তো পাথেয় নেই! আপনার বিবেকের কাছে সর্বশেষ প্রশ্ন। আপনার বিবেকের কাছে সর্বশেষ জিজ্ঞাসা। আমার ও অধিকাংশ লোকের অবস্থা কি এমনটা নয়? নামাজের সময় ঘুমিয়ে থাকা। জঘন্য সব পাপ ও নাফরমানিতে ডুবে থাকা। আপনার প্রতি তাই শেষ প্রশ্নটি করছি। আপনি কি আপনার কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট?  আজকে যদি মৃত্যু এসে যায়, তাহলে কি আপনি তার জন্য প্রস্তুত? আপনি কি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত? হে উদাসীনতায় ডুবে থাকা ব্যক্তি!  কবর আপনাকে ডাকছে। সুনিশ্চিত সেই মৃত্যুর জন্য পাথেয় প্রস্তুত করুন।

কুরআন মাজিদে ইরাশাদ হয়েছে, ‘‘হে আমার মু’মিন বান্দারা! আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর। জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী; অতঃপর তোমরা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আমি অবশ্যই তাদের বসবাসের জন্য সুউচ্চ প্রাসাদ দান করব জান্নাতে, যার পাশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, কত উত্তম প্রতিদান সৎকর্মশীলদের জন্য। যারা ধৈর্য অবলম্বন করে এবং তাদের রবের ওপর নির্ভর করে। (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৫৬-৫৯)

আবু হুরায়রা (রা.) তার (শেষ) রোগে কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কিসের জন্য কাঁদছেন আপনি? তিনি বললেন, শোনো! আমি তোমাদের এই দুনিয়ার জন্য কাঁদিনি। আমি কাঁদছি আমার সফরের দূরত্ব ও সম্বলের স্বল্পতার জন্য! আমি এখন জান্নাত অথবা জাহান্নামের দিকে চড়তে লেগেছি। আর জানি না যে, দুটির মধ্যে কোনটির দিকে আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে! (হিলয়াতুল আওলিয়া ১/৩৮৩)

এসব কথা যিনি বলছেন তিনি আবু হুরায়রা, যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পাঁচ হাজারের অধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, কিয়ামতের দিন পুলসিরাত পার হতে গিয়ে জাহান্নামে পড়ে যাই কিনা এটার জন্য আমার ভয় হয়। আজকাল আমাদের শেষ বয়সে উপনীত হওয়ার আগ পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামায আদায় করার সুযোগ হয় না। ফজরের নামাযে মুসল্লি খোঁজে পাওয়া যায় না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, মা-বাবার অবাধ্যতা, কন্যা সন্তানদের মিরাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা- প্রভৃতি ঘৃণিত কাজ করে আমলনামা পূর্ণ করছি। জলিলুল কদর একজন সাহাবি যিনি কিনা পুলসিরাত থেকে জাহান্নামে পড়ে যাওয়ার ভয় করেন, তাহলে আমার আপনার কী হতে পারে কল্পনা করা যায়?

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির