post

শান্তিতে বসবাসের জন্য একটি মানবিক পৃথিবী চাই

জালাল উদ্দিন ওমর

০৬ জানুয়ারি ২০২৪

মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেছে আরো একটি বছর, যেই বছরের একটি মুহূর্তও আর কখনো ফিরে আসবে না। সেই সাথে আমাদের সবার জীবন থেকেও একটি বছর বিদায় নিয়েছে এবং নতুন একটি বছর সবার সামনে উপস্থিত হয়েছে। বিদায় ২০২৩, স্বাগতম ২০২৪। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে যে সকল মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। পাশাপাশি এ বছর যে সব নতুন শিশু পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে তাদের সবাইকে স্বাগত জানাই। সময়ের পরিক্রমায় নতুন বছরও একদিন আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিয়ে যাবে। এভাবেই চলতে থাকবে জীবনের গতি। লক্ষ কোটি বছর ধরে চলে আসা পৃথিবীতে এটাই চিরাচরিত এবং স্বাভাবিক নিয়ম। বহমান এই সময়কে যথাযথ কাজে লাগাতে পারলেই জীবনে সুখ আসে, শান্তি আসে আর সমৃদ্ধি আসে। জীবন হয়ে ওঠে অর্থবহ এবং মূল্যবান। অপরদিকে এই সময়কে যথাযথ কাজে না লাগিয়ে যদি অপচয় করি এবং ব্যয় করি মূল্যহীন কাজে, জড়িত হই হিংসা, হানাহানি, মারামারি এবং যুদ্ধ বিগ্রহে তাহলে জীবন হয়ে পড়ে পশ্চাৎপদ ও দুর্বিষহ। তখন জীবনে নেমে আসে দুঃখ, কষ্ট আর অশান্তি। তাই আমাদের সবারই উচিত চলমান এই সময়কে যথাযথ কাজে লাগানো এবং এর থেকে সর্বোত্তম ফসল তুলে আনা। প্রয়োজন জীবনকে সুখী করা এবং শান্তিতে বসবাসের জন্য একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলা। সুতরাং বিদায়ী বছরকে পর্যালোচনা করে এর ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা যেমন আমাদের সবার জন্য জরুরি, ঠিক তেমনি নতুন বছরকে যথাযথ কাজে লাগানোর জন্য সঠিক পরিকল্পনা নেয়াও অপরিহার্য। তাহলেই কেবল সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সুখ, শান্তি, উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। 

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব এবং মহাবিশ্বের এই পৃথিবীতেই কেবল মানুষের বসবাস। মানুষের জীবন ধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। স্রষ্টা মানুষকে দিয়েছেন বিবেক, বৃদ্ধি, জ্ঞান এবং চিন্তার স্বাধীনতা। আজকের পৃথিবীতে জ্ঞান বিজ্ঞানের যত উন্নতি তার সবই মানুষেরই অবদান। কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উন্নতি সত্ত্বেও মানুষের জীবনে আজ সুখ এবং শান্তি নেই। শান্তিময় জীবন যাপনের জন্য মানুষের মাঝে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য এবং মানবিকতা প্রয়োজন। মানুষের মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ লালসা এবং বিভেদ দ্বন্দ্ব দূর করতে হবে। তাহলে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। ফলে মানুষের জীবন সুখের এবং শান্তিময় হবে। মানুষ নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে পারবে এবং পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বিশ্ব আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। আর এসব সমস্যা কিন্তু মানুষেরই সৃষ্টি। সুতরাং শান্তির স্বার্থে মানুষকেই আজ এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। 

প্রথমেই জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বশেষে সকল মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের দেশে দেশে বহু মানুষ আজ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রত্যেক মানুষেরই কতকগুলো মৌলিক অধিকার থাকে, যা যে কোনো দেশের, যে কোনো ধর্মের এবং যে কোনো নাগরিকের বেলায় সমভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বব্যাপী মানুষের এই মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৮ সালের ১০ ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সার্বজনীন মানবাধিকারের নীতিমালা গ্রহণ করে। সেই থেকে ১০ই ডিসেম্বর প্রতিটি বছর বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আর মানুষের মৌলিক মানবাধিকারকে নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকারের এই ঘোষণাপত্রে বিভিন্ন উপধারাসহ মোট ৩০টি মূলধারা সংযুক্ত করা হয়। এই ঘোষণাপত্রে- আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার, জাতীয়তা লাভের অধিকার, চিন্তা-বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার, সভা সমাবেশ করার অধিকার, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজ দেশে সরকারে অংশগ্রহণের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার, সকলের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং সর্বোপরি শাসনতন্ত্র বা আইন কর্তৃক প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে বিচার বা আদালতের মাধ্যমে তার কার্যকর প্রতিকার লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল দেশের মানুষের এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ^জুড়েই আজ শোষণের মহোৎসব চলছে। তাইতো পৃথিবীর অর্ধেক সম্পত্তির মালিক মাত্র ৬২ জন লোক। অর্থাৎ মাত্র ৬২ জন লোকের হাতেই পৃথিবীর মোট সম্পদের অর্ধেক কুক্ষিগত হয়ে আছে। কেউ দিন দিন ধনী হচ্ছে, আবার কেউ দিন দিন গরিব হচ্ছে। এর ফলে বিশ^জুড়ে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। প্রতিদিন বাড়ছে গরিবের সংখ্যা। বাড়ছে পুষ্টিহীনতা, অশিক্ষা, মূর্খতা এবং নিম্নমানের জীবন। কেউ অট্টালিকায় আবার কেউ বস্তিতে বাস করছে। মানবতার স্বার্থেই মানুষের মাঝে বিদ্যমান এই শোষণ বঞ্চনা দূর করতে হবে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতা সত্ত্বেও বিশ্ব থেকে যুদ্ধ নির্মূল এবং বন্ধ হয়নি। সব সময় এই পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চলে অতীতেও যুদ্ধ চলেছে এবং বর্তমানেও যুদ্ধ চলছে। একটি যুদ্ধ শেষ না হতেই পৃথিবীতে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বর্তমানে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধ বিশ্বে চলমান যুদ্ধসমূহের সাথে আরেকটি নতুন সংযোজন। গৃহযুদ্ধ চলছে লিবিয়ায়, সিরিয়ায় ও ইয়েমেনে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ তিনটি দেশে যুদ্ধ চলছে। ইরাকে এবং আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলেছে। ইরাকে প্রায় এক দশক এবং আফগানিস্তানে প্রায় চার দশক ধরে যুদ্ধ চলেছে। এ দু’টি দেশে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। আফগানিস্তানের তিরিশ লাখেরও বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। বর্তমানে এ দুটি দেশে যুদ্ধ বন্ধ হলেও দেশ দুটিতে পুরোপুরি ভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুদ্ধে যুদ্ধে এসব দেশ আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এসব দেশের সাধারণ জনগণের জীবনে আজ কষ্টের শেষ নেই। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা যুদ্ধে এসব দেশে ধ্বংস হয়েছে বাড়িঘর, অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। নিহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছে কয়েক লাখ মানুষ। যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচার তাগিদে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে ভিন দেশে উদ্বাস্তুর জীবন যাপন করছে অগণিত মানুষ। যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় শিশু, মহিলা এবং বয়স্করা। যুদ্ধের কারণে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে যায়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে উদ্বাস্তুর সংখ্যা এখন প্রায় ছয় কোটি এবং এদের পরিচয় এখন শরণার্থী। এসবই হচ্ছে যুদ্ধের উপহার এবং অর্জন। মূলত যুদ্ধে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই অর্জন হয় না। এসব যুদ্ধে যে সব অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে তার মূল্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। অথচ এই সব অর্থ অস্ত্র এবং যুদ্ধের পেছনে ব্যয় না করে যদি মানবতার কল্যাণে ব্যবহৃত হতো, তাহলে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং অশিক্ষা বহু আগেই দূর হয়ে যেত। ফলে পৃথিবীজুড়ে শান্তি বিরাজ করত। যুদ্ধ মানবতার জন্য কখনো কোনো ধরনের কল্যাণ বয়ে আনেনি এবং ভবিষ্যতেও আনবে না। আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। আমরা মানবতার মুক্তি চাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ বিশ্বকে যুদ্ধমুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৭৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রতি বছর জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতিসংঘে সম্মেলন হয় এবং এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা তাদের প্রদত্ত বক্তৃতায় বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ বন্ধ হয় না এবং শান্তিও প্রতিষ্ঠা হয় না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশের মাঝে বিদ্যমান যুদ্ধ বন্ধে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধ জাতিসংঘ বন্ধ করতে পারেনি। কয়েক দশক ধরে চলে আসা ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের দখলদারিত্ব বন্ধেও জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে। ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি বছরের পর বছর ধরে উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাস করছেন। এদের অনেকেই উদ্বাস্তু শিবিরেই জন্মগ্রহণ করেছেন, উদ্বাস্তু শিবিরেই বড় হয়েছেন এবং উদ্বাস্তু শিবিরেই মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের নিজভূমিতে প্রত্যাবাসনেও জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে। এসব রোহিঙ্গা আজ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিরাট এক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গারা আজ বাংলাদেশের জন্য বিরাট একটি সঙ্কট সৃষ্টি করেছে, যার আশু সমাধান খুবই জরুরি। যারা নিজেদের ক্ষমতা এবং প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্য যুদ্ধ করছেন, মানুষকে হত্যা করছেন এবং সবকিছু ধ্বংস করছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, আপনারা কেউই চিরদিন এই পৃথিবীতে বাঁচবেন না। আপনাদের এই ক্ষমতা এবং সাম্রাজ্যও আপনি চিরদিন ভোগ করতে পারবেন না। তাই মানুষে মানুষে যুদ্ধ এবং হানাহানি চিরতরে বন্ধ করুন। আর গড়ে তুলুন ভালোবাসার পৃথিবী, যেখানে আপনি আমি সকলেই সুখে শান্তিতে বসবাস করবো। 

মাদক বিশ্বব্যাপী মানবজাতির জন্য আজ ভয়াবহ এক সমস্যার নাম। দেশে দেশে মহামারী আকারে আজ মাদকের আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়েছে লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবন, সুন্দর এবং সাজানো ভবিষ্যৎ। প্রতিনিয়তই অসংখ্য মানুষ মাদকে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষই সর্বনাশা মাদকের ছোবলে আক্রান্ত। বস্তি থেকে প্রাসাদ এবং বলিউড থেকে হলিউড সর্বত্রই মাদকের উপস্থিতি বিদ্যমান। নর-নারী, ছোট-বড়, ধনী-গরিব, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত সবাই মাদকের নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে। এই মাদক মানবজাতির জন্য একটি ক্যান্সার। ক্যান্সারের মতো মাদকদ্রব্যও মানব দেহের সকল শক্তি এবং সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়। এই মাদকের সাম্রাজ্য অনেক বিস্তৃত। সিগারেট, মদ, গাঁজা, আফিম, হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, আইস ইত্যাদি মাদকের বিভিন্ন রূপ। এসবে মাদক বা নেশার মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। মাদকের প্রথম ধাপ কিন্তু ধূমপান। যারা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে তারা সবাই প্রাথমকিভাবে ধূমপানে আসক্ত ছিল। পর্যায়ক্রমে তারা শক্তিশালী মাদকে আসক্ত হয় এবং ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যে একবার মাদকের নেশায় আক্রান্ত হয়েছে, সে ক্রমেই আরো বেশি করে মাদকের কোলে ঢুকে পড়েছে এবং দিনের পর দিন আরো বেশি করে মাদক গ্রহণ করেছে। এক পর্যায়ে সে ধ্বংস হয়েছে। নিয়মিত মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তিটি ক্রমান্বয়ে তার স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে ফেলে এবং আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংসার কোনোটাই সম্ভব নয়। সুতরাং সকল ধরনের মাদকদ্রব্য নির্মূল করতে হবে। মাদকের কবল থেকে যে কোনো ভাবেই হোক মানবজাতিকে রক্ষা  করতে হবে। মাদককে বর্জন করে সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনই গড়তে হবে। তার জন্য প্রয়োজন সকল মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং প্রয়াস। রাষ্ট্রের উদ্যোগে মাদকের উৎপাদন এবং বিপণন বন্ধ করতে হবে। মাদক ব্যবসায় জড়িতদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক উদ্যোগে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাতে হবে এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে জনগণকে বুঝাতে হবে। সুতরাং আসুন আমরা মাদকমুক্ত জীবন গড়ি এবং গড়ে তুলি মাদকবিরোধী একটি সামাজিক আন্দোলন। জীবন কিন্তু একটাই। সুতরাং সেই জীবনকে মাদকের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে এবং স্বাভাবিক জীবন গড়তে হবে । 

বিশ্বব্যাপী নারী নির্যাতন আজ আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা। সময়ের সাথে সাথে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি কেবলই বাড়ছে, একই সাথে বাড়ছে সংসারের ভাঙন। ঘরে বাইরে সর্বত্রই নারীরা আজ যৌন হয়রানির শিকার। এই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক মেয়ের জীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগ নেমে এসেছে। যৌন নির্যাতনের অপমান এবং যন্ত্রণা সইতে না পেরে অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। নারী নির্যাতন বন্ধে প্রতি বছর ৮ই মার্চ বিশ্বব্যাপী নারী দিবস পালন করলেও নারী নির্যাতন কিন্তু কমছে না বরং সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে আমরা ধর্মকে পরিত্যাগ করছি। আর ধর্ম ছাড়া মানুষ কখনো নৈতিক চরিত্রে সমৃদ্ধ হতে পারে না। আর নৈতিকতা ছাড়া কখনো নারী নির্যাতন সহ কোনো ধরনের অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা সম্ভব নয়। মানুষের নৈতিক অধঃপতনের প্রধান কারণ হচ্ছে ধর্মহীনতা। ধর্মকে পরিত্যাগ করে কেউ ভালো হতে পারেনি। আধুনিকতার নামে ধর্মকে পরিত্যাগ করার ফলে মানুষ হারিয়ে ফেলেছে চারিত্রিক মাধুর্য, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতা। ফলে অপরাধ বাড়ছে, নারী নির্যাতন বাড়ছে এবং যৌন নিপীড়ন বাড়ছে। আর নারী নির্যাতন চরিত্রহীন লোকদের অপকর্মের একটি দিক মাত্র। যে ব্যক্তি নারী নির্যাতনে জড়িত সে কিন্তু অনেক ধরনের অপকর্মেই জড়িত এবং এটাই প্রমাণিত সত্য। সুতরাং সত্যিকার অর্থেই যদি আমরা নারী নির্যাতনমুক্ত এবং নারীর প্রতি সহিংসতামুক্ত একটি সমাজ চাই তাহলে ধর্মকেই অনুশীলন করতে হবে এবং ধর্মীয় অনুশাসনই কেবলমাত্র নারীর প্রতি সহিংসতা এবং যৌন নির্যাতন বন্ধ করতে পারে এবং এটাই একমাত্র পথ। মোট কথা নারী নির্যাতন কমাতে হলে ধর্মীয় অনুশাসন বাড়াতে হবে। কারণ প্রত্যেক ধর্মই নারী নির্যাতন এবং নারীর প্রতি যৌন হয়রানিকে নিষিদ্ধ করেছে। যৌনতাকে ফ্রি করা সত্ত্বেও, পশ্চিমা সমাজে নারীরা নির্যাতনের শিকার। পারিবারিক অবকাঠামো সেখানে পুরোপুরিই ধসে পড়েছে। বিয়ে না করে সেখানে নারী পুরুষ লিভ টুগেদার করছে। অনেক দেশে সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। কুমারী মাতা এবং অবৈধ সন্তানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পশ্চিমা সমাজেই মরণব্যাধি এইডসের প্রকোপ বেশি। আর এসবই ধর্মহীনতার পরিণাম। এ অবস্থায় নারী নির্যাতনমুক্ত একটি সুন্দর সমাজের জন্য প্রত্যেকের উচিত তার নিজ নিজ ধর্মকে অনুসরণ করা এবং এর আলোকে মানুষকে চরিত্রবান করে গড়ে তোলা।

এই পৃথিবীতেই আমাদের বসবাস। তাই এই পৃথিবীতেই আমাদের বসবাসের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের নিজেদের স্বার্থে মানবিক সমাজ গঠন করতে হবে। মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শোষণ বঞ্চনা বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধ বিগ্রহ চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে হবে। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ নয় বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আজ যুদ্ধ করতে হবে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে। মারণাস্ত্র না বানিয়ে বরং এসব ধ্বংস করতে হবে। নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং নারীর জন্য নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। মাদকের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মানবজাতিকে বাঁচাতে হবে। পৃথিবীর শতকোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। অস্ত্র নির্মাণে অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ আজ বিপন্ন মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ যে সব মানুষ শরণার্থী হিসাবে বিভিন্ন উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাস করছে তাদেরকে নিজ নিজ দেশের নিজ বাসভূমিতে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে হবে। মানবিকতাকে ছড়িয়ে দিতে হবে সবখানে। রোগব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীর বিরাট এলাকার মানুষ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ভাবে ক্ষতির মুখোমুখি। এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে সত্যিকারের মানবিকতা। সুতরাং আসুন এই পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল ধরনের অন্যায়, অনৈতিকতা ও যুদ্ধকে বন্ধ করি এবং এর মাধ্যমে এসব দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করি। শান্তিতে বসবাসের জন্য একটি মানবিক পৃথিবী চাই এবং সবাই মিলে মিশে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।

লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক 
Email : [email protected]

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির