সর্বশেষঃ
post

১৭ রমাদান বদরযুদ্ধ সমরনীতিতে মানবিকতা ও জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম

নাবিউল হাসান

২৪ মার্চ ২০২২

ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাত এখন বিশ্ববাসীর সামনে প্রতীয়মান। দিনের পর দিন ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের খবর সারা বিশ্বের জন্য আতঙ্ক ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিন কিংবা কাশ্মিরের স্বাধীন ভূমিতে ইসরাইল ও ভারতের আগ্রাসন ক্ষত-বিক্ষত করে মানুষের হৃদয়। চীনের উইঘুর মুসলমানদের ওপর বর্বরতার ঘটনা প্রায় চাপা পড়ে গেছে। এখনও অশ্রু শুকায়নি রোহিঙ্গাদের চোখ থেকে। গত দুই শতাব্দী থেকে পৃথিবীতে এভাবেই চলছে কথিত সাম্যবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ধৃষ্ট আচরণ। জুলুম-অত্যাচারে প্রতিনিয়তই পিষ্ট হচ্ছে মানবতা। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে সংঘটিত হওয়া এই শতাব্দীর যুদ্ধগুলোতে অসহায় মানুষদের হত্যার চিত্র অবর্ণনীয়।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৮) সারা বিশ্বে ৯০ লক্ষ যোদ্ধা এবং ১ কোটি ২০ লক্ষ নিরীহ মানুষ নিহত হয়। প্রায় ১ কোটি সৈন্য এবং ২ কোটি ১০ লক্ষ সাধারণ মানুষ আহত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৪১-৪৫) মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। ঐ সময় জাপানের হিরোশিমাতে নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমায় তাৎক্ষণিক মারা যায় ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৬৬১ জন। তিনদিন পর দ্বিতীয় বোমা নিক্ষিপ্ত হয় জাপানের নাগাসাকি শহরে। এতেও সাথে সাথে মৃত্যুবরণ করে ২ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ। উভয় বোমার তেজষ্ক্রিয়তার কারণে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে এখনও মানুষ মরছে সেখানে। বংশপরিক্রমায় জাপানিরা বহন করে চলেছে এসব দুরারোগ্য ব্যাধি। ভিয়েতনামের যুদ্ধে (১৯৫৫-৭৩) দীর্ঘ ১৮ বছরে এককভাবে আমেরিকা ৩৬ লক্ষ ৭২ হাজার মানুষকে হত্যা করে ও ১৬ লক্ষ মানুষকে পঙ্গু বানায় এবং ৯ লক্ষ শিশু এতিম হয়। এছাড়াও বসনিয়া, চেচনিয়া, সার্বিয়া, সুদান, শ্রীলঙ্কা, সোমালিয়া, কসোভো, কাশ্মির, নেপাল, ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ আরো বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ হয়েছে। এইসব দেশে কথিত মানবাধিকারবাদী বা সাম্রা জ্যবাদীরা নিত্যদিন নানা অজুহাতে যে কত মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে- তার অন্ত নেই।
এই যুদ্ধ-বিগ্রহগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- শুধু নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা ও রক্তের হলিখেলা। অথচ আঁধার পৃথিবীতে আলোর দিশারি বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর জীবদ্দশায় ২৭টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। যেখানে এমন ক্ষয়ক্ষতি তো দূরের কথা- মুসলমানমানদের পক্ষ থেকে সামান্যতম মানবতাবিরোধী কোনো দৃশ্য পরিলক্ষিত হয় না। তাই বিশ্বনবী সা.-এর যুদ্ধনীতি বিশ্বের সবার জন্য অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চিরদিনের জন্য।
ইসলামের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ বদর পৃথিবীবাসীকে প্রদর্শন করে রাসূল সা.-এর সমরনীতি ও বন্দীনীতি। যে নীতিতে রণাঙ্গনের প্রতিটি দিক ও বিভাগেই রয়েছে শৃঙ্খলতা, আদব কিংবা শিষ্টাচার। সচেতনভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এইভাবে কেউ মজলুম হবে না, আবার মজলুমও তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। নবীজি মুহাম্মাদ সা. হলেন বিশ^শান্তির মুক্তিদূত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সেই আদর্শের ঘোষণা দিয়েছেন, “তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাব : ২১)
বিশ^নবী সা.-এর আদর্শকে অনুধাবন না করা ও না জানার ফলে পৃথিবীতে ইসলামের অনুসারী সরলপ্রাণ মুসলিমদের ওপর ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র অদ্যাবধি থামেনি। অন্যদিকে আজ মুসলমানরাও তাদের সোনালি অতীত ভুলে যেতে বসেছে। অথচ মহান আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে- “তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যাও, যতক্ষণ ইসলামী বিধান কায়েম করার পথ থেকে সকল বাধা অপসারিত না হয়ে যায় এবং সমগ্র জীবনব্যবস্থা আল্লাহর বিধানের অনুসারী না হয়ে যায়। এরপর যদি তারা বাধা দেওয়া থেকে বিরত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে অত্যাচারীদের কথা স্বতন্ত্র।” (সূরা বাকারা : ১৯৩) “তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং বিশেষ করে ঐসব অসহায় নর-নারী ও শিশুকে অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ কর না, যারা দোয়া করে- হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে এই জনপদ থেকে উদ্ধার কর, যার অধিবাসীরা জালেম। আমাদের জন্য তোমার পক্ষ থেকে কাউকে রক্ষক বানিয়ে পাঠাও এবং তোমার পক্ষ থেকে কাউকে সাহায্যকারী বানিয়ে পাঠাও।” (সূরা নিসা : ৭৫) “তোমরা যদি (জিহাদের জন্য) বের না হও তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন। এবং তোমাদের স্থলে অন্য কাউকে ক্ষমতায় বসাবেন, তাঁর কোনো ক্ষতিই তোমরা করতে পারবে না। আল্লাহ সব কিছুই করতে সক্ষম।” (সূরা তওবা : ৩৯) যেদিন মুসলিমরা তাদের গৌরবময় অতীতে ফিরে যাবে সেদিন আবার বদরের মতো আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় লাভ করবে এটাই স্বাভাবিক। আসুন, আমরা মুসলমানদের গৌরবদীপ্ত ইতিহাস থেকে বদর সম্পর্কে জানি ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে জীবনের প্রতিটি বাঁকে ইসলামকে আদর্শ হিসেবে মেনে নেই।
বদরের পরিচয়
বদর একটি কূপের নাম ছিল। ঐ কূপের নামানুসারেই অঞ্চলটির নাম ‘বদর’ হিসেবে পরিচিত। মরুময় বিস্তৃত ভূমি বদরের দক্ষিণ প্রান্ত উঁচু যা ‘উদওয়াতুন কাছওয়া’ নামে পরিচিত এবং উত্তর প্রান্তটি নিচু ও ঢালু যা ‘উদওয়াতুন দুনিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। তৎকালীন সময় মক্কা ও সিরিয়ার বাণিজ্যের কাফেলা এ বদর প্রান্তর দিয়েই যেত। এটি মদিনার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৮০-৮১ মাইল দূরে অবস্থিত। ঐ এলাকায় যুদ্ধ হয়েছিল বলেই যুদ্ধটি ‘বদর যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। বদরযুদ্ধ হলো মুসলিমদের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ, সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী অথবা ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, মুসলমানদের আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ, সত্যের পক্ষে; নিপীড়িতদের পক্ষে; মানবতার কল্যাণে ছিল এই যুদ্ধ। বদরযুদ্ধ সংঘটিত হয় উভয় পক্ষের নিকটাত্মীয়ের সাথে। সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সেদিন সন্তান তার বাবার বিরুদ্ধে, ভাই তার অপর ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। এজন্য পবিত্র কুরআনে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ বলা হয়েছে- “আর তোমরা জেনে রাখ, তোমরা যা কিছু গনিমতরূপে পেয়েছ, নিশ্চয় আল্লাহর জন্যই তার এক- পঞ্চমাংশ ও রাসূলের জন্য, নিকট আত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরের জন্য, যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং হক ও বাতিলের ফয়সালার দিন আমি আমার বান্দার উপর যা নাজিল করেছি তার প্রতি, যেদিন দু’টি দল মুখোমুখি হয়েছে, আর আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।” (সূরা আনফাল : ৪১)
বদরের প্রেক্ষাপট
রাসূল সা. মক্কার প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠী আবু জাহল, উতবা, শায়বাদের নির্যাতনে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন। মহান আল্লাহর ঐশী বাণীকে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ মহামানব কখনোই ইসলাম প্রচারের কাজ বন্ধ রাখতে পারেন না। ফলে মদিনায় হিজরত করেও তাঁর সাহাবিদের নিয়ে ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য দাওয়াতি কাজ অব্যাহত রাখেন। তাই মক্কার কুরাইশ কাফেরদের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত তখনও থেমে থাকেনি। তারা মদিনাতেও বিশ্বনবী সা.কে কষ্ট দেওয়ার জন্য ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। ভিতরে ভিতরে তাদের মিত্রদেরকে নিয়ে ইসলামের প্রচারণা বন্ধ করে দেওয়ার নানামুখী চেষ্টা অব্যাহত রাখে। দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাস তথা ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চে কুরাইশদের এক বিরাট কাফেলা সিরিয়া থেকে ফেরার পথে মুসলমানদের এলাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। সেই কাফেলার সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার আশরাফি মূল্যের সম্পদ এবং ৩০-৪০ জনের মতো রক্ষক ছিল। তাদের ভয় ছিল, মদিনার কাছে পৌঁছলে মুসলমানরা হয়তো তাদের ওপর হামলা করবে। কাফেলার সরদার আবু সুফিয়ান এই আশঙ্কা করে এক ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্যে মক্কায় পাঠিয়ে দিল। লোকটি মক্কায় পৌঁছেই এই বলে চিৎকার শুরু করলো যে, ‘তাদের কাফেলার ওপর মুসলমানরা হামলা চালাচ্ছে। কাফেলার সঙ্গে যে ধন-মাল ছিল, তার সাথে বহু লোকের স্বার্থ জড়িত ছিল। ফলে কুরাইশদের সমস্ত বড় বড় সর্দার যুদ্ধের জন্য সবাইকে প্রস্তুত করে। প্রায় এক হাজার যোদ্ধার এক বিরাট বাহিনী মক্কা থেকে মদিনা আক্রমণের জন্য যাত্রা করলো।
মুসলিম বাহিনীর পরামর্শসভা
কুরাইশদের মদিনা আক্রমণের খবর পেয়ে মুসলিম সামরিক বাহিনীর সেনাপতি বিশ্বনবী সা. সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভার বৈঠক করেন। যুদ্ধ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও পরামর্শ চান সাহাবিদের কাছ থেকে। সভায় আবু বকর রা. ও উমর রা. বক্তব্য রাখার পর মিকদাদ ইবনু আমর রা. উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল সা.! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনাকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন সে পথে আপনি চলতে থাকুন। আমরা সকল অবস্থায় ধৈর্যসহ আপনার সাথেই আছি। আল্লাহর কসম! আমরা আপনাকে ঐ কথা বলব না, যে কথা মূসা (আ)-এর সঙ্গীরা বলেছিল- তোমার প্রতিপালক ও তুমি যাও এবং যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে থাকব। (সূরা মায়িদাহ : ২৪) অবশ্যই আমাদের ব্যাপার ভিন্ন। আমরা বরং বলব, আমরা সর্বাবস্থায় আপনার সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করব। যিনি আপনাকে এক মহাসত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আপনি আমাদেরকে নিয়ে চলুন আমরা পথরোধকারীদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আপনার সঙ্গে সেখানে যাব।” হযরত মিকদাদ রা.-এর বক্তব্য শুনে বিশ্বনবী সা. খুব খুশি হলেন ও তার জন্য দোয়া করলেন। এরপর রাসূলে কারিম সা. সাহাবিদের উদ্দেশ্যে একটা বক্তব্য রাখলেন এবং বদরযুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
বদরযুদ্ধের প্রস্তুতি
বদরযুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ৩১৩ জনের সবাই ছিলেন মুহাজির ও আনসার সাহাবি। তাঁদের ঘোড়া ছিল ২টি, উট ৭০টি। সেনাধিপতি বিশ^নবী মুহাম্মাদ সা.। সহকারী সেনাপতি হযরত আবু বক্কর রা., হযরত উমর ফারুক, রা., হযরত হামজা রা., হযরত আলী রা.। যুদ্ধের সুনিপুণ পরিচালনার জন্য রাসূল সা. মুসলিম বাহিনীকে ২ ভাগে বিভক্ত করেন। একদল মুহাজিরদের সমন্বয় এবং অন্যদল আনসার সাহাবিদের সমন্বয়ে। তারপর নিরস্ত্র ৩১৩ জন সৈন্যের বাহিনী নিয়ে রাসূল সা. বদর অভিমুখে এগিয়ে চললেন। অন্যদিকে মুশরিকরা ছিল ১০০০ জন। তাদের অনেকগুলো উটসহ ছিল ১০০টি ঘোড়া, ৬০০টি লোহার বর্ম। খাবারের জন্য কোনোদিন ৮টি আবার কোনোদিন ১০টি পর্যন্তও উট জবাই হতো। মুশরিকদের সেনাধিপতি ছিল আবু জাহল, উতবা ইবনে রাবিয়া, উমাইয়া ইবনে খালাফ।
মুসলিম সামরিক ঘাঁটি স্থাপন
রাসূল সা. মুসলিম বাহিনীকে পথ এগোবার নির্দেশ দেন যেন মুশরিক বাহিনী ঝরনার পাশ দখলে না নিতে পারে। এজন্য মুসলিম বাহিনী রাসূল সা.সহ এশার সময় বদরের নিকট অবতরণ করেন। হযরত হাব্বাব ইবনে মুনযির রা.-এর পরামর্শে কুরাইশ বাহিনীর নিকটে একটি ঝরনার পাশে ঘাঁটি স্থাপন করলেন। তারপর কুরাইশ বাহিনীর সম্ভাব্য পানি সংগ্রহ করার সব ঝরনা বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের ঝরনার ওপর চৌবাচ্চা তৈরি করে তাতে পানি ভর্তি করার আদেশ দিলেন। সৈন্য পরিচালনা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য সাহাবিগণ রাসূল সা.-এর জন্য একটা কেন্দ্রস্থল ছাউনি নির্মাণ করলেন।
আল্লাহর সাহায্য চেয়ে বিশ^নবীর মুনাজাত
বিশ্বনবী সা. মুসলিম বাহিনীকে সুসজ্জিত করে আকাশের মালিকের নিকট হাত তুলে কাঁদতে লাগলেন তিনি মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন, “হে আল্লাহ! মুসলমানদের ক্ষুদ্র এ দলটিকে যদি আজ আপনি ধ্বংস করে দেন, তাহলে আপনার আর ইবাদত করার কেউ থাকবে না। হে আল্লাহ! আপনি কি চান আজকের পরে আপনার আর কখনো ইবাদত করা হবে না।... ” আবু বকর রা. এমন দৃশ্য দেখে দৌড়ে এসে রাসূল সা.-এর চাদরটিকে তুললেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আর কাঁদবেন না। আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবেন।”
আল্লাহর সাহায্য
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর পথে নিবেদিত মুসলমানদের জন্য বদরের প্রান্তরে মহান আল্লাহ অবারিত রহম বর্ষণ করেন। পবিত্র কুরআনে সূরা আরাফের ১১ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “সেই সময়ের কথা স্মরণ করো, যখন আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে প্রশান্তির জন্য তোমাদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেন। এটা তোমাদের পবিত্র করার জন্য এবং তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করার জন্য; তোমাদের মন দৃঢ় করার জন্য এবং তোমাদের পদযুগল প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য করা হয়েছে।” সেদিন মুসলমানদের দৃষ্টিতে কাফিরদের সংখ্যা কম এবং কাফিরদের দৃষ্টিতে মুসলমানদের সংখ্যা অনেক বেশি দেখানো হয়েছে। মুসলমানদের ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। প্রথমে এক হাজার, তারপর তিন হাজার এবং প্রয়োজনে পাঁচ হাজার ফেরেশতা পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রণাঙ্গনে মুখোমুখি লড়াই
ময়দানে যখন মুসলিম বাহিনী ও মুশরিক সৈন্যরা মুখোমুখি এসে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হয়। একদিকে আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ^াসে ভরপুর ও আনুগত্য স্বীকারকারী মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান, যাদের কাছে সাধারণ মানেরও কোনো যুদ্ধ সরঞ্জাম ছিল না। অন্যদিকে ১০০০-এর বেশি অস্ত্রে সুসজ্জিত কাফির সৈন্য, যারা এসেছে তাওহিদের আওয়াজকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে। যুদ্ধে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে ছিল মুহাজিরদের জন্য। তাঁদের প্রতিপক্ষ ছিল আপন ভাই, সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। কারো পিতা, কারো চাচা, কারো মামা আর কারো ভাই ছিল তাঁদের তলোয়ারের লক্ষ্যবস্তু এবং নিজ হাতে তাদের হত্যা করতে হয়েছিল এইসব কলিজার টুকরাগুলোকে। মূলত ঈমানের এই স্তরে উন্নীত হতে পারলেই বান্দার জন্য আল্লাহর সাহায্য নাজিল হয়ে থাকে। বদরযুদ্ধে তাই আল্লাহ তায়ালা এই সহায়-সম্বলহীন ৩১৩ জন মুসলমানকে সাহায্য করেন। এর ফলে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ১০০০ সুসজ্জিত সৈন্য অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পরাজয় বরণ করে এবং তাদের সমস্ত শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়।
যুদ্ধবন্দী ও শত্রুদের প্রতি বিশ্বনবীর মানবতা
বদরযুদ্ধের বন্দী আবু আজিজ ইবনে উমায়ের যখন বন্দী হয়ে আসেন, তখন মদিনার লোকজন নিজেরা না খেয়ে তাদের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই আচরণে মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (মু’যাম আল কবীর) হাদিসে রাসূলে এসেছে, “যে মুসলিম তার বন্দীর সাথে খারাপ ব্যবহার করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” (মুসনাদে আহমদ) মানুষকে জোর করে মুসলমান বানানোর উদ্দেশ্য ইসলামে নেই। যুদ্ধের উদ্দেশ্য হলো- ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অধিকার রক্ষা করা। তাই রাসূল সা. সব যুদ্ধেই একটি সুনির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করতেন। যুদ্ধের সময় কোনো শিশু, মহিলা, ধর্মীয় যাজক, বেসামরিক সাধারণ মানুষ, শ্রমিক এবং আত্মসমর্পণকারী সৈন্যদের হত্যা না করার কঠোর নির্দেশনা দেন বিশ^নবী সা.। তিনি অন্য ধর্মের লোকদের ধর্মীয় উপাসনালয় বা সম্পদ ধ্বংস করতে নিষেধ করেছেন। যুদ্ধে যেন কোনো কোনো ধরনের গাছপালা ও প্রাণিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।
যেকোনো পরিস্থিতিতে কোনো মানুষকে জোরপূর্বক মুসলমান বানাতেও নিষেধ করেছেন বিশ^নবী সা.। ক্ষতিগ্রস্ত সাহাবাগণ শত্রুদের জন্য রাসূল সা.-এর কাছে বদদোয়া ও শাস্তির আবেদন জানালে রাসূল সা. বলতেন “আমি অভিশাপ দেওয়ার জন্য আসিনি, বরং আমি এসেছি ক্ষমা প্রার্থনার জন্য।” (মুসলিম) হুনাইনের যুদ্ধে সাহাবিরা রাসূল সা.-এর কাছে আবেদন করেন, “হে আল্লাহর রাসূল সা.! সাকিফ গোত্রের তীর আমাদের ছিন্নভিন্ন করেছে। তাদের ধ্বংসের জন্য দোয়া করুন।” কিন্তু আল্লাহর রাসূল সা. দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! সাকিফ গোত্রকে হেদায়েত দান করুন।" (তিরমিজি) উহুদ যুদ্ধে শত্রুদের দ্বারা রাসূল সা. রক্তে রঞ্জিত হয়েও দোয়া করলেন, “হে আমার মালিক! আমার লোকদের ক্ষমা করুন। তারা জানে না যে, তারা কি করছে।” (ইবনে হিব্বান)
বদরের যুদ্ধবন্দীদের কাছে অতিরিক্ত কাপড় ছিল না। রাসূল সা. সবাইকে পরিধান করার মতো পোশাক দান করলেন। এর মধ্যে রাসূল সা.-এর চাচা আব্বাস ছিলেন দীর্ঘদেহের অধিকারী। কোনো ব্যক্তির জামা তাঁর গায়ের মাপে হচ্ছিল না। ফলে দীর্ঘদেহী মুনাফিক আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের একটি জামা আব্বাসকে দান করে। পরে আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যুর পর মুনাফিক ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও তার ছেলের অনুরোধে রাসূল সা. নিজের একটি জামা লাশের গায়ে পরানের জন্য দান করেন।
বদর যুদ্ধে আটককৃতদেরকে তিনি নানাভাবে মুক্তি দেন। তিনি বন্দীদের প্রতি যে উদারতা প্রদর্শন করেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। ৭০ জন বন্দির মধ্যে নযর ইবনু হারিস এবং উকবাহ ইবনু আবি মুঈত নামক মাত্র দুইজন গুরুতর অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া সবাইকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কয়েকজন বেশি অসহায় হওয়ার কারণে নিজ দেশে গিয়ে প্রত্যেকজন ১০ জন করে লোককে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করবে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছেড়ে দেন। মানবতার ইতিহাসে পরম শত্রুর প্রতি এমন উদারতা আর কোথাও দেখা যায়নি।
সহায়ক গ্রন্থ-
আর রাহিকুল মাখতুম : আল্লামা শফিউর রহমান মুবারকপুরী
সিরাতে সরওয়ারে আলম : সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী
রাসূলুল্লাহর (সা.) বিপ্লবী জীবন : আবু সলীম মুহাম্মদ আবদুল হাই
বিশ^নবী : গোলাম মোস্তফা

লেখক : সহকারী সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির