post

প্রদীপ্ত মিছিলের হাতছানি

রাজিবুর রহমান

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

দার্শনিক মহলে বিতর্ক আছে, ‘বর্তমান’ বলতে আদতে কিছু নেই। ‘বর্তমান’ শব্দটি উচ্চারণ করতে করতেই তা নিজেও অতীতের গর্ভে হারিয়ে যায়। এমন নশ্বর অযুত-লক্ষ-কোটি বর্তমানের সমষ্টিই মানবজীবন; মহাকালের কাছে যা নিতান্তই সামান্য সময়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “মানুষের জীবনের অতীতটা হচ্ছে একটা স্বপ্ন, ভবিষ্যৎটা হচ্ছে একটা আকাক্সক্ষা; আর মাঝখান থেকে সময় সব চলে যাচ্ছে।” আমাদের এই সংক্ষিপ্ত সময়ের পথচলায় এমন কিছু মুহূর্ত এসে উপস্থিত হয়, যা ঘুরিয়ে দেয় জীবনের বাঁক। জীবনকে মুখোমুখি করে দেয় এক নতুন যুগসন্ধিক্ষণের। 

নবম শ্রেণিতে ওঠার পর আমার জীবনে এসে উপস্থিত হলো বাঁকবদলের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জানি না, সেদিনের সেই মুহূর্তগুলো না এলে জীবনসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ আমাকে ঠিক কোন বেলাভূমিতে আছড়ে ফেলত! হয়তো হারিয়েই যেতাম সময়ের অজানা কোনো স্রােতে। অশ্লীলতার জীবনধ্বংসী নর্দমায় কীট হিসেবেই পড়ে থাকতাম হয়তো। হেরার প্রদীপ্ত আলোর মিছিলের সন্ধান পাওয়া হতো না এ জনমে। কিন্তু রাব্বুল আ’লামিন আমাকে অনুগ্রহ করেছেন, পাইয়ে দিয়েছেন সত্য পথের সন্ধান। 

তখন পর্যন্ত ইসলাম বলতে আমি কেবল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াকেই বুঝতাম। এটি যে এক বিপ্লবী জীবনব্যবস্থার নাম; এ ধারণা তখনও আমার মধ্যে জন্মায়নি। আজ চারদিকে যে নৈতিক অবক্ষয়ের সয়লাব চিত্র দেখছি, আমাদের বাল্যকালটা ছিল এর সূচনালগ্ন। তাই এলাকার ছেলেদের সাথে মিশতে দিতেন না বাবা। ভয় পেতেন তিনি, অসৎ সঙ্গে মিশে নষ্ট না হয়ে যাই! স্কুল ও মসজিদের বাইরে সাধারণত ঘরেই থাকতাম সবসময়। বাইরের পৃথিবী নিয়ে জ্ঞান ছিল সামান্যই।

বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত বাবার সাথে আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে গিয়েছি বহুবার। এলাকার সমবয়সী বিএনপিপন্থীদের সাথে প্রায়ই বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। বাবার পথ ধরে আমিও একজন খাঁটি মুজিব সৈনিক হয়ে উঠব; এমন স্বপ্নই বুনেছি সে সময়টায়। এমন অবস্থা থেকে ইসলামী আন্দোলনের মতো একটি নিয়ামতের সন্ধান লাভ ছিল আমার কাছে দুনিয়াতেই জান্নাত প্রাপ্তির মতো আনন্দের। সে অনুভূতি ভাষায় রূপ দেওয়া অসম্ভব!

একদিনের ঘটনা। পাশের গ্রামের কয়েকজন মহিলা সম্ভবত দাওয়াতি কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে আসরের নামাজের সময় হলে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে আমার মায়ের কাছে নামাজ আদায়ের সুযোগ চাইলেন। মা আনন্দের সাথে নামাজের ব্যবস্থা করে দিলেন তাদের জন্য। নামাজ শেষ হলে সেই আন্টিদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন মা। পৃথিবীর সকল মা-ই সম্ভবত তাঁদের সন্তানদের ব্যাপারে ভালো কথা বলতে ও শুনতে পছন্দ করেন। আমার মা-ও তার ব্যতিক্রম নন। তিনি আন্টিদের বললেন, ‘আমার ছেলেটা ভালো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।’ তখন একজন আন্টি বললেন, ‘বাবা, তাহলে তো তুমি শিবির করতে পার! ভালো ছেলেরা শিবির করে।’

এই একটি কথা আমার জীবনের মোড় ঘোরাতে অনুঘটকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। জীবনে প্রথমবারের মতো ‘শিবির’ শব্দটি শুনলাম এবং সেই আন্টিকে আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আন্টি, শিবির কী?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমার ছেলে শিবির করে। তাকে তোমার কাছে পাঠাবো। সে তোমাকে শিবির সম্পর্কে বিস্তারিত বলবে, কেমন?’ সেই আন্টিরা সেদিন চলে যাওয়ার পর থেকে আমার হৃদয়ে কেবল একটি কথাই বাজতে লাগল, ‘ভালো ছেলেরা শিবির করে।’ হৃদয়-মন আবেশিত হয়ে পড়ল আমার। আমি যেন পেয়ে গেলাম এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান; ঝলমলে আলোকোজ্জ্বল এক সুসজ্জিত গুলবাগের।

আন্টির ছেলের নাম রাশেদীন আলম। পরদিন স্কুল ছুটির পরই দেখা হয়ে গেল তাঁর সাথে। দূর থেকে তিনিই প্রথম আমাকে সালাম দিলেন। বড়রাও যে ছোটদের সালাম দিতে পারেন; জীবনে সেটাই ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। তাই খানিকটা লজ্জিত এবং অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। সালামের জবাব দিতেই তিনি কাছে টেনে বিভিন্ন কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। এরপর নিরিবিলিতে কিছু কথা বলার ইচ্ছে পোষণ করে সময় চাইলেন আমার কাছে। আমি বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ করলাম তাঁকে।  তিনি সম্মত হলে আমি খুশিমনে ফিরে চললাম বাড়ির দিকে। 

বৃহস্পতিবার বেশ আগ্রহ নিয়ে বিকেল ৪টা বাজার অপেক্ষা করছি। তখন পর্যন্ত শুধু ‘শিবির’ শব্দটি ব্যতীত আর কিছুই জানা নেই আমার। ঠিক ৪টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় টোকা পড়ল। শিবিরের একজন দায়িত্বশীলের এহেন সময় সচেতনতায় অভিভূত হয়ে পড়লাম আমি। রাশেদীন ভাই বাড়িতে না বসে মসজিদের মাঠে বসার প্রস্তাব করলেন। তাঁর সাথে অগ্রসর হলাম মসজিদ মাঠের দিকে। সেদিন তিনি ২৫ থেকে ৩০ মিনিট কথা বললেন। সূরা আলে ইমরানের ১০৩ ও ১০৪ নাম্বার আয়াত দুটি ব্যাখ্যা করে শোনালেন আমাকে। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তাঁর কথা। ইসলাম যে নিছক একটি ধর্ম নয় বরং এক বিপ্লবী জীবনব্যবস্থার নাম; এ সম্পর্কে সেদিনই প্রথম জানলাম। 

তবে যে জিনিসটি আমাকে এ আন্দোলনের প্রতি সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করল, তা হলো তাঁর প্রীতিপূর্ণ আচরণ। পরিবারে আদর এবং শাসন; দুটোই থাকতো। কিন্তু দায়িত্বশীল ভাইদের সান্নিধ্যে গেলে মনে হতো, তারা শাসন করতে জানেন না, কেবলই জানেন হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসতে। সেদিন সমর্থক ফরম পূরণের মধ্যে সত্য পথের সৈনিকদের সঙ্গে আমার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজও তা চলছে নিরন্তর। অজ¯্র ঘাত-প্রতিঘাত সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আমাকে থামিয়ে দেওয়ার স্পর্ধা নিয়ে। কিন্তু আমি কী করে থামব? আমার হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছে কবি আল মাহমুদের কবিতার চরণ-

‘আমাদের হাতে একটি মাত্র গ্রন্থ আল কুরআন,

এই পবিত্র গ্রন্থ কোনোদিন, কোনো অবস্থায়, কোনো তৌহিদবাদীকে থামতে দেয়নি।

আমরা কি করে থামি?’

লেখক : সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির